৯ মাসে ধরে বন্ধ টেকনাফ স্থলবন্দর, রাজস্ব ঘাটতি ৩০০ কোটি টাকা

সাঈদ মুহাম্মদ আনোয়ার, কক্সবাজার
আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২: ১৭
টেকনাফ স্থলবন্দর। ছবি: সংগৃহীত

টানা নয় মাস ধরে কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সরকারের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ শ্রমিক ও ব্যবসায়ী পড়েছেন চরম আর্থিক সংকটে।

দীর্ঘদিন বন্দর বন্ধ থাকায় রাজস্ব আয় যেমন কমছে, তেমনি বন্দরের নিজস্ব আর্থিক সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সীমান্ত এলাকায় অবৈধ বাণিজ্য ও চোরাচালান বেড়েছে। নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবিকার তাগিদে অনেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতি।

টেকনাফ কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বন্দর থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল ৬৪০ কোটি টাকা। পরবর্তী অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪০৪ কোটি টাকায়, অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব কমে যায় ২৩৬ কোটি টাকা। সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রাজস্ব আয় নেমে এসেছে মাত্র প্রায় ১১০ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা কম।

টেকনাফ কাস্টমসের কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, নানা জটিলতার কারণে চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্দর পুনরায় সচল করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাজস্ব আয় আবার বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে মিয়ানমার থেকে সবশেষ চাল, ডাল, ভুট্টা, শিম, আদা, রসুন, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, পেঁয়াজ ও মাছ আমদানি করা হয়। এরপর মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গত ৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সভায়ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় বন্দরের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ শ্রমিক মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। সীমান্ত বাজারগুলোতে চোরাই পণ্যের সরবরাহ বাড়ছে, আর সরকার হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব।

কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এহতেশামুল হক বাহদুর বলেন, প্রায় এক বছর ধরে কোনো ব্যবসা নেই। আয় না থাকলেও অনেক ব্যবসায়ীকে ব্যাংকের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বহু ব্যবসায়ী একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান, প্রায় ৯০ লাখ মার্কিন ডলার মিয়ানমারে আটকে রয়েছে, যা আদায় বা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তার মতে, মিয়ানমারে নির্বাচন শেষে নতুন সরকার গঠনের পর আরাকান অঞ্চলে শান্তি ফিরলে ব্যবসা চালুর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন চৌধুরী জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণে গত ১২ এপ্রিল থেকে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে বন্দরের ব্যয় বাবদ প্রতি মাসে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে, অথচ কোনো আয় নেই। এই ব্যয় বহন করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার মতে, নিরাপত্তার শঙ্কা দূর না হলে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এ ছাড়া এ স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী এনামুল হাসান বলেন, টেকনাফের অর্ধেকের বেশি মানুষ এই বন্দরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। এটি এখানকার মানুষের একমাত্র বড় বৈধ আয়ের উৎস। বন্দর বন্ধ থাকায় অনেক মানুষ জীবিকার সংকটে পড়ে অবৈধ পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি দ্রুত বন্দর চালুর দাবি জানান।

বন্দরের শ্রমিক সর্দার আবুল হাশিম জানান, গত নয় মাস ধরে বন্দর বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেকেই পরিবার নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় শুরুর আশাতেই দিন গুনছেন তারা।

চলমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও বন্দর সংশ্লিষ্টরা দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং পরীক্ষামূলকভাবে হলেও বন্দর চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, বন্দর বন্ধ থাকলে রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি সীমান্ত অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, বেতন কমল ৫ জনের

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গত বছর বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যানকে অবরুদ্ধ করার ঘটনায় ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে ২২ জনের বিষয়ে মঙ্গলবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

৩ দিন আগে

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৬ সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ

৩ দিন আগে

শেয়ারবাজারে মার্জিন অর্থায়নে বড় পরিবর্তন, ইক্যুইটি-ঋণের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১

সংশোধিত বিধানে কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী গ্রাহকের ইক্যুইটির চেয়ে বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না। অর্থাৎ গ্রাহকের ইক্যুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১ থাকবে। পাশাপাশি কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার প্রকৃত মূলধন বা নিট সম্পদের চারগুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না।

৩ দিন আগে

ঋণনির্ভরতা কমাতে রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় সংস্কারের কথা জানালেন অর্থমন্ত্রী

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

৪ দিন আগে