মার্কিন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সতর্কতা

আফ্রিকায় ইবোলা সংক্রমণ ২০১৪ সালের মহামারির ‘ভয়াবহ রেকর্ড ছুঁতে পারে’

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ১২: ২০
পূর্ব কঙ্গোর বেনি শহরে ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধার বাড়িতে প্রবেশ করার পর তার এক সহকর্মীকে জীবাণুমুক্ত করছেন স্বাস্থ্যকর্মী কাভোতা মুগিশা রবার্ট। ছবি: সংগৃহীত

মধ্য আফ্রিকায় ইবোলা সংক্রমণ অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে চলেছে। চলমান এই প্রাদুর্ভাবের বিস্তার ২০১৪-২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় আঘাত হানা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ইবোলা মহামারির আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মার্কিন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। পশ্চিম আফ্রিকার সেই প্রাদুর্ভাবে ১১ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

শনিবার (৬ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, মার্কিন স্বাস্থ্য সংস্থা ‘সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (সিডিসি) গতকাল শুক্রবার কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে তৈরি বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির রূপরেখা প্রকাশ করেছে। সেখানে এই প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে পশ্চিম আফ্রিকার সেই রেকর্ড প্রাদুর্ভাবে ২৮ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন।

সিডিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের কতটা দ্রুত অন্যদের থেকে আলাদা (আইসোলেশন) করে ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার বা তারও বেশি হতে পারে।

সিডিসির ইবোলা রেসপন্স বিভাগের ইনসিডেন্ট ম্যানেজার ড. সতীশ পিল্লাই বলেন, ‘জনস্বার্থ ও সুরক্ষায় যদি এখনই শক্তিশালী এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে আমাদের এই গাণিতিক মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী মহামারিটি ওই বিশাল স্কেলে পৌঁছে যাওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব।’

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্যানডেমিক সেন্টারের পরিচালক জেনিফার নুজো বলেন, এই মডেলিংয়ের ফলাফল আসলে শুরু থেকেই আমাদের মনে থাকা ভয়টিকেই সত্যি প্রমাণ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি ভাইরাসের বিস্তার রোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত বিপজ্জনক এক গতিপথ অনুসরণ করছে।’

কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কিভু প্রদেশের বুটেম্বো ও গোমা শহরের মধ্যবর্তী সড়কে স্থাপিত একটি ইবোলা স্ক্রিনিং স্টেশনে হাত ধুয়ে নিচ্ছেন এক মোটরসাইকেল চালক। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কিভু প্রদেশের বুটেম্বো ও গোমা শহরের মধ্যবর্তী সড়কে স্থাপিত একটি ইবোলা স্ক্রিনিং স্টেশনে হাত ধুয়ে নিচ্ছেন এক মোটরসাইকেল চালক। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

তবে মহামারির গতিপ্রকৃতি নিখুঁতভাবে অনুমান করা কতটা কঠিন, সে কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। জেনিফার নুজো বলেন, ‘নির্দিষ্ট এই সংখ্যাগুলো নিয়েই আমাদের কেবল মগ্ন থাকলে চলবে না। কারণ যখন আপনার কাছে পর্যাপ্ত বা সীমিত তথ্য থাকে, তখন একদম সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সত্যি খুব কঠিন।’

এদিকে আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন শুক্রবার জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০ জন নিশ্চিতভাবে ইবোলা আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৬৩ জনের। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে এমন আরও অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি রয়েছেন যাদের এখনো রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি কিংবা তারা রিপোর্টের আওতাভুক্ত হননি।

সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির বমি, রক্ত ও বীর্যের মতো শরীরের তরল পদার্থের সংস্পর্শে এলে ইবোলা ভাইরাস ছড়ায়। বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে মূলত ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo) নামের একটি ভাইরাস, যার সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা প্রতিষেধক টিকা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে এই রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে।

ডিআর কঙ্গোতে ইবোলা নিয়ে সতর্কামূলক ব্যানার। ছবি: সংগৃহীত
ডিআর কঙ্গোতে ইবোলা নিয়ে সতর্কামূলক ব্যানার। ছবি: সংগৃহীত

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত মে মাসে এই প্রাদুর্ভাবকে ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, আক্রান্তের প্রক্রিয়াটি আসলে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা শুরুতে ইবোলার অন্য একটি ধরন মনে করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করায় আসল রূপটি ধরতে দেরি হয়ে যায়।

মহামারি মোকাবিলার এই লড়াইটি কঙ্গো সরকারের সাথে রুয়ান্ডা সমর্থিত ‘এম২৩’ বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সাথে সম্পৃক্ত ‘অ্যালাইড ডেমোক্রেটিক ফোর্স’ নামক জঙ্গি গোষ্ঠীর সশস্ত্র সংঘাতের কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে চলমান এই সহিংসতার কারণে ওইসব এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ছেন, যা ভাইরাসের বিস্তারকে আরও সহজ করে দিচ্ছে।

সিডিসির মডেলিং প্রতিবেদনে মূলত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে, তা প্রাক্কলন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— এখন পর্যন্ত কতজন আক্রান্ত বা মারা গেছেন এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা কত দ্রুত নতুন আক্রান্তদের শনাক্ত করে আইসোলেশনে নিতে পারছেন, যেন তারা অন্যদের মাঝে সংক্রমণ ছড়াতে না পারেন।

ড. সতীশ পিল্লাই জানান, বর্তমানে আক্রান্তদের আইসোলেশনে নেওয়ার আসল হার ঠিক কত, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে সিডিসির তৈরি করা মডেলের সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে এটি বর্তমানে বেশ ‘নিম্ন পর্যায়ে’ রয়েছে বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।

সিডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, যদি আক্রান্তদের আইসোলেশনের হার বাড়িয়ে ৫০ বা ৭০ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তবে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজারের কাছাকাছি আটকে রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু মে মাসের শেষের দিকে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা যদি বর্তমানের স্বীকৃত সংখ্যার চেয়ে বেশি হয়ে থাকে, তবে বাস্তব পরিস্থিতি পূর্বাভাসের চেয়েও আরও অনেক বেশি খারাপ হতে পারে।

অবশ্য অতীতে সিডিসির তৈরি কিছু ইবোলা মডেলের পূর্বাভাস সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হওয়ার রেকর্ডও রয়েছে। ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় যখন ইবোলা মহামারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা দ্রুত রেসপন্স টিম গঠনের চেষ্টা করছিলেন, তখন সিডিসি একটি মডেলিং প্রকাশ করেছিল।

সে সময় বলা হয়েছিল, যদি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তবে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ১৪ লাখ মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছিল, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সিডিসির সেই অনুমানের চেয়ে ৫০ গুণেরও কম ছিল।

রাজনীতি/আইআর

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইউরোপ জুড়ে দাবানলের তাণ্ডব অব্যাহত, গ্রিসে ৩ দমকলকর্মী নিহত

বিশেষজ্ঞদের মতে, আটলান্টিক উপকূল থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর, স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ডস থেকে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত দাবানলের এই ধারা সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে নজিরবিহীন। অনেক আগুনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং শহর ও জনবসতির কাছাকাছি পৌঁছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

১৫ ঘণ্টা আগে

কয়লা কেলেঙ্কারি মামলায় প্রয়াত মনমোহন সিংকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

সুপ্রিম কোর্ট বলেন, সিবিআইয়ের দাখিল করা দুটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আদালতের মনে হয়েছে, সেগুলো বাতিল করে নতুন করে বিচার শুরুর মতো কোনো গ্রহণযোগ্য বা জোরালো কারণ নেই। ফলে তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই মামলাটি নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

১৫ ঘণ্টা আগে

আন্দোলন দমনে গুলি চালাতে বলেছিলেন অমিত শাহ— রাহুলের অভিযোগে লোকসভায় হট্টগোল

রাহুল বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদে এসে বসার সাহস নেই। আমি তাকে ৩০টি গাড়ির কনভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বসে থাকতে দেখেছি। তিনি আজ সংসদে নেই কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

২১ ঘণ্টা আগে

ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে নতুন আইন, সর্বোচ্চ সাজা বেড়ে ১০ বছর

রাজ্যসভায় পাস ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর বিলটি আইনে পরিণত হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস বা পরীক্ষায় অনিয়মে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি বেড়ে হবে ১০ বছরের কারাদণ্ড, পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৫০ লাখ রুপি জরিমানার বিধানও থাকবে।

২১ ঘণ্টা আগে