পরিবর্তিত বাংলাদেশ এবং অন্তর্বর্তী সরকার

বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা ফ্যাসিবাদ ও একনায়কোচিত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এসেছে অনেকটা নাটকীয়ভাবে। ভোটারবিহীন নির্বাচন, সীমাহীন দুর্নীতি, বাকস্বাধীনতা হরণের মতো ঘটনার ঘনঘটায় আচ্ছন্ন জাতি নবজাগরণের একটিমাত্র ফুলকিতে জ্বলে উঠেছে নতুনভাবে। গুলি, বোমা, সাঁজোয়া বহরের সামনে অকাতরে নিজের জীবন ঢেলে ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ জনতা এনেছে মুক্তির নতুন সূর্য। কিন্তু ফ্যাসিবাদ, একনায়তন্ত্রের পতনের মাত্র সাত মাস পরই দেশের মানুষের মনে উঁকি দিয়েছে শঙ্কার কালো মেঘ।
পুলিশ, প্রাশাসন, রাষ্ট্র কাঠামো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে ফুটপাথ— সবখানেই অবাঞ্ছিত বিশৃঙ্খলা। যেন এক অরক্ষিত জনপদ। বাইরে গিয়ে একটু ঠিক করে সাধারণ মানুষের চোখ-মুখে চাইলেই দেখা যায় ভীতি, অনিশ্চয়তা আর শঙ্কার ছায়া। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির আনন্দ, বিষাদের অন্ধকারে ঢাকতে খুব বেশি সময় নেয়নি।
মাত্র কিছুদিন আগে দেশে একের পর এক ছিনতাই, তারপর ডাকাতির মহড়া। শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিক শিশু হত্যা, ধর্ষণ। মব কিংবা মিরপুরের ফুটপাতে বিক্রেতার হাতে ক্রেতার উপর্যুপরি মার খাওয়া ও হেনস্তার সংবাদ। ধর্মকে বর্ম করে রাজনীতির ঘোরটোপ। সময়ের পালাবদলে অর্থনীতির হাত বদল। ফলশ্রুতিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া বন্ধ কারখানায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিক। সব মিলে জনজীবনে কোথায় যেন নীরব এক ছন্দপতন।
বিক্ষিপ্ত রাজনীতির মাঠে স্বপ্ন দেখানো নতুন দল, এমনকি দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়েও ওঠে প্রশ্ন। তবে সেই প্রশ্নে মুখোমুখি হয়ে বর্তমানের হালহকিকত, রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথাও শোনাচ্ছেন সরকারের অন্যতম প্রধান অংশীজন, সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলী। দেশকে কোন স্থান থেকে নিয়ে কোন স্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সরকার? কীভাবে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছেন তারা? কীভাবে হবে রাষ্ট্র সংস্কার? কোন পথে চলবে বিপ্লোবোত্তর বাংলাদেশ ও দেশের রাজনীতি?
বর্তমান সময় ও রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন সরকারের উপদেষ্টা আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। দেশের জনপ্রিয় টকশো ‘তৃতীয় মাত্রা’য় জিল্লুর রহমানের সরাসরি প্রশ্নের মুখে তিনি খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সরকার ও রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কথা। বর্তমানে দেশের রাজনীতি-সংস্কৃতিতে ঢালাও দোষারোপ ও ভারতপন্থি কিংবা পাকিস্তানপন্থি তকমা দিয়ে রাজনীতির মাঠে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করেন এ উপদেষ্টা।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, পাকিস্তানপ্রেমী-পাকিস্তানের এজেন্ট বলে আমার রুমে আগুন দেওয়া হয়েছে। আমার রুমে তালা দেওয়া হয়েছে। আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। কতবার আপনি টকশোতে বিভিন্ন লোককে বলতে শুনেছেন এসব কথা। অথচ রাতারাতি আমি হয়ে গেলাম ভারতের দালাল। আমার কাছে ফানি লাগে। এটা খুবই ফানি এক সোসাইটিতে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা যাওয়ার পর মিথ্যাভাবে পাকিস্তানপন্থি হিসেবে অভিহিত একটা লোক ১৫ দিনের মধ্যে ভারতের দালাল হয়ে গেল!
একটি ঘটনার বর্ণনাও তুলে ধরেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বলেন, ‘জামিল সাহেব (সৈয়দ জামিল আহমেদ) যখন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেলেন, সেদিন ২৪ ঘণ্টা প্রচারণা ছিল আমি ভারতের দালাল। তারপর তাজুল (মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম) যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চিফ প্রসিকিউর হিসেবে নিয়োগ পেল, ২৪ ঘণ্টা প্রচারণা ছিল আমি পাকিস্তানের দালাল। আমি কী বলব! ভেরি ক্লিয়ারলি বলি, আমি বাংলাদেশের দালাল। বাংলাদেশের স্বার্থের ঊর্ধে পৃথিবীর কোনো দেশ আমার কাছে কখনোই স্থান পায়নি। মিথ্যাচার-চরিত্রহনের মধ্যেও একটা সীমার ব্যাপার আছে। জবাবদিহিটা তো অন্য জিনিস। এই গালাগালি-মিথ্যাচার এসব অশ্লীল-অশ্রাব্য জিনিসের উত্তর তো দেওয়া যায় না!’
জিল্লুর রহমানের সঙ্গে আলাপচারিতায় বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন ড. আসিফ নজরুল। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দেশের চলমান সময়ে সামাজিকভাবে এক ধরনের ভয় তৈরি হয়েছে মব জাস্টিস নিয়ে। আপনি যদি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এর পেছনে কোনো প্রণোদনা আছে কি না? আমি বলব, নাই, জিরো। আপনি যদি বলেন, এটাকে দমন করার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা আছে কি না? হ্যাঁ, থাকতে পারে।’
আসিফ নজরুল আরও বলেন, ‘এটাকে দমন করার জন্য সরকারের যতটুকু কঠোরতা দেখানো দরকার ছিল, সেটা নিয়ে আপনি সমালোচনা করতে পারেন। সমালোচনার অবকাশ আছে, কেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা গেল না আট মাসে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্ভ আছে। একটা সময় খুব খারাপ থাকে। আবার একটু খারাপ হয়ে যায়। আমি জানি, এটা শুনলে হয়তো মনে হবে আমি ট্র্যাডিশনাল মন্ত্রীর মতো কথা বলছি। তবে আপনি যদি অপরাধের স্ট্যাটিস্টিকস দেখেন, তাহলে আমাদের অপরাধ প্রবণতা বাড়ে নাই, কিছু ক্ষেত্রে বরং কমেছে।’
সেনাবাহিনী নিয়ে বিতর্ক ও এর অবস্থান প্রসঙ্গে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রত্যেকটা জিনিস পারসপেক্টিভ অনুযায়ী দেখতে হবে। আমাদের যে সেনাপ্রধান আছেন, উনার একটি ঐতিহাসিক রোল ছিল এই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে। এটা কারও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা উচিত না। আমার কাছে মনে হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের প্রতি উনার প্রচণ্ড শ্রদ্ধাবোধ আছে। আমি এটা উইথ রেস্পেক্ট বলি, এই যে ইনক্লুসিভ ইলেকশন, এ ধরনের কথা যদি উনি না বলেন তবে এটা ভালো। অ্যাজ এ স্টেকহোল্ডার তিনি যদি বলেন, উনি যেহেতু লিড করছেন, বলতেই পারেন।’
বর্তমান সরকারের অবস্থান সম্পর্কে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘সরকারে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার আছে। সবাই মিলেই সরকার গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ আছে। তবে তারা এক উদ্দেশ্যেই কাজ করছেন। আর তা হলো— বাংলাদেশকে একটি স্ট্যাবল অবস্থানে নিয়ে আসা।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনার আমলে দুটি জিনিস খুব ঘৃণা করতাম। একটা হচ্ছে মালিকানার রাজনীতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল। অথচ এটি ছিল জনযুদ্ধ। আরেকটা হচ্ছে ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতি। এখন ধরেন এই মালিকানার রাজনীতি, ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতি— এগুলো ছাত্র সংগঠনের কারও কারও মধ্যে আছে কি না, সে প্রশ্ন তুলতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও আছে কি না, সে প্রশ্নও উঠতে পারে। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ওই প্রবণতা আছে কি না, এ প্রশ্নও আপনি তুলতে পারেন।
‘এখন ধরুন, আমরা ছাত্রদের বেশি ভালোবাসি। বেশি স্নেহ করি। আমরা ওদের থেকে খুব পারফেক্ট আচরণ আশা করি। কিন্তু জিল্লুর, একটা জিনিস খেয়াল করে দেখেন, আমার আপনার যখন ২৫-২৬ বছর ছিল, কত ভুল আমরা করতাম? আরও বেশি ভুল করতাম। সো, ওরা তো একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আসছে। শিখছে, জানার চেষ্টা করছে। আজ আপনি দেখেন, সার্জিস ১০০টা গাড়ির মিছিল নিয়ে যে প্রোগ্রামটা করেছে, তাসনীম যারা প্রশ্ন তুলেছে ফেসবুকে— সার্জিস, এটা তুমি ব্যাখ্যা করো। এই চর্চা কি আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক দলে ছিল? ছিল না। আমাদের অনেক এক্সপেক্টেশন, অনেক ভালোবাসা দেখে আমরা খুব কষ্ট পাই। কিন্তু আপনি পজিটিভ জিনিসটাও দেখেন,’— বলেন আসিফ নজরুল।
তিনি আরও বলেন, ‘আবার এটাও লক্ষ করেন, আজ মাহফুজ যেভাবে মবের বিরুদ্ধে, এই আপনার উন্মত্ততা, মানে তৌহিদী জনতার নামে উন্মত্ততা, এসবের বিরুদ্ধে মাহফুজ যে স্ট্যান্ডটা নিয়েছেন, যেভাবে নিন্দিত হয়েছেন স্ট্যান্ডটা নিয়ে, যেভাবে নিজেকে ভালনারেবল করেছেন, এই পজিটিভ সাইডগুলো দেখে আপনি কী বলবেন? বাংলাদেশের গায়ে যদি মৌলবাদ বা উগ্রবাদের তকমা লাগে, সবচেয়ে বেশি রেপুটেশন ক্ষতি কার হবে? ড. ইউনূসের হবে। আমরা দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। কিন্তু আমরা তো উগ্রবাদ পক্ষে কথা বলি নাই।’
দেশে নির্বাচন প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নের উত্তরে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমাদের আসিফ মাহমুদ (স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা) কিন্তু একটি স্ট্যাটাস দিয়েছে খুব স্ট্রংলি। সে বলেছে, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ইলেকশন হবে। জোর দিয়ে বলেছে। এ কথা বলার অধিকারই আমার নাই কবে ইলেকশন হবে। কারণ এটা উপদেষ্টা পরিষদের মিটিংয়ে আলোচিত হবে। বাট আমরা একটা ফ্যামিলির মধ্যে থাকলে আপনি ভাইবটা ধরতে পারেন। তো আসিফ ওই ভাইবটা ধরতে পেরে যে কথাটা বলেছে, আমারও তাই মনে হয় যে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে (নির্বাচনের) খুব সম্ভাবনা রয়েছে।’
লেখক: কবি ও জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক