
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে এই সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সোমবার (১৫ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রথমে এই চুক্তির খবর প্রকাশ করার পর ট্রাম্প নিজেই এর সত্যতা নিশ্চিত করেন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি এখন সম্পন্ন হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এতদ্বারা হরমুজ প্রণালি কোনো টোল বা শুল্ক ছাড়াই উন্মুক্ত করার পূর্ণ অনুমোদন দিচ্ছি এবং একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি।’ বিশ্ববাসীর উদ্দেশে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। এবার তেল সচল হোক!’
শান্তি চুক্তি নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবর
বিবিসি জানায়, এই শান্তি চুক্তির বিষয়ে ইরানের সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য করা হয়নি। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এই চুক্তির খবর প্রচার করেছে। অবশ্য তারা খবরটির সূত্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতির কথা উল্লেখ করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই ঘোষণার সময় উপস্থাপক বলেন, ‘আমেরিকা শেষ পর্যন্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং ‘প্রতিরোধ ফ্রন্টে’র (রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট) সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছে।’ ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং কিছু স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এই চুক্তিটিকে তেহরানের একটি বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের আধা সরকারি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ সমঝোতা স্মারকে থাকা ১৪টি বিষয় প্রকাশ করে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
১. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত।
২. ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি না করা এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের।
৩. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি।
৪. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি।
৫. ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।
৬. ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রত্যাহার।
৭. ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া।
৮. যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠন পরিকল্পনা দেবে, যাতে ব্যয় হবে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার।
৯. ইরানের তেল ও জ্বালানি পণ্যের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞার অবসান।
ট্রাম্পের দাবি: ‘আমিই সফল হলাম’
পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ট্রুথ সোশ্যালে এই চুক্তি নিয়ে পোস্ট করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, অন্য সব প্রেসিডেন্ট যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, তিনি সেখানে সফল হয়েছেন।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এই মহৎ চুক্তি পুরো অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বয়ে আনবে। আমার আগে অনেক প্রেসিডেন্ট ইরানের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন এবং তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছেন। এই অঞ্চলের নেতারা প্রথমবারের মতো এমন একজন প্রেসিডেন্টকে খুঁজে পেয়েছেন, যিনি তাদের প্রকৃত শান্তি অর্জনে সাহায্য করতে পারেন।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আগামী শুক্রবার চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর মাইন অপসারণের উদ্দেশ্যে প্রণালিটি উন্মুক্ত করা হবে। এর ফলে এই অঞ্চল এবং পুরো বিশ্বের জন্য আবারও দুই প্রান্ত থেকেই তেল সরবরাহ চালু হবে!’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘পরাজয়’: ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড
এদিকে এই শান্তি চুক্তিকে ওয়াশিংটন এবং ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ‘পরাজয়’ ও ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড।
দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের সাধারণ জনগণ, সশস্ত্র বাহিনী এবং এ অঞ্চলে তেহরানের প্রক্সি ও মিত্র সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এটা বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তাদের সামনে ‘পরাজয় মেনে নেওয়া এবং আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।’
বিবিসি জানায়, ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডের এই বক্তব্য মূলত দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রচার কৌশলের সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ, যেখানে প্রথম থেকেই এই চুক্তিটিকে ইরানের একটি বড় বিজয় হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে এই চুক্তির পর থেকেই ইরানের ভেতরে কট্টরপন্থিদের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা ও বিরোধিতার ঝড় উঠছে।
চুক্তিটির বিরোধিতাকারী কট্টরপন্থিদের একাংশ এই সমঝোতার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পার্লামেন্ট স্পিকারের বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন কট্টরপন্থিরা।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। নিজের মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও খামেনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেছিলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতা মোটেও ‘বুদ্ধিমানের কাজ হবে না‘ এবং এটি দেশের সংকট ও সমস্যাগুলোর কোনো ‘সমাধান‘ বয়ে আনবে না। সর্বোচ্চ নেতার সেই অবস্থান ভেঙে এই চুক্তি করায় এখন দেশটির অভ্যন্তরেই তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
আগামী শুক্রবার সই হবে ঐতিহাসিক চুক্তি
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে বিবিসি আরও জানিয়েছে, ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক ফোনালাপে নিশ্চিত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে।
তিনি বলেন, ‘লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধ এবং সামরিক অভিযানের একটি তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী অবসান আজ রাতেই ঘোষণা করা হবে।’ এর পাশাপাশি ইরানের ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর যে অবরোধ রয়েছে, সেটিও আজ রাত থেকেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিশ্বনেতাদের স্বাগত ও প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার। পাকিস্তানের পাশাপাশি এই আলোচনায় অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘আমরা আমাদের ভাই রাষ্ট্র ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা আশা করি, সব পক্ষই আগামী দিনের আলোচনাগুলোতে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক মনোভাব নিয়ে অংশ নেবে, যা এই অগ্রগতিকে আরও সুসংহত ও এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘যুদ্ধ শেষ করা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারকে অভিনন্দন জানিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান জানিয়ে আসছিলাম এবং এটিই ছিল আমাদের প্রত্যাশিত অগ্রগতি। হরমুজ প্রণালিতে টোলমুক্ত নৌ চলাচলের স্বাধীনতা অবশ্যই পুনরুদ্ধার করতে হবে, যাতে গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্ব জুড়ে সাধারণ মানুষের ওপর যে তীব্র অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে, তা লাঘব করা যায়।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই শান্তি বজায় রাখতে হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই কঠোরভাবে যাচাইযোগ্য এবং সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেটাই যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের অবস্থান।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘এটি সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি বিশ্বনেতাদের মধ্যে অন্যতম প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এই চুক্তির প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, জাপান ‘দৃঢ়ভাবে আশা করে’ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ ও নিরাপদ চলাচল বাস্তবে নিশ্চিত করা হবে এবং ইরানের পারমাণবিক সমস্যাসহ অন্যান্য বিষয়ে দ্রুত একটি চূড়ান্ত চুক্তি হবে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ আশা প্রকাশ করে বলেছেন, এই চুক্তি একটি ‘দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শান্তি’ বয়ে আনবে। তিনি বলেন, ‘পুরোপুরি অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগলেও, এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোরটি পুনরায় চালু করা জ্বালানির দাম এবং আমাদের অঞ্চলসহ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে অত্যন্ত জরুরি।’
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স এটিকে একটি ‘যুগান্তকারী ও গঠনমূলক চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাস এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে এই সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সোমবার (১৫ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রথমে এই চুক্তির খবর প্রকাশ করার পর ট্রাম্প নিজেই এর সত্যতা নিশ্চিত করেন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি এখন সম্পন্ন হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এতদ্বারা হরমুজ প্রণালি কোনো টোল বা শুল্ক ছাড়াই উন্মুক্ত করার পূর্ণ অনুমোদন দিচ্ছি এবং একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি।’ বিশ্ববাসীর উদ্দেশে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। এবার তেল সচল হোক!’
শান্তি চুক্তি নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবর
বিবিসি জানায়, এই শান্তি চুক্তির বিষয়ে ইরানের সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য করা হয়নি। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এই চুক্তির খবর প্রচার করেছে। অবশ্য তারা খবরটির সূত্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতির কথা উল্লেখ করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই ঘোষণার সময় উপস্থাপক বলেন, ‘আমেরিকা শেষ পর্যন্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং ‘প্রতিরোধ ফ্রন্টে’র (রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট) সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছে।’ ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং কিছু স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এই চুক্তিটিকে তেহরানের একটি বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের আধা সরকারি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ সমঝোতা স্মারকে থাকা ১৪টি বিষয় প্রকাশ করে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
১. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত।
২. ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি না করা এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের।
৩. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি।
৪. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি।
৫. ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।
৬. ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রত্যাহার।
৭. ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া।
৮. যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠন পরিকল্পনা দেবে, যাতে ব্যয় হবে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার।
৯. ইরানের তেল ও জ্বালানি পণ্যের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞার অবসান।
ট্রাম্পের দাবি: ‘আমিই সফল হলাম’
পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ট্রুথ সোশ্যালে এই চুক্তি নিয়ে পোস্ট করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, অন্য সব প্রেসিডেন্ট যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, তিনি সেখানে সফল হয়েছেন।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এই মহৎ চুক্তি পুরো অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বয়ে আনবে। আমার আগে অনেক প্রেসিডেন্ট ইরানের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন এবং তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছেন। এই অঞ্চলের নেতারা প্রথমবারের মতো এমন একজন প্রেসিডেন্টকে খুঁজে পেয়েছেন, যিনি তাদের প্রকৃত শান্তি অর্জনে সাহায্য করতে পারেন।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আগামী শুক্রবার চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর মাইন অপসারণের উদ্দেশ্যে প্রণালিটি উন্মুক্ত করা হবে। এর ফলে এই অঞ্চল এবং পুরো বিশ্বের জন্য আবারও দুই প্রান্ত থেকেই তেল সরবরাহ চালু হবে!’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘পরাজয়’: ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড
এদিকে এই শান্তি চুক্তিকে ওয়াশিংটন এবং ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ‘পরাজয়’ ও ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড।
দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের সাধারণ জনগণ, সশস্ত্র বাহিনী এবং এ অঞ্চলে তেহরানের প্রক্সি ও মিত্র সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এটা বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তাদের সামনে ‘পরাজয় মেনে নেওয়া এবং আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।’
বিবিসি জানায়, ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডের এই বক্তব্য মূলত দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রচার কৌশলের সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ, যেখানে প্রথম থেকেই এই চুক্তিটিকে ইরানের একটি বড় বিজয় হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে এই চুক্তির পর থেকেই ইরানের ভেতরে কট্টরপন্থিদের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা ও বিরোধিতার ঝড় উঠছে।
চুক্তিটির বিরোধিতাকারী কট্টরপন্থিদের একাংশ এই সমঝোতার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পার্লামেন্ট স্পিকারের বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন কট্টরপন্থিরা।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। নিজের মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও খামেনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেছিলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতা মোটেও ‘বুদ্ধিমানের কাজ হবে না‘ এবং এটি দেশের সংকট ও সমস্যাগুলোর কোনো ‘সমাধান‘ বয়ে আনবে না। সর্বোচ্চ নেতার সেই অবস্থান ভেঙে এই চুক্তি করায় এখন দেশটির অভ্যন্তরেই তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
আগামী শুক্রবার সই হবে ঐতিহাসিক চুক্তি
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে বিবিসি আরও জানিয়েছে, ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক ফোনালাপে নিশ্চিত করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে।
তিনি বলেন, ‘লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধ এবং সামরিক অভিযানের একটি তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী অবসান আজ রাতেই ঘোষণা করা হবে।’ এর পাশাপাশি ইরানের ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর যে অবরোধ রয়েছে, সেটিও আজ রাত থেকেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিশ্বনেতাদের স্বাগত ও প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার। পাকিস্তানের পাশাপাশি এই আলোচনায় অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘আমরা আমাদের ভাই রাষ্ট্র ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা আশা করি, সব পক্ষই আগামী দিনের আলোচনাগুলোতে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক মনোভাব নিয়ে অংশ নেবে, যা এই অগ্রগতিকে আরও সুসংহত ও এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘যুদ্ধ শেষ করা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারকে অভিনন্দন জানিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান জানিয়ে আসছিলাম এবং এটিই ছিল আমাদের প্রত্যাশিত অগ্রগতি। হরমুজ প্রণালিতে টোলমুক্ত নৌ চলাচলের স্বাধীনতা অবশ্যই পুনরুদ্ধার করতে হবে, যাতে গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্ব জুড়ে সাধারণ মানুষের ওপর যে তীব্র অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে, তা লাঘব করা যায়।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই শান্তি বজায় রাখতে হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই কঠোরভাবে যাচাইযোগ্য এবং সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেটাই যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের অবস্থান।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘এটি সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি বিশ্বনেতাদের মধ্যে অন্যতম প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এই চুক্তির প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, জাপান ‘দৃঢ়ভাবে আশা করে’ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ ও নিরাপদ চলাচল বাস্তবে নিশ্চিত করা হবে এবং ইরানের পারমাণবিক সমস্যাসহ অন্যান্য বিষয়ে দ্রুত একটি চূড়ান্ত চুক্তি হবে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ আশা প্রকাশ করে বলেছেন, এই চুক্তি একটি ‘দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শান্তি’ বয়ে আনবে। তিনি বলেন, ‘পুরোপুরি অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগলেও, এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোরটি পুনরায় চালু করা জ্বালানির দাম এবং আমাদের অঞ্চলসহ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে অত্যন্ত জরুরি।’
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স এটিকে একটি ‘যুগান্তকারী ও গঠনমূলক চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাস এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।

ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ নেতারা। তারা এই সমঝোতাকে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৩ ঘণ্টা আগে
ইরানি এক কর্মকর্তার বরাতে রোববার (১৪ জুন) বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, পারমাণবিক ইস্যুর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ফের চালু, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
২১ ঘণ্টা আগে
সার্ভেতে আয় বৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়টিও উঠে এসেছে। পাশাপাশি একটি পৃথক বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা কিংবা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে লাখ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
১ দিন আগে
গেল বছরের ১৩ জুন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরমাণু আলোচনার মাঝেই, তেহরানে অতর্কিত বিমান হামলা চালায় তেল আবিব। পরে হামলায় যুক্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রও। পাল্টা জবাবে ইসরাইলের বিভিন্ন স্থাপনা ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় আইআরজিসি। পরে ১২ দিনের সংঘাত শেষ যুদ্ধের বন্ধের ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
১ দিন আগে