পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত প্রথম জেলা পাবনা

মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকালেই পাবনা জেলা শত্রুমুক্ত হয়। অপারেশন সার্চলাইটের শুরুতেই রুখে দাঁড়ায় পাবনাবাসী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে নেমে পড়ে। দুইদিনের যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয় এবং ২৯শে মার্চ পাবনা শত্রুমুক্ত হয়। আধুনিক মারণাস্ত্র সজ্জিত কথিত দুর্ধর্ষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশীয় অস্ত্রের পাবনাবাসী যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু এমন অসম যুদ্ধে বিজয়ের প্রেরণা পাবনাবাসী কোথায় পেল?
রাজনীতিতে পাবনা সবসময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাস সেই সাক্ষ্য দেয়। পাবনার নেতৃবৃন্দ জাতীয় রাজনীতিতেও অবদান রেখেছে। তারই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি বাঁকেই পাবনা ছিলো অগ্নিগর্ভ। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘... তোমাদের যার যাকিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। ... প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। ... এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশনায় দেশের অনেক জেলায় যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। মুক্তিপাগল বাঙালি স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও আয়োজন ছিলো পাবনায়।
১৫ই মার্চ ঢাকায় শুরু হয় মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা। দ্বিতীয় দিন থেকেই ছয়দফার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু অনমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করেন। তিনি পূর্ব বাংলার পরিবর্তে বাংলাদেশ শব্দ ব্যবহার করেন। প্রকৃতপক্ষে আলোচনার নামে ইয়াহিয়া কালক্ষেপণ করতে থাকে। আগে থেকেই সে সিদ্ধান্ত ছিল সামরিক কায়দায় বাঙালিদের দমন করবে। এজন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র গোলাবারুদ গোপনে ঢাকায় আনা হয়।
১৭ই মার্চ চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ খান সামরিক অভিযান পরিকল্পনা তৈরির জন্য লে. জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে নির্দেশ দেয়। পরদিন ঢাকা সেনানিবাসে জিওসি অফিসে বসে জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সামরিক অভিযান চূড়ান্ত করে। প্রকৃতপক্ষে সামরিক কায়দায় বাঙালিকে দমনের সিদ্ধান্ত হয় ২২শে ফেব্রুয়ারি। সামরিক অভিযান সফল করতে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তার দু’জন ঘনিষ্ঠ অফিসার মেজর জেনারেল ইখতেখার জানজুয়া ও মেজর জেনারেল এ.ও মিঠঠিকে ঢাকায় নিয়ে আসে।
৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু'র ঐতিহাসিক ভাষণের পর পাবনায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আমজাদ হোসেনকে (এমএনএ) আহবায়ক করে সাত সদস্যের সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন- আব্দুর রব বগা মিয়া (এমপিএ), আমিন উদ্দিন (এমপিএ), আওয়ামীলীগ নেতা দেওয়ান মাহবুবুল হক ফেরু ও গোলাম আলী কাদেরী, ন্যাপ নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশা এবং ছাত্রলীগ পাবনা জেলা শাখার সভাপতি আব্দুস সাত্তার লালু। ২৫শে মার্চের পর জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান ও পুলিশ সুপার চৌধুরী আব্দুল গফফারকে কমিটির সদস্য করা হয়।
প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ১লা মার্চ বেতার ভাষণে হঠাৎ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে। প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ১লা মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ৭ই মার্চের পর থেকে অসহযোগ আন্দোলন তীব্ররূপ ধারণ করে। পাবনায় শহরেও হরতাল, অবরোধ, মিটিং-মিছিল চলতে থাকে।
পাবনায় জেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে শহরের পাড়া-মহল্লায় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। তরুণ যুবকদের সংগঠিত করে তাদের জন্য ছাত্রলীগ সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। পাবনা জিলা স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়। এখানে প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন সেনাসদস্য জাহাঙ্গীর আলম সেলিম, অপর প্রশিক্ষক ছিলেন জিলা স্কুলের স্কাউট শিক্ষক মাওলানা কসিম উদ্দিন।
শহরের কাচারীপাড়ায় সাহারা ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় জিসিআই স্কুল মাঠের প্রশিক্ষণে প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন আনসার কমান্ডার আনোয়ার হোসেন ঘুটু। নয়নামতি অভিযান ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় চাঁদমারী মাঠের প্রশিক্ষণের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন আনসার কমান্ডার মোকাদ্দেস হোসেন ফুটু। রাধানগর অধিনায়ক ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় মক্তব পুকুরপাড়ের প্রশিক্ষণে প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন আনসার কমান্ডার খলিলুর রহমান। প্রশিক্ষণে বাঁশের লাঠি ও স্কাউটের ডামি রাইফেল ব্যবহার করা হয়। ১২ই মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ এসব পর্যন্ত প্রশিক্ষণ চলে।
২৫শে মার্চ ঢাকায় অপরেশন সার্চলাইট শুরু হয়। এই অপারেশনের প্রথম পরিকল্পনা ছিল- একযোগে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন শুরু করা। ২৫শে মার্চ গভীর রাতে রাজশাহী থেকে ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানি সৈন্য পাবনা বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থান নেয়। কোম্পানির কমান্ডিং অফিসার ছিলেন ক্যাপ্টেন আসগর, ডেপুটি কমান্ডিং অফিসার ছিলেন লেফটেন্যান্ট রশিদ। সুবেদার ও নায়েক সুবেদরসহ মোট ১৩০জন সৈন্য ছিলো। তারা ঝটিকা বেগে তারা পাবনা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করে।
২৬শে মার্চ ভোর থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহরে কারফিউ জারি করে। ওয়াপদার বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, টেলিগ্রাফ অফিস নিয়ন্ত্রণে নেয়। তারা খোলা জিপে মাইক বেঁধে কারফিউ জারির কথা প্রচার করতে থাকে। কারফিউর সময়ে জনসাধারণকে ঘরে থাকা ও দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। কেউ রাস্তায় বের হলে গুলি করা হবে বলে সতর্ক করা হয়। সকাল ১১টার দিকে হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। কারফিউ ঘোষণার আগেই যারা রাস্তায় বের হয়েছিল তাদের অনেকেই হতাহত হয়। পুরো শহরজুড়ে এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শহরে কী ঘটছে তা জানা বা বুঝার উপায় নেই। মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর টহল গাড়ির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। হানাদার বাহিনী পাবনা বাজারের পাহারাদা সরদার উজির খানকে গাড়িতে তুলে নেয়। তার সাহায্যে আওয়ামী লীগ নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাসা-বাড়ি চিনে নেয়।
উজির খানের সাহায্যে হানাদার বাহিনী বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের বাসায় অভিযান চালায়। তারা পাবনা মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি, ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া এলাকা থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ) অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে।
এছাড়াও ভাসানী ন্যাপের পাবনা জেলা সভাপতি ডা. অমলেন্দু দাক্ষী, রাধানগর তৃপ্তি নিলয় হোটেলের মালিক ও মটর ব্যবসায়ী সাঈদ তালুকদার, দিলালপুর মহল্লার আইনজীবী মোশাররফ হোসেন, ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক শফিকুল হায়দার, আইনজীবী মুছা মোখতার, ওষুধ কারখানা এডরুক লিমিটেডের মালিক আবদুল হামিদ খান, সিগারেট কোম্পানির এজেন্ট হাবিবুর রহমান, পৌরসভার ট্যাক্স কালেক্টর খালেক তালুকদার, কাপড় ব্যবসায়ী সাহাজ উদ্দিন মুন্সিসহ শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ গ্রেপ্তার করে।
