
ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

আমি একবার লিখেছিলাম, আমরা সৌভাগ্যবান ও অতুলনীয় জাতি, কেননা আমাদের আছে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস। ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। সেই স্বাধীনতাটা কীভাবে এলো?
প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় পাকিস্তান জন্মের পরপরই। প্রথমে এমন কথা উচ্চারণ বিপজ্জনক ছিল বলেই এ দেশের মানুষকে প্রথমে ভাষা আন্দোলন ও তারপর স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। একপর্যায়ে স্বায়ত্তশাসনের ধারণাটি স্বাধীনতার ধারণায় পর্যবসিত হয়। তাই পাকিস্তানের ২৩ বছরের সময়কালের সব আন্দোলন-সংগ্রামকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা অসঙ্গত নয়।
এই স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সাংবিধানিকভাবে তাই ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বিভিন্ন কণ্ঠে পুনরুচ্চারিত হয়েছে এবং এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে আমরা সবাই গ্রহণ করেছি।
২৬ মার্চ থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না, যদি না পাকিস্তানিরা আমাদের মাটিতে জেঁকে বসে না থাকত। আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে উচ্ছেদ করার জন্যই মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। ৯ মাসের গেরিলা যুদ্ধ ও সশস্ত্র গতানুগতিক যুদ্ধে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব সমাপ্ত করি এবং সাংবিধানিকভাবে তার স্বীকৃতিও মিলেছে। তাই ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস।
ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামকে স্বাধীনতা যুদ্ধ বলার যৌক্তিক বা সাংবিধানিক ভিত্তি যেমন নেই, তেমনি ১৬ ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস বলারও যৌক্তিকতা বা সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। তবু আমাদের দেশে এক শ্রেণির মানুষ জেনেশুনে দুটোকে এক করে দেখতে প্রয়াসী। তারা সাংবিধানিকভাবে দুটোকে এক করার প্রয়াসে ব্যর্থ হলেও তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
আমাদের দেশে আরও এক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা কথায়-কাজে দুটোর ফারাক বোঝেন না। তাই কেউ সজ্ঞানে, কেউ অজ্ঞানে, কেউ চেতনাহীনতার কারণে সাংবিধানিকভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া ও ঐতিহাসিকভাবে দুটো স্বীকৃত দিবসকে এক করে দেখেন।
একটা গল্প বলি—
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছি। বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আমাদের তদানীন্তন অধিভুক্ত কলেজ জগন্নাথ কলেজে মৌখিক পরীক্ষা নিতে যেতে হতো। বহু দিন আগে থেকেই আমরা মজা করে সেই কলেজটির নাম দিয়েছিলাম ‘জগ বাবুর পাঠশালা’। কলেজ হোক আর পাঠশালা হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন তাকে অধিভুক্ত করেছে তখন তার নিম্নগামিতা রোধ আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ছিল। সে কারণে মৌখিক পরীক্ষায় করুণা কিংবা নমনীয়তা আমার ব্যক্তিগত নীতি-নৈতিকতার বাইরে ছিল।
একবার ভাইভা নিতে গিয়ে বুঝলাম, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি প্রশ্নবোধক। তাই আমি তাদের ‘ব্যবস্থাপনা’র ওপর নয়, সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। এক শিক্ষার্থীর প্রতি আমার প্রশ্ন— ‘আমাদের স্বাধীনতা দিবস কবে?’ ছেলেটি উসখুস করছিল। প্রশ্নের জবাব দিতে বিলম্ব হওয়ায় তার বিভাগীয় প্রধান কনুই দিয়ে গুতো মেরে বললেন, ‘বল, ১৬ ডিসেম্বর’!
আমি বিস্মিত। ছাত্রজীবনে ওই বিভাগীয় প্রধান আমাদের প্রবণতা ও চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাই তাকে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বলে শ্রেণিবদ্ধ করার অবকাশ ছিল না। বুঝলাম, ব্যাপারটি ধারণাগত; এর ভিত্তিটা হলো জ্ঞানের অভাব। আমি তাকে বুঝিয়ে বলায় তিনি আমার ব্যাখ্যাকে পরবর্তী জীবনেও ধারণ করেছিলেন। এখনো জ্ঞানের অভাবে অনেকেই স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের ফারাক গুলিয়ে ফেলতে পারেন।
অনেকেই শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু নাও বলতে পারেন, কিংবা বিজয়ের মাসে সদম্ভে তাকে বিশ্বাসঘাতক বলতে পারেন, বা বিজয় দিবসকে অস্বীকার নাও করতে পারেন। কেননা এ বিজয় তার মনস্তাত্ত্বিক বেদনার উদ্রেক করলেও তার বৈষয়িক সমৃদ্ধি এ কারণেই ঘটেছে। তিনি হয়তো আজও পাকিস্তানে বিশ্বাসী এবং পাকিস্তানের দ্বিজাতি তত্ত্বেও বিশ্বাসী। দ্বিজাতি তত্ত্বের অনুরাগীরা আজও বিশ্বাস করেন, মুসলমান একটি জাতি এবং তারা শাসিত হবেন কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাব যদি তারা প্রমাণ করতে পারেন যে পাকিস্তান কোরআন ও সুন্নাহর শাসনে নিবেদিত ছিল এবং পাকিস্তান (বাকিস্তান) এখনো কোরআন ও সুন্নাহর শাসনে নিয়োজিত।
যাক, এ প্রসঙ্গটি নিয়ে পরে আলোচনা করব। পাকিস্তান তৈরির লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের জন্য আবাস ও মুসলমানদের আর্থিক সংকট সংকোচন বা তা দূরীকরণ নিশ্চিত করার জন্য নীতি, পলিসি ও কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। বাঙালি মুসলমানরা হিন্দু জমিদার, মহাজন, ব্যবসায়ী ও বেনিয়াদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তানি ভূস্বামী, ব্যবসায়ী ও বেনিয়াদের কবলে আত্মনিবেদন করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল না নব্য সাম্রাজ্যবাদীদের সংরক্ষিত বাজার হওয়া; তবুও তারা তাদের নব্য প্রভুদের জালে আবদ্ধ হলো।
তারা দেখল, ধীরে ধীরে এসবই তাদেরকে গ্রাস করছে। তখন প্রথমে সেটা ঠেকাতে স্বায়ত্তশাসন ও পরে স্বাধীনতার দিকে পা ফেলা শুরু করল। শেখ মুজিব সেই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকে শুরু করে পাকিস্তানের পরিসমাপ্তির দিনটি পর্যন্ত বাঙালির দেশ বাংলাদেশের জন্মে একান্তই ব্রতী ছিলেন।
তবে বাংলার স্বাধীনতা টেবিল টকে, কলমের খোঁচায় বা মুরব্বির মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-শোষক ও দুর্বৃত্তরা মুসলমান পরিচয়ে তাদের পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের ভাই-বোনদের নারকীয় হত্যা না করে, ধর্ষণ না করে, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে না দিয়ে, তাদের ভূমি তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে পারত। তাতে প্রথমত পাকিস্তান কলঙ্কিত হতো না (বাকিস্তান হয়ে যেত না), ইসলাম কলঙ্কিত হতো না, মানবিকতা ধর্ষণের শিকার হতো না, মানুষ বিমুখ হতো না এবং এই অঞ্চলে তাদের কিছু বশংবদ তৈরি হতো না, যারা আজও পাকিস্তান ফিরিয়ে আনতে বৃথা আস্ফালন করছে।
পাকিস্তান ক্রমাগত পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ পর্যন্ত ঠেলে দিয়েছিল। সে দিন বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ভাষায় একবার নয়, দুবার স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। বক্তৃতা শুরুর কিছু পরেই তিনি স্বাধীনতার কথা বলেন, আর বক্তৃতা শেষের আগে বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমার মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সেই ১৯৪৭ সাল থেকে একাত্তরের ৬ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানে যা যা ঘটেছে তার বর্ণনার পর তার যৌক্তিক উচ্চারণ— ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
প্রথম ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করলেন, তার ঘোষণা তো একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে গেল, যার পরিণতি নাইজেরিয়ার বায়াফ্রার মতো হতে পারে। পাকিস্তান এখনই তার ও তার মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তখন তিনি সুর নামিয়ে চারটি দাবি পেশ করলেন। আদতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে হানাদার বা দখলদার বাহিনীকে তাদের দেশে পাঠাবার পথটি খোলা রেখেছিলেন।
একই সঙ্গে নিজের মুসলমান পরিচয় ও পাকিস্তানিদের মুসলমান মেনেই তিনি বলেছিলেন ‘তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাক, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।’ তবে ‘আর যদি একটি গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের মতো রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব।’
অর্থাৎ সেই ৭ মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণাটি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং আশা করেছিলেন, পাকিস্তানিরা নিজেদের গুটিয়ে ব্যারাকে আশ্রয় নেবে। তিনি সেদিন যুদ্ধের হুকুম দেননি। পাকিস্তানিরা উলটো ব্যারাক ছেড়ে আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিলো। তা না হলে আমাদের স্বাধীনতা দিবস হতো ৭ মার্চ। স্বতন্ত্র কোনো বিজয় দিবসের প্রতীক্ষায় থাকতে হতো না। সেদিনই স্বাধীনতা কার্যকর হতো এবং দখলদারদের শান্তিপূর্ণ পন্থায় তাদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা হতো।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতার পর তারই ৩৫টি নির্দেশে সারা দেশ চলতে থাকে। দলে দলে বাঙালিরা তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। সেক্রেটারিয়েটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার ৩২ নম্বর ভবন থেকে নির্দেশ নিয়ে তা আক্ষরিকভাবে পালন শুরু করেন। পুলিশের প্রধান বলতে গেলে তার স্থায়ী অফিস ৩২ নম্বরে পেতে বসেন। আনসার, ইপিআর ও মুজাহিদ বাহিনী তার কাছে আনুগত্য প্রকাশ করে। পশ্চিমের দিকে অর্থপাচার ও সম্পদ পাচার বন্ধ হয়ে যায়। সব মিলিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান যেভাবে রাষ্ট্রাচার পালন করেন, বঙ্গবন্ধুও সেভাবে করতে থাকেন।
পাকিস্তান টেলিভিশন ও বেতারের নবনাম দেওয়া হয়, বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয় এবং জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ যেখানে প্রয়োজন সেখানেই গাওয়া হয়। বিদেশিরা, এমনকি পাকিস্তানিরাও বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে আসে। ৩২ নম্বর হয়ে ওঠে ব্রিটেনের ডাউনিং স্ট্রিটের মতো, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
একমাত্র সেনানিবাস ও বিদেশি দুয়েকটি দূতাবাসের কার্যালয় ছাড়া বাংলাদেশ চৌহদ্দিভুক্ত আর সব স্থাপনা বঙ্গবন্ধুর কর্তৃত্বের আওতায় চলে আসে। সব লক্ষণই বলে দেয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায় ৭ মার্চ। শুধু অপেক্ষা— পাকিস্তানিরা তাদের জীবন-সম্পদ নিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিদায় নেবে।
কিন্তু ঘটনা ঘটল ভিন্নতর। তারা ২৫ মার্চ একটি জাতিসত্তাকে নির্মূলের সব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি চূড়ান্ত করে আঘাত হানে। প্রতিঘাত হিসেবে যুদ্ধ ব্যতীত আর কী করা যায়? তাই বঙ্গবন্ধু এবারে যুদ্ধের হুকুম দিয়ে বসেন। এতে ৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার পুনরাবৃত্তি থাকলেও বাংলা ভাষাভাষী ছাড়াও অন্যদের কাছে ২৫/২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাও যুদ্ধ ঘোষণারূপে পরিচিতি পেয়ে যায়। ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ সন্ধ্যার ভাষণে নিজ মুখে তা স্বীকার করেন। বহু পরে পাকিস্তানিদের শ্বেতপত্রে স্পষ্টই শেখ মুজিবের রাষ্ট্রদ্রোহিতার কথা বলা হয়, বলা হয় তার যুদ্ধ প্রস্তুতি ও যুদ্ধ ঘোষণার ইতিবৃত্ত।
প্রত্যাশার বিপরীতে পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চ পূর্বপ্রস্তুতি সহ সদলবলে ব্যারাক থেকে বের হয়ে একটি জাতিসত্তাকে সম্পূর্ণ নির্মূলের পথ ধরেছিল, আর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার একটি ঘোষণা ইথারে ছড়িয়ে দেন। এ ঘোষণাটি রাত ১২টার কাছাকাছি সময়ে পাকিস্তানের ক্র্যাকডাউনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সজ্ঞানে দেওয়া হয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক পাকিস্তান বেতারের ওয়্যারলেসের কাছাকাছি জায়গা থেকে নিজস্ব ট্রান্সমিটার দিয়ে তা প্রচার করেন। তারপর সে রাতে তিনি দ্বিতীয় একটি ঘোষণা প্রচারের ব্যবস্থা রেখেছিলেন, যা সুবেদার মেজর শওকত আলীসহ অন্যদের প্রয়াসে ছড়িয়ে পড়ে।
তাহলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু অপারেশন সার্চলাইট শুরুর আগে স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি, কোনো একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি, বরং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নেমেছিলেন। এখানে লক্ষ্যণীয়, বঙ্গবন্ধুর ২৫/২৬ মার্চের ঘোষণা দুটিই ইংরেজিতে প্রণীত। তার মানে, এ সব বাংলা ভাষাভাষী বা বাঙালি ছাড়াও সংশ্লিষ্ট অন্যদের জন্য প্রচারিত হয়। বাঙালিদের জন্য ঘোষণাটি ছিল ৭ মার্চে। বাঙালিরা ৭ মার্চকেই স্বাধীনতা দিবস হিসেবেই মেনে নিয়েছিল।
সবার প্রত্যাশা ছিল, এই ঘোষণার পর পাকিস্তানিরা স্বেচ্ছায় এ মাটি ছেড়ে চলে যাবে, পোড়া মাটি নীতি গ্রহণ করবে না কিংবা পুরো জাতিকে নির্মূলে সর্বাত্মক অভিযানে নামবে না। কিন্তু যখন নেমেই গেল, তখন তাকে শুধু প্রতিহত নয়, পরাভূত করতে হবে ও উচ্ছেদ করতে হবে বলেই বাঙালিদের অস্ত্র ধারণ করতে হলো।
আবারও বলছি, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও যুদ্ধের ঘোষণা দেননি। যুদ্ধের ঘোষণা দেন ২৫/২৬ মার্চ মধ্যরাত বা তার পরে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সে কারণেই ২৬ মার্চে বিদ্রোহ করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। অবশ্য সময়ের হিসেবে জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ ও যুদ্ধের ঘোষণার সময়টি ছিল ২৫ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিট। আর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাটি ছিল ২৫ মার্চ রাত ১২টার কাছাকাছি সময়ে এবং দ্বিতীয় ঘোষণাটি ছিল রাত ১টা ৩০ মিনিটের পর। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের দ্বাদশ অনুচ্ছেদে তার উচ্চারণ ছিল, ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে এবং সর্বশেষ ‘জয় বাংলা’ বলে তার বক্তব্য শেষ করেন।
‘ইনশাআল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ যদি চান। তাহলে আল্লাহ চেয়েছেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। একটি সম্পূরক কথা বলছি। ৭ মার্চ ভাষণে তিনি কী বলবেন, তার তাৎপর্য কী হতে পারে— সে সব নিয়ে বহু আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। উপদেশ বা পরামর্শের ঝুড়ি ভরা ছিল। কিন্তু তিনি কী বলবেন, সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হাজী মোর্শেদকে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ আমার মুখ দিয়ে যা বলাবেন, আমি তা-ই বলব।’
আমাদের উপলব্ধি— আল্লাহ চেয়েছিলেন বাঙালি স্বাধীন হোক এবং বঙ্গবন্ধু সেদিন, মানে ৭ মার্চ, আল্লাহর ইচ্ছাতেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানিদের উচ্ছেদের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন হতে পারে, তাই বলেছিলেন, ‘আমি যদি (যুদ্ধের) হুকুম দিবার নাও পারি, তাহলে কী করবে? গেরিলা তৎপরতা দিয়ে শুরু করে যা যা প্রয়োজন, তা দিয়ে দখলদার শত্রুকে বাংলার মাটি থেকে উচ্ছেদের সকল ব্যবস্থা করবে।’
বঙ্গবন্ধুর ভাষ্যে তাহলে আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার দিন দুটি— একটি ৭ মার্চ, আর ২৬ মার্চ অপর দুটি ঘোষণা, যা বাংলার মাটিতে বসবাসকারী দুদেল বান্দাসহ এবং মুখ্যত বিশ্ববাসীর জন্য প্রয়োজন ছিল। কার্যত শেষোক্তরাই আমাদের ভাগ্য নির্ধারণে প্রভাব রেখেছিল। এ কারণে ৭ মার্চের ব্যাপারে কম্প্রোমাইজও করতে হয়েছিল।
বাংলাদেশের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণার আনুষ্ঠানিক বা সাংবিধানিক ঘোষণার দায়িত্ব ছিল তাজউদ্দিন সরকারের। তার কন্যা শারমিন আহমদ বলেন, তার পিতা নাকি ডায়েরিতে লিখেছেন বা পরিবারকে বলেছেন, কিংবা মঈদুল হাসানকে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বলেছেন যে বঙ্গবন্ধু তার অনুরোধ, উপরোধ, পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও স্বাধীনতার কোনো ঘোষণা দেননি।
এ কথার সত্যতা প্রমাণের জন্য শারমিন সেকেন্ডারি তথ্যের সমাহার ঘটিয়েছেন। তিনি অন্তত কিছু লোককে এই বোধ দিয়েছিলেন যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তবে তিনিই আবার উপসংহার টেনেছেন, তার পিতা আনীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর কিংবা কণ্ঠ না দিলেও তার ‘মুজিব কাকু’ যে পৃথকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, তা প্রশ্নাতীত।
সেটা প্রমাণে তিনি প্রাথমিক সত্যানুসন্ধানে নামেন এবং প্রাথমিক ও দ্বৈত তথ্যের ভিত্তিতে তার প্রারম্ভিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটিয়ে তার বইয়ে লিপিবদ্ধ করেন। এবার তিনি বলেন, তার মুজিব কাকু বন্দি হওয়ার আগেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন (পৃ. ১৪৭-১৪৮); যদিও তার বইয়ের প্রথম ভাগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি বলে উল্লেখ করেছিলেন।
একটি আলাদা লেখায় তিনি তার কথার পুনরাবৃত্তি ঘটান। জামালপুরের কোনো এক সভায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শারমিনকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘শেখ মুজিব কোনো স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।’ সুযোগটা পেয়েই শারমিন তার প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা স্বরূপ নিম্নোক্ত নিবন্ধটি প্রথম আলো পত্রিকায় লেখেন—
‘‘বিএনপির সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামালপুরের জনসভায় (২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪) ‘তাজউদ্দিন আহমদ: নেতা ও পিতা’ বইটি থেকে আমার লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে এনেছিলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেননি। তিনি সচেষ্ট থাকেন এ কথা প্রমাণ করতে যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। (ভিডিও বক্তব্যের লিংক: http://www.youtube.com/watch?v=bOev2d0uQ30)।”
