ফ্যামিলি কার্ড: নারীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নবতর আশা

জাকির আহমদ খান কামাল

বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শক্তি নারী। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে নারীর অংশগ্রহণ যত বাড়ছে, ততই দেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের চালু করা ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগটি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এ উদ্যোগ নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ড মূলত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে। সাধারণত পরিবারে নারীর নামেই এই কার্ড ইস্যু করা হয়। ফলে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নারীর হাতে আসে। এটি কেবল একটি কার্ড নয়, বরং নারীর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের একটি কার্যকর মাধ্যম।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, পরিবারের আর্থিক সংকটের সময় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে নারীদের ওপর। তারা সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে নানা ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেন। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে চাল, ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে পরিবারের ব্যয় অনেকটাই কমে আসে। এর ফলে নারীরা পরিবারের সঞ্চয় বাড়াতে বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ ব্যয় করতে পারেন। অর্থাৎ এই উদ্যোগটি নারীর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— ফ্যামিলি কার্ড নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। যখন পরিবারের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহের দায়িত্ব নারীর হাতে থাকে, তখন পরিবারে তার মতামত ও সিদ্ধান্তের গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়। এটি ধীরে ধীরে নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং তাকে আরও সক্রিয় সামাজিক ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করে।

তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করছে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। অনেক সময় অভিযোগ ওঠে, প্রকৃত দরিদ্ররা তালিকার বাইরে থেকে যায়, আবার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে অযোগ্য লোকেরা সুবিধা পেয়ে থাকে। এমন অনিয়ম থাকলে এই মহৎ উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রয়োজন স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

আজ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) প্রধানমন্ত্রী পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) ১৪টি এলাকার নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা ও আর্থিক সহায়তা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। দেশের আটটি বিভাগেরই কোনো না কোনো উপজেলা বা এলাকাকে রাখা হয়েছে তালিকায়।

ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিংয়ের আওতায় থাকা এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে— ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বনানী এলাকা (কড়াইল বস্তি, সাততলা বস্তি ও ভাষানটেক বস্তি) এবং মিরপুর এলাকা (অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তি)। রয়েছে ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়ন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পতেঙ্গা এলাকা।

পাইলটিংয়ের আওতায় থাকা বাকি উপজেলাগুলো হলো— ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর ও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সব উপজেলা ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আসবে। প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, প্রতিটি পরিবার ২৫০০ টাকা করে সুবিধা পাবে।

সবশেষে বলা যায়, ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি নয়, এটি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি সম্ভাবনাময় মাধ্যম। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা পরিবারকে যেমন সহায়তা করবে, তেমনি নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও মর্যাদা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর নারীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই শেষ পর্যন্ত একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনের ভিত্তি।

লেখক: কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

শুধু দাবিদাওয়ার আন্দোলন নয়, রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষের গল্প

২০ জুলাইয়ের সেই দিন এবং এরপর পুলিশি দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করার পরও মানুষ যে আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছে, তা সম্ভব হতো না, যদি এমন এক শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত না হতো, যারা এতদিন সংগঠিত রাজনীতির বাইরে ছিল। তারা এতদিন শুধু পর্যবেক্ষক ছিল। কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও স্বী

৭ দিন আগে

পোল্ট্রি খামার: লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা

বিশ্ব জুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোল্ট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বি

৭ দিন আগে

ককরোচ আন্দোলনে উত্তাল দিল্লি, ভারতের বুকেও কি ‘জুলাইয়ের আবহ’?

দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্দোলনের সূচনা, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পরে রাজপথে বড় আকারের বিক্ষোভের কারণে ভারতের চলমান ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে অনেকেই ‘জুলাইয়ের আবহ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।

৯ দিন আগে

হুমায়ূন আহমেদ—একটি প্রজন্মের অনুভূতি

আজ তার মহাপ্রয়াণ দিবসে আমরা কেবল একজন লেখককে স্মরণ করছি না, আমরা স্মরণ করছি এমন এক আলোকবর্তিকাকে, যিনি বাংলা সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন— সহজ ভাষাও গভীর হতে পারে, নীরবতাও অনেক কথা বলতে পারে, আর ছোট ছোট সুখ-দুঃখও সাহিত্যের মহৎ বিষয় হতে পারে।

১১ দিন আগে