যুদ্ধ এবং ‘ফিল্ড মার্শাল’ তত্ত্ব

ড. মোহাম্মদ হাননান

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম ‘ফিল্ড মার্শাল’ ছিলেন জেনারেল আইয়ুব খান। তিনি যুগপৎ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন এবং দেশেরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সামরিক অভ্যুত্থান করে রাজনীতিবিদদের ‘গাদ্দার’ আখ্যা দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিজের কাছে নিয়েছিলেন।

একচ্ছত্র ক্ষমতা বলতে যা বোঝায়, আইয়ুব খানের হাতে তা-ই ছিল। কিন্তু খ্যাতির আকাক্সক্ষায় তিনি ‘জেনারেল’ থেকে ‘ফিল্ড মার্শাল’ হতে চাইলেন। ‘ফিল্ড মার্শাল’ হতে হলে একটা যুদ্ধ হতে হবে। ১৯৬৫ সালে তাই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল।

ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ১৭ দিন যুদ্ধ হয়েছিল। ভারতের সেনারা যখন ঘোষণা করলেন যে তারা লাহোরে গিয়ে চা খাবেন, তখন সম্বিত ফিরে পেলেন আইয়ুব খান। সোভিয়েত রাশিয়াকে ধরে তাসখন্দে ভারতের সঙ্গে সন্ধি করে আইয়ুব দেশে ফিরলেন।

যুদ্ধে যে পাকিস্তান হেরে গেছে, এটা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ জনগণকে বুঝতে দিলো না। তারা প্রচারণা-প্রোপাগান্ডা চালাতে লাগল— মাশাআল্লাহ, আসমান থেকে ফেরেশতা এসে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করেছে, পাকিস্তান তাই ‘জিতেগা’।

আইয়ুব খান দেখতে পেলেন, আমেরিকা তাকে গাছে উঠিয়ে দিয়ে মই সরিয়ে নিচ্ছে। তাই দ্রুত তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার শরণাপন্ন হলেন। এ ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি তার আস্থা ছিল। পরবর্তীকালে জেনারেল আইয়ুব খান তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন,

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ৩ এপ্রিল, ১৯৬৫ সালে। ... দাবা খেলার প্রাথমিক চালে সোভিয়েতের যে খ্যাতি রয়েছে, সেটা দেখলাম মিথ্যা নয়। [মুহম্মদ আইয়ুব খান: প্রভু নয় বন্ধু, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচি-ঢাকা-লাহোর, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা ২১৬]

তাসখন্দ (বর্তমান উজবেকিস্তানের রাজধানী, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ) থেকে আইয়ুব খান এমনভাবে ফিরলেন যেন পাকিস্তানের জনগণ তাকে ‘বিজয়ী বীর’ মনে করে। যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন। তাই নিজেই নিজেকে ‘ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করলেন।

ভারত এত বড় দেশ, অনেক বড় তার সেনাবাহিনী। কিন্তু সেখানেও ‘ফিল্ড মার্শাল’ বিরল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের সেনাবাহিনী যে শৌর্য-বীর্য দেখিয়ে পাকিস্তানকে পরাজিত করতে সমর্থ হয়েছিল, তার জন্য ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ ‘ফিল্ড মার্শাল’ উপাধি পেয়েছিলেন। ভারতে তিনিই প্রথম ‘ফিল্ড মার্শাল’। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রথম ভারতীয় সেনাপ্রধান কোদানদেরা মদপ্পা কারিয়াপ্পাকে অবশ্য ‘জাতির প্রতি দৃষ্টান্তমূলক সেবার প্রতি কৃতজ্ঞতা’ হিসেবে ১৯৮৬ সালে ‘ফিল্ড মার্শাল’ পদমর্যাদা দেওয়া হয়।

এদিকে পাকিস্তানে সেই ১৯৬৫ সালের পর ছয় দশকে আর ‘ফিল্ড মার্শাল’ নেই। সেভাবে যুদ্ধও হচ্ছে না ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। জাঁদরেল-জাঁদরেল জেনারেলরা কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো পরোক্ষভাবে পাকিস্তানে সেনা শাসনই চালিয়ে যাচ্ছেন।

আইয়ুব খানের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৯ মাস যুদ্ধ করেও ‘ফিল্ড মার্শাল’ হতে পারেননি। কারণ হাতেনাতে ধরা খেয়ে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। জেনারেল জিয়াউল হক, জেনারেল পারভেজ মোশাররফরাও ‘ফিল্ড মার্শাল’ হতে পারেননি। কিন্তু বাজিমাৎ করে দিলেন পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনির।

বর্তমান পাকিস্তানের অসীম ক্ষমতার অধিকারী আসিম। ইমরান খানকে জেলে ঢুকিয়ে পুতুল জারদারি-শাহবাজ-বিলওয়ালকে সামনে রেখে ঢাল হিসেবে তিনিই পাকিস্তান শাসন করছেন। এত ক্ষমতা, কিন্তু তাতেও পেট ভরে না! তাই একটা যুদ্ধ চাই। ১৯৬৫ সালের পর ২০২৫ সালে এসে প্রায় ৬০ বছর পর ভারত-পাকিস্তান আবার যুদ্ধ হলো শুধু একজন জেনারেলকে ‘ফিল্ড মার্শাল’ বানানোর জন্য!

মাত্র ছয় দিন (৪ মে থেকে ১০ মে) মেয়াদ ছিল এ ‘যুদ্ধে’র। আর এতেই গদগদ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মন্ত্রিসভা ২০ মে জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনিরকে ‘ফিল্ড মার্শাল’ বানানোর কথা ঘোষণা করে। করাচি থেকে প্রকাশিত দ্য ডনের বরাতে ঢাকার অনলাইন পোর্টাল ‘রাজনীতি ডটকম’ সে দিন দিবাগত রাতে এ খবরে জানিয়েছে, আইয়ুব খানের পর আসিম মুনীর প্রথম পাকিস্তানি, যিনি ‘ফিল্ড মার্শাল’ হলেন।

অথচ কাশ্মিরের পহেলগামে পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার জের ধরে দুই দেশের মধ্যেকার এই বিবাদকে ‘যুদ্ধ’ বলা যায় কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষকদের। এমনকি গত ১৬ মে খোদ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফই বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ থেকে দুর্দশা ছাড়া কিছুই পায়নি দুই দেশ’। [ঢাকার দৈনিক প্রথম আলো, ১৮ই মে ২০২৫]

মাত্র ছয় দিন যুদ্ধ করেই ‘ফিল্ড মার্শাল’ হয়ে গেলেন জেনারেল আসিম মুনির। অথচ তার পাপেট প্রধানমন্ত্রী শাহবাজই বলেছিলেন, এ যুদ্ধ থেকে দুর্দশা ছাড়া আর কিছুই পাননি তারা। যে যুদ্ধ দুর্দশা আনল, সেই যুদ্ধ করে কীভাবে একজন ‘ফিল্ড মার্শাল’ খেতাব পান?

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

৯ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১১ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১১ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১২ দিন আগে