top ad image
top ad image
home iconarrow iconমতামত

ট্রাম্পের শুল্ক নীতি: বাংলাদেশের রপ্তানি চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের পথ

ট্রাম্পের শুল্ক নীতি: বাংলাদেশের রপ্তানি চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের পথ

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি এবং দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্পের পারস্পরিক শুল্ক নীতির মাধ্যমে মার্কিন আমদানি শুল্ককে তাদের বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর মার্কিন পণ্যের ওপর প্রযুক্ত শুল্কের সঙ্গে সমতুল্য করাই লক্ষ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যদি মার্কিন পণ্যের ওপর বাংলাদেশের শুল্ক উচ্চ হিসাবে বিবেচিত হয়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর শুল্ক বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়।

ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সময় (২০১৭–২০২১) এই নীতি কার্যকর হয়, যা "আমেরিকা ফার্স্ট" কৌশলের অংশ হিসাবে বাণিজ্য বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়। যদিও এর মূল ফোকাস ছিল চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ওপর, তবে বাংলাদেশও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রপ্তানি নির্ভরতার কারণে পরোক্ষ ঝুঁকির মুখে পড়ে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৯৫ শতাংশ (২০২০ সালে ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার)। অন্যান্য পণ্যের মধ্যে পাট, চামড়া ও সামুদ্রিক খাদ্য উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে যন্ত্রপাতি, তুলা, বিমান ও কৃষিপণ্য।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন পণ্যের ওপর বাংলাদেশের গড় শুল্ক ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ট্রাম্পের নতুন এই শুল্কনীতি-পূর্ব সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১ দশমিক ৬ শতাংশ গড় শুল্কের তুলনায় অনেক বেশি।

শ্রমিক অধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ ২০১৩ সালে মার্কিন জিএসপি সুবিধা হারায়। তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর এরই মধ্যে সাধারণ শুল্ক প্রযোজ্য হওয়ায় পারস্পরিক শুল্ক বৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বাড়ে।

পারস্পরিক শুল্কের প্রভাব: অর্থনৈতিক সংবেদনশীলতা

  • বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে লাভের মার্জিন খুবই কম (২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ)। তাই সামান্য শুল্ক বৃদ্ধিও ভিয়েতনাম, ভারত বা চীনের তুলনায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলকতা হ্রাস করতে পারে।

  • তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে ৪ মিলিয়ন শ্রমিক (বেশির ভাগ নারী) কাজ করেন। রপ্তানি কমলে বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। শুল্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি সংকুচিত হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে।

  • বাংলাদেশের ৮০ শতাংশের বেশি রপ্তানি তৈরি পোশাকনির্ভর, যা অভিযোজন ক্ষমতা সীমিত করে। কমপ্লায়েন্স কস্ট, মার্কিন শ্রম ও পরিবেশগত মান (যেমন— রানা প্লাজা-পরবর্তী সংস্কার) পূরণে বাড়তি খরচ যোগ হয়, যা শুল্কজনিত মূল্য চাপকে জটিল করে তোলে।

বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ

  • শুল্ক বৃদ্ধি: পারস্পরিক শুল্কের মাধ্যমে তৈরি পোশাকের ওপর মার্কিন শুল্ক ১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।

  • অশুল্ক বাধা: শ্রম অধিকার বা টেকসই বিষয়ে কঠোর মার্কিন তদন্ত বাণিজ্য বাধাকে তীব্র করতে পারে।

  • বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা: মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবিধাপ্রাপ্ত দেশগুলোর (যেমন— ভিয়েতনাম-ইউরোপ) সঙ্গে প্রতিযোগিতা।

  • সীমিত কূটনৈতিক সুবিধা: ক্ষুদ্র অর্থনীতি হিসেবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের দর কষাকষির ক্ষমতা কম।

সমাধানের পথ

  • আলোচনা-লবিং: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ফোরামে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা ও উন্নয়ন চাহিদা তুলে ধরা। দ্বিপাক্ষিক সংলাপ-জঙ্গিবাদবিরোধী ও জলবায়ু সহনশীলতাসহ কৌশলগত অংশীদারিত্বের ওপর জোর দিয়ে বাণিজ্য উত্তেজনা কমানো।

  • অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ: আইটি, ফার্মাসিউটিক্যালস ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মতো উচ্চ মূল্য সংযোজন খাত উন্নয়নের মাধ্যমে রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (বর্তমানে তৈরি পোশাক রপ্তানির ৬০ শতাংশ), জাপান ও আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের মতো উদীয়মান বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে বাজারেও বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে হবে।

  • প্রতিযোগিতা বাড়ানো: অটোমেশন ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মতো খাত এবং পদ্মা সেতু ও গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো অবকাঠামোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন করতে হবে। শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত মান শক্তিশালী করে অশুল্ক বাধা প্রতিরোধের মাধ্যমে কাজের মানোন্নয়ন করতে হবে।

  • আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা: সার্ক বা বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে সম্মিলিত দর কষাকষির অবস্থা তৈরি করতে হবে। একতরফা শুল্কের বিরুদ্ধে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় আপত্তি তুলে ধরতে হবে।

  • অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কার: শক্তি ও প্রযুক্তি খাতে মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নিয়ম সহজ করার মাধ্যমে ব্যবসাকে সহজ করতে হবে। কৃষি যন্ত্রপাতির মতো মার্কিন পণ্যের শুল্ক ধাপে ধাপে কমিয়ে পারস্পরিক ঝুঁকি কমিয়ে ফেলতে হবে।

  • ট্রাম্প-পরবর্তী নীতি পরিবর্তন: বাইডেন প্রশাসন কিছু শুল্ক বহাল রাখলেও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা (নবায়নযোগ্য শক্তি অংশীদারিত্ব) ব্যবহার করে বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে পারে।

সর্বোপরি ট্রাম্পের পারস্পরিক শুল্ক নীতি বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি, বিশেষত তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। যদিও নীতির বিস্তৃত ফোকাসের কারণে তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত ছিল, তবুও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো রয়ে গেছে।

এগুলো মোকাবিলায় কূটনৈতিক নমনীয়তা, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সমন্বয় প্রয়োজন। বৈশ্বিক টেকসইতা প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা শক্তিশালী করে বাংলাদেশ ঝুঁকি হ্রাস ও দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা অর্জন করতে পারে।

লেখক: কোম্পানি সচিব, সিটি ব্যাংক পিএলসি

r1 ad
r1 ad
top ad image