হাসনাতের স্ট্যাটাসে ‘রিফাইন্ড আ.লীগ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’, সমঝোতার জন্য ‘চাপ’\n
আসিফ বলেন, আমরা তখন কথাগুলোকে ডিবাংক করছিলাম। বলছিলাম, সেগুলো ছিল আওয়ামী লীগের সময়কার পলিকিটিক্যালি মোটিভেটেড মামলা। এমন মামলা তো সবার নামে পাওয়া যাবে। আমাদের নামেও পাওয়া যাবে। আমার নামেও আছে। এটা বলার পর তারা আরেকটা কথা বললেন, ‘সোসাইটির একটা বড় অংশ তো উনাকে হেট করে।’
আসিফ বলেন, বড় অংশ বলতে উনি (সেনাপ্রধান) সরাসরি বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। আওয়ামী লীগ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দুচক্ষে দেখতে পারে না, একদম অপছন্দ করে। আওয়ামী লীগ একটা লোককে একেবারে দেখতে পারছে না, কিন্তু বাংলাদেশে আলটিমেটলি ৩০-৪০ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। এই ৩০-৪০ শতাংশ মানুষের মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে একটা লোককে প্রধান উপদেষ্টা করা উচিত?’
সেনাপ্রধানের এমন বক্তব্যের পরও ছাত্রনেতারা নিজেদের অবস্থান ছাড়েননি। আসিফ বলেন, আমরা বললাম, আওয়ামী লীগ এখন এমন কিছু না যেটা নিয়ে আমাদের কনসার্ন হওয়া উচিত। আওয়ামী লীগকে পরাজিত করেই আমরা এই প্ল্যাটফর্মে এসেছি, এখানে বসেছি। আওয়ামী লীগ কী চাইল বা না চাইল, এটা এখন আর কোনোভাবেই ম্যাটার করে না।
এরপরও বিষয়টি নিয়ে সেনাপ্রধান ও ছাত্রনেতাদের মধ্যে আরও দীর্ঘ সময় ধরে কথা হয়। আসিফের ভাষ্য, প্রায় চার ঘণ্টার ওই বৈঠকের প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার আলোচনাই অধ্যাপক ইউনূসকে ঘিরে আবর্তিত হয়। সেনাপ্রধান বারবাই ঘুরেফিরে ড. ইউনূসকে নিয়ে আওয়ামী লীগের অপছন্দের কথা তুলে ধরেন। তারাও বারবারই বলেন, আওয়ামী লীগের চিন্তাভাবনা নিয়ে তারা মোটেও ভাবতে রাজি নন।
আসিফ ভিডিওতে বলেন, বৈঠকে দুই দফা বিরতি দেওয়া হয়। সেনাপ্রধানসহ অন্যরা এ সময় ছাত্রনেতাদের অধ্যাপক ইউনূসের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বলেন। কিন্তু নতুন করে তারা আর কিছু ভাবেননি। বরং বৈঠকে তাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে তারা নিজেরা শহিদ মিনারে গিয়ে সরকার গঠনের শপথ নেওয়ার কথা তুলে ধরেন।
আসিফ বলেন, আমরা তো ঘোষণা দিয়ে দিয়েছি। আমরা এক ধরনের হুমকির সুরেই সেখানে বলি, রাষ্ট্রীয়ভাবে বা রাষ্ট্রপতি যদি মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ঘোষণা না দেন, তাহলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। কারণ আমরা ততক্ষণে ঘোষণা দিয়েছি, আমরা আমাদের তৈরি করা উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে শহিদ মিনারে গিয়ে শপথ নেব। এই হুমকিটা দেওয়ার পর তারা একটু নড়েচড়ে বসেন এবং তারা গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে আসেন।
সেনাপ্রধানকে উদ্ধৃতি করে আসিফ ভিডিওবার্তায় বলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে সেনাপ্রধান সবশেষে আমাদের বলেছিলেন, ‘আমি বুকে পাথর চাপা দিয়ে এই সিদ্ধান্তটা মেনে নিচ্ছি।’ আমাদের জায়গাটা ছিল খুবই অনড় যে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে না আনতে পারলে এখানে একটা শক্ত সরকার গঠন করা সম্ভব হবে না।
