নাউরু: দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধনী থেকে ভিখারি রাষ্ট্র

প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে ভেসে থাকা ছোট্ট দ্বীপদেশ নাউরু। আয়তন মাত্র ২১ বর্গ কিলোমিটার। এটি আয়তনে এতটাই ছোট যে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রতম উপজেলা, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলাও (৫৫ দশমিক ৩৬) আকারে এর আড়াই গুণের চেয়েও বড়। ভ্যাটিকান সিটি আর মোনাকোর পর বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র এই নাউরু। জনসংখ্যা মাত্র ১১ হাজার।
বর্তমানে নাউরুর না আছে কোনো আবাদি জমি, না আছে জনগণের কোনো নিশ্চিন্ত জীবন। মাত্র দুই দশকেই বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র থেকে ভাড়াটে রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে নাউরু। একসময় প্রশান্ত মহাসাগরের কুয়েত হিসেবে বলে খ্যাতি অর্জন করেছিল যে দেশ, সেই দেশ এখন অন্য রাষ্ট্রের কাছে হাত পেতে চলে। কীভাবে ঘটল এই পতন?
কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক পাখির অভরায়ণ্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা এই নাউরু দ্বীপ। তাদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে জমতে জমতে উৎকৃষ্ট মানের ফসফেটের টিলায় পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে এই ফসফেটের টিলা নাউরুর জন্য ‘সোনার খনি’ হয়ে ধরা দেয়।
ফসফেট কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। নাউরুতে যে ফসফেট পাওয়া যেত, তার মান ছিল পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট। একটি দেশের আবাদি জমি প্রায় নেই বললেই চলে, অথচ সেখানে রয়েছে চাষাবাদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট উপাদান!
১৯০৬ সালে জার্মনি প্রথম নাউরুর এই ফসফেট খনির সন্ধান পায়। ‘প্যাসিফিক ফসফেট কোম্পানি’র নামে এখান থেকে তারা ফসফেট তুলতে শুরু করে, চলতে থাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা পরাজিত হলে ‘ব্রিটিশ ফসফেট কমিশন’ নাউরু থেকে ফসফেট উত্তোলন অব্যাহত রাখে। এ সুবিধা নেয় ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও অবস্থা প্রায় একই ছিল।
১৯৬৮ সালে নাউরু স্বাধীনতা লাভের পর দৃশ্যপট পুরো পাল্টে যায়। ‘ব্রিটিশ ফসফেট কমিশন’ কিনে নিয়ে নাম দেওয়া হয় ‘নাউরু ফসফেট করপোরেশন’। তাদের অধীনে চলতে থাকে ফসফেট উত্তোলন, তা বিক্রি করতে থাকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে। জাহাজে পণ্য তোলার জন্য প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে গড়ে তোলে বিশালাকৃতির ক্রেন। সহজেই নাউরুর সরকারের হাতে আসতে থাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

মাত্র ২১ বর্গকিলোমিটার আয়তন আর ১১ হাজার অধিবাসীর নাউরু এখন ব্যাপক ঋণগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
১৯৭৫ সালে নাউরুর সরকারি ব্যাংকে জমা হয় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার! স্বাধীনতার পর এক যুগের অর্ধেক সময়ে কোনো রাষ্টের এত বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হওয়া বিরল। সে সময় নাউরুর জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাত হাজার। মাথাপিছু আয় এত বেশি ছিল যে, নাউরুর সামনে একমাত্র ধনী রাষ্ট্র ছিল কুয়েত। নাউরুকে তখন বলা হতো প্যাসিফিকের কুয়েত। তেল রাজ্য কুয়েতের মতোই সহজ অর্থ আয় করতে থাকে নাউরু।
নাউরুর এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে তাদের পরবর্তী কয়েক প্রজন্মকে আরামেই খাইয়ে-পরিয়ে রাখা যেত। তবে তার জন্য এই অর্থ দেশের উন্নয়নে খরচ করা ছিল অত্যন্ত জরুরি। উন্নত চিকিৎসা, উচ্চ শিক্ষা, মানসম্মত বাসস্থান— এসব কাজে খরচ করার জন্য এই অর্থ ছিল যথেষ্ট। কিন্তু নাউরু কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।
তারা দামি বাড়ি, বিলাসবহুল হোটেল আর গলফ কোর্ট তৈরি করে। নাউরু কর্তৃপক্ষ এমনভাবে টাকা ওড়াতে থাকে যেন তা কোনদিনই শেষ হবে না। পশ্চিমা দেশ থেকে খাদ্য আমদানির জন্য নাউরু একটি বিমানবন্দর তৈরি করে। খাদ্য উৎপাদন করার চেয়ে বিদেশ থেকে খাবার আনার দিকেই বেশি মনোযোগী ছিল তখনকার প্রশাসন। এ জন্য তারা সাতটি বোয়িং বিমান কেনে, যা একসঙ্গে নাউরুর ১০ শতাংশ জনগণ বহন করতে সক্ষম।
দেশটির এই বিলাসিতা যেন শেষ হওয়ার নয়। সবকিছু একসঙ্গে দেখভাল করার জন্য তারা একটি নাউরু ট্রাস্ট গঠন করে। কিন্তু ‘সরষের মধ্যে ভূত’ থাকলে যা হয়! অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অবাস্তব পরিকল্পনা— সবকিছু নাউরুকে নিঃস্ব করে দেয়।
সরকারি লোকজন রাষ্ট্রের টাকায় বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, লন্ডন ও ফিজির মতো দেশগুলোতে তৈরি করে নিজেদের বিলাসবহুল হোটেল। ফলে তারা প্রচুর পরিমাণ অর্থ পাচার করতে থাকে।
এই করতে করতে একসময় নাউরুর সম্পদ ফসফেট ফুরিয়ে আসে। ফসফেট রপ্তানি ছাড়া নাউরুর যেহেতু আর কোনো রাষ্ট্রীয় উপার্জন নেই, তাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারও ফাঁকা হতে থাকে। এভাবে সময়ের পরিক্রমায় এখন নাউরু অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়েছে। তাদের চলতে হচ্ছে অন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে। বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানেই রীতিমতো পথে বসেছে দেশটি!

দূষণের শিকার হয়ে এখন নাউরুর সৈকতও ব্যবহারের উপযোগী নেই। আবহাওয়াও অসহনীয়। ছবি: সংগৃহীত
তবে পথে বসেও মুক্তি নেই। অন্য রাষ্ট্র থেকে ধার করা অর্থে না হয় দিন চলছে। কিন্তু এই অর্থ তো নাউরুকে ফেরতও দিতে হবে। তার জন্য তাদের অর্থ উপার্জনের বিকল্প পথ খোঁজা দরকার।
নাউরুর একজন অর্থ বিশেষজ্ঞ লন্ডনভিত্তিক ব্যান্ড ‘ইউনিট ফোর প্লাস টু’কে দিয়ে সঙ্গীত অনুষ্ঠান আয়োজন করার পরামর্শ দিলেন। লন্ডনে তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে উঠে আসবে নাউরুর রাষ্ট্র চালানোর অর্থ। কতটুকু ভারসাম্যহীন হলে একটি রাষ্ট্র তাদের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেয় একটি সঙ্গীত দলের অনুষ্ঠানের ওপর!
মাত্র দুসপ্তাহ চলার পর ‘ইউনিট ফোর প্লাস টু’র অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে নাউরুর ওপর ফেলে দেয় সাত মিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা! এ ঋণের বোঝা বহন করা দেশটির পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এ জন্য অনুষ্ঠানের পেছনে যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থ খরচ করেছিল, তারা নাউরুর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় পুরো জাতির ভবিষ্যৎ। পথে বসতে বাধ্য হয় পুরো নাউরু জাতি।
দেশটির কাছে এখন আছে ২১ বর্গ কিলোমিটারের জমি, যার কোথাও ফসল আবাদ করা সম্ভব না। মাত্রাতিরিক্ত খোঁড়াখুড়ির ফলে আশেপাশের সব পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। সাত হাজার বাসিন্দা যেন একটি জেলখানায় আটকা পড়েছে। এদের সবার মৌলিক চাহিদা পূরণ করা নাউরু সরকারের জন্য অসম্ভব ব্যাপার।
নাউরু সরকার ঘোষণা দিলো, ২০ হাজার ডলার দিয়ে যে কেউ চাইলে নাউরুতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিন্তু হলো হিতে বিপরীত। নাউরুর অতি সাদাসিধে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মাফিয়া গোষ্ঠী ৭০ বিলিয়ন ডলারের অর্থ পাচার করে বসে।
নাউরুর করুণ দশা এখানেই থেমে থাকেনি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, কসোভা ও আবখাজিয়াকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য নাউরু রাশিয়ার কাছ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থ আত্মসাৎ করেছে। যদিও জাতিসংঘে নাউরু এ ঘটনা অস্বীকার করে। বলেছে, রুশ সরকার নাকি মানবিক বিবেচনায় দেশটিকে ৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে!

নাউরুর একটি শরণার্থী শিবির, যেখানে অস্ট্রেলিয়া থেকে পাঠানো অপরাধীদের রাখা হতো। এটিও ছিল দেশটির একটি উপার্জনের উপায়! ছবি: সংগৃহীত
দিনে দিনে দেশটি আরও দুর্দশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার নাউরুতে উদ্বাস্তু শিবির প্রতিষ্ঠা করে। যারা অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে আসত কিংবা কোনো মারাত্মক অপরাধে জড়িত হতো, অস্ট্রেলিয়া সরকার তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে নাউরু পাঠিয়ে দিত। এ জন্য নাউরুকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ভাড়া দিত অস্ট্রেলিয়া সরকার। কিন্তু নাউরুর পরিবেশ এতই করুণ যে সেখানে নিয়মিত খাবার পানি পেতেও মারামারি করা লাগত। জীবনের নিরাপত্তার তো প্রশ্নই ওঠে না।
নানা আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া উদ্বাস্তু শিবির বন্ধ করে দেয়। পরে ২০১৪ সালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে আবার এই কেন্দ্র চালু করা হয়। বাস্তবে পরিস্থিতি সেই আগের মতোই। যারাই এ কেন্দ্রের দুর্দশা নিয়ে কথা বলতে যায়, তাদের কপালে জোটে করুণ পরিণতি। এ জন্য প্রাণের ভয়ে কেউ এই কেন্দ্র নিয়ে আর কথাও বলতে চায় না।
২০১৬ সালে এক ইরানি জানতে পারেন, তাকে নাউরুর উদ্বাস্তুকেন্দ্রে ১০ বছর কাটাতে হবে। এ কথা শোনার পর তিনি গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন। পরিস্থিতি কতটা শোচনীয় হলে এমনটা ঘটতে পারে!
বর্তমান নাউরুর দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানে ৭০ শতাংশ জমি আছে, কিন্তু চাষাবাদ করা সম্ভব না। নিম্নমানের খাবার ও নানা রোগে আক্রান্ত জনগণ। দেশটির ৯৭ শতাংশ পুরুষ ও ৯৩ শতাংশ নারী স্থূলতার শিকার। মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ নাগরিকের রয়েছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস। বিকল কিডনি ও হৃদরোগ সেখানে খুবই স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে দেশটির ৯০ শতাংশ নাগরিকই বেকার।
ধনী রাষ্ট্রগুলো কখনোই ছোট রাষ্ট্রকে সহায়তা করে না। ছোট দেশগুলো উন্নত বা স্বাভাবিক জীবনের অধিকারী হোক— কোনো ধনী রাষ্ট্রই তা চায় না। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপই নিজেদের স্বার্থ ও লাভবান হওয়ার কৌশল। এই কৌশল বাস্তবায়নে ছোট দেশের সকল নাগরিকের মৃত্যু ঘটলেও মানবতার কোনোই অমর্যাদা হয় না তাদের কাছে। নাউরু এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত!
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি)