top ad image
top ad image
home iconarrow iconমতামত

আব্দুল খালেক: এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

আব্দুল খালেক: এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

আব্দুল খালেক এলাকায় চা বিক্রি করতেন। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার প্রবীণ এই মানুষটার মৃত্যুতে গ্রামের মানুষ দারুণ শোকাহত। কারণ চা বিক্রি করলেও অন্য যেকোনো মানুষের চেয়ে মনের দিক থেকে অনেক ধনী ছিলেন খালেক। তাই তো নিজের চা বিক্রির টাকা দিয়ে কেনা জমিটি এলাকায় একটি হাই স্কুল করার জন্য দিয়েছিলেন তিনি! তার কারণ, এলাকায় কোনো স্কুল ছিল না।

অনেক শিক্ষিত বা প্রভাবশালী মানুষ থাকলেও তাদের চেয়ে চা বিক্রেতা আব্দুল খালেকের মনটা অনেক বড় ছিল।‌ এখানেই তিনি অনন্য!

এই রমজান মাসে গত শুক্রবার দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে নিজ বাড়ি বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের নলুয়া চাঁদপুর (ডেবপুর) গ্রামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আব্দুল খালেক। বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয় তার। আমাকে ওই গ্রামের একজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, বৃদ্ধ বয়সেও তিনি চা বিক্রি করতেন এবং এলাকার স্কুল আর মানুষকে নিয়ে ভাবতেন!

নলুয়া চাঁদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মরহুম আব্দুল খালেক সমাজের জন্য অনুকরণীয়। তিনি কোটি টাকার মালিক ছিলেন না। চা দোকানের মালিক থেকে বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান সত্যিই সবাইকে বিমোহিত করেছে। তার এ স্কুল প্রত্যন্ত এলাকায় আলো ছড়াচ্ছে। তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।

এলাকাবাসী ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, বিয়ের কয়েক বছর পর খালেকের স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তার কোনো সন্তান ছিল না। চা বিক্রি করেই তার জীবন চলত। ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি চা বিক্রির টাকায় কেনা ৫২ শতক জমি দান করে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন আব্দুল খালেক। নলুয়া চাঁদপুর উচ্চ বিদ্যালয় নামের ওই স্কুলটি ২০১৯ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টির জায়গার পরিমাণ ৯৩ দশমিক ৫০ শতক।

জীবিত থাকতে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ও নানা বক্তব্যে আব্দুল খালেক বলতেন, এই এলাকায় স্কুল ছিল না। অন্ধকার ছিল। আলো ছড়ানোর জন্যই স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে জমি দিয়েছেন!

আমি সবসময় বলি, এই দেশের মূল সংকট মূল্যবোধের সংকট, মানবতার সংকট। আপনার আশপাশে দেখবেন অনেক সম্পদশালী আছে, অনেক সফল মানুষ আছে। কিন্তু সত্যিকারের মানুষের ভীষণ অভাব।‌ এর মধ্যেও দেখবেন গুটিকয়েক মানুষ আলোর দিশারী।

এমন মানুষদেরই একজন এই চা বিক্রি করে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা আব্দুল খালেক। আরও আছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে দই বিক্রি করে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা জিয়াউল হক, রাজশাহীর বইওয়ালা দাদুভাই পলান সরকার। আছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ৮০ বছর পল্লী চিকিৎসক খোরশেদ আলী, যিনি পরিবেশ রক্ষায় আর মানুষকে বজ্রপাত থেকে বাঁচাতে ৫২ হাজার তালগাছ লাগিয়েছেন। কিংবা ময়মনসিংহের জয়নাল আবেদিন, যিনি ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জমানো সব টাকা দিয়ে গ্রামের মানুষের জন্য হাসপাতাল ও স্কুল করেছেন!

এই মানুষগুলো কিংবা তাদের মতো নাম না জানা আরও যারা আছেন, যারা নিজের বদলে মানুষের কথা ভাবতেন, আমার কাছে এরাই সত্যিকারের মানুষ। এদের মতো মানুষের কারণেই এখনো এই সমাজ-রাষ্ট্র টিকে আছে। ভালোবাসা তাদের জন্য।

এ কারণেই আমি সবসময় নিজেকে বলি, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষার্থীদের কিংবা আমার সহকর্মীদের বলি— দেখুন, চারপাশে কত সফল মানুষ, সম্পদশালী মানুষ, কিন্তু সত্যিকারের মানুষের ভীষণ অভাব, যারা নিজের স্বার্থ না ভেবে আরেকজনের কথা ভাবে, সমাজ ও দেশের কথা ভাবে।‌

চলুন, আমরা তেমন মানবিক মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিবেকবোধ, মনুষ্যত্ববোধ দিক। এই দুটো থাকলে এই বাংলাদেশ বদলে যাবে! ভালো থাকুন সবাই! ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ!

লেখক: অভিবাসন বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট

r1 ad
r1 ad
top ad image