বিশ্ব শিক্ষক দিবস

মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ অপরিহার্য

অধ্যাপক মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান
মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ অপরিহার্য

শিক্ষক মানুষকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করে দেশ ও জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার্থীর নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন আদর্শ শিক্ষকের সংস্পর্শে শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি যেমন বিকশিত হয়, তেমনি সে হয়ে ওঠে বিনয়ী, কল্যাণমুখী, সৃষ্টিশীল ও মানবিক মানুষ।

তাই মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় শিক্ষক সব সময়ই অপরিহার্য। শিক্ষকের অধিকার, মর্যাদা, দায়িত্ব ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশেষ আন্তঃসরকার সম্মেলনে ইউনেস্কো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যৌথভাবে ‘Recommendation concerning the Status of Teachers’ বা শিক্ষকের মর্যাদা-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সুপারিশ গ্রহণ করে। এতে শিক্ষকের অধিকার ও দায়িত্ব, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত মর্যাদা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়।

এই ঐতিহাসিক সুপারিশ গ্রহণের দিন ৫ অক্টোবরকে ১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে এ দিবসের ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে।

এবারের প্রতিপাদ্য— ‘Standing with Teachers: 60 years of protecting the profession, advancing its status and shaping our futures’। অর্থাৎ শিক্ষকতার পেশাকে সুরক্ষা দেওয়া, এর মর্যাদা এগিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার ওপর এবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু শিক্ষককে অভিনন্দন জানানোর দিন নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবারও দিন। শিক্ষকদের পেশাগত সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা মূল্যায়ন, তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে আলোচনা এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে করণীয় নির্ধারণের সুযোগও তৈরি করে এই দিবস।

শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়

শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়; এটি একটি মহান পেশা ও ব্রত। যুগে যুগে আদর্শ শিক্ষক জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞানপিপাসা সৃষ্টি করা, তাকে অনুসন্ধানী ও অধ্যবসায়ী করে তোলা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করাই একজন শিক্ষকের অন্যতম দায়িত্ব।

একজন শিক্ষককে তার বক্তব্য ও আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে হয়। শ্রেণিকক্ষে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পাঠদান করলে শিক্ষার্থীর আলাদা করে গৃহশিক্ষক বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসতে পারে। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে শেখাতে হবে, যাতে তারা মুখস্থনির্ভর না হয়ে জ্ঞান অনুসন্ধানে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

তবে একজন শিক্ষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করার পাশাপাশি তার জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন-ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা, পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষকের কর্মপরিবেশের সঙ্গে শিক্ষার মানের সম্পর্ক সরাসরি। আন্তর্জাতিকভাবেও শিক্ষকের কর্মপরিবেশ ও পেশাগত মর্যাদাকে মানসম্মত শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য

কতটা যুক্তিসঙ্গত?

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য এখনও একটি বড় সমস্যা। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করলেও এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের সমপর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা সব ক্ষেত্রে পান না।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা, পদোন্নতি, অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অথচ একজন শিক্ষার্থীর কাছে তার শিক্ষক সরকারি না বেসরকারি— এটি শিক্ষার মানের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কতটা যোগ্য, দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং শিক্ষাদানে নিবেদিত।

শিক্ষকদের মধ্যে এমন বৈষম্য রেখে একটি সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। তাই শিক্ষকতার পেশাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

জাতীয়করণই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

আমার বিবেচনায়, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা প্রয়োজন। তবে এটি একদিনে সম্ভব নয়। তাই জাতীয়করণের পথে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।

জাতীয়করণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। বর্তমানে সরকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের একটি বড় অংশসহ বিভিন্ন ভাতা প্রদান করছে। ফলে ধাপে ধাপে তাদের সুযোগ-সুবিধা সরকারি শিক্ষকদের সমপর্যায়ে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একই সঙ্গে অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তার জন্য পূর্ণাঙ্গ পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, সমযোগ্যতা ও সমঅভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে হবে।

তৃতীয়ত, যোগ্য বেসরকারি শিক্ষকদের শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে লিয়েন বা ডেপুটেশনে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা বোর্ড, নায়েম ও এনসিটিবিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ১৯৬৬ সালের ইউনেস্কো-আইএলও সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ওই সুপারিশে শিক্ষককে শুধু পাঠদানের কর্মী হিসেবে নয়, শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রয়োজন স্বাধীন শিক্ষা সার্ভিস কমিশন

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের বিকল্প নেই। এ জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘শিক্ষা সার্ভিস কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, মেধা, যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

কোনো অবস্থাতেই স্থানীয় প্রভাব বা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত একাডেমিক পরিদর্শন জোরদার করতে হবে। এতে শিক্ষার পরিবেশ, পঠন-পাঠনের মান এবং প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে হবে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দলাদলি ও রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও পেশাদার, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

একইভাবে সরকারি কলেজের আদলে বেসরকারি কলেজের জনবল কাঠামো প্রবর্তন করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা, দায়িত্ব ও পদমর্যাদার ক্ষেত্রে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিশ্লেষণ করে জরিপের ভিত্তিতে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দেওয়া উচিত।

অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ‘চাহিদাভিত্তিক’ পরিকল্পনা অনুসরণ করতে হবে। এতে একদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা বন্ধ হবে, অন্যদিকে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নে পর্যাপ্ত সম্পদ ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

জাতীয়করণের বিকল্প নেই

মানসম্মত শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। আর সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান কারিগর শিক্ষক। তাই শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত না করে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

আজকের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শুধু শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানালেই দায়িত্ব শেষ হবে না। তাদের অধিকার, মর্যাদা, পেশাগত নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য দূর করতে হবে।

ইউনেস্কো-আইএলওর সুপারিশের আলোকে শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করে একটি সমতাভিত্তিক, মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও পর্যায়ক্রমিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে হবে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এটাই আমাদের প্রত্যাশা— শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক, সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য দূর হোক এবং জাতীয়করণের মাধ্যমে একটি সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠুক।

লেখক : সাবেক ট্রেজারার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও সভাপতি, বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদ

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement