টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল, আশ্রয়কেন্দ্রে শতাধিক পরিবার

বান্দরবান প্রতিনিধি
টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে শহরের একাধিক এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। ছবি: সংগৃহীত

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে বান্দরবানের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় শহরের একাধিক এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সাত উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবান সদরেই শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গতদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কাসেমপাড়া, আর্মিপাড়া, বনানী স-মিল এলাকা, বালাঘাটার আমবাগানপাড়া এবং সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী বসতঘরগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা মঙ্গলবার রাত থেকে প্রশাসন নির্ধারিত বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করেন।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস। এ সময় তিনি দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন এবং খিচুড়ি, শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও মোমবাতি বিতরণ করেন।

বুধবার সকালে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা পরিবার-পরিজন নিয়ে নিকটবর্তী বিদ্যালয়গুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রিতদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি। অধিকাংশ কেন্দ্রেই গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে তাদের।

শহরের রাজারমাঠ এলাকার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া পারভিন আক্তার বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বুধবার ভোরে আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন। আগে আসা অনেকেই চাল, ডাল ও শুকনা খাবার পেয়েছেন শুনলেও তারা এখনো কোনো সহায়তা পাননি।

সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

তবে একই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা আবু তাহের জানান, সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে মঙ্গলবার রাতেই তারা আশ্রয় নিতে এসেছেন। তিনি বলেন, সবাই একসঙ্গে আসেননি। পানির অবস্থা দেখে কেউ আগে, কেউ পরে এসেছে। রাতে খাবার এবং সকালে খিচুড়ি দেওয়া হয়েছে।

সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বুধবার সকাল পর্যন্ত ৬০টির বেশি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। স্কুলের দাপ্তরিক দায়িত্বে থাকা মো. কামাল জানান, সকালে প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসে কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেছেন।

নারী-শিশু বেশি, চলছে চিকিৎসাসেবা

শহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। একটি কক্ষে একাধিক পরিবার গাদাগাদি করে অবস্থান করছে। কেউ কেউ ঘরের হাঁস-মুরগিও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। আশ্রিতদের বেশির ভাগই নারী। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে গেছেন।

মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে আসা রবিউল জানান, পানি বাড়তে শুরু করলে মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে তারা আশ্রয় নেন। ঘরের মালামাল সরাতে গিয়ে দেরি হওয়ায় অনেক জিনিসপত্র পানিতে নষ্ট হয়েছে। একটি কক্ষে নয়টি পরিবারের সদস্যদের থাকতে হচ্ছে। রাতে নিজেদের উদ্যোগে খাবারের ব্যবস্থা করলেও সকালে প্রশাসনের লোকজন এসে তালিকা তৈরি করেছেন।

মঙ্গলবার রাত থেকেই দুর্গতরা প্রশাসন নির্ধারিত বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। ছবি: সংগৃহীত
মঙ্গলবার রাত থেকেই দুর্গতরা প্রশাসন নির্ধারিত বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। ছবি: সংগৃহীত

এ সময় সদর উপজেলার একটি মেডিকেল টিম আশ্রয়কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবা দিতে দেখা যায়। স্যানিটারি টিমের পরিদর্শক নাঈম উদ্দিন জানান, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করে পানিবাহিত রোগ, সর্দি, কাশি ও হালকা জ্বরে আক্রান্ত কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহের আজাদ বলেন, ইসলামপুর, আর্মিপাড়া, বনানী স-মিল ও মোহাম্মদপুর এলাকার ৭৫টি পরিবারের ২৬৫ জন সদস্য বর্তমানে এই কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। মঙ্গলবার রাতে আশ্রিতের সংখ্যা প্রায় ৪০০ জনে পৌঁছেছিল। পরে অনেক পুরুষ সদস্য বিভিন্ন কাজে বের হয়ে যান। স্কুলটিতে সর্বোচ্চ ৪০০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে, তবে সে ক্ষেত্রে গাদাগাদি করেই থাকতে হবে।

রুমায় উন্নতি, থানচিতে যোগাযোগে সমস্যা

পরিস্থিতি জানতে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুর রহমান আল ফয়সালকে বুধবার একাধিকবার ফোন করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। থানচি প্রেস ক্লাবের সভাপতি মংবোয়াচিং মারমা অনুপম জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় ইউএনও কার্যালয়ের টেলিটক নম্বরও বন্ধ রয়েছে।

তিনি আরও জানান, টানা বৃষ্টির কারণে কয়েক দিন আগে তিন্দু ও নাফাখুম জলপ্রপাত এলাকায় আটকে পড়া পর্যটকরা মঙ্গলবারের মধ্যে নিরাপদে ফিরে গেছেন।

অন্যদিকে রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথি জানান, সেখানে পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। কয়েকটি স্থানে পানি বাড়ায় রাস্তা ও কালভার্ট ডুবে গেলেও পরে পানি নেমে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছে এবং পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণার পর অধিকাংশ পর্যটক ফিরে গেছেন।

বৃষ্টি অব্যাহত, ভূমিধসের শঙ্কা

বান্দরবানে টানা তৃতীয় দিনের মতো থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বুধবার সকাল কিছুটা শুষ্ক থাকলেও সকাল ১০টার পর আবার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির কারণে শহরের মধ্যমপাড়ার সাপ্তাহিক মারমা বাজারও বসেনি।

জেলা শহর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি এবং উপজেলা পর্যায়ের সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কালাঘাটা এলাকার বেইলি সেতু ডুবে যাওয়ায় রোয়াংছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেল চলাচল করছে।

বান্দরবান আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা সনাতন কুমার মণ্ডল জানান, বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের আট বিভাগেই কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। এতে চট্টগ্রাম মহানগরীতে জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

জেলায় ২২০ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, টানা বৃষ্টির কারণে সাত উপজেলায় মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবান সদরে ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, লামায় ৫৫টি, আলীকদমে ১৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, সদর উপজেলা ছাড়া অন্য কোথাও এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ আসেননি। ফায়ার সার্ভিস, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, রেড ক্রিসেন্ট, আনসার এবং প্রয়োজনে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনীর তিনটি দলও প্রস্তুত রয়েছে।

তিনি বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত খাবারের মজুত রয়েছে। প্রয়োজন হলে বর্তমানের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মানুষের জন্যও অন্তত আট থেকে ১০ দিনের খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছেও পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে।

এদিকে বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, সাঙ্গু নদীর বিপৎসীমা ১৪ দশমিক ৮০ মিটার হলেও বর্তমানে নদীর পানি ১৫ দশমিক ৮৫ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বেতনসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ, তীব্র যানজট

আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে গেজেট অনুযায়ী নির্ধারিত ন্যায্য বেতন থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দাবিতেও তারা আন্দোলনে নেমেছেন।

৯ ঘণ্টা আগে

ভারী বৃষ্টিতে দেয়াল ধসে প্রাণ গেল তরুণের

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ঘটনার সময় পরিবারটি পাহাড়ঘেঁষা একটি সেমিপাকা ঘরে ছিল। ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে দেয়ালের ওপর পড়ে। এতে দেয়ালটিও ধসে যায়। দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই শফিকুলের মৃত্যু হয়।

১ দিন আগে

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাংক কর্মকর্তাকে কুপিয়ে জখম, হাসপাতালে মৃত্যু

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় দুর্বৃত্তের হামলায় গুরুতর আহত উত্তরা ব্যাংকের এক কর্মকর্তা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। সোমবার রাতে তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে মঙ্গলবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

১ দিন আগে

৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি, চট্টগ্রামের বহু এলাকা পানির নিচে

টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীতে ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রবল বর্ষণের সঙ্গে জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় নগরের বহু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক।

১ দিন আগে