শিল্পনগরী ইপিসিকের (বর্তমানে বিসিক) সেনাক্যাম্পে তাদের আটক রাখা হয়। জেলার আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও ছাত্রনেতারা নিরাপদ স্থান হিসেবে চর অঞ্চলে অবস্থান নেয়।
অন্য একটি ঘটনায় ২৫শে মার্চ শুকুর আলী নামে একজন নিহত হন। তিনি কৃষ্ণপুরের বাসিন্দা ছিলেন। ২৭শে মার্চ সন্ধ্যার পর কৃ্ষ্ণপুর মক্তব স্কুল মাঠে শুকুর আলীর জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় হানাদার বাহিনী জানাজার জামাতে মুসল্লিদের ওপর গুলি চালায়। গুলিতে শেখ আব্দুস সামাদ নামে একজন নিহত এবং মাওলানা ইব্রাহিম হোসেন ও শেখ বদিউজ্জামান নামে অপর দুইজন আহত হন।
কারফিউ জারি করে হানাদার বাহিনী ডিসি নূরুল কাদের খান এবং এসপি চৌধুরী আব্দুল গাফফারকে তলব করে এবং পুলিশ লাইনের সকল পুলিশকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেয়। ডিসি-এসপি তলবে সাড়া না দেওয়ায় হানাদার বাহিনী তাঁদের বাসভবনে অভিযান চালায়। কিন্তু এর আগেই ডিসি-এসপি বাসভবন ছেড়ে পাবনার দক্ষিণ দিকে চর রামচন্দ্রপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন মালিথার বাড়িতে আশ্রয় নেন। এই পরিস্থিতিতে চরঅঞ্চলের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা নবাব আলী মোল্লার সহযোগিতায় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা বৈঠকে বসেন। আমজাদ হোসেন, আব্দুর রব বগা মিয়া, ওয়াজি উদ্দিন খান, গোলাম আলী কাদেরী, রফিকুল ইসলাম বকুল, ফজলুল হক মন্টু তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
বৈঠকে নেতারা পাবনায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। পাবনার ডিসি ওয়ারলেসের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবস্থান জানার চেষ্টা করে। এসপিকে সাথে নিয়ে তিনি পুলিশ লাইনের পুলিশ সদস্যদের আত্মসমর্পণ করতে নিষেধ করেন। ২৭শে মার্চ নেতৃবৃন্দ সারাদিন শহরের চারপাশে তরুণ যুবকদের সংগঠিত এবং লাইসেন্সকৃত দেশীয় বন্দুক সংগ্রহ করা হয়। বিভিন্ন পাড়ায় তরুণ-যুবকরা, লাঠি-ফালা, তীর-ধনুক এবং দেশী অস্ত্র সংগ্রহ করে।
২৭শে মার্চ গভীর রাতে ডিসি নূরুল কাদের খান, এসপি চৌধুরী আব্দুল গাফফার, আওয়ামী লীগ নেতা নবাব আলী মোল্লা, ছাত্রনেতা রফিকুল ইসলাম বকুল ও ফজলুল হক মন্টুর নেতৃত্বে শতাধিক যোদ্ধা চরাঞ্চল থেকে পুলিশ লাইনের দক্ষিণ দিকে অবস্থান নেন। ভোর রাতে হানাদার বাহিনী পুলিশ লাইনের পূর্ব ফটকে (বর্তমান পোস্ট অফিস) অবস্থান নিয়ে হ্যান্ডমাইকে পুলিশদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিতে থাকে। এ সময়ে ডিসি অফিসের ছাঁদ, জজকোর্টের দক্ষিণ পাশ এবং জিসিআই স্কুল এলাকা থেকে একযোগে প্রতিরোধ যোদ্ধারা গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশ লাইন থেকে পুলিশ সদস্যরাও গুলিবর্ষণ শুরু করে। একযোগে চারদিক থেকে গুলি শুরু হওয়ায় হানাদার বাহিনী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে থাকে।
পালানোর সময়ে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। একদল পালিয়ে বিসিক নগরীতে যায়, আরেক দল টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আটকা পড়ে। মুক্তিকামী জনতা আরো সাহসী হয়ে উঠে। তারা চারিদিক থেকে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ঘিরে ফেলে এবং হানাদার বাহিনীর ওপর গুলি চালাতে থাকে। এ সময়ে ডিসি ও এসপি'র নির্দেশে পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার খুলে দেওয়া হয়। অস্ত্র হাতে পেয়ে পুলিশ-ছাত্র-জনতা হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ জোরদার করে। সারারাত গুলি বিনিময়ের পর ভোর থেকে তুমুল আক্রমণ শুরু হয়। দুপুরের আগেই টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পতন ঘটে এবং এখানে অবস্থান নেওয়া ৩৩জন পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হয়।
