অর্থনীতিতে নানা চ্যালেঞ্জ, কেমন হবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম মুদ্রানীতি

কর্মসংস্থান আর বিনিয়োগে স্থবিরতার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ সামনে রখে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতির নানা সূচকে স্থবিরতার কারণে গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে আসছিল। দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবারের মুদ্রানীতি কেমন হবে, তা জানতে আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টসহ সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির ধারা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে টানা সুদের হার বাড়িয়ে চলছিল, সেই ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসার দিকনির্দেশনা থাকতে পারে নতুন মুদ্রানীতিতে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ডলারসহ অন্যান্য বিদেশি মুদ্রার বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও নতুন মুদ্রানীতিতে দৃশ্যমান হতে পারে।
সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে পর্ষদ সভায় প্রাক্কলিত মুদ্রানীতি অনুমোদন দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে বিকেল ৩টায় আগামী জুন পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন গভর্নর আহসান এইচ মনুসর।
গত বছরখানেক ধরেই দেশে মূল্যস্ফীতির ধারা ঊর্ধ্বমুখী। গত বছর শেষ হয়েছে দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতিতে। টানা চার মাস পর গত জানুয়ারিতে শেষ পর্যন্ত এটি এক অঙ্কে নেমে আসে। ফলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারা থেকে এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে।
সাধারণত বছরের প্রথম মাসেই পরবর্তী ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকারের আর্থিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাজারে অর্থ সরবরাহের পরিমাণ নির্দিষ্ট রাখার পরিকল্পনা থাকে মুদ্রানীতিতে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ পান আহসান এইচ মনসুর। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সরকারের আমলের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির বিপরীতে অর্থনীতির নানা সূচক নিয়ন্ত্রণ করতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেন। এসব উদ্যোগের ফলে জানুয়ারি নাগাদ অর্থনীতিতে কতটুকু পরিবর্তন আসে, তা আমলে নিয়ে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেন গভর্নর। সে কারণেই এ বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ হতে যাচ্ছে এই নীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই নীতি ঘোষণা করা হবে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মূল্যস্ফীতিতে লাগাম টানাকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ও গভর্নর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, জানুয়ারি শেষে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে। এর আগের চার মাসই মূল্যস্ফীতি ছিল দুই অঙ্কের ঘরে।
এতেই অবশ্য সন্তুষ্ট নয় সরকার। গত ২৮ জানুয়ারি অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রমজান মাসের জন্য সরকার কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে। মার্চ থেকে আরও কিছু উদ্যোগ দৃশ্যমান হবে। এগুলোর ফলাফল মিলবে জুন-জুলাই নাগাদ। ওই সময় মূল্যস্ফীতি ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে নেমে আসতে পারে। জুলাই নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন গভর্নরও।
মূল্যস্ফীতি কমে আসার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার বাড়ানোর কৌশলের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। গভর্নরের দায়িত্ব পাওয়ার পর শুরুতেই এই হার বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সাড়ে ৮ শতাংশ থেকে কয়েক দফায় বাড়িয়ে সর্বশেষ একে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছেন। এতে কয়েক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি কমে এলেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
তারা বলছেন, উচ্চ সুদের হারের কারণে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে গভর্নরের কাছে সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। তবে গভর্নর ইঙ্গিত দিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি কমে আসতে ভূমিকা রাখায় সুদহার না-ও কমাতে পারেন নতুন মুদ্রানীতিতে। আবার রমজান সামনে রেখে পণ্য আমদানিতে যেন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে তিনি হয়তো সুদহার আর বাড়াবেনও না।
এদিকে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অর্থনীতিতে অন্যতম দুশ্চিন্তার নাম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। একসময় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এই রিজার্ভ গত বছরের মে মাসে ১৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে আসে। এ নিয়ে অর্থনীতিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে রেমিট্যান্সে নেতিবাচক ধারা দেখা দেয়। কমতে থাকে রপ্তানি আয়ও।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় মাস থেকেই ফের রেমিট্যান্সে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে গতি ফিরে পায় রপ্তানি খাতও। সবশেষ রপ্তানি আয়ে প্রায় ১১ শতাংশ ও রেমিটান্সে ২৩ দশমিক ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি গত কয়েক মাসে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ ও সুদ পরিশোধের পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন আইএমএফ নির্দেশিত বিপিএম পদ্ধতিতে ২০ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রস পদ্ধতিতে এই রিজার্ভ ২৫ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের ঘুরে দাঁড়ানোর এই প্রবণতা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে। আইএমএফের চতুর্থ কিস্তির ঋণ পেতে তাই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণার চাপ থাকলেও গভর্নর মুদ্রানীতি প্রণয়নে কিছুটা হলেও স্বাধীনতা পাবেন।
মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বিবেচ্য বিষয় বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার। গত বছর দেড়েক সময়ে ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে এর বিনিময় হার বাজারমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়৷ সবশেষ গত ডিসেম্বরে বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারমুখী করার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর জানুয়রি থেকে ডলারের দাম ১২২ টাকায় স্থিতিশীল আছে।
আইএমএফ অবশ্য এই হার পুরোপুরি বাজারমুখী করতে ডলারের দাম আরও আড়াই টাকা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। এর কারণ হলো, ব্যাংকগুলো তাদের ডলারের বিনিময় বাংলাদেশ ব্যাংককে ১২২ টাকা দেখালেও বাস্তবে আরও বেশি দরে বেচাকেনা করছে। আইএমএফের পরামর্শ মেনে ডলারের দাম পুরোপুরি বাজারদর অনুযায়ী করলে ব্যাংকগুলোর এই অনৈতিক চর্চা বন্ধ হলে সাময়িক অসুবিধা হলেও দীর্ঘ মেয়াদে সুফল মিলবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, লুটপাট আর অনিয়ম-দুর্নীতিতে বেহাল হয়ে পড়া দেশের অর্থনীতি অন্তর্বর্তী সরকার গত ছয় মাসে যেভাবে সামাল দিয়েছে, তাতে অর্থনীতির ধসে পড়ার আশঙ্কা দূর হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা হলেও কমে আসার পাশাপাশি রেমিট্যান্স, রপ্তানি আর রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল থাকায় এবার বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থান খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারলে সরকার অনেকটাই স্বস্তিতে থাকবে। নতুন মুদ্রানীতিতে তারই দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করছেন তারা।