‘বক্তব্যে তিনি অনুল্লেখিত রাখেন, আমার বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে উল্লেখিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাকি অংশগুলোর বর্ণনা। বঙ্গবন্ধু আমার বাবা বা দলকে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও তিনি যে ভিন্ন মাধ্যমে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা তথ্য ও সাক্ষাৎকারসহ আমার বইয়ে স্পষ্ট উল্লেখিত (তাজউদ্দিন আহমদ: নেতা ও পিতা, পৃ. ১৪৭-১৪৮, ২৭৪-২৯১, ৩০১-৩১০) আছে।’
শারমিন আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার বার্তা পাঠিয়েছিলেন, তার একমাত্র জীবিত সাক্ষী (অবশ্য এখন তিনি প্রয়াত) বঙ্গবন্ধুর পারসোনাল এইড হাজি গোলাম মোরশেদ, যিনি ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার হন, তার এবং প্রকৌশলী শহীদ নূরুল হক, যিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে খুলনা থেকে ট্রান্সমিটার এনেছিলেন ঘোষণা দেওয়ার জন্য— তার স্ত্রীর সাক্ষাৎকার আমার বইয়ে ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে।’
‘বইয়ে আরও উল্লেখিত যে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে ২৬ মার্চ দুপুরে এবং সেই সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন (পৃ. ১৪৭) এবং ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে পরবর্তী ঘোষণা দেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান (পৃ. ৭১ ও ১৪৭)।’
“আরও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, যা বইয়ে ব্যারিস্টার আমীরউল ইসলামের সাক্ষাৎকারে উদ্ধৃত হয়েছে, তা হলো— ‘অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। অতএব, ওই দিন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা কার্যকর হবে।’ (পৃ. ২৭১, প্রথম আলো, ১৩/১০/২০১৪)।”
‘তাজউদ্দিন আহমদ সীমান্ত অতিক্রমের পূর্বেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছিলেন। তাজউদ্দিন আহমদ আরও জেনেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু কেবল স্বাধীনতার ঘোষণা নয়, তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করে সরকার গঠন করেছেন; কিন্তু একটি বিভ্রান্তির কবলে পড়ে সীমান্ত অতিক্রম করে যুদ্ধে জড়িত হতে চেয়েও সফল হননি। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কথাও ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিজ গৃহে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল তাজউদ্দিনের পরামর্শজাত, যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং বঙ্গবন্ধু নিজ গৃহে থেকে বন্দি হয়ে যান। তবে তিনি সরকার কাঠামো ও যুদ্ধ পরিচালনায় যুবা ও তরুণদের দায়িত্ব দিয়েও ইন্দিরা গান্ধীকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন।’
আগেই বলেছি, বন্দি হওয়ার আগেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক শক্তিশালী ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচার করেন। সে ঘোষণাটি একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না। আগেই বলেছি, তাজউদ্দিন আহমদ ও আমীরউল ইসলাম তথা মুহম্মদ আলী ও রহমত আলী ছদ্মনামে সীমান্ত অতিক্রমের পূর্বেই বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার কথা জেনেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর কথা তাদের শিরোধার্য ছিল। তাই তাজউদ্দিন তার ১০ এপ্রিলের ভাষণে এবং মুজিবনগর সরকারের অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে ২৬ মার্চকেই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সেই আইনি স্বীকৃতির কারণে কিংবা বঙ্গবন্ধুর শেষ মুহূর্তের ইচ্ছা বা অভিপ্রায়কে বলবৎ রাখার জন্যই এবং একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার অপবাদ থেকে পরিত্রাণের জন্যই ২৬ মার্চই আমাদের স্বাধীনতা দিবস।
সবাই জানত, ৭ মার্চে সংসদ অধিবেশন স্থগিতের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া নাজায়েজ হলেও শেষ রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চ একটি জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও বিকাশের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা অনিবার্য ছিল।
তবে পাকিস্তানিরা যদি বাস্তবতা বিচার করে খাঁটি মুসলমানদের ন্যায় কিংবা আইয়ুব খান বা এম এস আহমদের পরামর্শে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা মেনে নিয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ব্যারাকে থেকে যেত, তাহলে যুদ্ধের প্রয়োজন হতো না, বিজয় দিবস প্রাসঙ্গিক হতো না, সে দিবসটিকে কালো দিবস বলার দুঃসাহসও প্রয়োজন হতো না।
যুদ্ধে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক করতে হতো না, পাকিস্তানিদের যুদ্ধে সহায়তার জন্য রাজাকার, আলবদর বাহিনী গড়তে হতো না, ৩০ লাখ লোককে হত্যা কিংবা পাঁচ লাখ মা-বোনকে ধর্ষণের প্রয়োজন হতো না। আমাদের সোনার মানুষ শত শত বুদ্ধিজীবীকে হারাতে হতো না, ভারতকে যুদ্ধে জড়ানোর প্রয়োজন হতো না।
সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তানকে হিন্দু, শিখ, ইহুদির কাছে আত্মসমর্পণ করে মুসলমানের মান-ইজ্জত, সম্মান ও মর্যাদাকে বিসর্জন দিতে হতো না। বঙ্গবন্ধুর মধ্যে আমরা বাংলার লি কুয়ান ইউ খুঁজে পেতাম; যিনি জীবদ্দশায় রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আর্থিক উন্নয়ন দিয়ে সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে যেতে পারতেন; তিনি প্রত্যাশার বিপ্লবকে সামলে যেতেন।
তিনিই শেখ মুজিব, বঙ্গশার্দূল, বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, বাংলাদেশের মহান স্থপতি ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে আমাদের স্মৃতি ও চেতনায় বিরাজ করতেন। তাকে সপরিবারে নিহত হতে হতো না, তাকে নিয়ে এত মিথ ও মিথ্যাচারের জন্ম ও ঐসবের শাখা-প্রশাখা বিস্তারের পথ খোলা থাকত না।
লেখক: শিক্ষাবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো

আমি একবার লিখেছিলাম, আমরা সৌভাগ্যবান ও অতুলনীয় জাতি, কেননা আমাদের আছে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস। ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। সেই স্বাধীনতাটা কীভাবে এলো?
প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় পাকিস্তান জন্মের পরপরই। প্রথমে এমন কথা উচ্চারণ বিপজ্জনক ছিল বলেই এ দেশের মানুষকে প্রথমে ভাষা আন্দোলন ও তারপর স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। একপর্যায়ে স্বায়ত্তশাসনের ধারণাটি স্বাধীনতার ধারণায় পর্যবসিত হয়। তাই পাকিস্তানের ২৩ বছরের সময়কালের সব আন্দোলন-সংগ্রামকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলা অসঙ্গত নয়।
এই স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সাংবিধানিকভাবে তাই ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বিভিন্ন কণ্ঠে পুনরুচ্চারিত হয়েছে এবং এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে আমরা সবাই গ্রহণ করেছি।
২৬ মার্চ থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না, যদি না পাকিস্তানিরা আমাদের মাটিতে জেঁকে বসে না থাকত। আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে উচ্ছেদ করার জন্যই মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হই। ৯ মাসের গেরিলা যুদ্ধ ও সশস্ত্র গতানুগতিক যুদ্ধে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব সমাপ্ত করি এবং সাংবিধানিকভাবে তার স্বীকৃতিও মিলেছে। তাই ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস।
ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামকে স্বাধীনতা যুদ্ধ বলার যৌক্তিক বা সাংবিধানিক ভিত্তি যেমন নেই, তেমনি ১৬ ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস বলারও যৌক্তিকতা বা সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। তবু আমাদের দেশে এক শ্রেণির মানুষ জেনেশুনে দুটোকে এক করে দেখতে প্রয়াসী। তারা সাংবিধানিকভাবে দুটোকে এক করার প্রয়াসে ব্যর্থ হলেও তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
আমাদের দেশে আরও এক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা কথায়-কাজে দুটোর ফারাক বোঝেন না। তাই কেউ সজ্ঞানে, কেউ অজ্ঞানে, কেউ চেতনাহীনতার কারণে সাংবিধানিকভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া ও ঐতিহাসিকভাবে দুটো স্বীকৃত দিবসকে এক করে দেখেন।
একটা গল্প বলি—
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছি। বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আমাদের তদানীন্তন অধিভুক্ত কলেজ জগন্নাথ কলেজে মৌখিক পরীক্ষা নিতে যেতে হতো। বহু দিন আগে থেকেই আমরা মজা করে সেই কলেজটির নাম দিয়েছিলাম ‘জগ বাবুর পাঠশালা’। কলেজ হোক আর পাঠশালা হোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন তাকে অধিভুক্ত করেছে তখন তার নিম্নগামিতা রোধ আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ছিল। সে কারণে মৌখিক পরীক্ষায় করুণা কিংবা নমনীয়তা আমার ব্যক্তিগত নীতি-নৈতিকতার বাইরে ছিল।
একবার ভাইভা নিতে গিয়ে বুঝলাম, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি প্রশ্নবোধক। তাই আমি তাদের ‘ব্যবস্থাপনা’র ওপর নয়, সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। এক শিক্ষার্থীর প্রতি আমার প্রশ্ন— ‘আমাদের স্বাধীনতা দিবস কবে?’ ছেলেটি উসখুস করছিল। প্রশ্নের জবাব দিতে বিলম্ব হওয়ায় তার বিভাগীয় প্রধান কনুই দিয়ে গুতো মেরে বললেন, ‘বল, ১৬ ডিসেম্বর’!
আমি বিস্মিত। ছাত্রজীবনে ওই বিভাগীয় প্রধান আমাদের প্রবণতা ও চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাই তাকে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বলে শ্রেণিবদ্ধ করার অবকাশ ছিল না। বুঝলাম, ব্যাপারটি ধারণাগত; এর ভিত্তিটা হলো জ্ঞানের অভাব। আমি তাকে বুঝিয়ে বলায় তিনি আমার ব্যাখ্যাকে পরবর্তী জীবনেও ধারণ করেছিলেন। এখনো জ্ঞানের অভাবে অনেকেই স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের ফারাক গুলিয়ে ফেলতে পারেন।
অনেকেই শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু নাও বলতে পারেন, কিংবা বিজয়ের মাসে সদম্ভে তাকে বিশ্বাসঘাতক বলতে পারেন, বা বিজয় দিবসকে অস্বীকার নাও করতে পারেন। কেননা এ বিজয় তার মনস্তাত্ত্বিক বেদনার উদ্রেক করলেও তার বৈষয়িক সমৃদ্ধি এ কারণেই ঘটেছে। তিনি হয়তো আজও পাকিস্তানে বিশ্বাসী এবং পাকিস্তানের দ্বিজাতি তত্ত্বেও বিশ্বাসী। দ্বিজাতি তত্ত্বের অনুরাগীরা আজও বিশ্বাস করেন, মুসলমান একটি জাতি এবং তারা শাসিত হবেন কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাব যদি তারা প্রমাণ করতে পারেন যে পাকিস্তান কোরআন ও সুন্নাহর শাসনে নিবেদিত ছিল এবং পাকিস্তান (বাকিস্তান) এখনো কোরআন ও সুন্নাহর শাসনে নিয়োজিত।
যাক, এ প্রসঙ্গটি নিয়ে পরে আলোচনা করব। পাকিস্তান তৈরির লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের জন্য আবাস ও মুসলমানদের আর্থিক সংকট সংকোচন বা তা দূরীকরণ নিশ্চিত করার জন্য নীতি, পলিসি ও কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। বাঙালি মুসলমানরা হিন্দু জমিদার, মহাজন, ব্যবসায়ী ও বেনিয়াদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তানি ভূস্বামী, ব্যবসায়ী ও বেনিয়াদের কবলে আত্মনিবেদন করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল না নব্য সাম্রাজ্যবাদীদের সংরক্ষিত বাজার হওয়া; তবুও তারা তাদের নব্য প্রভুদের জালে আবদ্ধ হলো।
তারা দেখল, ধীরে ধীরে এসবই তাদেরকে গ্রাস করছে। তখন প্রথমে সেটা ঠেকাতে স্বায়ত্তশাসন ও পরে স্বাধীনতার দিকে পা ফেলা শুরু করল। শেখ মুজিব সেই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকে শুরু করে পাকিস্তানের পরিসমাপ্তির দিনটি পর্যন্ত বাঙালির দেশ বাংলাদেশের জন্মে একান্তই ব্রতী ছিলেন।
তবে বাংলার স্বাধীনতা টেবিল টকে, কলমের খোঁচায় বা মুরব্বির মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-শোষক ও দুর্বৃত্তরা মুসলমান পরিচয়ে তাদের পূর্বাঞ্চলের মুসলমানদের ভাই-বোনদের নারকীয় হত্যা না করে, ধর্ষণ না করে, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে না দিয়ে, তাদের ভূমি তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে পারত। তাতে প্রথমত পাকিস্তান কলঙ্কিত হতো না (বাকিস্তান হয়ে যেত না), ইসলাম কলঙ্কিত হতো না, মানবিকতা ধর্ষণের শিকার হতো না, মানুষ বিমুখ হতো না এবং এই অঞ্চলে তাদের কিছু বশংবদ তৈরি হতো না, যারা আজও পাকিস্তান ফিরিয়ে আনতে বৃথা আস্ফালন করছে।
