
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কোনো সাধারণ তারিখ নয়। সেটা ছিল একটা রাত থেকে আরেকটা রাতে গড়িয়ে যাওয়া দীর্ঘ, দ্বিধাগ্রস্ত দিন, যার প্রতিটি ঘণ্টায় ভয় আর প্রত্যাশা পাশাপাশি হেঁটেছে। কেরানীগঞ্জের রাস্তা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে আবার কেরানীগঞ্জে ফিরে আসার সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহ— একজন সাংবাদিকের চোখে দেখা, অনুভব করা এবং বয়ে বেড়ানো স্মৃতিরই এই স্মৃতিচারণ।
৪ আগস্টের রাতটা মনে আছে এক অস্বস্তিকর জাগরণ হিসেবে। ঘুম আসছিল না, আর আসারও কথা ছিল না। সাংবাদিক হিসেবে সেদিন রাতে যা টের পাচ্ছিলাম, তা নিছক পেশাগত সতর্কতা ছিল না; ছিল এক গভীর, নাম-না-জানা উৎকণ্ঠা। ততক্ষণে খবর এসে গেছে, আসিফ মাহমুদ ৫ বা ৬ তারিখে ‘লং মার্চে’র ডাক দিয়েছেন।
কিন্তু এই ঘোষণার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যা ঘটছিল, তা কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল না। আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছিলেন, আর পুলিশও একের পর এক জায়গায় গুলি ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছিল। ৫ তারিখের কর্মসূচিকে আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল বলেই একটা ভয় কুরে কুরে খাচ্ছিল— তারা হয়তো শেষ চেষ্টা হিসেবে সবচেয়ে বড় আঘাতটাই হানবে।
রাত যত গভীর হচ্ছিল, ইঙ্গিতগুলো তত স্পষ্ট হচ্ছিল। বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উস্কানিমূলক স্লোগান দিতে দেখা যাচ্ছিল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে দলটির নেতাকর্মীরা রাতের অন্ধকারে ঢাকায় ঢুকছেন— এমন খবরও একের পর এক আসছিল। তাদের আচরণে একটা প্রকাশ্য জেদ ছিল, যেন পরদিন আন্দোলনকারীদের চূড়ান্তভাবে প্রতিহত করে দেবেন। সেই রাতে সাংবাদিক মহলে যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল, তার তুলনা খুব কম সময়ের সঙ্গেই চলে। কেউ ঘুমাননি বললেই চলে— সবাই অপেক্ষা করছিলেন, না জেনেই কীসের জন্য অপেক্ষা করছেন।
ভোর হতে না হতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম কেরানীগঞ্জের পথে। এলাকা ঘুরে যা দেখলাম, তাতে বুকের ভেতরটা আরও দমে গেল। মোড়ে মোড়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়ে বসে আছেন। সাধারণ মানুষের বের হওয়ার কোনো উপায় নেই— রাস্তাগুলো যেন হঠাৎ করেই অচেনা হয়ে গেছে।
কদমতলী পৌঁছাতেই পুলিশ পথ আটকাল। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও উত্তর এলো, ‘আমরা ছেড়ে দিলেও সামনে যেতে পারবেন না।’ আমি শুধু বললাম, ‘ঠিক আছে, আমারটা আমি দেখব, আপনারা আমাকে যেতে দিন।’ সেই মুহূর্তে ওই একটি লাইনের মধ্যেই যেন গোটা দিনের ঝুঁকিটা ঘনীভূত হয়ে ছিল।
বাবুবাজার সেতুর কেরানীগঞ্জ প্রান্তে পৌঁছে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা আজও চোখ বুজলে ভেসে ওঠে। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের নেতৃত্বে প্রায় হাজারখানেক সশস্ত্র লোক অবস্থান নিয়েছিলেন সেখানে। কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র, কারও হাতে ধারালো অস্ত্র, আবার কারও হাতে পিস্তল কিংবা শর্টগান। এই একটি দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে কী রকম থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। রাজধানীর দিকে তাকিয়ে থাকা সেই অস্ত্রধারী সারি যেন একটা প্রতীক্ষার মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল— কীসের প্রতীক্ষা, তখনও স্পষ্ট নয়।
