
শরিফুজ্জামান পিন্টু

কোনো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকে না। গণতান্ত্রিক সমাজে নিয়োগের যোগ্যতা, স্বচ্ছতা, অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা কিংবা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে— এটাই স্বাভাবিক। বরং এসব প্রশ্নই রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়। কিন্তু যখন সেই সমালোচনা ব্যক্তির পেশাগত সক্ষমতা ছেড়ে তার লিঙ্গ, শরীর বা ব্যক্তিগত মর্যাদাকে নিয়ে পরিচালিত হয়, তখন তা আর গণতান্ত্রিক সমালোচনা থাকে না, সেটি রূপ নেয় সামাজিক সহিংসতায়।
দেশের রাষ্ট্রয়াত্ত চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক হিসেবে কাজী জেসিনের নিয়োগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটি বড় অংশ এই সীমারেখা অতিক্রম করেছে। কেউ তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন— এসব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো— বিপুলসংখ্যক মন্তব্যে তাকে একজন কর্মকর্তা হিসেবে নয়, একজন নারী হিসেবে অপমান করার চেষ্টা করা হয়েছে। যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা, অশালীন কটাক্ষ, চরিত্রহননের প্রচেষ্টা— এসবের সঙ্গে তার পেশাগত যোগ্যতার কোনো সম্পর্ক নেই।
এখানেই আমাদের সমাজের একটি গভীর সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন পুরুষ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন, তখন তার কাজ, সিদ্ধান্ত, অতীত রেকর্ড কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক হয়। কিন্তু একজন নারী একই অবস্থানে গেলে অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় তার যোগ্যতা নয়, তার নারী পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে— যেন একজন নারীর সাফল্য স্বাভাবিকভাবে অর্জিত হতে পারে না, তার পেছনে অবশ্যই এমন কোনো ব্যাখ্যা আছে, যা তাকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করতে সাহায্য করবে।
এই মানসিকতা নতুন নয়। বহু শতাব্দীর পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো নারীর সাফল্যকে প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখেছে। একজন পুরুষের পদোন্নতি ‘যোগ্যতার স্বীকৃতি’, আর একজন নারীর পদোন্নতি ‘বিশেষ সুবিধা’— এই ধারণা শুধু বৈষম্যমূলক নয়, এটি তথ্যবিবর্জিতও। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বা পদোন্নতির সমালোচনা করতে হলে তথ্য, নীতি ও যোগ্যতার প্রশ্নই হওয়া উচিত আলোচনার কেন্দ্র। ব্যক্তিগত অপমান সেখানে যুক্তির অভাবেরই প্রকাশ।
বাংলাদেশের সংবিধানও এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতার কথা বলা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সাংবিধানিক দর্শন শুধু রাষ্ট্রের জন্য নয়, নাগরিক সমাজের জন্যও একটি নৈতিক মানদণ্ড। ফলে কোনো নারীর সরকারি দায়িত্ব গ্রহণের পর তার নারী পরিচয়কে অপমানের উপাদান বানানো সংবিধানের সমতার চেতনার সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, জনপরিসরে নারীদের বিরুদ্ধে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার আসলে একটি ক্ষমতার কৌশল। এর উদ্দেশ্য শুধু একজন ব্যক্তিকে অপমান করা নয়; বরং তাকে এবং তার মতো অন্য নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণ থেকে নিরুৎসাহিত করা। অর্থাৎ এটি ব্যক্তি আক্রমণের চেয়েও বড় একটি সামাজিক বার্তা বহন করে— ‘নেতৃত্বে এলে তোমাকেও এই অপমান সহ্য করতে হবে।’
এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশেই জনজীবনে সক্রিয় নারীরা একই ধরনের অনলাইন বিদ্বেষের মুখোমুখি হচ্ছেন। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর গবেষণায় দেখা গেছে, জনপরিসরে কাজ করা নারী সাংবাদিকদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময় অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের অনেকেই যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ধর্ষণের হুমকি, ব্যক্তিগত অপমান ও মিথ্যা তথ্যভিত্তিক প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে ইউনেসকো আরও সতর্ক করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের কারণে নারীদের বিরুদ্ধে ভুয়া ছবি, বিকৃত ভিডিও এবং চরিত্রহননের নতুন প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থাও বলছে, অনলাইন সহিংসতা এখন নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাগত অংশগ্রহণের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শুরু হওয়া বিদ্বেষ অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব জীবনের হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন ব্যক্তি নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পরিবেশও।