মক্কা চুক্তি: কূটনৈতিক ইশতেহার, নাকি মুসলিম বিশ্বের সহযোগিতার নতুন সূচনা?

সাইমন মোহসিন

২০২৬ সালের ৭ আগস্ট পবিত্র মক্কা নগরীতে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের নেতারা এমন এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেন, যা আধুনিক মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। নাম তার— মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। এর শর্তানুযায়ী, এই তিন রাষ্ট্রের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলাকে তিনটিরই বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। ঠিক সেই ‘একের জন্য সব, সবার জন্য এক’ নীতি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ন্যাটোর মূল শক্তি।

এটি নিছক আরেকটি কূটনৈতিক ইশতেহার নয়। এটি সম্ভবত মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে একটি প্রকৃত যৌথ প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তোলার প্রথম বিশ্বাসযোগ্য প্রয়াস। এমন এক স্থাপনা, যা একদিন কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং গোটা মুসলিম বিশ্বকেও সুরক্ষার ছায়া দিতে পারে।

এই দাবিটি নিবিড় পর্যালোচনার দাবি রাখে, কারণ ইতিহাস এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষার পক্ষে খুব একটা সদয় ছিল না। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও আনুষ্ঠানিক উপনিবেশবাদের অবসানের পর থেকে মুসলিম বিশ্ব খুব কমই একক কণ্ঠে কথা বলেছে। রাজনৈতিক ঐক্য কেবল ঝলকে ঝলকে দেখা দিয়েছে— কখনো একটি যৌথ বিবৃতি, কখনো কোনো শীর্ষ সম্মেলনের ইশতেহার; কিন্তু তা কদাচিৎ বাধ্যতামূলক, কার্যকর কোনো অঙ্গীকারে রূপ নিয়েছে।

ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), আরব লীগ কিংবা বিভিন্ন আঞ্চলিক জোট ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও অন্যান্য ইস্যুতে বাগ্মী সংহতি জানিয়েছে। অথচ যখনই সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রশ্ন এসেছে, সদস্য রাষ্ট্রগুলো বারবারই ফিরে গেছে নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ, সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা বহিঃশক্তির ওপর নির্ভরশীলতার কাছে। এর ফলাফল হলো এক বিপুল জনসংখ্যার, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম বিশ্ব, যা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে আজও খণ্ড-বিখণ্ড।

আর এই খণ্ড-বিখণ্ডতা ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীগুলোকে প্রায়শই বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। পশ্চিমা রাজনীতিতে নয়া-রক্ষণশীল এবং ক্রমবর্ধমানভাবে অতি-ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী ধারা যত প্রভাব বিস্তার করেছে, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’র কাঠামো ও তার উত্তরসূরিরা মুসলিম বিশ্বকে বারবার কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে প্রতিরক্ষামুখী অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। এই বৃহত্তর বিতর্কে কার কী অবস্থান, তা ভিন্ন প্রশ্ন; কিন্তু বাস্তব ফলাফল হলো এই যে, মুসলিম বিশ্ব এতদিন কেবল অন্যদের তৈরি করা হুমকি ও আখ্যানের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে— আগ্রাসন ঠেকাতে কিংবা পরিণতি নির্ধারণে নিজস্ব কোনো বিশ্বাসযোগ্য যৌথ প্রক্রিয়া গড়ে না তুলেই।

ঠিক এই কারণেই মক্কা চুক্তিটি মাত্রাগত নয়, গুণগতভাবেই ভিন্ন। যেকোনো কার্যকর প্রতিরোধ কাঠামো গড়তে ন্যূনতম চারটি স্তম্ভ প্রয়োজন— আর্থিক গভীরতা, সামরিক সক্ষমতা, আদর্শগত সংহতি ও ভূ-কৌশলগত নাগাল। আশ্চর্যজনকভাবে, এই তিন রাষ্ট্রই চারটি স্তম্ভ একসঙ্গে সরবরাহ করে। পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ পারমাণবিক শক্তি, যার রয়েছে বিশাল, যুদ্ধ-পরীক্ষিত সামরিক বাহিনী এবং প্রমাণিত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা-উৎপাদন ঘাঁটি। সৌদি আরব ইসলামের দুই পবিত্রতম স্থানের ধারক, যা তাকে গোটা মুসলিম বিশ্বে অতুলনীয় আদর্শগত ও প্রতীকী গুরুত্ব দেয়; পাশাপাশি আছে শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক হিসেবে গড়ে ওঠা প্রভূত আর্থিক সক্ষমতা। আর তুরস্ক, ১৯৫২ সাল থেকে ন্যাটোর সদস্য, জোটটির অন্যতম বৃহৎ স্থলসেনা এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বে থাকা ড্রোন ও নির্ভুল-গুলিবর্ষণ প্রযুক্তির এক প্রতিরক্ষা শিল্প নিয়ে আসে এই জোটে।

