বিজেপির ঘরে ‘ককরোচ’— মন্ত্রী-এমপিদের সন্তানরাও আন্দোলনে

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৪: ১৬
বাঁ কলামে ওপরে বাবা আসাম সরকারের মন্ত্রী কেশব মহন্ত ও নিচে মেয়ে দিবিসা মহন্ত, মাঝের কলামে ওপরে ওড়িশার বিজেপি নেতা ও সংসদ সদস্য মা অপরাজিতা সরঙ্গি ও নিচে মেয়ে অর্চিতা রাহা এবং ডানের কলামে ওপরে উত্তর প্রদেশের সাবেক বিজেপি বিধায়ক বিক্রম সিং ও নিচে মেয়ে যশস্বিনী রাজে সিং। ছবি: কোলাজ

দিল্লির যন্তর মন্তরে ৩৭ দিন ধরে চলা জেন-জি আন্দোলনের হট্টগোল পৌঁছেছে বিজেপি নেতাদের অন্দরমহলে। বিজেপি নেতা মুরলী মনোহর যোশী আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন আগেই। বহু বিজেপি নেতার সন্তানরাও এ প্রতিবাদে শামিল হন। এর মধ্যে আসাম গণপরিষদের (এজিপি) একজন মন্ত্রী, ওড়িশার এক প্রবীণ বিজেপি সংসদ সদস্য ও উত্তর প্রদেশের সাবেক এক বিজেপি বিধায়কের মেয়ের প্রকাশ্যে এই আন্দোলনকে সমর্থন আলোচনায় এসেছে।

বলা হচ্ছে, ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের প্রভাব বিজেপি নেতাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। বিজেপি নেতাদের বাড়িতে এই আন্দোলনের সমর্থকদের দেখা গেছে এবং এমনকি তাদের মেয়েরাও এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।

অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারে মুরলি মনোহর যোশী শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। গত ২৩ জুলাই তরুণদের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর দমননীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, নারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের নৃশংস শক্তি প্রয়োগ দেখে আমি গভীরভাবে মর্মাহত।

দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির অবস্থান কর্মসূচির সমর্থনে ২৩ জুলাই আসামের গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন রাজ্য বিধানসভার মন্ত্রী ও এজিপি নেতা কেশব মহান্তের মেয়ে দিবিসা। এজিপি আসামে বিজেপি সরকারের শরিক দল।

গত শনিবার ওড়িশার বিজেপি সংসদ সদস্য অপরাজিতা সরঙ্গির মেয়ে অর্চিতা সচিন রাহার একটি ইনস্টাগ্রাম স্টোরি শেয়ার করেন, যেখানে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার পর উদযাপন করার ভিডিও রয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের সাবেক বিজেপি বিধায়ক বিক্রম সিংয়ের মেয়ে যশস্বিনী রাজে সিংও সামাজিক মাধ্যমে দলটির সমালোচনা করেছেন। এই তিনজনই জেন-জি প্রজন্মের, অর্থাৎ যাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে।

আসাম সরকারের মন্ত্রী- কন্যা যা বললেন

আসাম রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ও সরকারের শরিক দল এজিপির প্রবীণ নেতা কেশব মহন্তের মেয়ে দিবিসা মহন্ত গুয়াহাটিতে সিজেপির নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন। বেশ কয়েকটি ভিডিওতে তাকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে ও ন্যায়বিচার দাবি করতে দেখা যায়।

একটি ভিডিওতে দিবিসা বলছিলেন, যন্তর মন্তরের সহিংসতা নিয়ে আমি কতটা খারাপ অনুভব করছি, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। শিক্ষার্থীরা শুধু একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল। কিন্তু লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস— সবকিছু দিয়ে সহিংস করে তোলা হয়। সেখানে উপস্থিত প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর জন্য আমি গর্বিত। তাদের সাহসই আমাকে তাদের পাশে এসে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে।

গত রোববার আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকেও বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তার মন্ত্রিসভার এক সদস্যের মেয়ের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেন, আমার সন্তানরা যা বলে, তার জন্য আমাকে কীভাবে দায়ী করা যেতে পারে?

হিমন্ত বলেন, আমার নিজের ভাই আমার কোনো কোনো কথার সঙ্গে একমত নন। আমার সন্তানরাও আমার অনেক বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে। ছেলেমেয়েরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তখন তাদের কার্যকলাপকে তাদের মা-বাবার সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। সে মোদিজির বিরুদ্ধে কথা বলেছে, এতে আমি ব্যথিত। কখনো তার সঙ্গে দেখা হলে আমি এ বিষয়ে কথা বলব।

বিজেপির সাবেক বিধায়কের মেয়ে যা বললেন

বুধবার যশস্বিনী রাজে সিং কাতারভিত্তিক আল-জাজিরার সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলেন আন্দোলনে সমর্থন করা নিয়ে। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পদত্যাগের ভাষায় কোনো অনুশোচনা নেই। কোনো জবাবদিহিতাই নেই। ভাষাটা এমন, যেন তিনি শহিদ হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নিয়ে যশস্বিনী বলেন, সিজেপি আধুনিক যুগের মাধ্যম, যেমন— মিম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কন্টেন্টের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক অরাজনৈতিক মানুষকে একত্রিত করার দারুণ কাজ করেছে। তাদের মুখ্য ফোকাস ছিল ইনস্টাগ্রাম, যেটি কৌশল হিসেবে চমৎকার। কারণ সেখানেই আমরা বিক্ষোভের ব্যাপক প্রচার দেখেছি। এর মাধ্যমে তারা এমন সব মানুষকে একত্রিত করেছে, যারা সাধারণত রাজনৈতিক আলোচনা এড়িয়ে চলেন।

যশস্বিনী সিংয়ের বাবা বিক্রম সিং উত্তর প্রদেশের ফতেহপুর সদর বিধানসভা কেন্দ্রের একজন সাবেক বিজেপি বিধায়ক। তিনি ফতেহপুর থেকে দুবার বিধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির এক প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলেও তিনি ফতেহপুরে এখনো বিজেপির একজন সক্রিয় নেতা।

বিজেপির সঙ্গে বাবার সম্পৃক্ততা ও তার নিজের রাজনৈতিক প্রস্থান প্রসঙ্গে যশস্বিনী সিং বলেন, আমি নিজেকে ভণ্ড বা কপট বলে মনে করি না। আমি আর্থিকভাবে কারও ওপর নির্ভরশীল নই। আমি নিজের মতো থাকি। আমি গত সাড়ে তিন বছর ধরে ভারতেই আছি এবং একাই বসবাস করছি। আমি ওই ধরনের পরিবেশে একেবারেই জড়াতে চাই না।

ওড়িশার বিজেপি সংসদ সদস্যের মেয়ে যা বললেন

ওড়িশার বিজেপি নেতা সংসদ সদস্য অপরাজিতা সরঙ্গির মেয়ে অর্চিতা সচিন রাহারের একটি পোস্টও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পিটিআইয়ের খবর, অর্চিতার এই পোস্টটি ওড়িশার দলীয় কর্মী ও নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়েছে।

অর্চিতার মাসহ ওড়িশা বিজেপির বেশ কয়েকজন নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধানের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু অর্চিতা রাহা ইনস্টাগ্রামে ভারতের জাতীয় পতাকার একটি ইমোজিসহ লেখেন, জয় হিন্দ! নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভের মধ্যে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন।

বিজেপি নেতারা অর্চিতা রাহারের পোস্টের সমালোচনা করেন। বিজেপি নেতা জগন্নাথ প্রধান বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান এই মাটির সন্তান। তার পদত্যাগে আমরা দুঃখিত। ওড়িশার মানুষ বিহার কন্যাকে (অপরাজিতা সরঙ্গি) সাদরে গ্রহণ করেছেন, তাকে দুবার নির্বাচিত করেছেন। অপরাজিতা সরঙ্গির উচিত পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করা। ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে তার মেয়ের নেতিবাচক মন্তব্যের জন্য তার ওড়িশার জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

অপরাজিতা সরঙ্গি তার মেয়ের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়ে বলেছিলেন, পোস্টটি অনিচ্ছাকৃতভাবে শেয়ার করা হয়েছিল। তবে অর্চিতা আরেক পোস্টে লেখেন, ‘ডিপির (ধর্মেন্দ্র প্রধান) পিএকে বলছি, যিনি নিশ্চয়ই আমার মাকে মেসেজ করে আগের স্টোরিটা মুছে ফেলতে বলবেন (এমনটা আগেও হয়েছে)। চিন্তা করবেন না, আমি মুছব না। জয় জগন্নাথ! জয় হিন্দ।’ স্টোরিটি অবশ্য পরে মুছে ফেলা হয়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপি নেতা অপরাজিতা সরঙ্গি এই পোস্টগুলো সম্পর্কে বলেছেন, অর্চিতা একজন জেন-জি এবং সে এই স্টোরিটি তার বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করেছিল। আমি যখন তাকে জিজ্ঞাসা করি, সে তার ভুল বুঝতে পেরে পোস্টটি মুছে ফেলে। সে আমাকে বলেছিল, স্টোরিটি অনিচ্ছাকৃতভাবে পোস্ট করা হয়েছিল। সে সময় আমি ওড়িশায় আমার নির্বাচনি এলাকায় ছিলাম এবং সে দিল্লিতে ছিল।

গত শনিবার রাতে অপরাজিতা সরঙ্গিও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিয়ে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করে পদত্যাগ করার জন্য অনেক সাহসের প্রয়োজন হয়। এই কঠিন সময়ে আমি তার পাশে আছি। আগামী দিনগুলোর জন্য আমি তার মঙ্গল কামনা করি। ভগবান জগন্নাথ যেন তাকে আশীর্বাদ করেন।

ওড়িশা ক্যাডারের ১৯৯৪ ব্যাচের আইএএস অফিসার অপরাজিতা সরঙ্গি ২০১৩ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ডেপুটেশনে ছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে দিল্লিতে দলের তৎকালীন জাতীয় সভাপতি অমিত শাহের বাসভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। অনুষ্ঠানে তৎকালীন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, ওড়িশা বিজেপি সভাপতি বসন্ত পান্ডা ও দলের ওড়িশা ইনচার্জ অরুণ সিংও উপস্থিত ছিলেন।

বিবিসি বাংলা অবলম্বনে

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ট্রাম্পের শুল্কের জবাবে কানাডার কড়া পদক্ষেপ, ৭০০ মার্কিন পণ্যে শুল্ক

কাতারের সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার কানাডা সরকার জানিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্কের সমপরিমাণ বা ‘ডলার-ফর-ডলার’ নীতিতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে তারা। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা এক ডলার শুল্কের বিপরীতে সমানহারে শুল্ক বসাবে কানাডা। একই সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্

৫ ঘণ্টা আগে

ভারতের তিন নাগরিক ও ৪ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য কেনা, সংগ্রহ, বিক্রি, পরিবহন বা বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য লেনদেনে জেনেশুনে জড়িত থাকার কারণে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

৬ ঘণ্টা আগে

গ্রিসের উপকূল থেকে বাংলাদেশিসহ ৭৯ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার

গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী থানোস প্লেভরিস অভিবাসীদের আগমন ঠেকাতে কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ ছাড়া অভিবাসীদের আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে রিটার্ন হাব স্থাপনের বিষয়েও জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে গ্রিস।

৭ ঘণ্টা আগে

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের, আলোচনায় ফিরতে চায় ওয়াশিংটন

ইরানের অর্থনীতি আরও বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জবাবে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরানের দাবি, ওয়াশিংটন একদিকে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ালেও অন্যদিকে আবারও কূটনৈতিক আলোচনার পথ খুলতে চাইছে।

১ দিন আগে