২০২৬ হোক শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক মর্যাদার বছর

ড. কাজী নূরুল ইসলাম

২০২৫ সাল মানবজাতির স্মৃতিতে একটি গভীর বেদনাবিধুর ও যন্ত্রণাময় সময় হিসেবে থেকে যাবে। এ বছরে বিশ্ব জুড়ে সংঘাত, যুদ্ধ, গণহত্যা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, মানবিক বিপর্যয় ও নৈতিক অবক্ষয় আমাদের প্রতিদিন স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—শান্তি কোনো স্বতঃসিদ্ধ বিষয় নয়, বরং এটি সচেতন চর্চা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সম্মিলিত মানবিক অঙ্গীকারের ফল।

এমন এক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ২০২৬ সালকে যদি আমরা শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক মর্যাদার বছরে পরিণত করতে চাই, তবে কেবল প্রার্থনার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রার্থনার পাশাপাশি আমাদের প্রয়োজন গভীর আত্মসমালোচনা এবং একটি সুস্পষ্ট নৈতিক সিদ্ধান্ত— জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও বিশ্বাস নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষকে নিজের মতো করে ভালোবাসব।

শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা বহির্জগতের নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত দুর্বলতা। লোভ, হিংসা, অহংকার, প্রতিশোধস্পৃহা, ক্ষমতার মোহ এবং অন্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়। এই প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ না করলে কোনো রাষ্ট্র, কোনো ধর্মীয় আহ্বান কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাই স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।

তাই শান্তির প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় ব্যক্তির নৈতিক চর্চার ওপর। আমাদের সবাইকে আন্তরিকভাবে অঙ্গীকার করতে হবে, যেকোনো পরিস্থিতিতেই আমরা বিশ্বের সব ধর্মগ্রন্থে ঘোষিত মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক আদর্শকে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করব।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি আশ্চর্যজনক ঐক্য লক্ষ করা যায়। ভৌগোলিক দূরত্ব, সাংস্কৃতিক পার্থক্য ও ধর্মীয় বিভাজন সত্ত্বেও বিশ্বের সব প্রধান ধর্ম ও দর্শনে একটি অভিন্ন নৈতিক সূত্র বারবার উচ্চারিত হয়েছে। এই সূত্রটি আজ ‘স্বর্ণনীতি’ নামে পরিচিত। কোথাও বলা হয়েছে— নিজের জন্য যা কামনা করো না, তা অন্যের জন্য কামনা কোরো না। কোথাও বলা হয়েছে— যা তোমার কষ্টের কারণ হয়, তা অন্যের ওপর আরোপ কোরো না। আবার কোথাও বলা হয়েছে— নিজের জন্য যা চাও, অন্যের জন্যও তাই চাও।

ভাষা আলাদা, ব্যাখ্যা আলাদা, কিন্তু মূল কথা একটাই— অন্য মানুষের অবস্থানে নিজেকে কল্পনা করা। এই অভিন্ন নৈতিকতাই প্রমাণ করে যে ধর্ম কখনোই সহিংসতার উৎস হতে পারে না; বরং ধর্মের প্রকৃত লক্ষ্য মানবিকতা, সহমর্মিতা ও শান্তি।

এই স্বর্ণনীতি শুধু ধর্মীয় নীতিবাক্য নয়; এটি জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃত একটি সার্বজনীন মানবিক নৈতিকতা। যদি রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি পর্যায়ে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ ঘটত, তাহলে যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা বহুগুণে কমে যেত। অথচ বাস্তবতা হলো— আমরা প্রায়ই ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করি, যার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে আমরা ধর্মের মূল শিক্ষাকেই উপেক্ষা করি।

আন্তঃধর্মীয় সংঘাতের পেছনে একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার সামনে আসে— আমরা কেন অন্য ধর্মের মানুষকে ভালোবাসব ও সম্মান করব? এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের জন্মপরিবেশ ও সামাজিক বাস্তবতায়। ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে অধ্যয়নকালে আমার শিক্ষক অধ্যাপক সাঈয়েদ আবদুল হাই অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর একটি সত্য তুলে ধরেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, একজন মানুষ কোন ধর্মে বিশ্বাস করবে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার জন্ম ও লালন-পালনের পরিবেশ দ্বারা নির্ধারিত। কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ— এটি কোনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব বা ব্যর্থতার ফল নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতার পরিণতি। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা এক, মানবজাতি এক পরিবার। এই উপলব্ধি মানুষকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে এবং অন্যের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং ভালোবাসা জন্ম দেয়।

এই একটি উপলব্ধিই আমাদের শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীদের মন থেকে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সব ধরনের বিদ্বেষ দূর করে দিয়েছিল। এটি দেখিয়ে দেয়— শিক্ষা, বিশেষ করে নৈতিক ও দার্শনিক শিক্ষা, সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। একটি শ্রেণিকক্ষ থেকেও বিশ্বশান্তির বীজ বপন করা সম্ভব।

২০২৬ সালের প্রাক্কালে মানবজাতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এমন মানুষ, যারা কেবল জ্ঞান বিতরণকারী নন, বরং নৈতিক পথপ্রদর্শক— যারা আচরণ দিয়ে শেখাবেন, বক্তব্য দিয়ে নয়। ভালোবাসা, ক্ষমা, আত্মসংযম, আত্মত্যাগ, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও দয়া— এই গুণগুলোই নৈতিক দর্শনের ভিত্তি এবং শান্তি ও সুখের প্রকৃত স্তম্ভ। এসব গুণ যদি ব্যক্তি জীবনে চর্চা করা যায়, তবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে তার প্রভাব অনিবার্যভাবে পড়বে।

শান্তি কোনো কল্পনাপ্রসূত স্বপ্ন নয় এবং কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একক দায়িত্বও নয়। এটি প্রতিদিনের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও নৈতিক সাহসের সমষ্টিগত ফল। যদি আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি যে পৃথিবী সবার জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়া উচিত, তবে আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে স্বর্ণনীতিকে কার্যকর করতে হবে। তখনই ২০২৫ সালের যন্ত্রণা পেরিয়ে ২০২৬ সাল একটি নতুন মানবিক যাত্রার সূচনাবিন্দু হয়ে উঠতে পারে—যেখানে শান্তি হবে অনুশীলনের ফল, আর ভালোবাসা হবে মানুষের স্বাভাবিক ভাষা।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ভয়, পতন আর উৎসব: আমার দেখা ৫ আগস্ট

৫ আগস্ট রাতের সেই এক ধরনের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পরিস্থিতি একটা চাপা শঙ্কা তৈরি করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশেই যা দেখেছিলাম— দেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে ওঠা সেই অবর্ণনীয় আনন্দ— তা ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম।

৪ দিন আগে

কী দিয়েছে ৫ আগস্ট, কী দিতে পারেনি?

আজ ৫ আগস্ট ২০২৬। সেই দুপুরের ঠিক দুই বছর পর। যে মিছিল সেদিন শাহবাগ, শহিদ মিনার আর যমুনার সামনের রাস্তায় থেমে গিয়েছিল আনন্দ-উল্লাসে, তার পায়ের শব্দ আজও যেন মিলিয়ে যায়নি। বদলেছে সরকার, বদলেছে সংসদ, বদলেছে রাষ্ট্রের নথিপত্র। কিন্তু সেই দিনের প্রশ্নগুলো এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

৪ দিন আগে

৫ আগস্ট: ইতিহাস নির্মাণের গণঅভ্যুত্থান দিবস

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, রক্তক্ষয় এবং দেশ জুড়ে অশান্তির পর ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।

৫ দিন আগে

চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশ আজ আর সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নয়; বরং উদীয়মান একটি আঞ্চলিক অর্থনীতি। সেই বাস্তবতার আলোকে কূটনীতিও হতে হবে আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে, কিন্তু কারও প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে, বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অটু

৫ দিন আগে