বিশ্লেষকরা যথার্থই লক্ষ করেছেন, তুরস্কের প্রতিরক্ষা-শিল্প সক্ষমতা, সৌদির আর্থিক শক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ও পারমাণবিক প্রতিরোধ— এই সমন্বয় নিছক পুনরাবৃত্তিমূলক নয়, বরং প্রকৃতই পরিপূরক। একই সঙ্গে এই তিন দেশের মধ্যে রয়েছে গভীর, পূর্ব-বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বন্ধন: পাকিস্তান কয়েক দশক ধরে সৌদি ও উপসাগরীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, আর ইসলামাবাদ-আঙ্কারা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই চুক্তির অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান, যা এই জোটকে শূন্য থেকে শুরু করার বদলে মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে।

এই জোটের আকার ও ব্যাপ্তিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তিন দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৩৮ কোটি— পাকিস্তানের প্রায় ২৫ কোটি ৭০ লাখ, তুরস্কের ৮ কোটি ৬০ লাখ এবং সৌদি আরবের ৩ কোটি ৬০ লাখ। এই সমষ্টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়েও বেশি জনবহুল এক শক্তিকাঠামো গড়ে তোলে। আইএমএফ ও জাতীয় পরিসংখ্যানের ২০২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, তাদের সম্মিলিত নামমাত্র জিডিপি ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, আর ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে তা ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এককভাবে তুরস্ক বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনীতির একটি; সৌদি আরব আরব বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি; আর পাকিস্তান, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, পৃথিবীর পঞ্চম জনবহুল দেশ। মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরে, এমনকি বৃহত্তর গ্লোবাল সাউথেও, এমন জনসংখ্যাগত বিশালত্ব, অর্থনৈতিক ওজন ও সামরিক সক্ষমতার এই ত্রিমুখী সমন্বয় বিরল।

আর এই সমন্বয়ই চুক্তিটিকে নিছক নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে এক প্রতীকী শক্তি প্রদান করে। কয়েক দশক ধরে মুসলিম বিশ্ব এবং তার সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের বৃহৎ অংশ একটি প্রকৃত, স্বনির্ভর যৌথ প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত থেকে বঞ্চিত ছিল— যা গড়ে উঠবে তাদের নিজেদের সদস্যদের দ্বারা, তাদের নিজেদের সুরক্ষার জন্য; বহিঃশক্তির কাছ থেকে ধার করা বা তাদের ওপর নির্ভরশীল কোনো কাঠামো নয়। মক্কা চুক্তি একটি ধারণার প্রমাণ হাজির করে: মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অন্য কারও অনুমতি বা পৃষ্ঠপোষকতার অপেক্ষায় না থেকেও নিজেদের শক্তি সমন্বিত করতে পারে। এটি প্রকৃত আশার উৎস— কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বরং গ্লোবাল সাউথের সেই সব অঞ্চলের জন্যও, যারা ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল ও বহুমুখী বিশ্বে নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগিতার আত্মসংগঠিত মডেল খুঁজছে।

কিন্তু শুধু আশাবাদী বয়ানে এই চুক্তি টিকবে না। এর চূড়ান্ত মূল্য নির্ভর করছে এটি আদৌ কার্যকর রূপ পায় কি না— যৌথ পরিকল্পনা, সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, ভাগাভাগি করা গোয়েন্দা তথ্য এবং বাস্তব আর্থিক ও বস্তুগত অঙ্গীকারের মাধ্যমে; নাকি মক্কার মার্বেল প্রাসাদে তোলা আরেকটি ফটোসেশনে পরিণত হয়। প্রতীকী সংহতি অনেক দিন ধরেই মুসলিম বিশ্বের পুরোনো অভ্যাস; এই কাঠামোকে এখন ঘোষণা নয়, প্রয়োগের মাধ্যমে সেই বৃত্ত ভাঙতে হবে।

