গণভোট ও জনরায়: আশা-আশঙ্কার আগামীর বাংলাদেশ

জাকির আহমদ খান কামাল

গণতন্ত্রের ইতিহাসে গণভোট ও জনরায় এমন দুটি প্রক্রিয়া, যা সরাসরি জনগণের মতামতকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। প্রতিনিধি নির্বাচনের বাইরে গিয়ে কোনো বড় সাংবিধানিক, রাজনৈতিক বা নীতিগত বিষয়ে জনগণের সরাসরি সম্মতি নেওয়ার এই পদ্ধতি একদিকে যেমন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে, অন্যদিকে তেমনি ভুল ব্যবহার তৈরি করতে পারে গভীর বিভাজন ও অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে নানা প্রশ্ন ও আশঙ্কাও।

আশার জায়গাটি স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে আস্থার সংকট, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাব— এসব প্রেক্ষাপটে গণভোট জনগণকে নতুন করে সম্পৃক্ত করার সুযোগ দিতে পারে। বড় কোনো সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো বা সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয়ে জনরায় নেওয়া হলে তা সরকারের সিদ্ধান্তকে অধিকতর বৈধতা দিতে পারে। জনগণের সরাসরি সম্মতি থাকলে রাজনৈতিক বিরোধও অনেক ক্ষেত্রে প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও রাষ্ট্রচিন্তা জাগ্রত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

কিন্তু আশার পাশাপাশি আশঙ্কাও কম নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো তীব্র দলীয় প্রতিযোগিতা ও অবিশ্বাসে ভরা। গণভোট যদি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক না হয়, তবে তা নতুন করে বিতর্ক ও সংঘাত উসকে দিতে পারে। অর্থ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রচারণা, ভ্রান্ত তথ্যের বিস্তার এবং প্রশাসনিক পক্ষপাত থাকলে জনরায় প্রকৃত জনমত প্রতিফলিত করবে কি না—সে প্রশ্ন থেকেই যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আবেগনির্ভর প্রচার ও গুজব ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত ডেকে আনতে পারে।

আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো— গণভোটকে রাজনৈতিক কৌশলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা। ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী শক্তি যদি এটিকে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার মাধ্যম হিসেবে দেখে, তবে প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে। গণভোট তখন গণতন্ত্রের শক্তি না হয়ে বিভাজনের উৎসে পরিণত হতে পারে।

গণভোট ও জনরায় কার্যকর হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো এবং নাগরিকদের রাজনৈতিক আস্থা নিশ্চিত হতে পারে। ফলে দেশের জনগণ সচেতনভাবে, আবেগতাড়িত না হয়ে যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

গণভোট নিজেই কোনো যাদুকাঠি নয়—এটি একটি উপকরণ মাত্র। সঠিক হাতে ও সঠিক পরিবেশে থাকলে তা গণতন্ত্রকে গভীরতর করতে পারে; আর ভুল ব্যবহারে তা ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো— আশার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং আশঙ্কার ঝুঁকিগুলো আগেভাগেই নিয়ন্ত্রণে আনা।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কলাম লেখক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

৯ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১১ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১২ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১২ দিন আগে