মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় এমপির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রাজধানীর মিরপুরে মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
আজ বুধবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দুর্গাপূজা-সংক্রান্ত আইনশৃঙ্খলা সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত কথা জানালেও তার নাম উল্লেখ করেননি। তবে এ ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিএনপির প্রয়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় নির্মোহ তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলে যারা অপরাধী হিসেবে উপস্থিত ছিল, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তা আমলে নেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ করা হয়েছে, মুখোশধারী দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কেন্দ্রে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে বেঁধে রাখেন। পরে তারা ওষুধ, ভ্যাকসিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র নিয়ে যান। এরপর ভারী যন্ত্র দিয়ে কেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে ওই ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। তার দাবি, এতে ১ কোটি ৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি শাহ আলী থানায় মামলা করেন।
এদিকে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডে’র কার্যক্রমের সঙ্গেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তারা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। যদিও ফেরদৌসী আহমেদ এ হামলার ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দা, হাতুড়ি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রাচীর টপকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করেন। তারা নিরাপত্তাকর্মী আন্দ্রিয় সরকার ও আবদুল হাইকে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন। পরে মূল ফটক ভেঙে ভারী যন্ত্র দিয়ে ভবনের বিভিন্ন কক্ষ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মামলায় হানিফ মিয়া (৫০) নামে একজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য।
এজাহার অনুযায়ী, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআই টিকা, টিকা প্রদানের রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার সরঞ্জাম, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, তিনটি স্টিলের আলমারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন মালপত্র নিয়ে যায়। পরে দেয়ালে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ লেখা ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়।
মিরপুরের ইসিবি চত্বর এলাকায় জমি দখল ও গোলাগুলির আরেক ঘটনায় এজাহার পাওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে মামলা নথিভুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ঘটনায় কোনো ধরনের প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। জমি দখলের ঘটনাটি রাতের অন্ধকারে ঘটেছে। ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে। সেখানে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন এবং মামলা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমাকে সমালোচনা করে একজন (সালমান মুক্তাদির) বলেছেন যে মামলা হয়েছে। আমি জানি, তবে অন্তত আইনের বিষয়ে আমরা একটু খুঁটিনাটি চর্চা করি। কেউ যখন এজাহার নিয়ে যায়, তখন সেটা মামলা হিসেবে লিপিবদ্ধ করার আগে একটু প্রাথমিক তদন্ত পুলিশকে করতে হয়। তা না হলে দেখা যাবে, ওই মামলায় আমাকেও–আপনাকেও আসামি করে ফেলেছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এজাহারে যা থাকে, তা–ই যদি লিপিবদ্ধ করতে হয়, তাহলে দেখা যাবে, বঙ্গভবনের ভূমি নিয়েও যদি কেউ আপত্তি তোলে, সেটাও এজাহার হয়ে যাবে। সে জন্য প্রাথমিক একটা তদন্ত করতে হয়। সেটা করে কেস এন্ট্রি করতে হয়। এজাহার পাওয়ার পর আইনি অনুযায়ী প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করে মামলা নথিভুক্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় যিনি বলেছেন, মামলা করেছেন, তিনি (সালমান মুক্তাদির) আজ পর্যন্ত মামলা করেননি। যিনি মামলা করেছেন, তিনি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে মামলা করেছেন।
এ ঘটনায় সরকার বা বিএনপিকে দোষারোপের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ঢালাও ব্লেম করার জন্য, সরকারকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করার জন্য এবং বিএনপিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে চাঁদাবাজ বলার জন্য কেউ যদি বক্তব্য দিয়ে থাকে, সেটা বিচার করবে জনগণ।’ তিনি বলেন, এখানে কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা ছিল না। তিনি (সালমান মুক্তাদির) নিজেই বলেছেন, তার কাছে চাঁদা চাওয়া হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্মোহভাবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং এ ঘটনায় যে–ই জড়িত থাকুক, সবাইকে তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। নিউগিনি প্রপার্টিজ হোক অথবা পার্শ্ববর্তী জমির মালিক— কেউই তদন্তের বাইরে থাকবেন না। খুব দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয়নির্বিশেষে অপরাধীকে কেবল অপরাধী হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অ্যাকশন নেওয়া হচ্ছে। ৯৯৯-এ ফোন করার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ যাচ্ছে। গ্রেপ্তার করছে। মামলা গ্রহণ করছে। যেখানে কোনো ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বা পুলিশ ব্যর্থ হয়, সেখানে সরকারের দায়ভার থাকে। কিন্তু এখানে পুলিশের বা সরকারের কোনো ব্যর্থতা নেই। তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছু প্রকাশ করা না হলেও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন। কোনো একটি বা দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামনে রেখে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।
এ সময় আজ সকালে মিরপুরে ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের বিষয়েও কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান, উচ্ছেদ অভিযানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান শুরুর আগে পুলিশের সঙ্গে সঠিকভাবে যোগাযোগ করেননি। তার মতে, ঘটনাটির পেছনে মূলত সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল।

















-ce5724-256x144.webp)

