উপকূলীয় পর্যটনই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন

বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক রূপান্তরের এক সন্ধিক্ষণে। গত দুই দশকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে তৈরি পোশাক, রেমিট্যান্স, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগরায়ননির্ভর প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে উঠেছে। তবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাতে হলে প্রবৃদ্ধির নতুন, টেকসই ও শ্রমঘন উৎস তৈরি অপরিহার্য। এ প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় পর্যটন হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে অব্যবহৃত কিন্তু সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক শক্তি।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ এবং প্রতি ১০টি চাকরির একটি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। অথচ বাংলাদেশে পর্যটনের অবদান এখনো প্রায় ৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ। কক্সবাজার, মেরিন ড্রাইভ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন ও মহেশখালী— এই পাঁচটি অঞ্চলকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করে একটি উপকূলীয় পর্যটন অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলা গেলে তা অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে গেম-চেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে এখনো পিছিয়ে। বছরে ৩০-৪০ লাখ দেশীয় পর্যটক এলেও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা নগণ্য। তুলনায় থাইল্যান্ড বছরে প্রায় চার কোটি বিদেশি পর্যটক থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে। আর মালদ্বীপ মাত্র ২০ লাখ পর্যটক থেকেই তার জিডিপির এক-চতুর্থাংশের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।

বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা মূলত অবকাঠামোর ঘাটতি নয়; বরং সমন্বিত গন্তব্য পরিকল্পনা, বহুমুখী পর্যটন পণ্য, আন্তর্জাতিক মানের সেবা এবং কার্যকর বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব।

এই করিডোরের শক্তি এর বৈচিত্র্যে। কক্সবাজারের সৈকত ও নগর পর্যটন, মেরিন ড্রাইভের নৈসর্গিক ল্যান্ডস্কেপ, শাহপরীর দ্বীপের শান্ত ও সীমান্তবর্তী চরিত্র, সেন্ট মার্টিনের প্রবালদ্বীপভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম এবং মহেশখালীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্বালানি হাব— সব মিলিয়ে একটি উচ্চমূল্যের পর্যটন গন্তব্য তৈরি করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, ক্রুজ টার্মিনাল, মেরিনা, কনভেনশন সেন্টার ও স্মার্ট সিটি ধারণা যুক্ত হলে বাংলাদেশ মৌসুমি পর্যটনের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে সারা বছরব্যাপী পর্যটনের পথে হাঁটতে পারবে। এতে পর্যটকের মাথাপিছু ব্যয় বাড়বে এবং আয় হবে গুণগত ও টেকসই।

এ উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুফল আসবে কর্মসংস্থানে। পর্যটন খাত অন্যতম শ্রমঘন শিল্প। হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, বিমান চলাচল, নিরাপত্তা, ট্যুর অপারেশন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও বিনোদন খাতে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হয়। পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য, হস্তশিল্প, নির্মাণ, লজিস্টিকস ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে পরোক্ষ কর্মসংস্থান আরও বহুগুণে বাড়ে।

একটি সমন্বিত উপকূলীয় পর্যটন করিডোর প্রথম দশকেই ৫০ থেকে ৭০ হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— এসব চাকরি তৈরি হবে স্থানীয় পর্যায়ে, যা উপকূলীয় এলাকার তরুণ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করবে।

একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয় বহুমাত্রিকভাবে বাড়বে— ভ্যাট, আয়কর, ভূমি ইজারা, বিমানবন্দর ও নৌবন্দর ফি এবং সেবা খাতের মাধ্যমে। পোশাক শিল্পের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস বৈচিত্র্যকরণেও পর্যটন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এ উন্নয়ন অবশ্যই পরিবেশবান্ধব ও সুপরিকল্পিত হতে হবে। উপকূলীয় ও সামুদ্রিক পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। অপরিকল্পিত নির্মাণ প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে পর্যটনের ভিত্তিকেই দুর্বল করতে পারে। তাই সেন্টমার্টিনে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ইকো-ট্যুরিজম, মহেশখালীতে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ, কক্সবাজারে কার্যকর সৈকত ব্যবস্থাপনা, আধুনিক বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিতে পর্যটক পুলিশ, স্মার্ট নজরদারি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।

সবশেষে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের অংশীদার না করলে এই প্রকল্প টেকসই হবে না। কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের ক্ষমতায়ন জরুরি। কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত একটি সমন্বিত উপকূলীয় পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলা গেলে তা হবে বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি পর্যটন প্রকল্প নয়, বরং একটি জাতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তরের মাইলফলক। সম্ভাবনা বিপুল, সময় উপযুক্ত। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, স্বচ্ছ পিপিপি বিনিয়োগ এবং সমন্বিত বাস্তবায়ন।

লেখক: ডেপুটি ডিরেক্টর (ফ্যাকাল্টি এইচআর), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি; সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

৯ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১১ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১১ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১২ দিন আগে