অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের স্লোগানে নারীদের দিন আজ

নারীদের কৃতিত্ব স্মরণ করতে এবং এর প্রতি সম্মান জানানোর দিন আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশ এই দিনটি (৮ মার্চ) নানা আয়োজনে পালন করছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন/ নারী ও কন্যার উন্নয়ন’।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) তথ্য বলছে, অগ্রগতির বর্তমান হারে অব্যাহত থাকলে পূর্ণ লিঙ্গ সমতা অর্জনে ২১৫৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে, যা এখন থেকে আরও প্রায় পাঁচ প্রজন্ম পরে ঘটবে। তাই লিঙ্গ সমতা অর্জনের জন্য দ্রুত ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে এ বছরের নারী দিবসে। ব্যক্তিজীবনে হোক কিংবা পেশাজীবনে হোক, মেয়েদের যে সবখানেই বাধা ও পক্ষপাতের মুখে পড়তে হয়, তা অতিক্রম করতেই এবারের নারী দিবসে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৯৭৫ সালে ৮ মার্চ দিনটিকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে গত ৫০ বছর ধরে উদ্যাপিত হয়ে আসছে নানা আয়োজনে। বাংলাদেশেও সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন ও সংস্থা দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
নারী দিবসের ইতিহাস
১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি সুঁচ কারখানার নারী শ্রমিকরা দৈনিক শ্রম ১২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘণ্টায় আনা, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে সমাবেশ করেন। সেই সমাবেশ থেকে অনেক নারীকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়, গ্রেপ্তার হন অনেকে।
তিন বছর পরে ১৮৬০ সালের একই দিনে গঠন করা হয় ‘নারী শ্রমিক ইউনিয়ন’। ১৯০৮ সালে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের কারখানার প্রায় দেড় হাজার নারী শ্রমিক একই দাবিতে আন্দোলন করেন। শেষ পর্যন্ত তারা আদায় করে নেন দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার অধিকার।
১৯১০ সালের এই দিনে ডেনমাকের্র কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে জার্মানির নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করেন। ১৯১১ সালে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করেন।
তখন থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছিল। অনেক দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখেও পালন করা হতো নারী দিবস। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালের ৮ মার্চ দিনটিকে নারী দিবস হিসেবে পালন করে জাতিসংঘ। পরে ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে দিবসটি সারাবিশ্বে একই দিনে পালিত হয়ে আসছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার বাণী
‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ উপলক্ষ্যে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। বাণীতে দুজনেই এই দিবসটির ব্যাপক সাফল্য প্রত্যাশা করেছেন।
বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরাও নিজ যোগ্যতায় এগিয়েও যাচ্ছে। এ অবস্থায় নারীদের অধিকার নিশ্চিত করে তাদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে একটি সমতাভ্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তবেই নারীদের উন্নতি হবে। সেটি সার্বিকভাবে সমাজকের উন্নতির জন্যই ভূমিকা রাখবে।
বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষায় ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে ছিল নারী। লাখ লাখ ছাত্রী বিভিন্ন ক্যাম্পাসে দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর ছিল। একাধিক নারী এই গণঅভ্যুত্থানে শাহাদাত বরণ করেছেন। নারীদের সম্ভাবনা ও কর্মদক্ষতাকে উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ত করে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
নারী দিবসের কর্মসূচি
আন্তর্জাতিক নারী দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় দেশব্যাপী উদ্যাপন করতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাব আয়োজন করেছে নারী দিবসের আলোচনা সভা। শনিবার সকাল ১১টায় ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এ সভায় সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর বনানী এলাকার বেলতলা থেকে কড়াইল মাঠ পর্যন্ত রিকশা র্যালি আয়োজন করেছে। শনিবার নারী দিবসের র্যালি আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলও। বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু করে কাকরাইল মোড় হয়ে ফের বিএনপি অফিসের সামনে গিয়ে শেষ হবে এই র্যালি।
দিনটিতে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির (৬৭টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম) উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র্যালি আয়োজন করা হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং আইএলও কনভেনশন ১৯০ অনুসমর্থনের দাবিতে জেন্ডার প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ আয়োজন করেছে মানববন্ধন। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে হবে এই মানববন্ধন।
সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে নারী সমাবেশ হবে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের আয়োজনে। ‘সারাদেশে অব্যাহত নারী শিশু ধর্ষণ বন্ধ কর’ স্লোগান সামনে রেখে নারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে সকাল ১০টায় ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে হবে আরেকটি সমাবেশ।
এ ছাড়া নারী সংহতির আয়োজনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সকাল ১০টায় হবে ‘নারীমুক্তির আকাঙ্ক্ষা: গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা।