অব্যবস্থাপনা ও প্রকাশকদের হতাশার বইমেলা

অধ্যাপক জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, ইমদাদুল হক মিলনসহ জনপ্রিয় লেখকদের অনেকেই এবার মেলায় আসেননি৷ কারো কারো একটা-দুটো বই প্রকাশিত হলেও একবারের জন্যও মেলায় আসেননি তারা।
‘যেভাবে মব চলছে!’
কবি নাসির আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমি বইমেলায় যাইনি। যেভাবে মব চলছে, তাতে বারবার নিরাপত্তার অভাবের কথাই মনে হয়েছে। তসলিমা নাসরিনের বই রাখার কারণে একজন প্রকাশককে যেভাবে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে, সেটা সবাইকে ভাবিয়েছে। একুশ মানে তো মাথা নত না করা। অথচ মনে হচ্ছে আমরা মাথা নত করে ফেলেছি। রাজনৈতিক পরিবর্তন তো হতেই পারে। এর সঙ্গে বইমেলার সম্পর্ক মেলানো ভালো লাগেনি। গত দুই যুগ ধরে আমি বইমেলায় যাইনি এমন একটা দিনও নেই। ব্যতিক্রম শুধু এবার। আমি পরিচিত লেখকদের সঙ্গে কথা বলেছি৷ তারা কেউ যাননি। বাংলা একাডেমির তরফে এই লেখকদের বই মেলায় নেওয়ার কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি। সব মিলিয়ে এবার যাওয়া হয়নি।’
অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামও ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, তিনিও এবার বইমেলায় যাননি।
তবে নিয়মিত বইমেলায় ছিলেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা.মোহিত কামাল। এবার তার ৬টি বই প্রকাশিত হয়েছে। ডয়চে ভেলকে তিনি বলেন, ‘এবারের বইমেলাটি আমার কাছে বেশ হতাশার ছিল। কারণ, মানুষের সমাগম যেমন কম ছিল, তেমনি বিক্রি ছিল তার চেয়েও কম। শুধুমাত্র শেষ দিন, অর্থাৎ শুক্রবার মানুষের উপস্থিতি ছিল আশাব্যঞ্জক।’ মানুষের বই কেনার আগ্রহ কমে যাওয়া লেখকদের জন্য খুব হতাশার- এ কথাও বলেন তিনি।
বইয়ের দাম বেশি
শুক্রবার, অর্থাৎ এবারের আয়োজনের শেষ দিন মেলায় এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরনি ঘোষ। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘বইয়ের দাম বেড়েছে। কিন্তু আমাদের বাজেট তো বাড়ছে না। আগে বাড়ি থেকে যে টাকা দিতো, এখনো সেই টাকাই দেয়। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে মাসের খরচ শেষে বাড়তি টাকা থাকে না। সে কারণে বইও কেনা হচ্ছে না। গত বছরও আমি ৬টি বই কিনেছি। কিন্তু এবার কিনেছি মাত্র একটি বই। তাও সেটি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার অংশ। ফলে আমার মনে হয়, মানুষের হাতে টাকা নেই বলে কিনতে পারছে না। জীবন চালাতেই মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন। বই কিনবেন কিভাবে? আর বইয়ের দামটাও এবার একটু বেশি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেক শিক্ষার্থী মাহমুদ হোসাইন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘অন্যান্য বছর বই কেনার জন্য আলাদাভাবে বাজেট করা হয়। এবার তো সামনে ঈদ, আবার সবকিছুর দামে এমন ঊর্ধ্বগতি, সব মিলিয়ে বই কেনার জন্য আলাদা বাজেট করা হয়নি। তারপরও যে দু-একজন পছন্দের লেখক আছে, তাদের কয়েকটা বই সংগ্রহ করেছি।’
বই বিক্রি নিয়ে হতাশা