দুপুরের দিকে হঠাৎ একটি ঘোষণা এলো— সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। তখনও প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল শেখ হাসিনা। তাই প্রশ্নটা এড়ানো গেল না— সেনাপ্রধান কেন ভাষণ দেবেন? এই একটি প্রশ্নের ভেতর দিয়েই যেন একটা ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠল সবার মনে— হয়তো সরকার পতনের মুখে। কিছুক্ষণ পরই খবর এলো, ভাষণ পিছিয়ে গেছে। তখন বোঝা গেল, পর্দার আড়ালে কোনো সমঝোতা বা আলোচনা চলছে। কিন্তু পতন যে আসন্ন, তা নিয়ে সংশয় কমে এলো, বাড়ল অপেক্ষার তীব্রতা।
এই সময়টায় সেতুর ওপারে খবর সংগ্রহে যাওয়া সহকর্মীরা একে একে ফিরে আসতে শুরু করলেন। তাদের মুখে যা শুনলাম, তা রীতিমতো নারকীয়। অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের তাণ্ডব তখনও চরমে। বিভিন্ন জায়গা থেকে হামলা আর সহিংসতার খবর একটার পর একটা আসছিল, আর প্রতিটি খবর যেন আগেরটার চেয়ে ভারী হয়ে চেপে বসছিল বুকে।
আনুমানিক দুপুর দুটোর দিকে দৃশ্যটা হঠাৎ বদলে গেল। সেতুর মোড়ে অবস্থান নেওয়া সশস্ত্র লোকগুলো ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে হঠাৎই এলাকা ছাড়তে শুরু করল। তাদের হাঁটার ধরনেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল— তারা পালাচ্ছেন। কোথায় যাচ্ছেন, জিজ্ঞেস করলেও কেউ কোনো জবাব দিলেন না; শুধু দ্রুত পায়ে জায়গা ছেড়ে চলে গেলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরটা নিশ্চিত হলো— শেখ হাসিনার পতন ঘটেছে। যে মুহূর্তটার জন্য সারা রাত-দিন এত উৎকণ্ঠা, সেটা শেষ পর্যন্ত এসে গেল এক নিঃশব্দ পলায়নের মধ্য দিয়ে।
খবরটা কানে আসামাত্র বাইক ঘুরিয়ে ছুটলাম টিএসসির দিকে। পথে যা দেখলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সব বয়স আর শ্রেণির মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায়। চারদিকে মিছিল, উল্লাস, একটা উৎসবের আবহ। মনে হচ্ছিল, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর মানুষ যেভাবে হাসিমুখে সড়কে নেমে এসেছিল, ঠিক তেমনই একটা ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছি নিজের চোখে।
টিএসসিতে পৌঁছে দেখি হাজার হাজার মানুষের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। মনে হচ্ছিল, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কোনো জাতীয় উৎসব পালিত হচ্ছে সেখানে। ঠিক সেই সময়ই ঘটল সেই আলোচিত মুহূর্ত— মেট্রোরেলের পিলারে সাঁটা শেখ হাসিনার ছবিতে জুতা মারা হলো।
ততক্ষণে গণভবনেও নেমেছে জনতার ঢল, যদিও শেখ হাসিনা তার আগেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। যে ক্ষমতা কিছুদিন আগেও অটুট মনে হচ্ছিল, তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল। আর সেই শূন্যতাই যেন সেদিনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে উঠল।
সন্ধ্যা নামতে নামতে আবার কেরানীগঞ্জের দিকে ফিরলাম। কিন্তু এবার যে পরিবেশ চোখে পড়ল, তা সকালের সঙ্গে মিলছিল না কিছুতেই। একটা অদ্ভুত, ভুতুড়ে নীরবতা যেন গ্রাস করেছে গোটা এলাকা। খবর এলো, প্রেস ক্লাবে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। রডের কারখানা আর শিটের গুদামে ট্রাক-পিকআপ নিয়ে এসে প্রকাশ্যে লুটপাট চলছে। রাস্তায় পুড়ে যাওয়া গাড়ি থেকে কুপিয়ে লোহা খুলে নিচ্ছে একদল সুবিধাবাদী মানুষ। একদিকে কেউ প্রতিশোধ নিচ্ছে, অন্যদিকে কেউ ব্যস্ত দখল আর লুটে। সরকার নেই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্তিত্ব নেই— সেই রাতে যেন কোনো অভিভাবকই ছিল না শহরের।
এই বৈপরীত্যটাই আজও সবচেয়ে বেশি মনে থেকে গেছে। একদিকে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান, স্বাধীনতার আনন্দ; অন্যদিকে নৈরাজ্য আর আইনশৃঙ্খলার ভেঙে পড়া। দুটি বাস্তবতা একই শহরে, একই রাতে, পাশাপাশি ঘটে যাচ্ছিল।
৫ আগস্ট রাতের সেই এক ধরনের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পরিস্থিতি একটা চাপা শঙ্কা তৈরি করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশেই যা দেখেছিলাম— দেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে ওঠা সেই অবর্ণনীয় আনন্দ— তা ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম।
দুই বছর পরও সেই দুটি ছবি একসঙ্গে মনে ভাসে— আগুনে পোড়া রাস্তা আর টিএসসির উল্লাস, ভয় আর মুক্তি— একই দিনের দুই মুখ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কোনো সাধারণ তারিখ নয়। সেটা ছিল একটা রাত থেকে আরেকটা রাতে গড়িয়ে যাওয়া দীর্ঘ, দ্বিধাগ্রস্ত দিন, যার প্রতিটি ঘণ্টায় ভয় আর প্রত্যাশা পাশাপাশি হেঁটেছে। কেরানীগঞ্জের রাস্তা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে আবার কেরানীগঞ্জে ফিরে আসার সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহ— একজন সাংবাদিকের চোখে দেখা, অনুভব করা এবং বয়ে বেড়ানো স্মৃতিরই এই স্মৃতিচারণ।
৪ আগস্টের রাতটা মনে আছে এক অস্বস্তিকর জাগরণ হিসেবে। ঘুম আসছিল না, আর আসারও কথা ছিল না। সাংবাদিক হিসেবে সেদিন রাতে যা টের পাচ্ছিলাম, তা নিছক পেশাগত সতর্কতা ছিল না; ছিল এক গভীর, নাম-না-জানা উৎকণ্ঠা। ততক্ষণে খবর এসে গেছে, আসিফ মাহমুদ ৫ বা ৬ তারিখে ‘লং মার্চে’র ডাক দিয়েছেন।
কিন্তু এই ঘোষণার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যা ঘটছিল, তা কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল না। আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছিলেন, আর পুলিশও একের পর এক জায়গায় গুলি ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছিল। ৫ তারিখের কর্মসূচিকে আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল বলেই একটা ভয় কুরে কুরে খাচ্ছিল— তারা হয়তো শেষ চেষ্টা হিসেবে সবচেয়ে বড় আঘাতটাই হানবে।
রাত যত গভীর হচ্ছিল, ইঙ্গিতগুলো তত স্পষ্ট হচ্ছিল। বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উস্কানিমূলক স্লোগান দিতে দেখা যাচ্ছিল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে দলটির নেতাকর্মীরা রাতের অন্ধকারে ঢাকায় ঢুকছেন— এমন খবরও একের পর এক আসছিল। তাদের আচরণে একটা প্রকাশ্য জেদ ছিল, যেন পরদিন আন্দোলনকারীদের চূড়ান্তভাবে প্রতিহত করে দেবেন। সেই রাতে সাংবাদিক মহলে যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল, তার তুলনা খুব কম সময়ের সঙ্গেই চলে। কেউ ঘুমাননি বললেই চলে— সবাই অপেক্ষা করছিলেন, না জেনেই কীসের জন্য অপেক্ষা করছেন।
ভোর হতে না হতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম কেরানীগঞ্জের পথে। এলাকা ঘুরে যা দেখলাম, তাতে বুকের ভেতরটা আরও দমে গেল। মোড়ে মোড়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়ে বসে আছেন। সাধারণ মানুষের বের হওয়ার কোনো উপায় নেই— রাস্তাগুলো যেন হঠাৎ করেই অচেনা হয়ে গেছে।
কদমতলী পৌঁছাতেই পুলিশ পথ আটকাল। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও উত্তর এলো, ‘আমরা ছেড়ে দিলেও সামনে যেতে পারবেন না।’ আমি শুধু বললাম, ‘ঠিক আছে, আমারটা আমি দেখব, আপনারা আমাকে যেতে দিন।’ সেই মুহূর্তে ওই একটি লাইনের মধ্যেই যেন গোটা দিনের ঝুঁকিটা ঘনীভূত হয়ে ছিল।
বাবুবাজার সেতুর কেরানীগঞ্জ প্রান্তে পৌঁছে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা আজও চোখ বুজলে ভেসে ওঠে। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের নেতৃত্বে প্রায় হাজারখানেক সশস্ত্র লোক অবস্থান নিয়েছিলেন সেখানে। কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র, কারও হাতে ধারালো অস্ত্র, আবার কারও হাতে পিস্তল কিংবা শর্টগান। এই একটি দৃশ্যই যথেষ্ট ছিল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে কী রকম থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। রাজধানীর দিকে তাকিয়ে থাকা সেই অস্ত্রধারী সারি যেন একটা প্রতীক্ষার মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল— কীসের প্রতীক্ষা, তখনও স্পষ্ট নয়।
দুপুরের দিকে হঠাৎ একটি ঘোষণা এলো— সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। তখনও প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল শেখ হাসিনা। তাই প্রশ্নটা এড়ানো গেল না— সেনাপ্রধান কেন ভাষণ দেবেন? এই একটি প্রশ্নের ভেতর দিয়েই যেন একটা ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠল সবার মনে— হয়তো সরকার পতনের মুখে। কিছুক্ষণ পরই খবর এলো, ভাষণ পিছিয়ে গেছে। তখন বোঝা গেল, পর্দার আড়ালে কোনো সমঝোতা বা আলোচনা চলছে। কিন্তু পতন যে আসন্ন, তা নিয়ে সংশয় কমে এলো, বাড়ল অপেক্ষার তীব্রতা।
এই সময়টায় সেতুর ওপারে খবর সংগ্রহে যাওয়া সহকর্মীরা একে একে ফিরে আসতে শুরু করলেন। তাদের মুখে যা শুনলাম, তা রীতিমতো নারকীয়। অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। পুলিশ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের তাণ্ডব তখনও চরমে। বিভিন্ন জায়গা থেকে হামলা আর সহিংসতার খবর একটার পর একটা আসছিল, আর প্রতিটি খবর যেন আগেরটার চেয়ে ভারী হয়ে চেপে বসছিল বুকে।
আনুমানিক দুপুর দুটোর দিকে দৃশ্যটা হঠাৎ বদলে গেল। সেতুর মোড়ে অবস্থান নেওয়া সশস্ত্র লোকগুলো ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে হঠাৎই এলাকা ছাড়তে শুরু করল। তাদের হাঁটার ধরনেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল— তারা পালাচ্ছেন। কোথায় যাচ্ছেন, জিজ্ঞেস করলেও কেউ কোনো জবাব দিলেন না; শুধু দ্রুত পায়ে জায়গা ছেড়ে চলে গেলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরটা নিশ্চিত হলো— শেখ হাসিনার পতন ঘটেছে। যে মুহূর্তটার জন্য সারা রাত-দিন এত উৎকণ্ঠা, সেটা শেষ পর্যন্ত এসে গেল এক নিঃশব্দ পলায়নের মধ্য দিয়ে।
খবরটা কানে আসামাত্র বাইক ঘুরিয়ে ছুটলাম টিএসসির দিকে। পথে যা দেখলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সব বয়স আর শ্রেণির মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায়। চারদিকে মিছিল, উল্লাস, একটা উৎসবের আবহ। মনে হচ্ছিল, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর মানুষ যেভাবে হাসিমুখে সড়কে নেমে এসেছিল, ঠিক তেমনই একটা ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছি নিজের চোখে।
