আইসিজেতে শুনানিতে গাম্বিয়া

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জীবন ‘দুঃস্বপ্নে’ পরিণত করেছে

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩: ৪৯
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। ছবি: আল-জাজিরা

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার করা মামলাটির পূর্ণাঙ্গ শুনানি গতকাল সোমবার (১২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে। এতে গাম্বিয়া অভিযোগ করেছে, মিয়ানমার সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্মূলের লক্ষ্যেই তাদের ওপর ‘পরিকল্পিত সহিংসতা’ চালিয়েছে এবং তাদের জীবন ‘দুঃস্বপ্নে’ পরিণত করেছে।

নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত জাতিসংঘের এই শীর্ষ আদালতের (আইসিজে) বিচারকদের সামনে গাম্বিয়ার পক্ষে এ কথা বলেন দেশটির আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা শান্তি ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন দেখা সাধারণ মানুষ। ধ্বংস করার জন্য তাদের নিশানা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমার তাদের স্বপ্নকে শুধু অস্বীকার করেনি, বরং তাদের জীবনকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। তারা এমন নৃশংস সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছেন, যা কল্পনাতীত।’

এর আগে ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে মামলাটি দায়ের করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ গাম্বিয়া। তখন গাম্বিয়াকে আইসিজেতে মামলা করতে সহযোগিতা করেছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৭ দেশের জোট ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)।

তবে মামলাটির প্রাথমিক শুনানিতেই মিয়ানমার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। শুনানিতে অংশ নিয়ে মিয়ানমারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অং সান সুচি গাম্বিয়ার জাতিগত নিধনের অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

এরপর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করেন। ২০২২ সালের জুলাইয়ে মিয়ানমারের ‘প্রাথমিক আপত্তি’ খারিজ করে দেন আইসিজে।

গতকাল সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই পূর্ণাঙ্গ শুনানি আগামী ২৯ জানুয়ারি (১৪ কার্যদিবস) পর্যন্ত চলবে। এতে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কথা শোনা হবে। তবে সংবেদনশীলতা ও গোপনীয়তার কারণে এসব সেশনে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত থাকতে পারবেন না।

এদিকে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলার চলমান শুনানি গত এক দশকের বেশি সময়ে জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) অভিযোগে প্রথম মামলা হিসেবে প্রথম পূর্ণাঙ্গ শুনানি। এ মামলার রায় মিয়ানমারের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

প্রসঙ্গত, আইসিজেতে গাম্বিয়ার মামলা দায়েরের দুই বছর আগে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। অভিযানের নামে তারা ব্যাপক সহিংসতা শুরু করলে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ এবং তাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

সেই অভিযানের পরপরই জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী দল ঘটনার তদন্ত করে। তদন্ত প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানকে ‘গণহত্যামূলক তৎপরতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ২০১৯ সালে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে দাবি করছিল, তাদের অভিযানটি মুসলিম সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার জবাবে চালানো বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ছিল।

রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য

হেগে শুনানির আগে কথা বলতে গিয়ে রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীরা জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই মামলার মাধ্যমে তারা ন্যায়বিচার আশা করছেন। ৫২ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শরণার্থী ইউসুফ আলী বলেন, ‘আমরা একটি ইতিবাচক রায়ের আশা করছি, যা বিশ্বকে জানাবে— মিয়ানমার গণহত্যা করেছে এবং আমরা তার শিকার। আমরা ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য।’

আগামী আরও তিন দিন গাম্বিয়া তাদের যুক্তি উপস্থাপন করবে। শুক্রবার মিয়ানমার অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ পাবে। এরপর রুদ্ধদ্বার শুনানিতে রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে আদালত। কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে সরাসরি রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শোনার ঘটনা এটি হবে প্রথম। পুরো শুনানি চলবে তিন সপ্তাহ।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে অং সান সুচি ও তার নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর থেকে মিয়ানমার আরও গভীর সংকটে রয়েছে। গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলন দমন ও দেশজুড়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের মধ্যেও বর্তমানে দেশটিতে জান্তা সরকারের অধীনে ধাপে ধাপে সাধারণ নির্বাচন চলছে। তবে জাতিসংঘ, কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু নয় বলে সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে ভোটে জনসমর্থন রয়েছে এবং কোনো ধরনের জবরদস্তি করা হচ্ছে না বলে দাবি করছে সামরিক কর্তৃপক্ষ।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বার্লিনের জঙ্গলে অস্ত্রের গোপন ভাণ্ডার, রুশ গোয়েন্দা সংযোগের সন্দেহ

ডোব্রিন্ট জানান, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে— এমন গুরুতর সহিংস কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির সন্দেহে’ তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাটি জার্মানির বর্তমান ‘উচ্চ ঝুঁকি’র নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে। এতে বিদেশি কোনো শক্তির সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

৭ ঘণ্টা আগে

স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ফের কারাগারে ইমরান খান

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইমরান খানকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে আবার রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকেরা পরীক্ষার পর তাকে ‘চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ’ ঘোষণা করেছেন।

১৬ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্প কি ইরানের সঙ্গে অন্য দেশগুলোর বাণিজ্য বন্ধ করতে পারবেন

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো দেশ ইরানকে আর্থিক, ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো সহায়তা দিলে সেই দেশকেও ‘প্রচণ্ড অর্থনৈতিক ক্ষতির’ মুখে পড়তে হবে।

১৯ ঘণ্টা আগে

কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা: নিহত ১৩, আহত ৩৩

রাশিয়ার এই ভয়াবহ হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক সহায়তার জোর আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, "ইউক্রেন যতদিন পর্যাপ্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না পাবে, ততদিন রাশিয়া শান্তির বিষয়টি বিন্দুমাত্র গু

২ দিন আগে