সরকারি প্রাথমিকে অনলাইন ক্লাস চালু করা কতটা প্রাসঙ্গিক?

মো. সিদ্দিকুর রহমান

৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু শিক্ষার্থীরা সাধারণত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে থাকে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ নিম্নবিত্ত। খুবই নগণ্য সংখ্যক মধ্যবিত্ত জনগণের সন্তানরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। তবে আশাব্যঞ্জক বিষয় এই যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান শিশু মনোবিজ্ঞানসম্মত; বয়স, রুচি ও সামর্থ্য অনুযায়ী মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সহায়ক। বিধায় সচেতন নাগরিকদের সন্তানরা বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে।

তাছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শিশু শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও উচ্চশিক্ষিত মেধাবী। নানা প্রতিকূল অব্যবস্থাপনার মধ্যেও বিগত সময়ে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা এগিয়ে এসেছে।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুর মেধা বিনাশকারী বিশাল বই-খাতার বোঝা শিশু শিক্ষার্থীকে জ্ঞান অর্জনের নামে অজ্ঞ করে ফেলে। আমাদের অভিভাবক সমাজ তাদের সন্তানদের জ্ঞান অর্জনমুখী শিক্ষার চেয়ে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়াতে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন।

শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য জ্ঞান অর্জন। মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সার্বিক জ্ঞান যাচাই করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত। আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থায় নির্ধারিত প্রশ্ন বা পড়া মুখস্থ করে নম্বর অর্জনের মাধ্যমে মেধা যাচাই করা হয়। যার ফলে চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানাস্থানে উচ্চ নম্বর পাওয়া মেধাবীরা জ্ঞান অর্জনবিহীন শিক্ষার কারণে হোঁচট খাচ্ছে।

বিগত করোনাকালীন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সে সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনলাইন পাঠদান চালু করা হয়েছিল। অনলাইন পাঠদানে কিছুটা ঘাটতি পূরণ হলেও তৃণমূলের দরিদ্র মানুষের সন্তানদের তেমন কোনো অর্জন হয়নি। সাধারণত তাদের অধিকাংশই আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও অশিক্ষিত হওয়ায় অনলাইন ক্লাসের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস কেনা সম্ভব হয়নি। ফলে অনলাইন পাঠদানে উপকৃত হয়েছে ধনী ও শিক্ষিত শ্রেণির অভিভাবকদের সন্তানেরা— তেলা মাথায় তেল পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে।

সামগ্রিক শিক্ষার্থীদের পাঠের ঘাটতি পূরণে তেমন উন্নতি হয়নি। সকল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো ১০টি শনিবার কর্মদিবস করার বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। বাংলাদেশে শুধু প্রাথমিক নয়, সকল স্তরেই শিখন ঘাটতি বিদ্যমান।

বরং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃণমূল পর্যায়ে জবাবদিহিতা ও পরিদর্শন ব্যবস্থা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি জোরদার। এর ফলে বিশেষ করে জানুয়ারি ও রোজার বন্ধের পূর্ব পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিখন ঘাটতি তেমন হয়নি বললেই চলে। সরকারি ও বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অনেক প্রতিষ্ঠানেই রোজার ছুটির আগে মাত্র ২–৪টি শ্রেণির কার্যক্রম দৃশ্যমান ছিল। পূর্ণাঙ্গভাবে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা খুবই নগণ্য সংখ্যক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে।

বাংলাদেশের জনগণের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত। তাদের অধিকাংশই সাধারণ মোবাইল ব্যবহার করে। অপরদিকে ওয়াই-ফাই সকলের বাসা-বাড়িতে নেই। এ অবস্থায় নানা আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে সাধারণ মানুষের সন্তানদের অনলাইন ক্লাস করা বিঘ্নিত হবে।

এ প্রেক্ষাপটে কতিপয় পরামর্শ উপস্থাপন করছি:

১। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা।

২। সন্ধ্যার পর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা।

৩। বাসা-বাড়িতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর বাড়তি কর ধার্য করা, যাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমে।

৪। নবম-দশম শ্রেণি, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিষয়গুলো অনলাইনে পাঠদান করা।

৫। যেকোনো অবস্থাতেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনলাইন শিক্ষাদান কার্যক্রম চালু করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অনলাইনে পাঠদানের সুযোগ সকলের জন্য নিশ্চিত না করে এটি চালু করা হলে কার্যকর হবে না।

৬। আপদকালীন সময়ে অফিস-আদালতের সময়সূচি কমানো।

৭। বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা।

৮। যেহেতু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৬ সালের রোজার ছুটির আগে শিখন ঘাটতি অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম হয়েছে, সেহেতু শিশুদের জন্য ১০টি শনিবার স্কুল বন্ধ রাখার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দুপুর দেড়টার মধ্যে সমাপ্ত করা এবং কোনো অবস্থাতেই শিশু শিক্ষায় অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম চালু না করার জন্য পুনরায় অনুরোধ জানানো হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই শিখন ঘাটতি কাম্য নয়। রাষ্ট্রের কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছি।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

৯ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১১ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১১ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১২ দিন আগে