প্রথমা প্রকাশনীতে খণ্ডকালীন বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন ঢাকা কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জহুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এবারের বইমেলার বেচা-বিক্রিতে প্রকাশকরা হতাশ। আমাদের প্রকাশনী থেকে রাজনৈতিক বইগুলো বেশি প্রকাশিত হয়। কিন্তু এবার রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নানা কারণে পাঠক কমেছে, বিক্রিও কমেছে। বঙ্গবন্ধুকেন্দ্রিক বইগুলোও আগে অনেক বিক্রি হতো, এবার সেটাও নেই। সব দিক মিলিয়ে বিক্রি অর্ধেকেরও কম।’
ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী আদিত্য অন্তর ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘এবারের বইমেলাটি একেবারেই অপরিচিত মনে হয়েছে। প্রথমত, আমি প্রকাশক হিসেবে আগের বছরগুলোতে যখনই বইমেলায় ঢুকেছি, আমাকে তল্লাশি করা হয়েছে। এবার একবারও কেউ তল্লাশি করেনি। তাহলে নিরপত্তা কেমন ছিল বুঝতেই পারছেন। দ্বিতীয়ত, ভাজা মুড়ি থেকে শুরু করে চুড়ি, শিশুদের খেলনা সবকিছুই ছিল বইমেলাতে। যে-কেউ ঢুকলে দেখবে এটা বারোয়ারি মেলা। অথচ বইমেলা তো এমন না। তৃতীয়ত, আমি নিজে নিজে অনেকদিন সার্ভে করেছি, আমার প্যাভেলিয়ন থেকে বের হয়ে প্রথম একশ' জন মানুষ গুণেছি, তাদের কারো হাতে বই নেই। এটা একদিন না, একাধিক দিন। ফলে বিক্রিয় অবস্থা বুঝতেই পারছেন কেমন ছিল। এবার অনেক লস হবে।’
পরিচিত লেখকদের অনুপস্থিতি বিক্রি কম হওয়ার কারণ কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই। পাঠকরা লেখকের অটোগ্রাফ নিতে চান। লেখক স্টলে না থাকলে ওই লেখকের বই কেনার আগ্রহ অনেক সময় কমে যায়।’
বাংলা একাডেমি যা বলছে
লেখক-প্রকাশকদের অনুযোগ, অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে অমর একুশে বইমেলার সদস্য সচিব ড.সরকার আমিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বইমেলা হবে কিনা সেটা নিয়েই তো সন্দেহ ছিল। তারপরও আমরা সুন্দরভাবে আয়োজনটি সম্পন্ন করেছি। পুলিশের ভুমিকা কী তা তো আপনারা ভালো করেই জানেন। আমরা বারবার তাদের সঙ্গে মিটিং করে সহযোগিতা চেয়েছি। পুলিশের সহযোগিতা ছাড়া তো বইমেলাকে হকারমুক্ত করা সম্ভব না। কিছু ভুল-ত্রুটি হয়ত ছিল, ভবিষ্যতে এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আরো ভালো করা হবে।’
অধ্যাপক জাফর ইকবাল,আনিসুল হক,ইমদাদুল হক মিললসহ জনপ্রিয় লেখকদের মেলায় না আসার বিষয়ে তিনি বলেন,‘লেখকদের আসতে তো কোনো বাধা নেই। বাংলা একাডেমি তো লেখকদের আমন্ত্রণ করে না। তারা কেন আসেননি সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।” বাংলা একাডেমি যেসব সেমিনারের আয়োজন করে, সেগুলোতে তাদের ডাকা যেতো কিনা জানতে চা্ইলে অমর একুশে বইমেলার সদস্য সচিব বলেন, "ওই সেমিনারগুলোতে গুনীজনদেরই ডাকা হয়েছিল।’
২৭তম দিন, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বই মেলায় নতুন বই এসেছে ১৭৬টি। সব মিলিয়ে ওইদিন পর্যন্ত বইমেলায় নতুন বইয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৯৬৪টি। এবারের মেলায় গতবারের চেয়ে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিক্রি কম হয়েছে বলে মনে করেন প্রকাশকরা। বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়ন থেকে ২০২৪ সালে মেলায় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকার বই বিক্রির তথ্য দেওয়া হয়েছিল। এর আগের বছর তা ছিল ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বই। বইমেলায় ২০২৪ সালে নতুন বই প্রকাশের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৭৫১টি। এর আগের বছর প্রকাশিত হয়েছিল ৩ হাজার ৭৩০টি। এবারের বইমেলায় বৃহস্পতিবার ২৭তম দিন পর্যন্ত নতুন প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৬৪টি। ফলে এবারের মেলায় অন্তত পাঁচশরও কম বই প্রকাশিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বইমেলায় অপ্রীতিকর ঘটনা
