ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির পর কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে বিশ্ব অর্থনীতি?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যে নৌ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর বিশ্বের তেলের বাজার অনেকটা নির্ভর করছে। ছবি: সংগৃহীত

তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির একটি কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছেছে। এই চুক্তি কার্যকর হলে আবারও খুলে যেতে পারে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। এতে বৈশ্বিক তেলের বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ থামলেই মুহূর্তেই সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরবে না। তেল পরিবহন, জাহাজ চলাচল, বিমা, জ্বালানি অবকাঠামো ও খাদ্য সরবরাহ— সবকিছু পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

হরমুজ প্রণালি কবে পুরোপুরি সচল হবে?

চুক্তির ঘোষণা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেল প্রবাহ আবার শুরু হোক।’ তিনি জানিয়েছেন, শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সইয়ের পর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি বদলায়নি।

জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান মেরিন ট্রাফিকের তথ্য, ঘোষণা দেওয়ার পরও প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল খুবই সীমিত। রোববারের পর মাত্র দুটি জাহাজ ওই পথ অতিক্রম করেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যত অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ ছিল। ফলে প্রায় ২০০টি জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকে পড়ে। সমুদ্রে মাইন, ড্রোন হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক শিপিং কোম্পানি এখনো অপেক্ষা করছে।

অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং বলেন, এই সমঝোতা স্থায়ী শান্তির সূচনা নাকি সাময়িক যুদ্ধবিরতি— তা এখনো নিশ্চিত নয়। তার মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও ট্যাংকারগুলোকে আবার সঠিক রুটে ফিরিয়ে আনা, তেল উৎপাদন ও পরিশোধন কেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা এবং জাহাজের বীমা-সংক্রান্ত জটিলতা কাটাতে সময় লাগবে।

তেলের দাম কতটা কমতে পারে?

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। সংঘাত শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলারের নিচে। যুদ্ধ চলাকালে তা বেড়ে ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। চুক্তির ঘোষণার পরপরই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম নেমে এসেছে ৮৩ দশমিক ৫৫ ডলারে।

জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাবুব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ফ্লোরেন্স স্মিটের মতে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা থাকতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে যে সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত ৬০ দিনের জন্য প্রণালি খোলা রাখার পরিকল্পনা। এরপর কী হবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি হতে আরও সময় লাগতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে বছরের শেষ নাগাদ তেলের বাজার অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

খাদ্যের দামেও কি স্বস্তি আসবে?

তেলের পাশাপাশি সার উৎপাদনও যুদ্ধের বড় প্রভাবের মুখে পড়ে। বিশ্ববাজারে ব্যবহৃত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার ও সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে যুদ্ধের সময় সারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যার চাপ পড়ে কৃষকদের ওপর।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কুইলটার শেভিওটের জ্বালানি বিশ্লেষক মৌরিজিও কারুল্লির মতে, যুদ্ধবিরতি সারের বাজারে তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো মেরামত এবং সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি সচল হতে সময় লাগবে।

এ ছাড়া বিশ্বের অনেক অঞ্চলে এরই মধ্যেই কৃষি মৌসুম শুরু হয়ে যাওয়ায় সার সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও এবারের উৎপাদনে তার পুরো সুফল পাওয়া যাবে না।

শিপিং কোম্পানিগুলো কী করছে?

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কনটেইনার পরিবহন কোম্পানি মায়েরস্কের পাঁচটি জাহাজ এখনো পারস্য উপসাগরে আটকে আছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আপাতত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

অন্যদিকে জার্মানির হ্যাপাগ লয়েড জানিয়েছে, তাদের চারটি জাহাজও এখনো আটকে রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর ও সমুদ্রপথের মাইন পরিষ্কার হলে সপ্তাহান্তে সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সুদের হার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে?

যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপও বেড়েছিল। এর ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যুদ্ধ শুরুর আগে চলতি বছর সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দিলেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেই পরিকল্পনা স্থগিত হয়।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এ জে বেলের পরিচালক রাস মোল্ড বলেন, যুদ্ধের সময় বাজার ধারণা করেছিল ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত অন্তত দুই দফা সুদের হার বাড়তে পারে। কিন্তু নতুন সমঝোতার পর সেই আশঙ্কা অনেকটাই কমেছে।

মোল্ডের মতে, সুদের হার স্থিতিশীল থাকলে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবে, কর্মসংস্থান বাড়তে পারে, ভোক্তাদের ব্যয়ও বাড়বে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে স্থবির হয়ে পড়া আবাসন বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

চুক্তির ঘোষণা বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত পরীক্ষা হবে এর বাস্তবায়ন। হরমুজ প্রণালিতে নিয়মিত জাহাজ চলাচল শুরু, তেল ও গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমে আসার ওপরই নির্ভর করবে বিশ্ব অর্থনীতি কত দ্রুত স্বস্তি ফিরে পাবে।

অর্থাৎ, যুদ্ধ থামার খবর বাজারকে স্বস্তি দিলেও বিশ্ব অর্থনীতির পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে এখনো কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

বিবিসি অবলম্বনে

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের ১৩১৬ কোটি টাকার লোকসান

সাম্প্রতিক আর্থিক পারফরম্যান্সের তুলনায় এই লোকসান এখন ব্যাংকের অবস্থায় বড় ধরনের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ইসলামী ব্যাংক মুনাফায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মুনাফা করে ব্যাংকটি। এই

১৩ ঘণ্টা আগে

রপ্তানি বহুমুখীকরণে ইসিফরজে প্রকল্প: ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান

বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি চালু করে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্

১৩ ঘণ্টা আগে

গানভর ইউএসএ থেকে ৭১ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আনবে সরকার

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে আগামী ১৩ বছর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করবে সরকার। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে মোট ৭৮ কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৯ সাল পর্যন্ত প্রতি

২ দিন আগে

বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক যুক্ত হচ্ছে না: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা

উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। তবে বাংলাদেশের ওপর নতুন শুল্ক যুক্ত হচ্ছে না।

২ দিন আগে