‘হিটলারের পূজারি’ সাকিবের সব রেকর্ড মুছে ফেলা উচিত: সাবেক প্রেস সচিব

ক্রীড়া ডেস্ক
ফেসবুক পোস্টে সাকিব আল হাসানের সব ক্রিকেটীয় রেকর্ড ও পরিসংখ্যান মুছে ফেলতে বিসিবির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে ‘গণহত্যাকারীর পূজারি’ ও ‘হিটলারের পূজারি’ বলে অভিহিত করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও ইংরেজি গণমাধ্যম ডেইলি ওয়াদার প্রধান সম্পাদক শফিকুল আলম। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, সাকিবের সব রেকর্ড ও পরিসংখ্যান যেন মুছে ফেলা হয়।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে শফিকুল এমন মন্তব্য করেন। এর আগে এ দিনই বার্তা সংস্থা রয়টার্সে সাকিবের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে সাকিব বলেছেন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে তিনি দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত রয়েছেন।

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের একসময়কার পোস্টার বয়। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বোর্ডের (আইসিসি) র‌্যাংকিংয়ে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই অলরাউন্ডার হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিলেন তিনি। ক্রিকেটীয় রেকর্ড ও পরিসংখ্যান বিবেচনায় দেশের ইতিহাসে অবিসংবাদিতভাবে সেরা ক্রিকেটার তিনি। বৈশ্বিক ক্রিকেটেও তাকে ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন বিবেচনা করা হয়।

দেশের ক্রিকেটের এই পোস্টার বয়কে নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের এমন বিরূপ মনোভাবের পেছনে রয়েছে সাকিবের রাজনৈতিক অবস্থান। ক্রিকেটের বাইরেও বিভিন্ন সময়ে নানা ‘বিতর্কিত’ ঘটনায় আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। পরে ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে মাগুরা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

ওই সময়েই সাকিবের রাজনৈতিক দলে যোগদান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সাকিব আল হাসান যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। নিজের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব না থাকলেও তার স্ত্রী-সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। পরিবারের সঙ্গে এখন পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করছেন তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাকিব আল হাসানের দেশে ফেরা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা উঠেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে একবার অন্তর্বর্তী সরকারের ‘নিরাপত্তার আশ্বাসে’ দেশে ফেরার পথেও ছিলেন তিনি। পরে যাত্রাপথে দুবাই থেকে ফিরে যেতে হয় তাকে।

পরে আরও একবার দেশে ফেরার উদ্যোগ নিয়েছিলেন সাকিব। তবে এর মধ্যে জুলাইয়ে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন তিনি। ধারণা করা হয়, সে কারণেই তার বিরুদ্ধে ফের জনমত তৈরি হয় এবং তার দেশে ফেরা আটকে যায়।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও সাকিবের দেশে ফেরা নিয়ে নানামুখী আলোচনা হয়েছে। তবে এবারে জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিন গত ৫ আগস্ট সাকিব আল হাসান ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন, যে অনুষ্ঠানে চেহারা না দেখালেও ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন শেখ হাসিনাও। ফলে আরও একবার সাকিবের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। সে দিন রাতে তার মাগুরার বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটে।

এদিকে সাকিব আল হাসানের নামে বর্তমানে দুটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটিতে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় এক বিক্ষোভকারীকে হত্যায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আরেকটি মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনের, যেখানে তার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শেয়ার বাজারে কারসাজির মাধ্যমে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। তার সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টও আদালতের আদেশে জব্দ করা রয়েছে।

সবশেষ রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাকিব তার বিরুদ্ধে থাকা মামলা দুটিতে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নিজেকে ১০ বছর ধরে সর্বোচ্চ করদাতা খেলোয়াড়ের একজন দাবি করে সাকিব বলেছেন, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো তদন্তের নামে দেড় বছর ধরে জব্দ রাখা হয়েছে। তদন্তের জন্য সব তথ্য দিতে প্রস্তুত জানিয়ে তিনি আরও বলেছেন, তদন্ত করে কিছু না পেলে অ্যাকাউন্টগুলো যেন খুলে দেওয়া হয়।

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সাকিবের সম্পর্কই মূলত এখন তার দেশে ফেরার পথে বড় বাধা। এসব কারণেই শফিকুল আলম তাকে নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে তার খেলার রেকর্ড পর্যন্ত মুছে দিতে বলেছেন।

শফিকুল আলম লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) উচিত সাকিব আল হাসানের সব রেকর্ড, পরিসংখ্যান ও অর্জনের স্বীকৃতি মুছে ফেলা। যে ক্রিকেটার প্রকাশ্যে একজন দণ্ডিত গণহত্যাকারীকে (ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা) পূজা করে, তার নাম ক্রিকেটের ইতিহাসে থাকার কোনো অধিকার নেই। সাকিবের নাম ও রেকর্ড ইতিহাস থেকে মুছে গেলেও বাংলাদেশের ক্রিকেট একটুও গরিব হবে না।’