আসিফ বলেন, আর্মির মোটিভেশন ছিল এক-এগারোর মতো একটি সরকার গঠন করা। তারা উপদেষ্টা হিসেবে ছয়-সাতজনের নাম দেয়। সেখান থেকেই বোঝা যায়, এটা ছিল এক ধরনের ডিকটেট করা। সুতরাং আমরা যদি এমন কাউকে নিই, যার ব্যক্তিত্ব অত শক্তিশালী না, তাহলে আমরা অন্য কারও দ্বারা পরিচালিত হব। এই সরকার আত্মনির্ভরশীল ও স্বতন্ত্র সরকার হতে পারবে না। এই অনড় অবস্থানের কারণেই সবাই অধ্যাপক ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়।
অধ্যাপক ইউনূসের নাম কীভাবে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আলোচনায় এসেছে বা তারা তাকেই কীভাবে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে চূড়ান্ত করেছেন, সে কথাও ভিডিওবার্তায় তুলে ধরেন আসিফ মাহমুদ। অধ্যাপক ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য রাজি করানোর বিষয়েও কথা বলেন তিনি।
আসিফ বলেন, আন্দোলনের সময় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তার পাশাপাশি শামীম নামে ছাত্রদলের সাবেক এক নেতার মাধ্যমে সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী, অধ্যাপক আলী রীয়াজ ও বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তাদের সঙ্গে আলোচনায় সবার একটা কমন কথা ছিল, উনি (অধ্যাপক ইউনূস) আসবেন না। আলী রীয়াজ স্যারও বললেন, বদিউল আলম মজুমদার স্যারও বললেন, উনি আসবেন না। আরও যাদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, সবাই প্রায় একই কথা বলছিল।
অধ্যাপক ইউনূসের পিএস মঈন চৌধুরীর নম্বর সংগ্রহ করে তার সঙ্গে যোগাযোগের কথা তুলে ধরেন আসিফ। বলেন, মঈন চৌধুরীর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয় ২ বা ৩ আগস্ট। মঈন তাকে জানান, অধ্যাপক ইউনূস ফ্রান্সে আছেন। তার ছোট একটি সার্জারি আছে। তবে ছাত্রদের বার্তা তাকে জানানো হয়েছে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, মঈন চৌধুরী কথা বলার স্যার (অধ্যাপক ইউনূস) বার্তা পাঠালেন, তোমরা যা করছ, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। ২ তারিখের (২ আগস্ট) দিকে এমন একটি মেসেজ তিনি মঈন চৌধুরীর মাধ্যমে আমাদের পাঠান। আমার চিন্তা ছিল, আমাদের অর্থনীতির যে ভঙ্গুর পরিস্থিতি, একটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে আমরা সরকার গঠন করলে সেটার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যে স্বীকৃতি প্রয়োজন, এটি উনি ছাড়া পসিবল হবে না।
অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে আলাপচারিতার কথা তুলে ধরে আসিফ বলেন, স্যারকে (অধ্যাপক ইউনূস) অ্যাপ্রোচ করার পর স্যার বললেন, তোমরা অন্য কাউকে ভাবো। কয়েকজনের নামও বললেন। এর মধ্যে দুয়েকজন আমাদের উপদেষ্টা পরিষদে আছেন। তখন স্যার বললেন, আমি ভেবে দেখি, তোমরাও ভাবো, যদি অন্য কোনো ভালো অপশন পাওয়া যায়।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ৩ অগাস্ট অনেক কিছু অনিশ্চিত ছিল। এক দফা কেবল ঘোষণা হয়েছে। কবে পতন হবে, কবে আসবে— সবকিছুই অনিশ্চিত ছিল। এটাও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা ছিল সে সময়। আমার মনে হয়েছে, উনি নারাজ হলেও কিছুটা ইতিবাচক ছিলেন।
