ডিজেলের মজুত ছাড়তে ইউরোপকে চাপ, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার হুমকি ট্রাম্পের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৮: ১৩
ডিজেলের মজুত ছাড়তে ইউরোপীয় দেশগুলোকে চাপ দিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
ডিজেলের মজুত ছাড়তে ইউরোপীয় দেশগুলোকে চাপ দিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত

ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করার কথা বিবেচনার পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের মজুতের কিছু অংশ বাজারে ছাড়ার আহ্বান জানাতে পারেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাজ্য ডিজেলের চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। আবার নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারাও জ্বালানির বাড়তি দামের চাপের মুখে পড়ায় দেশটি থেকে ডিজেল রপ্তানি সীমিত করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের পাম্পে ডিজেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প এ অবস্থানের কথা জানান।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে আলোচনা করছে। এ বিষয়ে শুক্রবার ইইউর একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করলে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়বে। এর ফলে মার্কিন গাড়িচালকদের জন্য ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, অন্য দেশগুলো অতিরিক্ত সরবরাহের ঘাটতি পূরণ করতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশ্ববাজারে ডিজেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি প্রতিদিন ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করে। এর বড় অংশই যায় লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে।

রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার পর ইউরোপের কয়েকটি দেশও যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেলের ওপর বেশি নির্ভর করছে। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্য এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য আমদানিকারক।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির বড় একটি অংশ ইউরোপের বাইরে চলে যায়। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার বিভিন্ন পরিশোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলেছে।

অন্যদিকে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেল— দুই ধরনের জ্বালানির সরবরাহই বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের মজুতের কিছু ডিজেল বাজারে ছাড়ার আহ্বান জানাবেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো তা করতে পারি। তাদের কিছু ডিজেল আছে।’

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইউরোপকে নিজেদের কিছু ডিজেল সরবরাহ দ্রুত বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের ‘এই বোঝা বহন করতে দেওয়া উচিত নয়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাজ্যের বাজার পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। মোটরিং সংস্থা আরএসি জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে দেশটিতে ডিজেলের গড় দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে প্রতি লিটারে ২০০ পেন্সের কাছাকাছি উঠেছে। সর্বশেষ হিসাবে প্রতি লিটার ডিজেলের গড় দাম ১৯৯ দশমিক ৭৯ পেন্স। এর আগে এই দাম ছিল ১৪২ দশমিক ৩৮ পেন্স।

বিবিসির খবরে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে ব্যবহৃত ডিজেলের অর্ধেকের বেশি আমদানি করা হয়। আমদানির মধ্যে ৩১ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম মিলিয়ে দেশটির মোট ডিজেল আমদানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সরবরাহ করে।

সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে যুক্তরাজ্যের জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রী মার্টিন ম্যাকক্লাসকি বৃহস্পতিবার ইউরোপের অন্যান্য দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

আলোচনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তবে বছরের শুরুতে কৌশলগত জ্বালানি মজুত সমন্বিতভাবে বাজারে ছাড়ার পরও ইউরোপের দেশগুলোর হাতে কিছু মজুত এখনো রয়েছে বলে জানান তিনি।

যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থা বৈচিত্র্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল। আমরা আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং যুক্তরাজ্যের জ্বালানি শিল্পের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি।’

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য ডিজেল সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তবে দেশটিতে ডিজেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নিয়ম অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যসহ সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোকে তাদের নিট তেল আমদানির ৯০ দিনের সমপরিমাণ তেলের মজুত রাখতে হয়।

অন্যদিকে, ইইউর নিয়ম অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোকে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের ৬১ দিনের সমপরিমাণ জ্বালানি মজুত রাখতে হয়। সব মিলিয়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে জরুরি ব্যবহারের জন্য প্রায় ১০ কোটি ৯০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি মজুত রয়েছে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ডিজেল ও সংশ্লিষ্ট জ্বালানি পণ্য।

ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ডিজেলের পরিস্থিতি নিয়ে ‘অনেক ফোনকল, অনেক বৈঠক’ হচ্ছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ‘উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের’ সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

এদিকে বৈশ্বিক ডিজেল সরবরাহ পরিস্থিতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের পরিশোধনাগারগুলো অক্টোবর মাসে কিছু জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করেছে। এর মাধ্যমে বেইজিং অভ্যন্তরীণ বাজারের সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়, সেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের দামও বেড়েছে।

এর সঙ্গে ডিজেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী রাশিয়ার রপ্তানি নিষেধাজ্ঞাও বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

বিবিসি লিখেছে, ট্রাম্পের বক্তব্যের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অতিরিক্ত ডিজেল মজুত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে রাখা হলে পাম্পে দাম কমতে পারে। এতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গাড়িচালক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

তবে জ্বালানি বাজারবিষয়ক প্রতিষ্ঠান আর্গাস মিডিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ফাইফ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে এ জ্বালানির দাম দ্রুত অনেক বেড়ে যেতে পারে।

ডিজেলের চাহিদা কমানোও তুলনামূলক কঠিন। পেট্রলের তুলনায় ডিজেল পরিশোধন করা কঠিন হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ও কৃষি খাতে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

যুক্তরাজ্যে চারটি তেল শোধনাগার রয়েছে। এসব শোধনাগার দেশের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত পেট্রল উৎপাদন করতে পারলেও অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট ডিজেল উৎপাদন করতে পারে না।

যুক্তরাজ্যের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ নাগাদ দেশটির সড়কে ১ কোটি ৫১ লাখ ডিজেলচালিত যানবাহন ছিল। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৭ লাখ।

দেশটিতে ডিজেলচালিত গাড়ির (প্রাইভেট কার) সংখ্যাও কমেছে। জুনের শেষ নাগাদ এ ধরনের গাড়ি ছিল ৯৮ লাখ। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪ লাখ।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement