top ad image
top ad image
home iconarrow iconখবরাখবর

নতুন ধারায় ঈদ উদ্‌যাপন

নতুন ধারায় ঈদ উদ্‌যাপন
সুলতানি আমলের মতো ঈদুল ফিতরের আনন্দ মিছিল হয়েছে ঢাকায়। সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি শেষ হয়েছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। ছবি: ফোকাস বাংলা

।দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর আসে ঈদুল ফিতর, মুসলিমদের সবচেয়ে বড় দুটি ধর্মীয় উৎসবের একটি। সামর্থ্যবানদের সহায়তায় সমাজের বিত্তহীনদেরও শামিল করে নিলে এটি পরিণত হয় সর্বজনীন উৎসবে। সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য আর ভ্রাতৃত্ব বাণী নিয়ে হাজির সেই ঈদুল ফিতর। সকালে সারা দেশে ঈদের জামাত দিয়ে শুরু করে নানান আয়োজনে চলছে সেই ঈদের উদ্‌যাপন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম এই ঈদ উৎসব নিয়ে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও স্বস্তির কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারি উদ্যোগেও জাতীয়ভাবে ঈদ আয়োজনে যুক্ত করা হয়েছে ভিন্ন কিছু আয়োজন, যা ঈদকে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী। ঢাকার রাস্তায় ঈদের আনন্দ মিছিল আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঈদ উদ্‌যাপনে যুক্ত করেছে ভিন্ন মাত্রা।

রোববার (৩০ মার্চ) সন্ধ্যায় দেশের আকাশে হিজরি শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে শুরু হয় ঈদের প্রস্তুতি। চাঁদ রাতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত দেখা যায় সাধারণ মানুষকে। এরপর সোমবার (৩১ মার্চ) সকালে ঈদ আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ঈদের জামাত দিয়ে।

Eid-At-National-Eidgah-31-03-2025

জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজের শেষে কোলাকুলি। ছবি: ফোকাস বাংলা

সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয় ঈদের প্রধান জামাত। এতে অংশ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন, জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সচিবসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ এই ঈদ জামাতে অংশ নেন।

ঈদ জামাতে অংশ নিয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সব বাধা অতিক্রম করে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ঈদ দূরত্ব ঘোচানোর দিন, নৈকট্যের দিন, ভালোবাসার দিন। আজ সেই দিনটা আমরা যেন গভীর ভালোবাসার সঙ্গে উদযাপন করতে পারি, সেই বার্তা যেন সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারি। আজ ঐক্য গড়ে তোলার দিন। আমরা স্থায়ীভাবে এই ঐক্য গড়ে তুলতে চাই, ঈদের জামাতে এটাই আমাদের কামনা।

পরে বিকেলে তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধান উপদেষ্টা। সেখানেও তিনি ঐক্যের বার্তাই দিয়েছেন। পাশাপাশি কেবল দেশ নয়, সারা বিশ্বের জন্যই শান্তি কামনা করেন তিনি।

CA-Greets-At-Tejgaon-02-Photo-31-03-2025

তেজগাঁও কার্যালয়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধান উপদেষ্টা। ছবি: প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বরাবরের মতো এ দিনও অনুষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি ঈদের জামাত। এ ছাড়া দেশের সবচেয়ে বড় দুটি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ময়দান ও দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে। লাখ লাখ মুসল্লির উপস্থিতিতে ঈদের তাকবিরে ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ঈদগাহ ময়দানগুলো। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই বিভিন্ন মসজিদ ও ময়দানে ঈদের নামাজ শেষে ছেলে-বুড়ো নির্বিশেষে সবার কোলাকুলিতে ঈদের সৌহার্দ্যের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে সবার মধ্যে।

এবারের ঈদে নতুন সংযোজন ছিল ঈদ আয়োজনের পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ঈদের আনন্দ মিছিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এর জন্য রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরাতন বাণিজ্যমেলা প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় বিশাল ঈদ জামাত। বিপুল পরিমাণ মুসল্লি সেই জামাতে অংশ নেন।

সেই ঈদ জামাতের পরপরই সবাইকে নিয়ে বের হয় বর্ণাঢ্য আনন্দ মিছিল। ঈদের শুভেচ্ছা ও সচেতনতার বার্তাসহ বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে ‘ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক’ আনন্দধ্বনিতে বের হয় সে মিছিল। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ সেই মিছিল নিয়ে চলে যান মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সবাইকে সেমাই ও মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়নও করা হয়।

সুলতানি ও মুঘল আমলের ঈদের আনন্দ মিছিলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার ঘোষণা ছিল সরকারের তরফ থেকে। সেই ঐতিহ্যের স্মরণেই মিছিলের একদম সামনের দিকে দুই সারিতে ছিল আটটি সুসজ্জিত শাহি ঘোড়া। আরও ছিল ১৫টি ঘোড়ার গাড়ি। ছিল ব্যান্ড পার্টি ও বাদক দল, মুঘল ও সুলতানি আমলের ইতিহাস স্মরণে ১০টি পাপেট শো। বাজনার তালে তালে ঈদের আনন্দ মিছিল সত্যিকার অর্থে আনন্দ ছড়িয়েছে মানুষের মনে।

আনন্দ মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আনন্দ ছড়িয়েছে সবার মনে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’ গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম’, ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে’র মতো জনপ্রিয় লোকগান পরিবেশন করেন শিল্পীরা।

আনন্দ মিছিলে অংশ নেন ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মিতুল হাসান। এবারের ঈদে বাড়ি যেতে পারেননি বলে কিছুটা মন খারাপ ছিল। তবে ঈদ আনন্দ মিছিলে অংশ নিয়ে তার মন ভালো হয়ে গেছে।

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালে মিতুল রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘ঈদ আনন্দ ছিল কেমন হবে, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। তবু ভেবেছিলাম, বাড়ি যেহেতু যেতে পারিনি, অন্তত আনন্দ মিছিলে অংশ নিয়ে দেখি কেমন লাগে। এখানে এসে খুবই ভালো লাগছে। ঈদ মানেই তো খুশি, ঈদ মানেই উৎসব। এ রকম খুশির দিনে, উৎসবের দিনে এমন আয়োজনই থাকা প্রয়োজন। আশা করব আগামীতে সারা দেশেই এমন আনন্দ মিছিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঈদ আনন্দ মিছিলের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেছেন অনেকে, এমন আয়োজনের প্রশংসাই করেছেন সবাই। যারা এই মিছিলে অংশ নিতে পারেননি, তারা আক্ষেপও করেছেন।

শেরেবাংলা নগরের ঈদ জামাত ও আনন্দ মিছিলে অংশ নেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ ও আহতদের স্মরণ করেন। আনন্দ উৎসবের বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, এবারের ঈদকে সত্যিকার অর্থেই ঈদ মনে হচ্ছে। ঢাকার যে ঐতিহ্যবাহী ঈদ মিছিল, সেটা হয়তো কয়েক শ বছর পর আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। এখন থেকে ঈদ উৎসব হবে আনন্দময়, টিভি দেখে সময় কাটাতে হবে না। সবাই একসঙ্গে ঈদ মিছিল করবে, মেলা উপভোগ করবে, একসঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেবে।

বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদরাও এবারের ঈদকে আনন্দময় ও স্বস্তির বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক দলগুলো দমন-পীড়নের মধ্যে ছিল। সেখান থেকে মুক্ত পরিবেশে এবারের ঈদ উদ্‌যাপন করতে পেরে তারা স্বস্তিতে রয়েছেন।

সকালে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জিয়ারত শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গত ১৫ বছরের তুলনায় এবারের ঈদে অনেক পার্থক্য। কারণ এবার মুক্ত পরিবেশে ঈদ উদযাপন করতে পারছে দেশের মানুষ।

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারাও একই কথা বলেছেন। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ পরিবারগুলোর বেদনার কথাও স্মরণ করেছেন তারা।

এদিকে এ বছর ঈদযাত্রাও ছিল স্বস্তির। সড়ক, রেল ও নৌ পথে কোটি মানুষের ঘরমুখী যাত্রায় খুব একটা ছন্দপতনের খবর মেলেনি। প্রতি বছর ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে যে দীর্ঘ যানজটে মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়, এ বার তেমন যানজট দেখা যায়নি সড়কে। সড়ক ও নৌ পথে দুর্ঘটনার সংখ্যাও ছিল তুলনামূলকভাবে কম।

এ বছরের ঈদের দীর্ঘ ছুটিকেও অবশ্য যানজটমুক্ত ঈদযাত্রার অন্যতম কারণ মনে করা হচ্ছে। কারণ ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের ছুটির পর ২৭ মার্চ বৃহস্পতিবার ছিল কর্মদিবস। এ দিনটি অনেক অফিস ছুটি দিয়েছে, অনেকে এ দিনে ছুটি দিয়েছেন। অন্যদিকে ঈদের ছুটির পর ৩ এপ্রিল কর্মদিবস থাকলেও সরকার দিনটিকে নির্বাহী আদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। ফলে এবারের ঈদে একটানা ৯ দিন ছুটি পান বেশির ভাগ মানুষ। ফলে ঈদযাত্রাতেও নির্দিষ্ট দুয়েক দিনে চাপ পড়েনি। এ কারণেও ঈদযাত্রা স্বস্তির হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা।

ঈদ ঘিরে যে স্বস্তির বার্তা ছড়িয়েছে, সেটি অব্যাহত থাকুক— এমন প্রত্যাশার কথাই জানিয়েছেন সবাই। এ ছাড়া ঈদ আয়োজনকে রাজধানী ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা দেশেই যেন ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তেমন আকাঙ্ক্ষার কথাও জানিয়েছেন তারা।

r1 ad
r1 ad
top ad image