নারী নয়, প্রশ্ন হোক নিয়োগের যোগ্যতা নিয়ে

নাহিদ আক্তার
আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ১০

কাজী জেসিনকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বিটিভির ইতিহাসে তিনি দ্বিতীয় নারী মহাপরিচালক। তার নিয়োগের খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা আমাদের জনপরিসরের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি— উভয়কেই বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

আমি মনে করি, এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আপনি কাজী জেসিনের নিয়োগের সমালোচনা করতেই পারেন। বলতে পারেন, তিনি এই পদের জন্য যোগ্য নন। বলতে পারেন, এটি একটি দলীয় বা রাজনৈতিক নিয়োগ। তার শিক্ষাগত যোগ‍্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা কিংবা এই পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে কঠোর সমালোচনা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক চর্চা।

বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি সরকারই কমবেশি এই চর্চা করেছে। ফলে বর্তমান সরকারের এই নিয়োগনীতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা, সমালোচনা করা কিংবা আরও স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগপ্রক্রিয়ার দাবি জানানো— এসবই গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অংশ।

কিন্তু সেই সমালোচনা কখনোই একজন নারীর বিরুদ্ধে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, অশ্লীল বা চরিত্রহননমূলক ভাষায় পরিণত হতে পারে না।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কাজী জেসিনের যোগ্যতা নিয়ে যুক্তি উপস্থাপনের পরিবর্তে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে— তিনি কার সঙ্গে ‘ঘুমিয়েছেন’, কাকে ‘খুশি করেছেন’ বা কীভাবে এই পদ পেয়েছেন। এসব মন্তব্য কোনোভাবেই রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, এগুলো নারীবিদ্বেষের প্রকাশ।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অর্জনকে প্রায়ই তার মেধা, শ্রম বা পেশাগত সক্ষমতার ফল হিসেবে দেখা হয় না। ধরে নেওয়া হয়, কোনো পুরুষের অনুগ্রহ বা যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেই তিনি সফল হয়েছেন। এই মানসিকতা কেবল একজন নারীকে অপমান করে না, এটি কর্মক্ষেত্রে থাকা প্রতিটি নারীর অর্জনকেই সন্দেহের চোখে দেখতে শেখায়।

লক্ষ্যণীয়, একই ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো পুরুষকে সাধারণত তার দলীয় পরিচয়, আনুগত্য বা দক্ষতার ভিত্তিতে বিচার করা হয়। কিন্তু একজন নারীকে বিচার করা হয় তার শরীর, ব্যক্তিগত জীবন ও যৌনতা দিয়ে। এই দ্বৈত মানদণ্ডই পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার অন্যতম প্রকাশ।

এই সরকারের দলীয়করণ নীতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কাজী জেসিনের নিয়োগের বিরোধিতা করা যেতে পারে। তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। এমনকি এই নিয়োগ বাতিলের দাবিও তোলা যেতে পারে। কিন্তু একজন নারী হিসেবে তার বিরুদ্ধে একটি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দও ব্যবহার করা যায় না।

বারবার এ ধরনের ভাষা ব্যবহার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এ দেশের মানুষের নৈতিক অবক্ষয় কতটা নিচে নেমেছে। যুক্তিনির্ভর ও শালীন সমালোচনা আমরা জাতি হিসেবে এখনো পুরোপুরি শিখতে পারিনি।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো নিয়োগের বৈধতা, যোগ্যতা বা রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে সমালোচনা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। গণতান্ত্রিক ও যুক্তিনির্ভর সমালোচনা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা, নীতি ও সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, তা কখনো লিঙ্গবিদ্বেষী বা চরিত্রহননমূলক ভাষার ওপর নির্ভর করে না। যোগ্যতার প্রশ্ন রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বিষয়।

কিন্তু সেই সমালোচনা যখন যৌন ইঙ্গিত, চরিত্রহনন বা লিঙ্গভিত্তিক অপমানের আশ্রয় নেয়, তখন তা আর যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সমালোচনা থাকে না; বরং পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক মানসিকতার পুনরুৎপাদনে পরিণত হয়।

লেখক: শিক্ষক ও সমাজবিশ্লেষক

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ, উত্তরণে প্রয়োজন অর্থনীতি-রাজনীতির সমন্বিত কৌশল

একটি নবনির্বাচিত বা নতুন গঠিত সরকারের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার নানাবিধ সংকট ও চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পথচলা নিছক রুটিন রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়; বরং এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানো, গণআকাঙ্ক্ষা রক্ষা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুত্থানের এক কঠিন পর

১৭ দিন আগে

সাংঘর্ষিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা স্পষ্ট করা দরকার— আমি রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা আন্দোলনকে অন্যায় বলছি না। আমার মূল যুক্তিটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে— রাজপথকে যদি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাখা হয়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

২০ দিন আগে

খাদ্য নিরাপত্তা— নতুন নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা

মানুষের জীবনে কিছু প্রয়োজন আছে, যেগুলো নিয়ে কোনো আপস চলে না। খাদ্য তার প্রথম সারিতে। সকালে শ্রমজীবী মানুষের নাশতার রুটি, দুপুরে পরিবারের ভাতের হাঁড়ি, কৃষকের গোলায় ধান কিংবা দুর্যোগে অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া খাদ্যসহায়তা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। সেই ব্যবস্থাপনার কেন

২২ দিন আগে

পিংক বাস: একটি রঙ, একটি পরিবর্তন ও অনেক প্রশ্ন

বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ঢাকার রাস্তায় যখন নারী চালক, নারী সহকারী আর নারী যাত্রীদের নিয়ে বাস চলছে, তখন সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এই ভালো লাগার ভেতরেই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, যে প্রশ্নগুলো শুধু বাসের রং নিয়ে নয়, বরং আ

২৩ দিন আগে
Advertisement