বইমেলায় তসলিমা নাসরিনের বই বিক্রির কারণে ১০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সব্যসাচী প্রকাশনীর স্টলে ‘তৌহিদী জনতা’-র ব্যানারের কিছু লোক হামলা চালায় । লেখিকার ‘চুম্বন' বই রাখার অভিযোগে স্টলটি ভাঙচুর হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্টলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সব্যসাচীর প্রকাশক ও অভিনেত্রী সনজানা মেহেরান তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রতি বছর তিনি তসলিমা নাসরিনের বই প্রকাশ করেন এবং বইমেলায় বিক্রি করেন। তবে বাংলাদেশে তসলিমার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি কিছু হুমকিও পান। তবে অতীতে সেগুলো মারাত্মক আকার ধারণ করেনি। এ বছরও তিনি তসলিমার ‘চুম্বন' বইটি প্রকাশ করেছেন এবং এর পর থেকে একের পর এক হুমকি পাচ্ছিলেন।
সেই হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে বাম সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা। তারা মিছিল নিয়ে মেলা প্রদক্ষিণ করে সব্যসাচী স্টলের সামনে বক্তব্য দেন। নেতা-কর্মীরা ‘বইমেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে', ‘বইমেলায় হামলা কেন, ইন্টেরিম জবাব দাও', ‘মবতন্ত্রের আস্তানা, বাংলাদেশে হবে না', ‘অভিজিৎ, দীপন, লাগবে আর কতজন'সহ নানা ধরনের স্লোগান দেন।
অমর একুশে বইমেলায় স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপার বিক্রি করায় একটি স্টল বন্ধ করা হয়। মেলা পরিচালনা কমিটির দাবি, স্যানিটারি ন্যাপকিন বা ডায়াপার বিক্রি করা আসল বিষয় নয়। অনুমোদন না থাকায় স্টলটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। মেলার নীতিমালা লঙ্ঘন করে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছিল বলে দাবি তাদের। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়, বেশ কিছু ইসলামিস্ট গ্রুপ স্টলটিতে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রিতে আপত্তি জানায়। ‘মব' এর শঙ্কা থেকে এবং স্পন্সর কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থকে বিবেচনায় রেখে স্টল করা হয়। বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব সরকার আমিন বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী, বইমেলায় বই এবং খাবার ছাড়া অন্য কোনো পণ্য বিক্রি করার সুযোগ নেই।
তবে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব সরকার আমিনের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে প্রাণ গ্রুপের মিডিয়া ম্যানেজার তৌহিদ হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘আমরা অনুমতি নিয়েই স্টলটি দিয়েছিলাম। সেখানে আমরা স্যানিটারি ন্যাপকিন যারা ফ্রি চেয়েছেন তাদের ফ্রি দিয়েছি। আর যারা কিনতে চেয়েছেন স্বল্প মূল্যে, তাদের কাছে বিক্রি করেছি। বাংলা একাডেমি যখন আমাদের এটা বন্ধ করতে বলেছে আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। আমাদের কারণে বইমেলায় কোনো ঝামেলা হোক সেটা আমরা চাইনি।’