খাগড়াছড়িতে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস, ‘ফ্যাক্টর’ আঞ্চলিক সংগঠনের ভোট

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
(বাঁ থেকে) বিএনপি প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা, জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান। ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৯৮ নম্বর সংসদীয় আসন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ভোটের উত্তাপ এখন তুঙ্গে। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম ও পাড়ায় পাড়ায় চলছে গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ, শোডাউন।

নির্বাচনে এ আসনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকলেও তার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী। বিশেষ করে পাহাড়ের তিনটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক সংগঠনের প্রত্যক্ষ সমর্থন পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ানকে ঘিরে বাড়ছে কৌতূহল।

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রচারের তৎপরতা। খাগড়াছড়িতে মোট ১১ জন প্রার্থী নিজ নিজ কৌশলে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বিরামহীনভাবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন। ফলে জমে উঠেছে নির্বাচনি মাঠ।

আঞ্চলিক সংগঠনের ‘ভোটব্যাংক’ বড় ফ্যাক্টর

খাগড়াছড়িতে এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে পাহাড়ের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর ‘ভোটব্যাংক’। মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যন্ত এলাকার ভোটারদের সংগঠিত সমর্থন জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ আসনে নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, খাগড়াছড়ি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা পাঁচবার, বিএনপি প্রার্থীরা দুবার ও জাতীয় পার্টি প্রার্থীরা একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আঞ্চলিক দল বা আঞ্চলিক সংগঠন-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী সংসদে যেতে পারেননি। এবার সেই দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণে একক অবস্থানে আসার চেষ্টা করছে পাহাড়ের প্রভাবশালী সংগঠনগুলো।

ভোটার সংখ্যা ও ভৌগোলিক গুরুত্ব

খাগড়াছড়ি জেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রাম জেলা, পূর্বে রাঙ্গামাটি জেলা, ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা অবস্থিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন আসনের মধ্যে ভৌগোলিক, জাতিগত, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত কারণে খাগড়াছড়ি আসনটি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ।

এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৬৪ জন। পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৭৪ হাজার ৪৬৫ জন, নারী ভোটার দুই লাখ ৭২ হাজার ৫৯৫ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন।

খাগড়াছড়ি আসনে নির্বাচনি লড়াই শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির সংঘর্ষ, উন্নয়ন ও বঞ্চনার বিতর্ক, অস্ত্র উদ্ধার, পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন ও প্রতিশ্রুতির হিসাব-নিকাশের। জাতীয় রাজনৈতিক এজেন্ডার বাহিরে প্রায়শই এখানের নির্বাচনে পাহাড়ি-বাঙালি ইস্যু বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

এ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন— স্বতন্ত্র ধর্মজ্যোতি চাকমা (ঘোড়া), ইসলামী আন্দোলনের মো. কাউছার আজিজী (হাতপাখা), বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির উশ্যেপ্রু মারমা (রকেট), গণঅধিকার পরিষদের দীনময় রোয়াজা (ট্রাক), জাতীয় পার্টির মিথিলা রোয়াজা (লাঙ্গল), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. নুর ইসলাম (আপেল), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. মোস্তফা (হারিকেন) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী জিরুনা ত্রিপুরা (কলস)।

বিএনপি-জামায়াত-স্বতন্ত্রের লড়াই

বিএনপিসহ সব দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী কল্প রঞ্জন চাকমাকে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন।

আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা বলেন, অতীতে সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি পাহাড়ি ও বাঙালি সব সম্প্রদায়ের উন্নয়নে কাজ করেছেন। বিগত সরকারের সময়ে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও এবার তিনি মাঠে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি করেন। তিনি আশ্বাস দেন, নির্বাচিত হলে পাহাড়ে পাহাড়ি-বাঙালির সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি সব সেক্টরে বৈষম্যহীন উন্নয়ন করবেন।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দখলে থাকা খাগড়াছড়ি আসনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া জামায়াতে ইসলামী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এখানে জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী চাঁদাবাজি, হামলা-মামলার সঙ্গে জড়িত না থাকায় এবার দলটির ভোট বেড়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. এয়াকুব আলী জানান, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে তিনি মাঠে কাজ করছেন। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত হলে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও খাগড়াছড়িকে পর্যটনবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলব।’

এদিকে পাহাড়ের কয়েকটি অনিবন্ধিত আঞ্চলিক দল নির্বাচনে তাদের কোনো প্রার্থী ঘোষণা না করলেও তারা সম্মিলিতভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ানের পক্ষে কাজ করছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

সমীরণ দেওয়ান দীর্ঘদিন স্থানীয় সরকার পরিষদের (পার্বত্য জেলা পরিষদ) চেয়ারম্যান হিসেবে দাযিত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া বাঙালি-পাহাড়ি সবার কাছে তিনি অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে বর্তমানে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাই এবার অনেকেই এই আসনে শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সমীরণ দেওয়ানকে বিবেচনায় রাখছেন।

সমীরণ দেওয়ান বলেন, সাধারণ মানুষ চায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি-বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ। নতুন ভোটাররা ভোট দিতে উদগ্রীব হয়ে আছে। পার্বত্য এ জেলায় মানুষের কর্মসংস্থানে নেই কোনো বিনিয়োগ। তাই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বেকারত্ব। বিগত সময়ে কৃষি গবেষণাগার, টেক্সটাইল ও কারিগরি ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো নির্মাণ হলেও স্থানীয়দের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। নির্বাচিত হলে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক হানাহানি বন্ধ, কর্মসংস্থান তৈরি, ভূমি সমস্যার সমাধানসহ স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ি আসনে এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় নয়, বরং জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির সমীকরণে এক গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাব্য ত্রিমুখী লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আনোয়ার সাদ জানান, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

এ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ২০৩টি। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬৮টি, ঝুঁকিপূর্ণ ১২১টি এবং সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ১৪টি কেন্দ্রকে। এ ছাড়া দুর্গম কেন্দ্র রয়েছে ৫৩টি, এর মধ্যে তিনটি কেন্দ্রে হেলিকপ্টার সার্ভিস ব্যবহার করা হবে— দীঘিনালার বাবুছড়া ইউপির দেওয়ানপাড়ার নারাইছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লক্ষীছড়ি উপজেলাধীন লক্ষীছড়ির ইউপির শুকনাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বর্মাছড়ি ইউপির ফুত্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

পরিত্যক্ত কূপে নেমে প্রাণ গেল বাবা-ছেলেসহ ৪ জনের

শনিবার (২০ জুন) সকালে উপজেলার টেলকি জলই এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে । নিহতরা হলেন জলই গ্রামের বাবুল হাদিমা (৪৮), তার ১০ বছর বয়সী ছেলে নেইমার ম্রং, রতন নকরেক (২৪) ও গাবরিয়েল নকরেক (৩২)। তারা সবাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সদস্য।

১৫ ঘণ্টা আগে

মেহেরপুর সীমান্তে ৪ জনকে পুশইনের চেষ্টা বিএসএফের, বিজিবির বাধায় ব্যর্থ

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ওই চারজন আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ১৫ ও ১৬-এর মধ্যবর্তী এলাকায় নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ ও তিনজন নারী রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের পরিচয় বা জাতীয়তা সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।

১ দিন আগে

শিশুসহ ৪ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে রৌমারী সীমান্ত থেকে

স্থানীয়রা বলছেন, রৌমারীর গয়টাপাড়া সীমান্তে ছয়জন ও ইজলামারী ভন্দুরচর সীমান্তে তিনজনকে বুধবার (১৭ জুন) রাত পর্যন্ত অবস্থান করতে দেখা গেছে। তবে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকাল থেকে দুই শিশুসহ চারজনকে আর সেখানে দেখা যায়নি।

২ দিন আগে

সুনামগঞ্জে ইয়াবাসহ আটক ‘জুলাই যোদ্ধা’, গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ

সুনামগঞ্জে প্রায় এক হাজার পিস ইয়াবাসহ ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া নাজমুল হাসান হিমেল নামে এক তরুণকে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছেন স্থানীয়রা। পরে পুলিশ তাকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম পুরান লাউড়েরগড়ে এ ঘটনা ঘটে।

২ দিন আগে