
মো. ফেরদাউস মোবারক

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে একটি কাঠামোগত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের গ্যাস উৎপাদন কমছে, আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা যথেষ্ট থাকলেও জ্বালানির অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। অর্থাৎ সক্ষমতা আছে কাগজে-কলমে, কিন্তু বাস্তবে তার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শিল্পকারখানা— সবাই ঘাটতিতে ভুগছে।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়াতে চাওয়া বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব গুরুতর। লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়, পরিচালন ব্যয় বাড়ে, কারখানার সক্ষমতার ব্যবহার কমে যায়। একই সঙ্গে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে কম নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক, ইস্পাতসহ রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। কারণ এসব খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট উৎপাদন, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান— সবকিছুর ওপরই চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাবদ অর্থ, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপও রয়েছে সরকারের ওপর। বৈশ্বিক এলএনজির দামের ওঠানামা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহে বিঘ্ন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের নানা ঝুঁকির সামনে আরও বেশি উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
সাময়িক সমাধান আর যথেষ্ট নয়
বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা আনুমানিক ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ রয়েছে এর চেয়ে অনেক কম। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ঘাটতি পূরণে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে। আবার এলএনজি টার্মিনালে কোনো ধরনের সমস্যা হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ দ্রুত কমে যেতে পারে।
তবে বাংলাদেশের সমস্যা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ঘাটতি নয়। গত এক দশকে দেশে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও দেশীয় জ্বালানি, সঞ্চালন অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পুরোপুরি চালানো যাচ্ছে না।
এটি একটি ব্যয়বহুল বৈপরীত্য। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু সেই সক্ষমতা ব্যবহারের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারেনি। এতে ব্যবসার খরচ বাড়ছে, সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমছে।
তাই জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া আরেক দফা সাময়িক পদক্ষেপ দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। সরবরাহ স্থিতিশীল করার পাশাপাশি যেসব কাঠামোগত দুর্বলতা বারবার সংকট তৈরি করছে, সেগুলোও দূর করতে হবে।
সরবরাহ স্থিতিশীল করতে হবে
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বিদ্যমান জ্বালানি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ঘাটতির কারণে অর্থনীতিতে আরও ক্ষতি হওয়া ঠেকানো।
এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেট— দুই ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। আরও নমনীয় চুক্তি সরবরাহের নিশ্চয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার ঝুঁকিও কমাতে পারে।
একইভাবে বিদ্যমান ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মহেশখালীর টার্মিনালগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সমস্যা হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে কমে যেতে পারে।
সরবরাহে বিঘ্ন মোকাবিলায় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণাগারসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। তবে আমদানি করা এলএনজি কোনোভাবেই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বিকল্প হতে পারে না। বরং দুটিকে পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার পথে এগোতে হবে
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাইলে দেশীয় গ্যাসের উৎস খুঁজে বের করার বড় উদ্যোগ নিতে হবে। এতে আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) আরও দ্রুত কূপ খনন, পুরোনো কূপ সংস্কার এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে যেতে হবে। বিশেষ করে সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধান জোরদার করা জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বড় পরিসরে ভূকম্পন জরিপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত এলএনজি টার্মিনাল, সংরক্ষণাগার ও পাইপলাইন তৈরি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। তবে আমদানি করা গ্যাস যেন দেশীয় অনুসন্ধানের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে উৎপাদন বাড়াতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ধাক্কা কমবে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য জ্বালানির খরচও আরও অনুমানযোগ্য হবে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থাতেও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। উৎপাদনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন ও বিতরণ অবকাঠামো বাড়াতে হবে। সিস্টেম লস কমানো, পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলানো এবং আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি চালু করলে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও নির্ভরযোগ্য হবে। একই সঙ্গে বর্তমানে থাকা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতারও বেশি ব্যবহার সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়বহুল আমদানি করা কয়লা ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমাতে হবে। তুলনামূলকভাবে দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং অদক্ষ ও ব্যয়বহুল কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি চালু হলে তা বেসলোড বিদ্যুতের আরেকটি উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপও কমবে।
জ্বালানির ভিত্তি আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একটি মাত্র জ্বালানি বা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল কোনো ব্যবস্থার ওপর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দাঁড় করানো যাবে না।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দ্রুত অনুমোদন প্রয়োজন।
শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খরচও কমানো সম্ভব হবে। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং পরিকল্পিত বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পও জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনতে পারে।
দেশীয় গ্যাস, এলএনজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং আমদানি করা বিদ্যুতের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। এতে জ্বালানি ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য সরবরাহের নিশ্চয়তা বাড়বে।
পরিকল্পনার ভুলগুলোও ঠিক করতে হবে
বাংলাদেশের প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ধারাবাহিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। স্পষ্ট নীতিমালা, দ্রুত অনুমোদন এবং উপযুক্ত প্রণোদনা থাকলে গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সংরক্ষণাগার ও গ্রিড অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। যাতে জ্বালানি খাতে ব্যয় করা অর্থ শুধু নতুন সক্ষমতা তৈরিতে নয়, বাস্তবে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতেও কাজে লাগে।
পরবর্তী সংকটের বাইরেও ভাবতে হবে
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির সংকট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দুর্বল চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনার ঘাটতি মিলেই বারবার এই সংকট তৈরি করছে।
আর সেই সংকট এখন সরাসরি উৎপাদন খরচ, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, রপ্তানি সক্ষমতা ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলছে। তাই সমাধানও আর কোনো সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে না।
সরবরাহ স্থিতিশীল করার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে, বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিক করতে হবে, ভর্তুকি ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার আনতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
এ জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে বাস্তবসম্মত, সময়বদ্ধ ও বাস্তবায়নযোগ্য একটি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিষয়টি শুধু ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, শিল্প সম্প্রসারণ, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত।
সাময়িক সমাধান হয়তো আজকের সংকট সামাল দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা।
লেখক: সাংবাদিক

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে একটি কাঠামোগত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের গ্যাস উৎপাদন কমছে, আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা যথেষ্ট থাকলেও জ্বালানির অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। অর্থাৎ সক্ষমতা আছে কাগজে-কলমে, কিন্তু বাস্তবে তার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শিল্পকারখানা— সবাই ঘাটতিতে ভুগছে।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়াতে চাওয়া বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব গুরুতর। লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়, পরিচালন ব্যয় বাড়ে, কারখানার সক্ষমতার ব্যবহার কমে যায়। একই সঙ্গে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে কম নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক, ইস্পাতসহ রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। কারণ এসব খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট উৎপাদন, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান— সবকিছুর ওপরই চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাবদ অর্থ, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপও রয়েছে সরকারের ওপর। বৈশ্বিক এলএনজির দামের ওঠানামা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহে বিঘ্ন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের নানা ঝুঁকির সামনে আরও বেশি উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
সাময়িক সমাধান আর যথেষ্ট নয়
বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা আনুমানিক ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ রয়েছে এর চেয়ে অনেক কম। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ঘাটতি পূরণে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে। আবার এলএনজি টার্মিনালে কোনো ধরনের সমস্যা হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ দ্রুত কমে যেতে পারে।
তবে বাংলাদেশের সমস্যা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার ঘাটতি নয়। গত এক দশকে দেশে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও দেশীয় জ্বালানি, সঞ্চালন অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পুরোপুরি চালানো যাচ্ছে না।
এটি একটি ব্যয়বহুল বৈপরীত্য। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু সেই সক্ষমতা ব্যবহারের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারেনি। এতে ব্যবসার খরচ বাড়ছে, সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমছে।
তাই জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া আরেক দফা সাময়িক পদক্ষেপ দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। সরবরাহ স্থিতিশীল করার পাশাপাশি যেসব কাঠামোগত দুর্বলতা বারবার সংকট তৈরি করছে, সেগুলোও দূর করতে হবে।
সরবরাহ স্থিতিশীল করতে হবে
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বিদ্যমান জ্বালানি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ঘাটতির কারণে অর্থনীতিতে আরও ক্ষতি হওয়া ঠেকানো।
এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেট— দুই ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। আরও নমনীয় চুক্তি সরবরাহের নিশ্চয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার ঝুঁকিও কমাতে পারে।
একইভাবে বিদ্যমান ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মহেশখালীর টার্মিনালগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সমস্যা হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে কমে যেতে পারে।
সরবরাহে বিঘ্ন মোকাবিলায় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণাগারসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। তবে আমদানি করা এলএনজি কোনোভাবেই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বিকল্প হতে পারে না। বরং দুটিকে পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার পথে এগোতে হবে
স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাইলে দেশীয় গ্যাসের উৎস খুঁজে বের করার বড় উদ্যোগ নিতে হবে। এতে আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) আরও দ্রুত কূপ খনন, পুরোনো কূপ সংস্কার এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে যেতে হবে। বিশেষ করে সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধান জোরদার করা জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বড় পরিসরে ভূকম্পন জরিপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত এলএনজি টার্মিনাল, সংরক্ষণাগার ও পাইপলাইন তৈরি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। তবে আমদানি করা গ্যাস যেন দেশীয় অনুসন্ধানের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে উৎপাদন বাড়াতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ধাক্কা কমবে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য জ্বালানির খরচও আরও অনুমানযোগ্য হবে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থাতেও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। উৎপাদনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন ও বিতরণ অবকাঠামো বাড়াতে হবে। সিস্টেম লস কমানো, পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলানো এবং আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি চালু করলে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও নির্ভরযোগ্য হবে। একই সঙ্গে বর্তমানে থাকা বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতারও বেশি ব্যবহার সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়বহুল আমদানি করা কয়লা ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমাতে হবে। তুলনামূলকভাবে দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং অদক্ষ ও ব্যয়বহুল কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি চালু হলে তা বেসলোড বিদ্যুতের আরেকটি উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপও কমবে।
জ্বালানির ভিত্তি আরও বৈচিত্র্যময় করতে হবে
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একটি মাত্র জ্বালানি বা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল কোনো ব্যবস্থার ওপর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দাঁড় করানো যাবে না।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দ্রুত অনুমোদন প্রয়োজন।
শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খরচও কমানো সম্ভব হবে। বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং পরিকল্পিত বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পও জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনতে পারে।
দেশীয় গ্যাস, এলএনজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং আমদানি করা বিদ্যুতের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। এতে জ্বালানি ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য সরবরাহের নিশ্চয়তা বাড়বে।
পরিকল্পনার ভুলগুলোও ঠিক করতে হবে
বাংলাদেশের প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ধারাবাহিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। স্পষ্ট নীতিমালা, দ্রুত অনুমোদন এবং উপযুক্ত প্রণোদনা থাকলে গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সংরক্ষণাগার ও গ্রিড অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। যাতে জ্বালানি খাতে ব্যয় করা অর্থ শুধু নতুন সক্ষমতা তৈরিতে নয়, বাস্তবে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতেও কাজে লাগে।
পরবর্তী সংকটের বাইরেও ভাবতে হবে
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির সংকট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, দুর্বল চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা পরিকল্পনার ঘাটতি মিলেই বারবার এই সংকট তৈরি করছে।
আর সেই সংকট এখন সরাসরি উৎপাদন খরচ, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, রপ্তানি সক্ষমতা ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলছে। তাই সমাধানও আর কোনো সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে না।
সরবরাহ স্থিতিশীল করার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে, বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিক করতে হবে, ভর্তুকি ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার আনতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
এ জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে বাস্তবসম্মত, সময়বদ্ধ ও বাস্তবায়নযোগ্য একটি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিষয়টি শুধু ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, শিল্প সম্প্রসারণ, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত।
সাময়িক সমাধান হয়তো আজকের সংকট সামাল দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা।
লেখক: সাংবাদিক

বিদ্যুৎ ঘাটতির সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছে দেশের গ্রামাঞ্চল। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সেখানে প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং এক নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ভ্যাপসা গরম, অন্যদিকে সেচ সংকটে কৃষকের হাহাকার— সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
৪ দিন আগে
স্যুটের একাধিক স্তর— মোটা কাপড়, টাই এবং কখনো ওয়েস্টকোট— শরীরের তাপ আটকে রাখে এবং বাতাস চলাচলের সুযোগ কমিয়ে দেয়। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস বা গাড়ির ভেতরে স্যুট পরেন, তাদের হয়তো এই অস্বস্তি অনুভব করতে হয় না। কিন্তু জনসমাগম, সমাবেশ বা মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনের জন্য বাইরে বের হলে এই বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ও
৫ দিন আগে
মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাইরের কোনো শক্তি নয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। সুন্নি-শিয়া বিভাজন, আরব-অনারব বৈরিতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করেছে। তাই কোনো অভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগের আগে প্রয়োজন আস্থা, সহযোগিতা ও অভিন্ন উন্নয়ন-দর্শন গড়ে তোলা।
৮ দিন আগে
কেন আজ শিক্ষক এত অসহায়? কারণ রাষ্ট্রের আইনেই তাদের সুরক্ষার জন্য আলাদা ও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ কিংবা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নীতিমালায় শিক্ষকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান নেই।
৮ দিন আগে