প্রিয় শিক্ষক আরেফিন সিদ্দিক

বিল্লাল বিন কাশেম
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

শিক্ষকের স্থান সবচেয়ে উচ্চে। কারণ শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, শিক্ষার্থীর মানস গঠনের কারিগরও হয়ে ওঠেন। কেউ কেউ এমন থাকেন, যারা শিক্ষার্থী-শিক্ষকের সম্পর্কের সীমানা অতিক্রম করে এক অভিভাবক হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য, অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যার তেমনই একজন ছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) রাতের অন্ধকারে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গত কয়েকদিন শুধু দোয়া করা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। আজও ভাবতে পারছি না, তিনি আর নেই। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম— একজন মানুষ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও তার কর্ম, আদর্শ, শিক্ষা ও স্মৃতি রয়ে যায় আমাদের হৃদয়ে, প্রতিটি মুহূর্তে।

শিক্ষক হিসেবে অনন্য ছিলেন তিনি

আরেফিন স্যার ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যার ক্লাস করার ধরনই ছিল অনন্য। তার লেকচার এতটাই গুছানো, পরিপূর্ণ ও প্রাণবন্ত ছিল যে আলাদা করে বই বা নোট পড়ার প্রয়োজন হতো না। তিনি পাঠদান করতেন বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে। উদাহরণ দিতেন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু বিষয়বস্তু শিখত না, বরং তা হৃদয়ে ধারণ করত।

আমার শিক্ষকতা জীবনের শুরু ফার্স্ট ইয়ার থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত তার সান্নিধ্যে কাটানো সময়গুলো এক শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তিনি শুধু একাডেমিক জ্ঞানের শিক্ষা দেননি, দিয়েছেন বাস্তব জীবনে সৎ ও সাহসী থাকার দীক্ষা।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সম্পর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়ি, তখন থেকেই আরেফিন স্যারের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ। ক্লাসে তিনি শুধু পড়াতেন না, বরং শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতেন ভাবতে, প্রশ্ন তুলতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকতা শুধু পঠনপাঠনের বিষয় নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

আমার সাংবাদিকতা জীবনের এক যুগেরও বেশি সময় জুড়ে আমি স্যারের শিক্ষা কাজে লাগিয়েছি। যদিও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার পর তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ কমে গিয়েছিল, কিন্তু স্মরণ করা কখনো কমেনি।

স্মৃতির পাতায় এখনো ভাসে স্যারের ক্লাসের কথা। তিনি যখন ক্লাস নিতেন, তখন তার কথা, তার অভিব্যক্তি, তার শেখানোর ধরন আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। আজও স্যারের লেকচারগুলো মনে আছে। তার শিক্ষা ছিল এমন যে তা আজও পথ দেখায়।

একজন গুণী ও কৃতিমান ব্যক্তিত্ব

আরেফিন স্যারের জীবন এক সফলতার গল্প। তিনি শুধু শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক, একজন জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ এবং সর্বোপরি একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ।

তার কর্মজীবন শুরু হয় বুয়েটের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু তার প্রতিভা, নিষ্ঠা ও জ্ঞানের গভীরতা তাকে শুধু একজন কর্মকর্তা নয়, বরং দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে যোগ দেওয়ার পর তিনি হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীদের আইকন। তার গবেষণা, তার লেখনী, তার বক্তব্য—সবকিছুই ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য দিকনির্দেশনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে ভূমিকা

আরেফিন সিদ্দিক যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন। প্রশাসনিক জটিলতা, ছাত্র রাজনীতি, একাডেমিক উন্নয়ন— সবকিছুর সমন্বয় করতে হয়েছে তাকে।

তার সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটে, ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। একজন প্রশাসক হিসেবে তার কঠোরতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল শিক্ষার্থীদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা।

একজন ভিসি হিসেবে তার শত সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু তার সময়কালে অনেক দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে— এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, ভিসি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ক্লাস নেওয়া বন্ধ করেননি। কারণ শিক্ষকতা ছিল তার সবচেয়ে পছন্দের বিষয়।