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কারণ এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষা দ্রুত মূলধারার সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলে। একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি বা প্রভাবশালী ব্যবহারকারী যখন অশালীন শব্দ ব্যবহার করেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভাষা হাজারও মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তায় প্রবেশ করে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এটি অনুকরণের প্রবণতা তৈরি করে। ফলে কুরুচি শুধু একটি পোস্টে সীমাবদ্ধ থাকে না, ধীরে ধীরে তা সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
অনলাইন সহিংসতার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো— এটি খুব সহজেই স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়। একটি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যে কয়েক হাজার মানুষ হাসির প্রতিক্রিয়া দিলে কিংবা সেটি হাজারবার ভাগাভাগি হলে অনেকেই ধরে নেন, এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করাই যেন স্বাভাবিক। অথচ বাস্তবতা হলো— ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা সমাজের মূল্যবোধও নির্মাণ করে। যে সমাজে অশ্লীলতা বিনোদন হয়ে ওঠে, সেখানে শালীনতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে— আমরা কি সত্যিই কাজী জেসিনের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক করছি, নাকি তার নারী পরিচয় নিয়ে? যদি কেউ মনে করেন তিনি এই পদের জন্য উপযুক্ত নন, তাহলে নিশ্চয়ই তার পেছনে যুক্তি থাকবে। তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, গণমাধ্যম পরিচালনার অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা কিংবা সরকারের নিয়োগনীতির সমালোচনা করা যেতে পারে। এগুলোই হওয়া উচিত আলোচনার বিষয়। কিন্তু যখন সেই বিতর্ক ছেড়ে একজন নারীকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দে আক্রমণ করা হয়, তখন বোঝা যায় যুক্তির জায়গা দখল করে নিয়েছে বিদ্বেষ।
আমরা প্রায়ই একটি বিষয় ভুলে যাই। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়া পুরুষদের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে সাধারণত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয় না। অর্থাৎ একই ধরনের বিতর্কে নারী ও পুরুষকে এক মানদণ্ডে বিচার করা হয় না। এই দ্বৈত আচরণই লিঙ্গবৈষম্যের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ, মনোজগতের চরম অসভ্যতা।

কাজী জেসিনের শত অযোগ্যতা থাকতে পারে, এ নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু তার নারী পরিচয়কে অপমানের হাতিয়ার বানানো মানে যোগ্যতার বিতর্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া।
এখানে আরেকটি বিষয়ও ভাবার আছে। আমরা কি আসলেই যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে শিখেছি? কোনো প্রতিষ্ঠানে নতুন কেউ দায়িত্ব নিলে তার কাজ দেখার আগেই চূড়ান্ত রায় দিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে ক্রমশ বাড়ছে। একজন কর্মকর্তা সফল হবেন কি ব্যর্থ— তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে তার কাজ। নিয়োগের প্রথম দিন থেকেই তাকে ব্যক্তিগতভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা তাকে টেনে ধরার শামিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন এক ধরনের গণআদালতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রমাণের চেয়ে গুজব দ্রুত ছড়ায়, যুক্তির চেয়ে কুরুচি বেশি জনপ্রিয় হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়— এই ভাষা এখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণ রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রিয় বক্তা, শিক্ষক, অভিনয়শিল্পী কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মুখে উচ্চারিত অশালীন শব্দ অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের কথাবার্তার অংশ হয়ে যায়। ফলে ভাষার অবক্ষয় শুধু ব্যক্তিগত রুচির সমস্যা থাকে না, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা যদি সত্যিই একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র চাই, তাহলে সরকারি নিয়োগের কঠোর সমালোচনা অবশ্যই করতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে— নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে, প্রার্থী কতটা যোগ্য, সিদ্ধান্ত কতটা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। কিন্তু সেই প্রশ্ন যেন কখনোই একজন নারীর মর্যাদাহানির অজুহাত না হয়ে ওঠে। কারণ ব্যক্তিগত অপমান কখনো দুর্বল যুক্তিকে শক্তিশালী করে না, বরং সমালোচনাকেই দুর্বল করে দেয়।
বিটিভির করুণ দশা আমরা সবাই কম বেশি জানি। একদিকে বিটিভির দর্শকপ্রিয়তা কমছে, আরেকদিকে বাড়ছে লোকসান। বিটিভি চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে করসহ আয় করেছে ৮ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় করেছে ২৫৪ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি টাকা, আর ব্যয় ছিল ৩০৮ কোটি টাকা।
গত ২২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন এ তথ্য জানিয়েছেন।
এই লোকসান প্রতি বছর হচ্ছে এবং তা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা তথ্য অনুযায়ী, তার আগের পাঁচ বছরে বিটিভির আয় অর্ধেকে নেমে যায়। ২০১০-১১ অর্থবছরে বিটিভির লোকসান ছিল ৪৩ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে লোকসান বেড়ে হয়েছে ১০১ কোটি টাকা।
বেতার, বিটিভি ও বিএসএস নিয়ে ২০১৪ সালের ১১, ১২ ও ১৩ নভেম্বর সংবাদপত্রে আমার লেখা তিনটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের লোকসান, দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়। ২০১৪ সালে সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে তখন লিখেছিলাম, বিটিভির লোকসান ছিল বছরে ৩০ কোটি টাকা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন বিটিভির বছরে লোকসান ২৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি।
জনসাধারণের এই বিপুল অর্থের অপচয় নিয়ে আমরা কেউ প্রশ্ন করি না। এমন লোকসানি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি না। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে জন্য প্রধান পদে নিয়োগের অন্যতম যোগ্যতা হওয়া উচিত সে কতটা লোকসান কমাতে পারবে, জনগণের টাকা সাশ্রয় করতে পারবে। তার বদলে একজন নারীকে নিয়োগ করা হলে তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েই আমরা প্রশ্ন করি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের মতপ্রকাশের নতুন সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে এসেছে দায়িত্বও। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে অন্যের মর্যাদা নষ্ট করার স্বাধীনতা নয়। বিশেষ করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে একজন নারীকে হেয় করা কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এটি একটি সামাজিক সংস্কৃতিকে বিষাক্ত করে তোলার প্রক্রিয়া।
আমাদের মনে রাখা উচিত, আজ যে ভাষা একজন নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, আগামীকাল সেই ভাষাই ব্যবহার করা হবে একজন নারী সাংবাদিক, একজন বিচারক, একজন শিক্ষক, একজন চিকিৎসক কিংবা আমাদের নিজের পরিবারের কোনো নারী সদস্যের বিরুদ্ধে। ঘৃণার ভাষা কখনো একটি মানুষে থেমে থাকে না, সেটি ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে সংক্রমিত করে।
ইতিহাস বলে, কোনো সমাজ তার নারীদের অসম্মান করে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে পারেনি। নারীর অংশগ্রহণ যত বাড়ে, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত তত বহুমাত্রিক হয়, প্রতিষ্ঠান তত শক্তিশালী হয় এবং গণতন্ত্র তত গভীর হয়। তাই একজন নারী কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হলে তাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু একটি ন্যায্য মানদণ্ড। তিনি সফল হলে প্রশংসা পাবেন, ব্যর্থ হলে সমালোচনার মুখোমুখি হবেন। কিন্তু সেই সমালোচনা হবে তার কাজের ভিত্তিতে, তার নারী পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কাজী জেসিনকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে চাই, যেখানে যুক্তির পরিবর্তে কুরুচি, তথ্যের পরিবর্তে গুজব এবং সমালোচনার পরিবর্তে যৌন অপমান স্থান করে নেবে? নাকি আমরা এমন একটি জনপরিসর গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ব্যক্তি নয়, কাজের বিচার হবে; লিঙ্গ নয়, যোগ্যতা হবে মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড?
সমালোচনা গণতন্ত্রের অক্সিজেন। কিন্তু লিঙ্গবিদ্বেষ গণতন্ত্রের শত্রু। তাই আসুন, মতের বিরোধিতা করি, সিদ্ধান্তের সমালোচনা করি, নিয়োগ নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলি। কিন্তু একজন নারীকে অপমান করে নয়। সমালোচনা হোক যোগ্যতা নিয়ে, নারী পরিচয় নিয়ে নয়।
লেখক: সাংবাদিক

কোনো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকে না। গণতান্ত্রিক সমাজে নিয়োগের যোগ্যতা, স্বচ্ছতা, অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা কিংবা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে— এটাই স্বাভাবিক। বরং এসব প্রশ্নই রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়। কিন্তু যখন সেই সমালোচনা ব্যক্তির পেশাগত সক্ষমতা ছেড়ে তার লিঙ্গ, শরীর বা ব্যক্তিগত মর্যাদাকে নিয়ে পরিচালিত হয়, তখন তা আর গণতান্ত্রিক সমালোচনা থাকে না, সেটি রূপ নেয় সামাজিক সহিংসতায়।
দেশের রাষ্ট্রয়াত্ত চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক হিসেবে কাজী জেসিনের নিয়োগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটি বড় অংশ এই সীমারেখা অতিক্রম করেছে। কেউ তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন— এসব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো— বিপুলসংখ্যক মন্তব্যে তাকে একজন কর্মকর্তা হিসেবে নয়, একজন নারী হিসেবে অপমান করার চেষ্টা করা হয়েছে। যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা, অশালীন কটাক্ষ, চরিত্রহননের প্রচেষ্টা— এসবের সঙ্গে তার পেশাগত যোগ্যতার কোনো সম্পর্ক নেই।
এখানেই আমাদের সমাজের একটি গভীর সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন পুরুষ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন, তখন তার কাজ, সিদ্ধান্ত, অতীত রেকর্ড কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক হয়। কিন্তু একজন নারী একই অবস্থানে গেলে অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় তার যোগ্যতা নয়, তার নারী পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে— যেন একজন নারীর সাফল্য স্বাভাবিকভাবে অর্জিত হতে পারে না, তার পেছনে অবশ্যই এমন কোনো ব্যাখ্যা আছে, যা তাকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করতে সাহায্য করবে।
এই মানসিকতা নতুন নয়। বহু শতাব্দীর পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো নারীর সাফল্যকে প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখেছে। একজন পুরুষের পদোন্নতি ‘যোগ্যতার স্বীকৃতি’, আর একজন নারীর পদোন্নতি ‘বিশেষ সুবিধা’— এই ধারণা শুধু বৈষম্যমূলক নয়, এটি তথ্যবিবর্জিতও। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বা পদোন্নতির সমালোচনা করতে হলে তথ্য, নীতি ও যোগ্যতার প্রশ্নই হওয়া উচিত আলোচনার কেন্দ্র। ব্যক্তিগত অপমান সেখানে যুক্তির অভাবেরই প্রকাশ।
বাংলাদেশের সংবিধানও এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতার কথা বলা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সাংবিধানিক দর্শন শুধু রাষ্ট্রের জন্য নয়, নাগরিক সমাজের জন্যও একটি নৈতিক মানদণ্ড। ফলে কোনো নারীর সরকারি দায়িত্ব গ্রহণের পর তার নারী পরিচয়কে অপমানের উপাদান বানানো সংবিধানের সমতার চেতনার সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, জনপরিসরে নারীদের বিরুদ্ধে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার আসলে একটি ক্ষমতার কৌশল। এর উদ্দেশ্য শুধু একজন ব্যক্তিকে অপমান করা নয়; বরং তাকে এবং তার মতো অন্য নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণ থেকে নিরুৎসাহিত করা। অর্থাৎ এটি ব্যক্তি আক্রমণের চেয়েও বড় একটি সামাজিক বার্তা বহন করে— ‘নেতৃত্বে এলে তোমাকেও এই অপমান সহ্য করতে হবে।’
এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশেই জনজীবনে সক্রিয় নারীরা একই ধরনের অনলাইন বিদ্বেষের মুখোমুখি হচ্ছেন। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর গবেষণায় দেখা গেছে, জনপরিসরে কাজ করা নারী সাংবাদিকদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময় অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের অনেকেই যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ধর্ষণের হুমকি, ব্যক্তিগত অপমান ও মিথ্যা তথ্যভিত্তিক প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে ইউনেসকো আরও সতর্ক করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের কারণে নারীদের বিরুদ্ধে ভুয়া ছবি, বিকৃত ভিডিও এবং চরিত্রহননের নতুন প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থাও বলছে, অনলাইন সহিংসতা এখন নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাগত অংশগ্রহণের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শুরু হওয়া বিদ্বেষ অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব জীবনের হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন ব্যক্তি নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পরিবেশও।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কারণ এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষা দ্রুত মূলধারার সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলে। একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি বা প্রভাবশালী ব্যবহারকারী যখন অশালীন শব্দ ব্যবহার করেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ভাষা হাজারও মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তায় প্রবেশ করে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এটি অনুকরণের প্রবণতা তৈরি করে। ফলে কুরুচি শুধু একটি পোস্টে সীমাবদ্ধ থাকে না, ধীরে ধীরে তা সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
অনলাইন সহিংসতার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো— এটি খুব সহজেই স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়। একটি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যে কয়েক হাজার মানুষ হাসির প্রতিক্রিয়া দিলে কিংবা সেটি হাজারবার ভাগাভাগি হলে অনেকেই ধরে নেন, এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করাই যেন স্বাভাবিক। অথচ বাস্তবতা হলো— ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা সমাজের মূল্যবোধও নির্মাণ করে। যে সমাজে অশ্লীলতা বিনোদন হয়ে ওঠে, সেখানে শালীনতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে— আমরা কি সত্যিই কাজী জেসিনের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক করছি, নাকি তার নারী পরিচয় নিয়ে? যদি কেউ মনে করেন তিনি এই পদের জন্য উপযুক্ত নন, তাহলে নিশ্চয়ই তার পেছনে যুক্তি থাকবে। তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, গণমাধ্যম পরিচালনার অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা কিংবা সরকারের নিয়োগনীতির সমালোচনা করা যেতে পারে। এগুলোই হওয়া উচিত আলোচনার বিষয়। কিন্তু যখন সেই বিতর্ক ছেড়ে একজন নারীকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দে আক্রমণ করা হয়, তখন বোঝা যায় যুক্তির জায়গা দখল করে নিয়েছে বিদ্বেষ।
আমরা প্রায়ই একটি বিষয় ভুলে যাই। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়া পুরুষদের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে সাধারণত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয় না। অর্থাৎ একই ধরনের বিতর্কে নারী ও পুরুষকে এক মানদণ্ডে বিচার করা হয় না। এই দ্বৈত আচরণই লিঙ্গবৈষম্যের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ, মনোজগতের চরম অসভ্যতা।

কাজী জেসিনের শত অযোগ্যতা থাকতে পারে, এ নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু তার নারী পরিচয়কে অপমানের হাতিয়ার বানানো মানে যোগ্যতার বিতর্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া।
এখানে আরেকটি বিষয়ও ভাবার আছে। আমরা কি আসলেই যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে শিখেছি? কোনো প্রতিষ্ঠানে নতুন কেউ দায়িত্ব নিলে তার কাজ দেখার আগেই চূড়ান্ত রায় দিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে ক্রমশ বাড়ছে। একজন কর্মকর্তা সফল হবেন কি ব্যর্থ— তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে তার কাজ। নিয়োগের প্রথম দিন থেকেই তাকে ব্যক্তিগতভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা তাকে টেনে ধরার শামিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন এক ধরনের গণআদালতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রমাণের চেয়ে গুজব দ্রুত ছড়ায়, যুক্তির চেয়ে কুরুচি বেশি জনপ্রিয় হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়— এই ভাষা এখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণ রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রিয় বক্তা, শিক্ষক, অভিনয়শিল্পী কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মুখে উচ্চারিত অশালীন শব্দ অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের কথাবার্তার অংশ হয়ে যায়। ফলে ভাষার অবক্ষয় শুধু ব্যক্তিগত রুচির সমস্যা থাকে না, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা যদি সত্যিই একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র চাই, তাহলে সরকারি নিয়োগের কঠোর সমালোচনা অবশ্যই করতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে— নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে, প্রার্থী কতটা যোগ্য, সিদ্ধান্ত কতটা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। কিন্তু সেই প্রশ্ন যেন কখনোই একজন নারীর মর্যাদাহানির অজুহাত না হয়ে ওঠে। কারণ ব্যক্তিগত অপমান কখনো দুর্বল যুক্তিকে শক্তিশালী করে না, বরং সমালোচনাকেই দুর্বল করে দেয়।
বিটিভির করুণ দশা আমরা সবাই কম বেশি জানি। একদিকে বিটিভির দর্শকপ্রিয়তা কমছে, আরেকদিকে বাড়ছে লোকসান। বিটিভি চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে করসহ আয় করেছে ৮ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় করেছে ২৫৪ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় ছিল ২৭ কোটি টাকা, আর ব্যয় ছিল ৩০৮ কোটি টাকা।
গত ২২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দীন স্বপন এ তথ্য জানিয়েছেন।
এই লোকসান প্রতি বছর হচ্ছে এবং তা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা তথ্য অনুযায়ী, তার আগের পাঁচ বছরে বিটিভির আয় অর্ধেকে নেমে যায়। ২০১০-১১ অর্থবছরে বিটিভির লোকসান ছিল ৪৩ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে লোকসান বেড়ে হয়েছে ১০১ কোটি টাকা।
বেতার, বিটিভি ও বিএসএস নিয়ে ২০১৪ সালের ১১, ১২ ও ১৩ নভেম্বর সংবাদপত্রে আমার লেখা তিনটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের লোকসান, দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়। ২০১৪ সালে সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে তখন লিখেছিলাম, বিটিভির লোকসান ছিল বছরে ৩০ কোটি টাকা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন বিটিভির বছরে লোকসান ২৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি।
জনসাধারণের এই বিপুল অর্থের অপচয় নিয়ে আমরা কেউ প্রশ্ন করি না। এমন লোকসানি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি না। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে জন্য প্রধান পদে নিয়োগের অন্যতম যোগ্যতা হওয়া উচিত সে কতটা লোকসান কমাতে পারবে, জনগণের টাকা সাশ্রয় করতে পারবে। তার বদলে একজন নারীকে নিয়োগ করা হলে তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েই আমরা প্রশ্ন করি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের মতপ্রকাশের নতুন সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে এসেছে দায়িত্বও। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে অন্যের মর্যাদা নষ্ট করার স্বাধীনতা নয়। বিশেষ করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে একজন নারীকে হেয় করা কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এটি একটি সামাজিক সংস্কৃতিকে বিষাক্ত করে তোলার প্রক্রিয়া।
আমাদের মনে রাখা উচিত, আজ যে ভাষা একজন নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, আগামীকাল সেই ভাষাই ব্যবহার করা হবে একজন নারী সাংবাদিক, একজন বিচারক, একজন শিক্ষক, একজন চিকিৎসক কিংবা আমাদের নিজের পরিবারের কোনো নারী সদস্যের বিরুদ্ধে। ঘৃণার ভাষা কখনো একটি মানুষে থেমে থাকে না, সেটি ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে সংক্রমিত করে।
ইতিহাস বলে, কোনো সমাজ তার নারীদের অসম্মান করে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে পারেনি। নারীর অংশগ্রহণ যত বাড়ে, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত তত বহুমাত্রিক হয়, প্রতিষ্ঠান তত শক্তিশালী হয় এবং গণতন্ত্র তত গভীর হয়। তাই একজন নারী কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হলে তাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু একটি ন্যায্য মানদণ্ড। তিনি সফল হলে প্রশংসা পাবেন, ব্যর্থ হলে সমালোচনার মুখোমুখি হবেন। কিন্তু সেই সমালোচনা হবে তার কাজের ভিত্তিতে, তার নারী পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কাজী জেসিনকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে চাই, যেখানে যুক্তির পরিবর্তে কুরুচি, তথ্যের পরিবর্তে গুজব এবং সমালোচনার পরিবর্তে যৌন অপমান স্থান করে নেবে? নাকি আমরা এমন একটি জনপরিসর গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ব্যক্তি নয়, কাজের বিচার হবে; লিঙ্গ নয়, যোগ্যতা হবে মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড?
সমালোচনা গণতন্ত্রের অক্সিজেন। কিন্তু লিঙ্গবিদ্বেষ গণতন্ত্রের শত্রু। তাই আসুন, মতের বিরোধিতা করি, সিদ্ধান্তের সমালোচনা করি, নিয়োগ নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলি। কিন্তু একজন নারীকে অপমান করে নয়। সমালোচনা হোক যোগ্যতা নিয়ে, নারী পরিচয় নিয়ে নয়।
লেখক: সাংবাদিক

বাংলাদেশ আজ আর সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নয়; বরং উদীয়মান একটি আঞ্চলিক অর্থনীতি। সেই বাস্তবতার আলোকে কূটনীতিও হতে হবে আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে, কিন্তু কারও প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে, বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অটু
৩ দিন আগে
মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে মাছে প্রবেশ করে? নদীতে ফেলা প্লাস্টিক সূর্যের আলো, তাপ, ঢেউ ও ঘর্ষণের ফলে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে যায়। প্ল্যাংকটন, চিংড়ি, শামুক এবং ছোট মাছ এগুলো খাদ্য ভেবে গ্রহণ করে। পরে বড় মাছ সেই ছোট মাছ খায়।
৬ দিন আগে
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো— আমাদের গণমাধ্যম কি সবসময় সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারছে? নাকি কখনো কখনো সংবাদও হয়ে উঠছে রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যবসায়িক স্বার্থ, ক্ষমতার প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার অংশ?
৭ দিন আগে
রাষ্ট্রের ক্রান্তিকালে বিএনপি ও তার সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলোও চায়নি দেশে আর কোনো সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হোক। যাকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো অপশক্তি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
১০ দিন আগে