ইতিহাসে প্রথমবার সোনার আউন্স ৫০০০ ডলারে

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
সোনার অলংকার। প্রতীকী ছবি

দেশের বাজারে বাড়তে বাড়তে আড়াই লাখ টাকা ছাড়িয়েছে প্রতি ভরি সোনার দাম। এর পেছনে রয়েছে বিশ্ববাজারের প্রভাব। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, বিশ্ববাজারেও সোনার দাম আকাশ ছুঁয়েছে। সবশেষ প্রতি আউন্স (২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম) সোনার দাম ছাড়িয়েছে পাঁচ হাজার ডলার। ইতিহাসে এর আগে কখনো সোনার দাম এত বেশি ছিল না।

বিবিসি খবরে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে কেবল ২০২৫ সালেই সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। এ বছরের শুরু থেকেও এর দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে সোনার দাম।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) যখন এ খবর এসেছে, তখন বাংলাদেশেও আরও একবার বেড়েছে সোনার দাম। এ দিন সন্ধ্যায় বাজুস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সোনার দাম ভরিতে (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) এক লাফে পাঁচ হাজার ২৪৯ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তাতে ২২ ক্যারেট মানের সোনার প্রতি ভরির দাম দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৬২ হাজার ৪৪০ টাকায়। স্থানীয় হিসেবে প্রতি ২ দশমিক ৪৩ ভরি সোনার সমান এক আউন্স হয়।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে চলমান টানাপোড়েন এবং বিশ্বজুড়ে আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও ঘণীভূত হওয়ার মধ্যেই সোনার দামে এ উল্লম্ফন দেখা গেল। বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতিও বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা বলেন, মূলত যেকোনো অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীরা যেসব সম্পদকে নিরাপদ মনে করেন, সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু তার মধ্যে অন্যতম। আর এই প্রবণতার কারণেই গত শুক্রবার রুপার দামও ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্সে ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত বছর বিশ্বব্যাপী রুপার দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছিল।

সোনাসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বাড়ার পেছনে আরও বেশ কয়েকটি কারণ আছে। এর মধ্যে রয়েছে তুলনামূলক বেশি মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল মার্কিন ডলার, বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় অঙ্কের সোনা কেনা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ চলতি বছরে আবার সুদের হার কমাতে পারে— এমন আভাসও বাজারকে সোনার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাও সোনার দামে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

সোনার প্রতি সবার বড় আকর্ষণের কারণ হলো এর সীমিত প্রাপ্যতা। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মোট প্রায় দুই লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন সোনা উত্তোলন করা হয়েছে। এ পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে তিন থেকে চারটি অলিম্পিক সাইজের সুইমিং পুল ভরা যাবে। এই সোনার বেশিরভাগই তোলা হয়েছে ১৯৫০ সালের পর। কারণ সেসময় খনন প্রযুক্তি আরও বেশি উন্নত হয় এবং সোনার নতুন খনি আবিষ্কার করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে বলছে, ভূগর্ভে এখনো প্রায় ৬৪ হাজার টন সোনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে উত্তোলন করা সম্ভব। তবে ধারণা করা হচ্ছে, আসছে বছরগুলোতে সোনার সরবরাহ ধীরে ধীরে স্থির হয়ে যেতে পারে।

সোনা ও মূল্যবান ধাতু পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান এবিসি রিফাইনারির ইনস্টিটিউশনাল মার্কেট বিভাগের গ্লোবাল হেড নিকোলাস ফ্রাপেল বলেন, হাতে সোনা থাকার অর্থ কোনো ঋণের ঝামেলা নেই। যেমন— এটি বন্ডের মতো নয়, যেখানে ঋণগ্রহীতার ওপর নির্ভর করতে হয়। কিংবা এটি শেয়ারের মতো নয়, যেখানে কোনো কোম্পানির পারফরম্যান্সের ওপর দাম নির্ভর করে।

নিকোলাসের মতে, অনিশ্চয়তার এই বিশ্বে বিনোয়োগের জন্য সোনা খুব ভালো একটি মাধ্যম।

সোনার দিকে ঝুঁকছে মানুষ

২০২৫ সালটি ছিল সোনার জন্য রেকর্ড গড়ার এক বছর। ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম সোনার দামে সবচেয়ে বড় বার্ষিক উত্থান দেখা গেছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে সোনাসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকেছেন।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে উদ্বেগ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর মূল্য অতিরিক্ত হয় কি না— এসব আশঙ্কায় আর্থিক বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এর প্রভাবেই সোনার দাম বারবার নতুন রেকর্ড গড়ছে।

আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মেটালস ফোকাসের গবেষক নিকোস কাভলিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তাই এই উত্থানের বড় কারণ।

সাধারণত অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা বাড়লে সোনার দাম বাড়ে। আবার সুদের হার কমবে— এমন আশঙ্কার কারণেও স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়। কারণ সুদের হার কমে যাওয়ার অর্থ সরকারি বন্ডের মতো বিনিয়োগে লাভ কমে যাওয়া। তখন বিনিয়োগকারীরা সোনা ও রুপার মতো সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। চলতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ দুই দফা সুদের হার কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পেপারস্টোনের রিসার্চ স্ট্র্যাটেজিস্ট আহমাদ আসিরি বলেন, এগুলোর সম্পর্ক বিপরীতধর্মী। কারণ (সুদ কমালে) সরকারি বন্ডে টাকা রেখে যে লাভ পাওয়া যায়, তখন তা আর তেমন একটা আকর্ষণীয় থাকে না। তাই মানুষ তখন সোনার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

শুধু বিনিয়োগকারীরাই নন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ব্যাপকভাবে স্বর্ণ কিনছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক শত শত টন সোনা তাদের রিজার্ভে যোগ করেছে। নিকোস কাভলিস বলেন, মার্কিন ডলার থেকে সরে আসার একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আর এতে সোনা সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরু থেকেই সোনার দাম বাড়তে থাকলেও নিকোলাস ফ্রাপেল সতর্ক করে বলেন, ‘খবরনির্ভর’ এই বাজার সোনার দাম কমিয়েও ফেলতে পারে। অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ কোনো ইতিবাচক খবর এলো, যা বিশ্ব পরিস্থিতির জন্য ভালো। কিন্তু সোনার জন্য তা ভালো নাও হতে পারে।

তবে সবাই যে শুধু বিনিয়োগের উদ্দেশ্যেই সোনা কিনে থাকেন, তা না। অনেক সংস্কৃতিতে উৎসব বা বিয়ের মতো অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে সোনা কেনা হয়। যেমন— ভারতে দীপাবলি উৎসবকে মূল্যবান ধাতু কেনার জন্য শুভ সময় হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়ে সোনা বা রুপার মতো ধাতু কিনলে তা সম্পদ ও সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আসে।

মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মর্গ্যান স্ট্যানলির হিসাব অনুযায়ী, ভারতের পরিবারগুলোর হাতে থাকা স্বর্ণের মূল্য প্রায় তিন দশমিক আট ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় ৮৮ দশমিক আট শতাংশের সমান।

এ ছাড়া ভারতের প্রতিবেশী দেশ চীন সোনার সবচেয়ে বড় একক ভোক্তা বাজার। সেখানে অনেকেই বিশ্বাস করেন, সোনা কেনা মানে সৌভাগ্য বয়ে আনে।

কাভলিস বলেন, চীনা নববর্ষের সময় সাধারণত সোনার চাহিদা বাড়ে। আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে শুরু হতে যাওয়া ‘ইয়ার অব হর্স’ ঘিরেও এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের ১৩১৬ কোটি টাকার লোকসান

সাম্প্রতিক আর্থিক পারফরম্যান্সের তুলনায় এই লোকসান এখন ব্যাংকের অবস্থায় বড় ধরনের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ইসলামী ব্যাংক মুনাফায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মুনাফা করে ব্যাংকটি। এই

১৪ ঘণ্টা আগে

রপ্তানি বহুমুখীকরণে ইসিফরজে প্রকল্প: ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান

বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি চালু করে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্

১৪ ঘণ্টা আগে

গানভর ইউএসএ থেকে ৭১ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আনবে সরকার

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে আগামী ১৩ বছর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করবে সরকার। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে মোট ৭৮ কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত প্রতি

২ দিন আগে

বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক যুক্ত হচ্ছে না: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা

উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। তবে বাংলাদেশের ওপর নতুন শুল্ক যুক্ত হচ্ছে না।

৩ দিন আগে