পাকিস্তান ক্রমাগত পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ পর্যন্ত ঠেলে দিয়েছিল। সে দিন বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ভাষায় একবার নয়, দুবার স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। বক্তৃতা শুরুর কিছু পরেই তিনি স্বাধীনতার কথা বলেন, আর বক্তৃতা শেষের আগে বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমার মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সেই ১৯৪৭ সাল থেকে একাত্তরের ৬ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানে যা যা ঘটেছে তার বর্ণনার পর তার যৌক্তিক উচ্চারণ— ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
প্রথম ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করলেন, তার ঘোষণা তো একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে গেল, যার পরিণতি নাইজেরিয়ার বায়াফ্রার মতো হতে পারে। পাকিস্তান এখনই তার ও তার মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তখন তিনি সুর নামিয়ে চারটি দাবি পেশ করলেন। আদতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে হানাদার বা দখলদার বাহিনীকে তাদের দেশে পাঠাবার পথটি খোলা রেখেছিলেন।
একই সঙ্গে নিজের মুসলমান পরিচয় ও পাকিস্তানিদের মুসলমান মেনেই তিনি বলেছিলেন ‘তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাক, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।’ তবে ‘আর যদি একটি গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের মতো রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব।’
অর্থাৎ সেই ৭ মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণাটি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং আশা করেছিলেন, পাকিস্তানিরা নিজেদের গুটিয়ে ব্যারাকে আশ্রয় নেবে। তিনি সেদিন যুদ্ধের হুকুম দেননি। পাকিস্তানিরা উলটো ব্যারাক ছেড়ে আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিলো। তা না হলে আমাদের স্বাধীনতা দিবস হতো ৭ মার্চ। স্বতন্ত্র কোনো বিজয় দিবসের প্রতীক্ষায় থাকতে হতো না। সেদিনই স্বাধীনতা কার্যকর হতো এবং দখলদারদের শান্তিপূর্ণ পন্থায় তাদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা হতো।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতার পর তারই ৩৫টি নির্দেশে সারা দেশ চলতে থাকে। দলে দলে বাঙালিরা তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। সেক্রেটারিয়েটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার ৩২ নম্বর ভবন থেকে নির্দেশ নিয়ে তা আক্ষরিকভাবে পালন শুরু করেন। পুলিশের প্রধান বলতে গেলে তার স্থায়ী অফিস ৩২ নম্বরে পেতে বসেন। আনসার, ইপিআর ও মুজাহিদ বাহিনী তার কাছে আনুগত্য প্রকাশ করে। পশ্চিমের দিকে অর্থপাচার ও সম্পদ পাচার বন্ধ হয়ে যায়। সব মিলিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান যেভাবে রাষ্ট্রাচার পালন করেন, বঙ্গবন্ধুও সেভাবে করতে থাকেন।
পাকিস্তান টেলিভিশন ও বেতারের নবনাম দেওয়া হয়, বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয় এবং জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ যেখানে প্রয়োজন সেখানেই গাওয়া হয়। বিদেশিরা, এমনকি পাকিস্তানিরাও বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে আসে। ৩২ নম্বর হয়ে ওঠে ব্রিটেনের ডাউনিং স্ট্রিটের মতো, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
একমাত্র সেনানিবাস ও বিদেশি দুয়েকটি দূতাবাসের কার্যালয় ছাড়া বাংলাদেশ চৌহদ্দিভুক্ত আর সব স্থাপনা বঙ্গবন্ধুর কর্তৃত্বের আওতায় চলে আসে। সব লক্ষণই বলে দেয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায় ৭ মার্চ। শুধু অপেক্ষা— পাকিস্তানিরা তাদের জীবন-সম্পদ নিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিদায় নেবে।
কিন্তু ঘটনা ঘটল ভিন্নতর। তারা ২৫ মার্চ একটি জাতিসত্তাকে নির্মূলের সব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি চূড়ান্ত করে আঘাত হানে। প্রতিঘাত হিসেবে যুদ্ধ ব্যতীত আর কী করা যায়? তাই বঙ্গবন্ধু এবারে যুদ্ধের হুকুম দিয়ে বসেন। এতে ৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার পুনরাবৃত্তি থাকলেও বাংলা ভাষাভাষী ছাড়াও অন্যদের কাছে ২৫/২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাও যুদ্ধ ঘোষণারূপে পরিচিতি পেয়ে যায়। ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ সন্ধ্যার ভাষণে নিজ মুখে তা স্বীকার করেন। বহু পরে পাকিস্তানিদের শ্বেতপত্রে স্পষ্টই শেখ মুজিবের রাষ্ট্রদ্রোহিতার কথা বলা হয়, বলা হয় তার যুদ্ধ প্রস্তুতি ও যুদ্ধ ঘোষণার ইতিবৃত্ত।
প্রত্যাশার বিপরীতে পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চ পূর্বপ্রস্তুতি সহ সদলবলে ব্যারাক থেকে বের হয়ে একটি জাতিসত্তাকে সম্পূর্ণ নির্মূলের পথ ধরেছিল, আর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার একটি ঘোষণা ইথারে ছড়িয়ে দেন। এ ঘোষণাটি রাত ১২টার কাছাকাছি সময়ে পাকিস্তানের ক্র্যাকডাউনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সজ্ঞানে দেওয়া হয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক পাকিস্তান বেতারের ওয়্যারলেসের কাছাকাছি জায়গা থেকে নিজস্ব ট্রান্সমিটার দিয়ে তা প্রচার করেন। তারপর সে রাতে তিনি দ্বিতীয় একটি ঘোষণা প্রচারের ব্যবস্থা রেখেছিলেন, যা সুবেদার মেজর শওকত আলীসহ অন্যদের প্রয়াসে ছড়িয়ে পড়ে।
তাহলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু অপারেশন সার্চলাইট শুরুর আগে স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি, কোনো একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি, বরং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নেমেছিলেন। এখানে লক্ষ্যণীয়, বঙ্গবন্ধুর ২৫/২৬ মার্চের ঘোষণা দুটিই ইংরেজিতে প্রণীত। তার মানে, এ সব বাংলা ভাষাভাষী বা বাঙালি ছাড়াও সংশ্লিষ্ট অন্যদের জন্য প্রচারিত হয়। বাঙালিদের জন্য ঘোষণাটি ছিল ৭ মার্চে। বাঙালিরা ৭ মার্চকেই স্বাধীনতা দিবস হিসেবেই মেনে নিয়েছিল।
সবার প্রত্যাশা ছিল, এই ঘোষণার পর পাকিস্তানিরা স্বেচ্ছায় এ মাটি ছেড়ে চলে যাবে, পোড়া মাটি নীতি গ্রহণ করবে না কিংবা পুরো জাতিকে নির্মূলে সর্বাত্মক অভিযানে নামবে না। কিন্তু যখন নেমেই গেল, তখন তাকে শুধু প্রতিহত নয়, পরাভূত করতে হবে ও উচ্ছেদ করতে হবে বলেই বাঙালিদের অস্ত্র ধারণ করতে হলো।
