মাশহাদে চিরনিদ্রায় শায়িত আলি খামেনি, বিদায় জানাতে লাখো মানুষের ঢল

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
জন্মস্থান মাশহাদে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে বৃহস্পতিবার জনতার ঢল নামে। ছবি: রয়টার্স

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে তার জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজা দরগাহে দাফন করা হয়েছে। সপ্তাহ জুড়ে চলা রাষ্ট্রীয় জানাজা, শোকমিছিল ও জনসমাবেশের মধ্য দিয়ে এই দাফন সম্পন্ন হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ বিমান হামলায় তিনি প্রাণ হারিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) মাশহাদের দিকে এগিয়ে যায় খামেনির মরদেহবাহী ট্রাক। রাস্তার দুই পাশে কালো পোশাক পরা লাখো শোকাহত মানুষ ইরানের পতাকা, খামেনির ছবি ও বিপ্লবী স্লোগান লেখা লাল প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ধীরগতিতে এগিয়ে চলা শবযাত্রার সময় পুরো শহরে শোক, ধর্মীয় আবেগ ও প্রতিশোধের আহ্বানের মিশ্র পরিবেশ তৈরি হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুর পর পুরোদমে যুদ্ধ চলার কারণে আলি খামেনির জানাজা ও দাফনের প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেয় ইরান সরকার। প্রায় চার মাস পর শুরু হয় তাকে শেষ বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা। প্রথমে গত শুক্রবার (৩ জুলাই) তার মরদেহ নেওয়া তেহরানে। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সেখানকার গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তিন দিন রাখা হয় মরদেহ। রোববার বিপুল জনতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা।

লাখ লাখ মানুষ মাশহাদে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন আলি খামেনির মরদেহে। ছবি: রয়টার্স
লাখ লাখ মানুষ মাশহাদে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন আলি খামেনির মরদেহে। ছবি: রয়টার্স

এরপর সোমবার শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র কুম শহরে নেওয়া হয় আলি খামেনির মরদেহ, দিনভর চলে শোকানুষ্ঠান। পরদিন মঙ্গলবার বিমানে করে মরদেহ ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হয়। প্রতিবেশী দেশটিতেও আলি খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে বিপুল জনসমাগম হয়। সবশেষে তার মরদেহ জন্মস্থান মাশহাদে এনে দাফন করা হলো।

ইরান সরকার এই দাফনকে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক বার্তা প্রদানের একটি বড় আয়োজন হিসেবে তুলে ধরেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, সাত দিনের এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে লাখো মানুষ অংশ নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তেহরান থেকে শুরু করে কুম, নাজাফ, কারবালা ও মাশহাদ— সবখানেই বিপুল পরিমাণ মানুষ হাজির হয়েছে আলি খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে।

মাশহাদে শেষ যাত্রা

মাশহাদের ইমাম রেজা দরগাহের দিকে যাওয়ার সব সড়ক বৃহস্পতিবার কালো পোশাক পরা মানুষের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়। জুলাইয়ের তীব্র গরমে শোকাহত মানুষের ভিড় ঠান্ডা রাখতে রাস্তার পাশে পানি ছিটানো হয়। মরদেহবারী কফিন এগিয়ে যাওয়ার সময় জনতা খামেনির প্রশংসায় স্লোগান দেয় এবং ইরানের শত্রুদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকের হাতে ছিল প্রতিশোধমূলক স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। কারও কারও প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘কিল ট্রাম্প’। উপস্থিত জনতার একাংশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের স্লোগানও দেয়। এর আগে তেহরানে আলি খামেনির জানাজার আগেও সরাসরি ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানিয়েছিলেন একজন কবি।

আলি খামেনির সঙ্গে নিহত তার পরিবারের আরও চার সদস্যের মরদেহও একই যাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিটি শহরে শিয়া শোকগীতি, ধর্মীয় বিলাপ ও বিপ্লবী স্লোগানের মধ্য দিয়ে তাদের শেষ বিদায় জানানো হয়।

আলি খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে তার ছবি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন অনেকে। ছবি: ফারস নিউজ
আলি খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে তার ছবি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন অনেকে। ছবি: ফারস নিউজ

