রাজনীতি-কূটনীতি, জ্বালানি-অর্থনীতি— ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ছেই

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সারা বিশ্বে তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। প্রতীকী ছবি

‘খুব দ্রুত’ শেষ হয়ে যাবে— যুদ্ধ শুরুর সময় এমনটাই বলেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সেই যুদ্ধের ১০০ দিন পেরিয়ে গেলেও থামার নাম নেই।

এর মধ্যে গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি পরিস্থিতি। হরমুজ প্রণালি কার্যত আংশিক বন্ধ, মাঝেমধ্যে গোলাগুলি ও হামলার ঘটনা ঘটছে, আর শান্তি আলোচনা বারবার ভেঙে পড়ছে।

শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গত ১০০ দিনে এই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও। সেই প্রভাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েই চলেছে।

৭ হাজারের বেশি প্রাণহানি

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত সাত হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, লেবাননে নিহত হয়েছেন তিন হাজার ৫৯৩ জন, ইরানে তিন হাজার ৪৬৮ জন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে ২৯ জন। এ ছাড়া ইরানের হামলায় নিহত হয়েছেন ২৬ জন ইসরাইলি ও ১৩ জন মার্কিন সেনা।

সংঘাত চলমান থাকায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লেবাননের এক-পঞ্চমাংশ এখন ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে

১৭ এপ্রিল লেবাননে পৃথক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে এখনো হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল।

ইসরাইলি অভিযানের কারণে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম এ অভিযানকে ‘ভূমি পুড়িয়ে দেওয়া নীতি’ এবং ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

১ জুন পর্যন্ত সময়ের তথ্য বলছে, ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে তারা ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গ দখল করে, যা ২৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে লেবাননের ভেতরে ইসরাইলের সবচেয়ে গভীর অগ্রযাত্রা।

বর্তমানে প্রায় দুই হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা, অর্থাৎ লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই ৩০ লাখের বেশি ইরানিও বাস্তুচ্যুত হন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনাগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।

হরমুজে জাহাজের সংখ্যা দৈনিক ১০০ থেকে কমে ৭

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, যুদ্ধ শুরুর পর সেই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত হরমুজ অতিক্রম করেছে মাত্র ৬০৭টি জাহাজ। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় সাতটি। অথচ যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি জাহাজ এ পথ ব্যবহার করত।

প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব জুড়ে তেলের মজুত দ্রুত কমতে শুরু করে। একই সঙ্গে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে ইরানের বন্দরগুলোতেও অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, যা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নতুন বাধা তৈরি করে।

এর ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে, দীর্ঘ হয়েছে যাত্রাপথ এবং জাহাজের সংকটও তৈরি হয়েছে।

১৪৬ দেশে বেড়েছে জ্বালানির দাম

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। গত তিন মাসে তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৫ ডলার। সংঘাতের এক সপ্তাহের মাথায় তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং পরে প্রায় ১২০ ডলার পর্যন্ত ওঠে। বর্তমানে দাম ১০০ ডলারের আশপাশে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এ পরিস্থিতিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ধাক্কাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

আল জাজিরার হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪৬টি দেশে পেট্রোলের দাম বেড়েছে।

সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে এশিয়ার দেশগুলোতে, যেগুলো তাদের তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। মিয়ানমারে তিন মাসে জ্বালানির দাম ৯০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

আফ্রিকায় নাইজেরিয়ায় পেট্রোলের দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে, যেমন পেরুতে, গাড়ির ট্যাংক ভর্তি করতে এখন যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি খরচ হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম দুই দফায় বেড়েছে বাংলাদেশেও।

বাড়ছে খাদ্যের দামও

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সার উৎপাদন থেকে শুরু করে খাদ্য পরিবহন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে খাদ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও।

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক হাদি কাহালজাদেহ বলেন, যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করেছে, মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে এবং নতুন অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

কাহালজাদেহর ভাষায়, ‘বিশ্ব অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের পূর্ণ প্রভাব এখনো জানা যায়নি। তবে এটি এরই মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপি সংকুচিত করেছে এবং নতুন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।’

শেয়ারবাজারে অস্থিরতা

যুদ্ধের শুরুতে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও বড় ধাক্কা লাগে। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক মার্চের শেষ দিকে আগের উচ্চতা থেকে ৯ দশমিক ১ শতাংশ কমে যায়। ইউরোপের প্রধান সূচকগুলোও তীব্র পতনের মুখে পড়ে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এশিয়ার বাজার। জাপানের নিক্কেই সূচক যুদ্ধ শুরুর সময় বড় ধরনের পতন দেখে। পরে যুদ্ধবিরতির গুঞ্জনে বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও নতুন উত্তেজনায় আবার নেমে যায়।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের জোরালো প্রবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর বাজারগুলো তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

আলোচনা অনেক, সমাধান নেই

গত এক বছরে দুবার এমন হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা চলাকালেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল সংঘাত থামিয়ে আবার আলোচনায় ফেরা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করা।

কিন্তু যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননে শতাধিক বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দফায় দফায় পরোক্ষভাবে আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও তা পারমাণবিক কর্মসূচি প্রশ্নে ভেঙে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরান পালটা প্রস্তাব দেয়। পরে ট্রাম্প সেটিকে ‘আবর্জনা’ বলে মন্তব্য করেন এবং যুদ্ধবিরতিকে ‘লাইফ সাপোর্টে থাকা’ অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেন।

শান্তি কি কাছে?

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ওমর রহমানের মতে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ হবে না।

ওমর বলছেন, ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না এবং ট্রাম্প প্রশাসন ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি মেনে চলবে কি না, সে বিষয়েও তেহরানের সন্দেহ রয়েছে।

এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও কমেছে। ২ জুন পর্যন্ত জরিপের গড় অনুযায়ী, তার প্রতি সমর্থন নেমে এসেছে ৪০ দশমিক ৩ শতাংশে। বিপরীতে ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক তার কাজের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

১০০ পেরিয়ে এসে তাই স্পষ্ট— যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ ছিল, তা শেষ করা ততটা সহজ নয়। আর এর প্রভাব শুধু ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর অভিঘাত পৌঁছে গেছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে।

আল-জাজিরা অবলম্বনে

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের, ‘সপ্তাহব্যাপী’ অভিযানের হুঁশিয়ারি

আইআরজিসি বলছে, এই অভিযান কোনো সাময়িক বা সাধারণ ঘটনা নয়, বরং এটি টানা এক সপ্তাহের অবিরাম হামলার শুরু মাত্র। ‘শত্রুপক্ষ’ তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ না করা পর্যন্ত আগামী সাত দিন ধরে চব্বিশ ঘণ্টাই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের একের পর এক বহর উৎক্ষেপণ অব্যাহত থাকবে।

১০ ঘণ্টা আগে

নির্বাচনে ‘কারচুপি’র দাবি নিয়ে প্রশ্ন, সাক্ষাৎকার ছেড়ে উঠে গেলেন ট্রাম্প

২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের মুখে মেজাজ হারিয়ে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের মাঝপথেই বেরিয়ে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এনবিসি নিউজের বিখ্যাত অনুষ্ঠান ‘মিট দ্য প্রেসে’র সাক্ষাৎকার চলাকালে সঞ্চালকের সঙ্গে তীব্র বাদানুবাদের একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি স্টুডিও ত্যাগ করেন।

১৩ ঘণ্টা আগে

ইরান যুদ্ধের ১০০ দিন— আলোচনায় অচলাবস্থা, ক্রমশই ফিকে হচ্ছে সমঝোতার সম্ভাবনা

ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ‘হুমকি’ পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত এবং কোনো ধরনের অবরোধের মুখে প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হবে না। অন্যদিকে ওয়াশিংটন জোর দিয়ে বলছে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হরমুজ অবশ্যই কোনো শর্ত বা টোল ছাড়াই আন্তর্জাতিক নৌ পরিবহনের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকতে হবে।

১৫ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওতে বন্দুকধারীদের এলোপাতাড়ি গুলি, আহত অন্তত ১২

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যে একটি গ্রীষ্মকালীন উৎসবের কাছে বন্দুকধারীদের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে অন্তত ১২ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন বন্দুকধারীরা সম্ভবত একে অপরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছিল। তবে ঘটনার পর থেকে হামলাকারীরা এখন

২১ ঘণ্টা আগে