আবারও বলছি, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও যুদ্ধের ঘোষণা দেননি। যুদ্ধের ঘোষণা দেন ২৫/২৬ মার্চ মধ্যরাত বা তার পরে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সে কারণেই ২৬ মার্চে বিদ্রোহ করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। অবশ্য সময়ের হিসেবে জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ ও যুদ্ধের ঘোষণার সময়টি ছিল ২৫ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিট। আর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাটি ছিল ২৫ মার্চ রাত ১২টার কাছাকাছি সময়ে এবং দ্বিতীয় ঘোষণাটি ছিল রাত ১টা ৩০ মিনিটের পর। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের দ্বাদশ অনুচ্ছেদে তার উচ্চারণ ছিল, ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে এবং সর্বশেষ ‘জয় বাংলা’ বলে তার বক্তব্য শেষ করেন।
‘ইনশাআল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ যদি চান। তাহলে আল্লাহ চেয়েছেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। একটি সম্পূরক কথা বলছি। ৭ মার্চ ভাষণে তিনি কী বলবেন, তার তাৎপর্য কী হতে পারে— সে সব নিয়ে বহু আলাপ-আলোচনা হয়েছিল। উপদেশ বা পরামর্শের ঝুড়ি ভরা ছিল। কিন্তু তিনি কী বলবেন, সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হাজী মোর্শেদকে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ আমার মুখ দিয়ে যা বলাবেন, আমি তা-ই বলব।’
আমাদের উপলব্ধি— আল্লাহ চেয়েছিলেন বাঙালি স্বাধীন হোক এবং বঙ্গবন্ধু সেদিন, মানে ৭ মার্চ, আল্লাহর ইচ্ছাতেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানিদের উচ্ছেদের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন হতে পারে, তাই বলেছিলেন, ‘আমি যদি (যুদ্ধের) হুকুম দিবার নাও পারি, তাহলে কী করবে? গেরিলা তৎপরতা দিয়ে শুরু করে যা যা প্রয়োজন, তা দিয়ে দখলদার শত্রুকে বাংলার মাটি থেকে উচ্ছেদের সকল ব্যবস্থা করবে।’
বঙ্গবন্ধুর ভাষ্যে তাহলে আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার দিন দুটি— একটি ৭ মার্চ, আর ২৬ মার্চ অপর দুটি ঘোষণা, যা বাংলার মাটিতে বসবাসকারী দুদেল বান্দাসহ এবং মুখ্যত বিশ্ববাসীর জন্য প্রয়োজন ছিল। কার্যত শেষোক্তরাই আমাদের ভাগ্য নির্ধারণে প্রভাব রেখেছিল। এ কারণে ৭ মার্চের ব্যাপারে কম্প্রোমাইজও করতে হয়েছিল।
বাংলাদেশের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণার আনুষ্ঠানিক বা সাংবিধানিক ঘোষণার দায়িত্ব ছিল তাজউদ্দিন সরকারের। তার কন্যা শারমিন আহমদ বলেন, তার পিতা নাকি ডায়েরিতে লিখেছেন বা পরিবারকে বলেছেন, কিংবা মঈদুল হাসানকে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বলেছেন যে বঙ্গবন্ধু তার অনুরোধ, উপরোধ, পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও স্বাধীনতার কোনো ঘোষণা দেননি।
এ কথার সত্যতা প্রমাণের জন্য শারমিন সেকেন্ডারি তথ্যের সমাহার ঘটিয়েছেন। তিনি অন্তত কিছু লোককে এই বোধ দিয়েছিলেন যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। তবে তিনিই আবার উপসংহার টেনেছেন, তার পিতা আনীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর কিংবা কণ্ঠ না দিলেও তার ‘মুজিব কাকু’ যে পৃথকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, তা প্রশ্নাতীত।
সেটা প্রমাণে তিনি প্রাথমিক সত্যানুসন্ধানে নামেন এবং প্রাথমিক ও দ্বৈত তথ্যের ভিত্তিতে তার প্রারম্ভিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটিয়ে তার বইয়ে লিপিবদ্ধ করেন। এবার তিনি বলেন, তার মুজিব কাকু বন্দি হওয়ার আগেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন (পৃ. ১৪৭-১৪৮); যদিও তার বইয়ের প্রথম ভাগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি বলে উল্লেখ করেছিলেন।
একটি আলাদা লেখায় তিনি তার কথার পুনরাবৃত্তি ঘটান। জামালপুরের কোনো এক সভায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শারমিনকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘শেখ মুজিব কোনো স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।’ সুযোগটা পেয়েই শারমিন তার প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা স্বরূপ নিম্নোক্ত নিবন্ধটি প্রথম আলো পত্রিকায় লেখেন—
‘‘বিএনপির সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামালপুরের জনসভায় (২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪) ‘তাজউদ্দিন আহমদ: নেতা ও পিতা’ বইটি থেকে আমার লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে এনেছিলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেননি। তিনি সচেষ্ট থাকেন এ কথা প্রমাণ করতে যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। (ভিডিও বক্তব্যের লিংক: http://www.youtube.com/watch?v=bOev2d0uQ30)।”
‘বক্তব্যে তিনি অনুল্লেখিত রাখেন, আমার বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে উল্লেখিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাকি অংশগুলোর বর্ণনা। বঙ্গবন্ধু আমার বাবা বা দলকে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও তিনি যে ভিন্ন মাধ্যমে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা তথ্য ও সাক্ষাৎকারসহ আমার বইয়ে স্পষ্ট উল্লেখিত (তাজউদ্দিন আহমদ: নেতা ও পিতা, পৃ. ১৪৭-১৪৮, ২৭৪-২৯১, ৩০১-৩১০) আছে।’
শারমিন আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার বার্তা পাঠিয়েছিলেন, তার একমাত্র জীবিত সাক্ষী (অবশ্য এখন তিনি প্রয়াত) বঙ্গবন্ধুর পারসোনাল এইড হাজি গোলাম মোরশেদ, যিনি ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার হন, তার এবং প্রকৌশলী শহীদ নূরুল হক, যিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে খুলনা থেকে ট্রান্সমিটার এনেছিলেন ঘোষণা দেওয়ার জন্য— তার স্ত্রীর সাক্ষাৎকার আমার বইয়ে ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে।’
‘বইয়ে আরও উল্লেখিত যে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে ২৬ মার্চ দুপুরে এবং সেই সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা আবদুল হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন (পৃ. ১৪৭) এবং ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে পরবর্তী ঘোষণা দেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান (পৃ. ৭১ ও ১৪৭)।’