আসিফ জানান, ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয় নাহিদ ইসলাম ও মাহফুজ আলমদের জানিয়ে রেখেছিলেন তিনি। পরে ৫ অগাস্ট রাতে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে থাকা অবস্থায় মঈন চৌধুরীর মাধ্যমে ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাদের। সেখানে লাউড স্পিকারে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে কথা হয় নাহিদ ও আসিফের।
আসিফ বলেন, ওই আলাপে তিনি সরকারে আসার বিষয়ে এক ধরনের মৌন সম্মতি দেন। বলেন, আমি আসব। কিন্তু বিস্তারিত অ্যানাউন্স করার আগে তোমরা কোথাও বইল না। এ আলোচনাটা হওয়ার পরে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের অফিসেই আমরা ব্রিফিংটা করি। সরকারের রূপরেখাসহ অনেক বিষয় ছিল ঘোষণা করার। একটা অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলি। রাজনৈতিক দলের নেতা, নাগরিক সমাজসহ অন্যদের নিয়ে সরকারের গঠনের কথা ওই ব্রিফিংয়ে বলা হলেও ইউনূসের নাম ঘোষণা করা হয়নি।
এরপর রাত দুইটা-আড়াইটায় ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি ও নাহিদ। বলেন, এক-এগারোর মতো অন্যদের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার হবে কি না, তা নিয়ে ড. ইউনূসের উদ্বেগ ছিল। স্যার বলেছেন, ‘আমাকে স্বাধীনতাটা দিতে হবে। আর্মি রান করবে বা পেছন থেকে কেউ রান করবে, সেটা হলে আমি আসব না।’ আমরা বলি, আমাদের অবস্থানও এটাই যে সরকার যদি আমরা গঠন করি, স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। এখানে সেনাবাহিনী বা অন্য কোনো অথরিটি যদি হস্তক্ষেপ করতে চায়, সেটাকে মাঠ থেকে আমরা চ্যালেঞ্জ করব। এ ধরনের নিশ্চয়তা আমরা স্যারকে দিই।
উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়ার কথা তুলে ধরে আসিফ বলেন, ড. ইউনূসের দিক থেকে ২৩-২৪ জনের নাম আসে। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েক নেতার নামও কমন ছিল। এরপর একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়, যারা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করবে। মাহফুজের নেতৃত্বে ওই লিয়াজোঁ কমিটি জামায়াত, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে দেয়। কিছু নাম ছিল সবার দিক থেকে কমন। যেমন— সালেহউদ্দিন আহমেদ স্যার, উনার নামটা সব দিক থেকে আসে।
অধ্যাপক ইউনূস ৮ অগাস্ট দুপুরে ঢাকায় নামার পর সেনাবাহিনী থেকে পাঁচ-ছয়টি নাম প্রস্তাব করা হয় জানিয়ে আসিফ বলেন, অভ্যুত্থানের নেতারা দেখেন, এই ব্যক্তিরা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য না। তাদের মধ্যে ‘সফট আওয়ামী লীগ’ বা ‘আওয়ামী লীগের সিভিল সোসাইটি’ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরাও ছিলেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, সেখানে নাম থাকা একজন সেনা কর্মকর্তা চার বছর ভারতে ছিলেন এবং সেখান থেকে তিনটি কোর্স করেন। উনার ব্যাপারে জনমত হলো, ‘র’-এর সঙ্গে সংযোগ আছে। ওই নামগুলো আমরা কেটে দিই। সেটাতে সেনাবাহিনী কিছুটা নাখোশ হয়। কিন্তু এক-এগারোর মতো সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার যেন না হয়, সে কারণেই নামগুলো রাখা হয়নি। সেখান থেকে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার নাম রাখা হয়েছে।