সহজে কাছে যাওয়ার মতো একজন মানুষ

আমরা অনেক সময় দেখি, উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের কাছে যাওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু আরেফিন স্যার ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন সহজ-সরল, সবার কথা শুনতেন, সবার জন্য সময় দিতেন। শিক্ষার্থীরা যখন-তখন তার অফিসে যেতে পারত, নিজের সমস্যার কথা বলতে পারত।

এমন মানুষ সত্যিই বিরল, যিনি দায়িত্বের উচ্চতায় থেকেও সাধারণ শিক্ষার্থীর কাছে সহজে পৌঁছাতে পারেন।

স্মৃতির পাতায় অমলিন

আমার জীবনে তার সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। সেই প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে শেষ দিন পর্যন্ত, তার প্রতিটি উপদেশ, প্রতিটি কথোপকথন আমার মনে গেঁথে আছে।

স্মরণ করছি সেই মুহূর্তগুলো, যখন তিনি আমাদের ক্লাসে সত্যিকার অর্থে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। কখনো আমাদের মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি দায়িত্ব, এটি সমাজের দর্পণ।

শেষ দেখা এবং শেষ বিদায়

স্যারের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একটি অনুষ্ঠানে। কথা হয়েছিল, আবার দেখা হবে। কিন্তু সেই দেখা আর হলো না। আজ যখন তিনি নেই, তখন শুধু স্মৃতিগুলোই অবলম্বন।

স্যার নিশ্চয়ই দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অস্বস্তি আর দুঃখ নিয়েই বিদায় নিয়েছেন। তিনি আরও কিছুদিন আমাদের মাঝে থাকলে হয়তো আরও নতুন কিছু দেখতে পারতেন, আরও নতুন কিছু গড়ে দিতে পারতেন।

একজন মহীরুহ শিক্ষক

বড় হতে গেলে শুধু উচ্চতা অর্জন করলেই হয় না, প্রয়োজন সহনশীলতা, পরিশ্রম, ধৈর্য, ও সত্যের পথে অবিচল থাকা। আরেফিন স্যার ছিলেন সেই মহীরুহ, যার ছায়া শিক্ষার্থীদের মনে চিরকাল থাকবে।

রাজনীতি মানুষকে বিভক্ত করতে পারে। কিন্তু শিক্ষকতা এমন একটি জায়গা, যেখানে ভালো-মন্দ, মতাদর্শ ভুলে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গঠনের কাজ করতে হয়। আরেফিন স্যার এই কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন।

শেষ প্রার্থনা

আমরা শুধু দোয়া করতে পারি, আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। তার ভালো কাজগুলো কবুল করুন, তার ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমা করুন।

তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তার শিক্ষা, তার আদর্শ, তার অবদান চিরকাল আমাদের মনে থাকবে। একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন অভিভাবক হিসেবে, একজন প্রশাসক হিসেবে তিনি অনন্য ছিলেন এবং থাকবেন।

স্যার, আপনি বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে, আমাদের চিন্তায়, আমাদের কর্মে। আল্লাহ আপনাকে শান্তিতে রাখুন। আমিন।

লেখক: লেখক ও সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাবি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

[email protected]

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ছয় শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ছয়শো শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

বর্তমান সরকার হাম প্রতিরোধে সকল ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় না। তাহলে এক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে বাধা কোথায়? হামে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় না আনা হলে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব

৪ দিন আগে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুষ্টু লোক, স্বাস্থ‍্যমন্ত্রীর কোটি টাকা ও মিরাকল প্রতিমন্ত্রী

সাম্প্রতিক সময়ের তিনটি আলোচিত ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি দৃশ্য। চরিত্র আলাদা, সংলাপ আলাদা, কিন্তু প্রশ্ন একটাই— প্রকৃত সত্য কী? সবটাই যে সত্য, তা নয়। আবার সবটাই যে মিথ্যা, সেটিও বলা যায় না। আর এই ধূসর অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয় জনবিশ্বাসের।

৫ দিন আগে

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

১০ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১২ দিন আগে