“আরও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, যা বইয়ে ব্যারিস্টার আমীরউল ইসলামের সাক্ষাৎকারে উদ্ধৃত হয়েছে, তা হলো— ‘অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। অতএব, ওই দিন থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা কার্যকর হবে।’ (পৃ. ২৭১, প্রথম আলো, ১৩/১০/২০১৪)।”
‘তাজউদ্দিন আহমদ সীমান্ত অতিক্রমের পূর্বেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছিলেন। তাজউদ্দিন আহমদ আরও জেনেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু কেবল স্বাধীনতার ঘোষণা নয়, তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করে সরকার গঠন করেছেন; কিন্তু একটি বিভ্রান্তির কবলে পড়ে সীমান্ত অতিক্রম করে যুদ্ধে জড়িত হতে চেয়েও সফল হননি। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কথাও ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিজ গৃহে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল তাজউদ্দিনের পরামর্শজাত, যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং বঙ্গবন্ধু নিজ গৃহে থেকে বন্দি হয়ে যান। তবে তিনি সরকার কাঠামো ও যুদ্ধ পরিচালনায় যুবা ও তরুণদের দায়িত্ব দিয়েও ইন্দিরা গান্ধীকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন।’
আগেই বলেছি, বন্দি হওয়ার আগেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, যা ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক শক্তিশালী ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচার করেন। সে ঘোষণাটি একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল না। আগেই বলেছি, তাজউদ্দিন আহমদ ও আমীরউল ইসলাম তথা মুহম্মদ আলী ও রহমত আলী ছদ্মনামে সীমান্ত অতিক্রমের পূর্বেই বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার কথা জেনেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর কথা তাদের শিরোধার্য ছিল। তাই তাজউদ্দিন তার ১০ এপ্রিলের ভাষণে এবং মুজিবনগর সরকারের অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে ২৬ মার্চকেই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সেই আইনি স্বীকৃতির কারণে কিংবা বঙ্গবন্ধুর শেষ মুহূর্তের ইচ্ছা বা অভিপ্রায়কে বলবৎ রাখার জন্যই এবং একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার অপবাদ থেকে পরিত্রাণের জন্যই ২৬ মার্চই আমাদের স্বাধীনতা দিবস।
সবাই জানত, ৭ মার্চে সংসদ অধিবেশন স্থগিতের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া নাজায়েজ হলেও শেষ রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চ একটি জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও বিকাশের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা অনিবার্য ছিল।
তবে পাকিস্তানিরা যদি বাস্তবতা বিচার করে খাঁটি মুসলমানদের ন্যায় কিংবা আইয়ুব খান বা এম এস আহমদের পরামর্শে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা মেনে নিয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ব্যারাকে থেকে যেত, তাহলে যুদ্ধের প্রয়োজন হতো না, বিজয় দিবস প্রাসঙ্গিক হতো না, সে দিবসটিকে কালো দিবস বলার দুঃসাহসও প্রয়োজন হতো না।
যুদ্ধে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক করতে হতো না, পাকিস্তানিদের যুদ্ধে সহায়তার জন্য রাজাকার, আলবদর বাহিনী গড়তে হতো না, ৩০ লাখ লোককে হত্যা কিংবা পাঁচ লাখ মা-বোনকে ধর্ষণের প্রয়োজন হতো না। আমাদের সোনার মানুষ শত শত বুদ্ধিজীবীকে হারাতে হতো না, ভারতকে যুদ্ধে জড়ানোর প্রয়োজন হতো না।
সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তানকে হিন্দু, শিখ, ইহুদির কাছে আত্মসমর্পণ করে মুসলমানের মান-ইজ্জত, সম্মান ও মর্যাদাকে বিসর্জন দিতে হতো না। বঙ্গবন্ধুর মধ্যে আমরা বাংলার লি কুয়ান ইউ খুঁজে পেতাম; যিনি জীবদ্দশায় রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আর্থিক উন্নয়ন দিয়ে সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে যেতে পারতেন; তিনি প্রত্যাশার বিপ্লবকে সামলে যেতেন।
তিনিই শেখ মুজিব, বঙ্গশার্দূল, বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, বাংলাদেশের মহান স্থপতি ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে আমাদের স্মৃতি ও চেতনায় বিরাজ করতেন। তাকে সপরিবারে নিহত হতে হতো না, তাকে নিয়ে এত মিথ ও মিথ্যাচারের জন্ম ও ঐসবের শাখা-প্রশাখা বিস্তারের পথ খোলা থাকত না।
লেখক: শিক্ষাবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনে চলমান সংঘাত এখন আর কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়; বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির ‘সাপ্লাই চেইনে’র জন্য বড় একটি ধাক্কা। যুদ্ধ কেবল অবকাঠামো ধ্বংস করছে না, বরং জ্বালানি ও বাণিজ্যের বৈশ্বিক স্নায়ুতন্ত্রকে অচল করে দিচ্ছে।
৬ দিন আগে
দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাত একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে— এটি শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং বাস্তবতার প্রমাণ রয়েছে। ইতিহাসে খলিফা হযরত উমর (রা.) এবং হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর শাসনামলে এমন সময় এসেছে, যখন জাকাত গ্রহণ করার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
৭ দিন আগে
ইসলাম মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। অর্থ উপার্জন বৈধ, সম্পদ অর্জনও বৈধ। কিন্তু সেই সম্পদের ভেতরে সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার আছে। এই বোধ তৈরি করাই জাকাত ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে জাকাত শুধু আধ্যাত্মিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও।
৮ দিন আগে
হুটহাট করে প্রথম শ্রেণিতেই শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি পরীক্ষা চালুর বদলে অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নীতি-কৌশল প্রণয়ন করা গেলে সেটিই বরং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
৮ দিন আগে