টিএসসিতে পৌঁছে দেখি হাজার হাজার মানুষের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। মনে হচ্ছিল, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কোনো জাতীয় উৎসব পালিত হচ্ছে সেখানে। ঠিক সেই সময়ই ঘটল সেই আলোচিত মুহূর্ত— মেট্রোরেলের পিলারে সাঁটা শেখ হাসিনার ছবিতে জুতা মারা হলো।
ততক্ষণে গণভবনেও নেমেছে জনতার ঢল, যদিও শেখ হাসিনা তার আগেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। যে ক্ষমতা কিছুদিন আগেও অটুট মনে হচ্ছিল, তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল। আর সেই শূন্যতাই যেন সেদিনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে উঠল।
সন্ধ্যা নামতে নামতে আবার কেরানীগঞ্জের দিকে ফিরলাম। কিন্তু এবার যে পরিবেশ চোখে পড়ল, তা সকালের সঙ্গে মিলছিল না কিছুতেই। একটা অদ্ভুত, ভুতুড়ে নীরবতা যেন গ্রাস করেছে গোটা এলাকা। খবর এলো, প্রেস ক্লাবে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। রডের কারখানা আর শিটের গুদামে ট্রাক-পিকআপ নিয়ে এসে প্রকাশ্যে লুটপাট চলছে। রাস্তায় পুড়ে যাওয়া গাড়ি থেকে কুপিয়ে লোহা খুলে নিচ্ছে একদল সুবিধাবাদী মানুষ। একদিকে কেউ প্রতিশোধ নিচ্ছে, অন্যদিকে কেউ ব্যস্ত দখল আর লুটে। সরকার নেই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্তিত্ব নেই— সেই রাতে যেন কোনো অভিভাবকই ছিল না শহরের।
এই বৈপরীত্যটাই আজও সবচেয়ে বেশি মনে থেকে গেছে। একদিকে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান, স্বাধীনতার আনন্দ; অন্যদিকে নৈরাজ্য আর আইনশৃঙ্খলার ভেঙে পড়া। দুটি বাস্তবতা একই শহরে, একই রাতে, পাশাপাশি ঘটে যাচ্ছিল।
৫ আগস্ট রাতের সেই এক ধরনের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পরিস্থিতি একটা চাপা শঙ্কা তৈরি করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশেই যা দেখেছিলাম— দেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে ওঠা সেই অবর্ণনীয় আনন্দ— তা ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম।
দুই বছর পরও সেই দুটি ছবি একসঙ্গে মনে ভাসে— আগুনে পোড়া রাস্তা আর টিএসসির উল্লাস, ভয় আর মুক্তি— একই দিনের দুই মুখ।

আজ ৫ আগস্ট ২০২৬। সেই দুপুরের ঠিক দুই বছর পর। যে মিছিল সেদিন শাহবাগ, শহিদ মিনার আর যমুনার সামনের রাস্তায় থেমে গিয়েছিল আনন্দ-উল্লাসে, তার পায়ের শব্দ আজও যেন মিলিয়ে যায়নি। বদলেছে সরকার, বদলেছে সংসদ, বদলেছে রাষ্ট্রের নথিপত্র। কিন্তু সেই দিনের প্রশ্নগুলো এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
৫ দিন আগে
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, রক্তক্ষয় এবং দেশ জুড়ে অশান্তির পর ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।
৫ দিন আগে
বাংলাদেশ আজ আর সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নয়; বরং উদীয়মান একটি আঞ্চলিক অর্থনীতি। সেই বাস্তবতার আলোকে কূটনীতিও হতে হবে আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে, কিন্তু কারও প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে, বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অটু
৬ দিন আগে
মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে মাছে প্রবেশ করে? নদীতে ফেলা প্লাস্টিক সূর্যের আলো, তাপ, ঢেউ ও ঘর্ষণের ফলে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে যায়। প্ল্যাংকটন, চিংড়ি, শামুক এবং ছোট মাছ এগুলো খাদ্য ভেবে গ্রহণ করে। পরে বড় মাছ সেই ছোট মাছ খায়।
৯ দিন আগে