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও উত্তেজনা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে এলে তবেই আলি খামেনির জানাজা ও দাফনের রাষ্ট্রীয় আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল ইরান সরকার। ওই চুক্তির পর যুদ্ধবিরতি কিছুটা হলেও স্থায়ী রূপ পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছিল। তবে চলতি সপ্তাহেই সে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। হামলা-পালটা হামলায় মধ্যপ্রাচ্য ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

ইরান এখনো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। সরকার দাবি করছে, তারা দীর্ঘমেয়াদি আক্রমণের মুখেও টিকে থেকে বিজয় অর্জন করেছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে ইরানি সরকার খামেনির জানাজা ও দাফনে বিপুল জনসমাগমকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জনপ্রিয়তা ও আদর্শিক শক্তির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের প্রায় অর্ধশতক পরও রাষ্ট্রটি সামাজিক স্থিতি ও স্বাধীনতা রক্ষার সংকল্প ধরে রেখেছে— এমন বার্তাই সরকার দিতে চাইছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, জনসমাগমের এই প্রদর্শনের আড়ালে ইরান গভীর অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও সাম্প্রতিক বছরগুলোর গণবিক্ষোভের মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

খামেনির দীর্ঘ শাসন ও বিতর্কিত উত্তরাধিকার

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও পররাষ্ট্রসহ সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কার্যত ছিল তারই হাতে। এক দশক পর ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর সে পদে আসীন হন তারই ঘনিষ্ঠতম শিষ্য আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ বছরের শাসনামলে আলি খামেনি ইরানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা নিজের কার্যালয়ে কেন্দ্রীভূত করেন। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের প্রভাব কমে যায় এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ইরানে একাধিক গণবিক্ষোভ হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে। তবু খামেনির সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তি ও প্রতিরোধের প্রতীক। বিদেশি শক্তির হাতে তার মৃত্যু শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যে শাহাদাতের ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইরানের রাজনৈতিক বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করেছে।

আলি খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে হাজির হওয়া জনতার অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার দাবি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। ছবি: ফারস নিউজ
আলি খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে হাজির হওয়া জনতার অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার দাবি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। ছবি: ফারস নিউজ

নতুন অধ্যায়ের সূচনা

মাশহাদে খামেনির দাফনের মাধ্যমে ইরানের ইতিহাসে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। একই সঙ্গে শুরু হলো তারই ছেলে মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়, যেখানে আইআরজিসির প্রভাব আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে সামনে ইরানের জন্য বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে— যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক চাপ সামলানো এবং জনগণের অসন্তোষের মুখে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কতটা স্থিতিশীল থাকতে পারবে। আলি খামেনির জানাজায় বিপুল জনসমাগমের মাধ্যমে ইরান সরকার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে, জনগণ সরকারের পক্ষেই রয়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলসহ পশ্চিমা বিশ্বের এখান থেকেই শিক্ষা নেওয়া উচিত— ইরানের জনগণ তাদের সরকারকে পছন্দ না করলেও অন্তত বিদেশিদের হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না।

সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, এপি

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘খুব ভালো আলোচনা’ চলছে: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মঙ্গলবার সারাদিন ইরানের সঙ্গে তার প্রশাসনের ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে। তার এই মন্তব্যে পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান শিগগিরই হতে পারে— এমন আশাবাদ নতুন করে জোরালো হয়েছে।

১ দিন আগে

রুশ হামলায় কিয়েভ অঞ্চলে নিহত অন্তত ১৪, আহত ২৭

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও এর আশপাশের এলাকায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন। হামলায় গুদামঘরসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ। তবে কয়েকটি প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ১৫ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

১ দিন আগে

ইরান যুদ্ধে ‘প্রায় সব’ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রই ব্যবহার করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র

সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (অ্যাটাকমস) এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম)। দুটি সূত্রের ভাষ্য, এসব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ‘প্রায় সবই’ ইতোমধ্যে ব্যবহার করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

১ দিন আগে

ট্রাম্পের সফরের আগে গলফ কোর্সের কাছে পিস্তলসহ সন্দেহভাজন আটক

র‍্যাঞ্চো পালোস ভার্দেস এলাকার ট্রাম্প ন্যাশনাল গলফ কোর্স থেকে একটি পিস্তল ও অবৈধ গোলাবারুদসহ আটক করা হয় ৩৮ বছর বয়সী জেনিন জন টায়েলকে আটক করা হয় বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

১ দিন আগে