কোন পথে জাতীয় পার্টি?

ডয়চে ভেলে
ঘোষণা দিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার কাকরাইলে জাতীয় পার্টির অফিসে হামলা চালানো হয়। ছবি : ডয়চে ভেলে

বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে জাতীয় পার্টি। দলটি শেষপর্যন্ত রাজনীতি করতে পারবে কি-না, তা নিয়ে দলের নেতারা চিন্তিত। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর জানিয়েছে, দেশে এখনও কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা ও শ্রমিক আন্দোলন ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদের’ সহযোগী হিসাবে দলটিকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে। আর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘আমরা মনে করি নিষিদ্ধ হবে বিচারের মাধ্যমে। তবে তার আগে আমরা জাতীয় পার্টির কার্যক্রম স্থগিত করার দাবি জানিয়েছি সরকারের কাছে।’

ঘোষণা দিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার কাকরাইলে জাতীয় পার্টির অফিসে হামলা চালানো হয়। এ সময় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। প্রথম দফায় জাতীয় পার্টির লোকজন ওই হামলা প্রতিরোধ করতে পারলেও রাত সাড়ে ৮টার দিকে দুইজন সমন্বয়ক ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদের নিয়ে সেখানে যান।

দ্বিতীয় দফায় হামলা ও আগুনের সময় ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকেও সেখানে আগুন নেভাতে দেয়া হয়নি। আর পুলিশ ছিলো পুরোপুরি নিস্ক্রিয়। আর শনিবার জাতীয় পার্টি কাকরাইল এলাকায় সমাবেশ ডেকেও তা প্রত্যাহার করে পুলিশের নিষেধাজ্ঞার কারণে। পুলিশ শনিবার ওই এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা ও শ্রমিক আন্দোলন নগরীর অন্য এলাকায় জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবিতে সমাবেশ করেছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদ বলেন, ‘হামলাকে আমরা সমর্থন করি না৷ তবে ফেসবুক পোস্ট দিয়ে যে সমন্বয়কেরা গেছেন, সেটা আমাদের আন্দোলনেরই অংশ৷ তারা স্বৈরাচার ফ্যাসিবাদের দোসর ছিল। তাই ঘেরাও করা আন্দোলনেরই অংশ। আমরা আগুন বা হামলা সমর্থন করি না। তবে ওই হামলা ও আগুনের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ তারা গেছে রাত সাড়ে ৮টার পরে৷ তার আগেই হামলা ও আগুনের ঘটনা ঘটেছে।’

তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে কি-না, তা দেশের মানুষই সিদ্ধান্ত নেবে৷ তাদের বিচার হবে৷ তবে বিচার শেষ হওয়ার আগে আমরা তাদের দলের কার্যক্রম স্থগিত করার আবেদন জানিয়েছি সরকারের কাছে।’

আর প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার জানান, ‘কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেই। কোনো দলকে নিষিদ্ধও করা হয়নি। একটি ছাত্র সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’

রাজনৈতিক দলগুলো কী বলছে?

বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘জাতীয় পার্টি একটি স্বৈরাচারি দল৷ তাদের জন্ম স্বৈরাচারি কায়দায়৷ আর তারা স্বৈরাচারকে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে৷ এই দলটি সম্পর্কে দেশের মানুষই সিদ্ধান্ত নেবে যে তারা রাজনীতি করতে পারবে কী পারবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আর আমাদের সংবিধানে সভা-সমাবেশ করার অধিকার দেয়া আছে৷ জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে৷ তার মানে এই নয় যে, কোনো একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হবে বা তার রাজনীতি করার অধিকার নেই।’

আর জাতীয় পার্টি অফিসে হামলা ও আগুন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা তো একটা ফ্যাসিবাদি আক্রমণ। যে ঘোষণা করে, ঘটা করে একটি রাজনৈতিক দলের অফিসে আক্রমণ এবং আগুন দেয়া হয়েছে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা মনে করি, আমরা যে ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আছি এর মাধ্যমে সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

গণ অধিকার পরিষদের প্রধান নুরুল হক নুর বলেন, ‘আমরা কোনো ধরনের হামলা, সহিংসতা ও মব জাস্টিসকে সমর্থন করি না। আমরা মনে করি, এখন একটা সরকার আছে৷ সেই অবস্থায় যদি এরকম করা হয় তাহলে দেশে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা হবে। আর জাতীয় পার্টি অফিসে কারা হামলা করেছে, নিজেরাই করেছে কি-না তার তদন্ত হওয়া দরকার।’

তিনি বলেন, ‘তবে যারা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর এবং সহযোগী ছিলো তাদের নিষিদ্ধের দাবি জানাই আমরা।’ এদিকে, ঢাকায় এক আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘দেশের কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নয় বিএনপি। দেশে অযথা ইস্যু তৈরি করে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে৷ বাংলাদেশকে ঘিরে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় দেশের জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।’

আর কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাঙচুর থেকে বিরত থাকতে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে সব দলকে আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টিকে আমি কোনো বিধিবদ্ধ রাজনৈতিক দল মনে করি না। স্বৈরাচারী উপায়ে এর জন্ম হয়েছে। পরে স্বৈরাচারের সহযোগী হয়েছে। আর আসলে তাদের কার্যালয়ে হামলা না বলে আমি দুই পক্ষের সংঘর্ষ বলব। আর এতে জাতীয় পার্টির উসকানি ছিল। আমি মনে করি, পুলিশ প্রশাসন শনিবার তাদের সমাবেশ করতে না দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

কী ভাবছে জাতীয় পার্টি?

জাতীয় পার্টি ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে দাওয়াত পেলেও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার কোনো সংলাপেই তাদের ডাকা হয়নি৷ আওয়ামী লীগের সহযোগী ১৩ দলও ডাক পায়নি৷ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল।

কয়েকদিন আগে রংপুরে দুই সমন্বয়কের সফরের সময় প্রতিরোধের ডাক দেয় জাতীয় পার্টি৷ এরপর তারা ঢাকায় শনিবারের সমাবেশের কর্মসূচি দিলে বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় পার্টি অফিসে হামলা ও আগুনের ঘটনা ঘটে৷ তারপরও তারা শনিবার সমাবেশের ব্যাপারে অনড় ছিল। কিন্তু পুলিশের নিষেধাজ্ঞার পর তারা সমাবেশ বাতিল করে।

এ প্রসঙ্গে আইনের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বললেও আসলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানান জাতীয় পার্টির কয়েকজন নেতা৷ তারা বলেন, ‘হামলার প্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া দেখে তারা পরের অবস্থান নেবেন।’

জাতীয় পার্টির অতিরিক্ত মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পটোয়ারী বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি, এই কারণে আমাদের নিষিদ্ধ করা হবে ছাত্রদের দাবীর মুখে তা হতে পারে না। সংবিধান এবং আইনে কারা সংগঠন করতে পারবে এবং দল করতে পারবে তা স্পষ্ট বলা আছে। সন্ত্রাসী কাজের জন্য, জঙ্গি তৎপরতার জন্য নিষিদ্ধ করা যায়৷ জাতীয় পার্টি কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন নয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দলীয় কার্যালয়ে হামলার সময় পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিরোধে যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, তা রাখতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া দরকার ছিল। মামলা করার জন্য আমাদের লোক গেছে। কিন্তু এখনও পুলিশ মামলা নেয়নি। এখানে ঘোষণা দিয়ে হামলা করা হয়েছে। সুতরাং কারা হামলা করেছে তা স্পষ্ট। সরকার চাইলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।’

শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘জাতীয় পার্টি তার গণতান্ত্রিক রাজনীতি অব্যাহত রাখবে। ঘোষণা দিয়ে হামলা, রাজনীতি নিষিদ্ধ করা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না।’

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ছয় শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ছয়শো শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

বর্তমান সরকার হাম প্রতিরোধে সকল ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় না। তাহলে এক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে বাধা কোথায়? হামে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় না আনা হলে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব

৪ দিন আগে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুষ্টু লোক, স্বাস্থ‍্যমন্ত্রীর কোটি টাকা ও মিরাকল প্রতিমন্ত্রী

সাম্প্রতিক সময়ের তিনটি আলোচিত ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি দৃশ্য। চরিত্র আলাদা, সংলাপ আলাদা, কিন্তু প্রশ্ন একটাই— প্রকৃত সত্য কী? সবটাই যে সত্য, তা নয়। আবার সবটাই যে মিথ্যা, সেটিও বলা যায় না। আর এই ধূসর অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয় জনবিশ্বাসের।

৫ দিন আগে

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

১০ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১২ দিন আগে