সমান গুরুত্বপূর্ণ এই কাঠামোর সম্প্রসারণের ধরন। এটি নতুন সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত, অন্যান্য মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রদেরও অন্তর্ভুক্ত করে; কিন্তু সদস্যপদ যেন দায়িত্ববিমুখ মর্যাদার ব্যাজে পরিণত না হয়। যেসব দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব বা তুরস্কের কৌশলগত গভীরতার সমকক্ষ নয়, তাদেরও স্বাগত জানানো উচিত— শর্ত একটাই, তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই জোটের অভীষ্ট লক্ষ্যে অর্থবহ ও ন্যায়সঙ্গত অবদান রাখতে হবে।

এই কাঠামো কোনোভাবেই এমন এক ক্লাবে পরিণত হতে পারে না, যেখানে সদস্যপদ নেওয়া হয় শুধু নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ভোগের জন্য, কোনো পারস্পরিক অবদান ছাড়াই; তাতে বিশ্বাসযোগ্যতা ফাঁপা হয়ে পড়বে। একইভাবে জোটটি যেন পূর্ব-আক্রমণ বা আগ্রাসী ভঙ্গির দিকে না যায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। এর প্রতিষ্ঠার মূল যুক্তি এবং এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি স্পষ্টতই প্রতিরক্ষামূলক ও প্রতিরোধী—সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে ঢাল, আগ বাড়িয়ে সংঘাতের তরবারি নয়।

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি যদি এই শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারে এবং একই সঙ্গে বাস্তব কার্যকরী সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে এটি সত্যিই এক বিরল মুহূর্তের জন্ম দিতে পারে— সেই ক্ষণ, যখন মুসলিম বিশ্ব বাগাড়ম্বর থেকে পারস্পরিক দায়বদ্ধতায়, আর খণ্ড-বিখণ্ডতা থেকে নিজেদের হাতে গড়া এক টেকসই যৌথ প্রতিরক্ষা স্থাপত্যের দিকে পা বাড়াল।

লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

সমালোচনা হোক যোগ্যতা নিয়ে, নারী পরিচয় নিয়ে নয়

বহু শতাব্দীর পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো নারীর সাফল্যকে প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখেছে। একজন পুরুষের পদোন্নতি ‘যোগ্যতার স্বীকৃতি’, আর একজন নারীর পদোন্নতি ‘বিশেষ সুবিধা’— এই ধারণা শুধু বৈষম্যমূলক নয়, এটি তথ্যবিবর্জিতও। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বা পদোন্নতির সমালোচনা করতে হলে তথ্য, নীতি ও যোগ্যতার

৬ দিন আগে

নারী নয়, প্রশ্ন হোক নিয়োগের যোগ্যতা নিয়ে

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কাজী জেসিনের যোগ্যতা নিয়ে যুক্তি উপস্থাপনের পরিবর্তে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে— তিনি কার সঙ্গে ‘ঘুমিয়েছেন’, কাকে ‘খুশি করেছেন’ বা কীভাবে এই পদ পেয়েছেন। এসব মন্তব্য কোনোভাবেই রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, এগুলো নারীবিদ্বেষের প্রকাশ।

৬ দিন আগে

ভয়, পতন আর উৎসব: আমার দেখা ৫ আগস্ট

৫ আগস্ট রাতের সেই এক ধরনের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পরিস্থিতি একটা চাপা শঙ্কা তৈরি করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশেই যা দেখেছিলাম— দেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে ওঠা সেই অবর্ণনীয় আনন্দ— তা ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম।

৮ দিন আগে

কী দিয়েছে ৫ আগস্ট, কী দিতে পারেনি?

আজ ৫ আগস্ট ২০২৬। সেই দুপুরের ঠিক দুই বছর পর। যে মিছিল সেদিন শাহবাগ, শহিদ মিনার আর যমুনার সামনের রাস্তায় থেমে গিয়েছিল আনন্দ-উল্লাসে, তার পায়ের শব্দ আজও যেন মিলিয়ে যায়নি। বদলেছে সরকার, বদলেছে সংসদ, বদলেছে রাষ্ট্রের নথিপত্র। কিন্তু সেই দিনের প্রশ্নগুলো এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

৮ দিন আগে