ব্যারি রিচার্ডস, গ্রায়েম পোলক, পিটার পোলক, মাইক প্রক্টর ও এডি বার্লো— এসব ক্রিকেটারের উদাহরণ টেনে শফিকুল লিখেছেন, “তারা সবাই সাকিবের চেয়ে অনেক বড় মাপের ক্রিকেটার ছিলেন। তাদের হাতে কোনো রক্তের দাগ ছিল না। তারা সাকিবের মতো দুর্নীতিগ্রস্তও ছিলেন না। তাদের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল বর্ণবাদী অ্যাপারথাইড শাসনের সময় দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলা, যে শাসনব্যবস্থা তাদেরকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সে কারণেই তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বঞ্চিত হন। অথচ ব্যারি রিচার্ডসকে অনেকেই তার সময়ের সেরা ব্যাটার বলে মনে করেন।’

‘সাকিবাল’ একজন ‘হিটলার’-এর পূজারি— এমন মন্তব্য করে সাবেক এই প্রেস সচিব লিখেছেন, “তিনি (সাকিব) দেশে ফিরে একটি ‘হত্যাকারী শাসনব্যবস্থা’কে পুনর্বাসিত করার স্বপ্ন দেখেন এবং হয়তো একদিন বিসিবির সভাপতিও হতে চান। তার ‘ক্যাপ্টেনে’র (শেখ হাসিনা) নেতৃত্বে সংঘটিত গণহত্যা নিয়ে তিনি কখনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি, যে অপরাধগুলোর বিস্তারিত তথ্য একটি স্বাধীন জাতিসংঘের অনুসন্ধানী মিশনের প্রতিবেদনে নথিভুক্ত হয়েছে।’

“মানবতাবিরোধী অপরাধকে সমর্থনকারী এবং একটি ‘ফ্যাসিবাদী শাসনে’র তোষামোদকারী এমন একজনের স্থান আমাদের ক্রিকেটে থাকা উচিত নয়। আমরা এমন কোনো ক্রীড়া নায়ক চাই না, যারা মানবতাবিরোধী অপরাধে মদত দেয়,”— লিখেছেন শফিকুল আলম।

ডেইলি ওয়াদার এই প্রধান সম্পাদক আরও লিখেছেন, ‘২০০৯ সালে বিডিআর সদর দপ্তরে ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কাবাডি, ভলিবল, বাস্কেটবল, কুস্তি ও অ্যাথলেটিক্সের বহু জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাদের জন্য কেউ অশ্রু ঝরায়নি, কেউ তাদের প্রতি দয়া দেখানোর আবেদনও করেনি।’

‘সাকিবের জানা উচিত— একজন গণহত্যাকারীর বন্দনা করে কেউ শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যেতে পারে না,’— লিখেছেন শফিকুল আলম।

ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

পিছু হটল ফিফা— বিশ্বকাপের বিতর্কিত বিনিয়োগ পরিকল্পনায় কী ছিল?

প্রথম দিকে ফিফা দাবি করেছিল, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা ছিল, এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের মতো সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবল সম্পদের ওপর বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি হবে। সেই বিতর্কই শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি ভেস্তে দেয়।

৭ দিন আগে

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে দেশ ছাড়ল টাইগাররা

প্রথম ফ্লাইটে ১০ জন কোচিং স্টাফদের সঙ্গে উড়াল দিয়েছেন কয়েকজন ক্রিকেটারও। তানজিদ তামিম ও অমিত হাসান একসঙ্গে এলেও আলাদাভাবে বিমানবন্দরে পৌঁছান তাইজুল ইসলাম, মুশফিকুর রহিম, খালেদ আহমেদ ও সাদমান ইসলাম। প্রিয় তারকাদের কাছ থেকে দেখতে ভিড় করেন অনেক সমর্থক। তবে এদিন ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি কেউই।

৭ দিন আগে

বিশ্বকাপের ‘বিক্রি’ ঠেকাতে ফিফাকে বয়কটের হুমকি উয়েফার

উয়েফা জানিয়েছে, সদস্যদেশগুলো চলতি সপ্তাহেই ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অবস্থান জানাবে। এর ফলে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা এখন বড় বাধার মুখে পড়েছে।

৭ দিন আগে

সেমিতে ফকল্যান্ড ব্যানার-ফাইনাল শেষে মারামারি: শাস্তির মুখে আর্জেন্টিনা

আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালের পর মাঠে সংঘর্ষে জড়িত কয়েকজন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও আলাদা অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

৯ দিন আগে