গাজায় গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার, ট্রাম্পের প্রশংসায় পঞ্চমুখ নেতানিয়াহু

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দাঁড়িয়ে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলে যা চলছে তা বরং ‘গণহত্যার বিপরীত’ বলে দাবি করেন তিনি।
আল-জাজিরা ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু এ কথা বলেন। এ সময় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করাকে ‘সহজ সিদ্ধান্ত ছিল’ বলে জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূঁয়সী প্রশংসা করার পাশাপাশি কাতার ও তুরস্কের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সমালোচনা নিয়েও দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন।
আগের কয়েক বছরের মতোই এবারও নেতানিয়াহুর ভাষণের শুরুতেই জাতিসংঘের অধিবেশনকক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদল বেরিয়ে যায়। এ সময় ইসরায়েলের প্রতিনিধিদল ও তাদের সমর্থকরা করতালি দিয়ে নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানালেও বাকিদের বেশির ভাগই দুয়োধ্বনি দেন। এ সময় অধিবেশনকক্ষে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। অধিবেশনের সভাপতি কয়েকবার শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
প্রতিনিধিদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই হলে যদি আর কোনো নৈতিক কাপুরুষ থেকে থাকেন, আমি তাদেরও বেরিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’ পরে তিনি বক্তব্য চালিয়ে যান। তার সমর্থকরা গ্যালারি থেকে দাঁড়িয়ে হাততালি ও স্লোগান দেন।
ট্রাম্পের ‘সাহসী নেতৃত্বের’ প্রশংসা
ভাষণের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করেন নেতানিয়াহু। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমেরিকা ও ইসরায়েল একসঙ্গে ‘সভ্যতাকে রক্ষা করতে’ কাজ করেছে।
ট্রাম্পের ‘সাহসী নেতৃত্ব’ ও দুই দেশের অংশীদারত্বের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, দুই দেশ মিলে ইরানের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত করেছে।
‘ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল’
নেতানিয়াহুর ভাষণের বড় অংশ জুড়ে ছিল ইরান। তার দাবি, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ইসরায়েল ও বিশ্বের জন্য অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করেছিল।
তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো ‘খুব কঠিন’ ছিল, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার জন্য এটি ছিল ‘সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্তগুলোর একটি’। কারণ, হামলা না হলে ‘সবাই মারা যেতাম’ বলে দাবি করেন তিনি।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে কী হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নেতানিয়াহু। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে নিজের দেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের নিরাপত্তার জন্যও প্রয়োজনীয় বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, অনেক দেশের নেতাই প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সমালোচনা করলেও ব্যক্তিগতভাবে ইসরায়েলের পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানান।

কাতার-তুরস্ককে ‘ইসরায়েলবিরোধী প্রচারে’র জন্য আক্রমণ
কাতার ও তুরস্কের বিরুদ্ধেও সরাসরি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। কাতারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলবিরোধী ‘মিথ্যা’ ছড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ তোলেন তিনি। তার দাবি, কাতার যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্থায়ন এবং আল-জাজিরার মতো সংবাদমাধ্যমকে সমর্থনের মাধ্যমে তরুণদের ইসরায়েল, আমেরিকা ও পশ্চিমাদের প্রতি ঘৃণা করতে ‘ব্রেইনওয়াশ’ করছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানকে ‘স্বৈরশাসক’ আখ্যা দিয়ে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, আঙ্কারা হামাসকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার করছে।
এরদোয়ানের বিরুদ্ধে কুর্দিদের ওপর নিপীড়ন, উত্তর সাইপ্রাস দখল এবং গ্রিসকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। একই সঙ্গে জেরুজালেম নিয়ে এরদোয়ানের অবস্থানের জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘না, আপনি তা করতে পারবেন না। এটি আমাদের শহর।’
‘মামদানি আমাকে চুপ করাতে পারবেন না’
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে নিয়েও দীর্ঘ সময় কথা বলেন নেতানিয়াহু। মামদানি তাকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘ভয়াবহ গণহত্যার স্থপতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
এর জবাবে নেতানিয়াহু মামদানিকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা দেন এবং তার বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ তোলেন, যে অভিযোগ মামদানি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মামদানির উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আপনি আমাকে এখানে আসা থেকে থামাতে চেয়েছিলেন। আপনি আমাকে চুপ করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি আমাকে চুপ করাতে পারবেন না। সত্যকেও চুপ করাতে পারবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েল গণহত্যা করেনি। ইসরায়েল গণহত্যা প্রতিরোধ করেছে।’
গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনার সমালোচনা করে নেতানিয়াহু এটিকে ‘এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা’ বলেও অভিহিত করেন। ইসরায়েলি বাহিনী বেসামরিক মানুষকে রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং গাজায় খাবার ও টিকা প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

‘গাজায় যা করছি, তা গণহত্যার বিপরীত’
গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাবেও সরাসরি অবস্থান নেন নেতানিয়াহু। তার দাবি, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে না, বরং হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
তিনি বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ ‘মিথ্যা’। গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের লক্ষ্য হামাসকে পরাজিত করা এবং ইসরায়েলি জনগণকে নিরাপদ রাখা।
ভাষণে তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ওই হামলার পর ইসরায়েল আত্মসমর্পণ না করে ‘সিংহের মতো লড়াই করেছে’।
গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি বলেন, ‘আমরা জিততে থাকব। কারণ আমাদের অন্য কোনো পথ নেই।’ বক্তব্যে তার ভাই প্রয়াত ইয়োনাতান নেতানিয়াহুর স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। ইয়োনাতান ১৯৭৬ সালে উগান্ডার এনতেবেতে জিম্মি উদ্ধারের অভিযানে নিহত হন।
‘ইহুদিদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র’
ভাষণের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ইহুদিবিদ্বেষ ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রচারণার অভিযোগ। নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে আন্তর্জাতিক সমালোচনা চলছে, তার একটি অংশ ইহুদিদের বিরুদ্ধে পুরোনো বিদ্বেষ ও মিথ্যা প্রচারের ধারাবাহিকতা।
গাজা নিয়ে সমালোচনাকারী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন দেশের নেতা এবং ইসরায়েলের বিরোধীদের বিরুদ্ধে তিনি পক্ষপাতদুষ্ট প্রচারের অভিযোগ তোলেন। তার ভাষায়, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ ছড়ানো হচ্ছে এবং এই প্রচারণা ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দিচ্ছে।
নেতানিয়াহুর ভাষণের বেশির ভাগ অভিযোগ ও ব্যাখ্যা ছিল ইসরায়েলি সরকারের অবস্থানভিত্তিক। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে, যা ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করে।
অধিবেশনকক্ষ ফাঁকা, বাইরে বিক্ষোভ
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের আগে জাতিসংঘের অধিবেশনকক্ষে ব্যাপক ওয়াকআউটের পাশাপাশি নিউইয়র্কের রাস্তায়ও বিক্ষোভ হয়। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের আশপাশে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে গাজা যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল ‘এন্ড দ্য জেনোসাইড’ এবং ‘ফান্ড পিপল, নট বম্বস’সহ নানা স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। কেউ কেউ ‘লেট গাজা লিভ’ স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীরা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় জাতিসংঘমুখী কয়েকটি গাড়িবহরের পথও পরিবর্তন করতে হয়।
নেতানিয়াহুর ভাষণের শেষ দিকে নিউইয়র্ক পুলিশ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে বলে গার্ডিয়ান জানিয়েছে। একই সময়ে জাতিসংঘের ভেতরে তার ভাষণ শোনার জন্য থাকা প্রতিনিধিদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম।




















-10a2b7-256x144.webp)