২৮শে মার্চ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখল করার পর দুপুরে জনতা লস্করপুরে (বর্তমান বাস টার্মিনাল) সামরিক বাহিনীর চেকপোস্টে আক্রমণ চালায়। লস্করপুরে তিনজন এবং বালিয়াহালট গোরস্তানে দুইজন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। পাবনার বীর জনতা দেশীয় অস্ত্র নিয়েই রাস্তায় নেমে আসে। ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়া পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে সারা শহরজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। লস্করপুর যুদ্ধে শামসুল আলম বুলবুল (তাঁর নামানুসারেই সরকারী শহীদ বুলবুল কলেজ), আমিরুল ইসলাম ফুনু, মুকুল বেগ ও আফসার উদ্দিন নামে চারজন যোদ্ধা শহিদ হন। একদল যোদ্ধা নিয়ে রফিকুল ইসলাম বকুল নেতৃত্বে শহরের মধ্যেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়।
পাবনায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিপর্যস্ত অবস্থা খবর ওয়ারলেসে রাজশাহীতে ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টে পৌঁছে যায়। কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফকাত পাবনার সৈন্যদের উদ্ধারের জন্য ১৮জন সৈন্যসহ ডেপুটি কমান্ডিং অফিসার মেজর আসলামকে পাঠায়। মেজর আসলাম রিকোয়ার্লেস রাইফেল, মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্রসহ পিকআপ ও জিপ নিয়ে দুপুর ২টায় পাবনা পৌঁছায়। তখন বিসিক ঘিরে রেখেছিল হাজার হাজার মানুষ। মেজর আসলামের সাথে থাকা একটি পিকআপ থেকে জনতার ওপর মেশিনগানের ব্রাসফায়ার করতে থাকে। একইসাথে বিকট শব্দে আকাশে যুদ্ধবিমান টহল দেয়। ভয়ে মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে পড়ে। সুযোগ বুঝে আটক সৈন্যসহ প্রায় ৪০জনকে গাড়িতে নিয়ে মেজর আসলাম রাজশাহীর দিকে রওনা হয়। রাস্তার বিপদ এড়াতে একটি গাড়িতে তারা বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে নেয়। হেমায়েতপুর মানসিক হাসপাতালের পাশ দিয়ে হানাদার বাহিনী পাকশী অভিমুখে রওয়ানা হয়।
সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে পাবনায় জনতার বিজয়ের খবর আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এই খবরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হয়। ফলে পাকিস্তানি হানাদারদের পালানোর পথেও জনতা রুখে দাঁড়ায়। সামরিক গাড়িগুলো মাধপুর, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি হয়ে লালপুর পৌঁছানোর আগে ১৭টি স্থানে যুদ্ধ হয়। এসকল যুদ্ধেও অনেক পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। পলায়নরত পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মালিগাছা যুদ্ধে আটঘরিয়া থানার দারোগা আব্দুল জলিল শহিদ হন। মাধপুর, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি ও লালপুর পর্যন্ত প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রায় ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। তাঁরা হলেন- শহিদ রাজু, শহিদ আব্দুর রাজ্জাক, শহিদ ওহিদুর রহমান, শহিদ আব্দুল গফুর, শহিদ আলী আহমেদ, শহিদ নবাব আলী প্রমুখ।
এদিকে হানাদার বাহিনী নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে তাদের হাতে আটক নেতৃবৃন্দকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ২৯শে মার্চ বিসিক মুক্ত হওয়ার পর নবনির্বাচিত এমএনএ আমিন উদ্দিন, জেলা ন্যাপের সভাপতি ডা. অমলেন্দু দাক্ষী, মটর ব্যবসায়ী সাঈদ তালুকদার, রাজনসহ অনেকের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায়। দুইদিনের যুদ্ধে প্রায় ২৫ জন যোদ্ধা শহিদ হন। অপরদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মেজর আসলামসহ দেড় শতাধিক সৈন্য নিহত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কেউ প্রাণ নিয়ে রাজশাহীতে ফিরতে পেরেছিল বলে জানা নাই।
২৯শে মার্চ পাবনা পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয়। এদিনই পাবনার ঘরে ঘরে সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের মাঝে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উড়েতে থাকে। মুক্ত পাবনা প্রধানত রফিকুল ইসলাম বকুলের নির্দেশনায় প্রশাসন চলতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসন পরিচালনার জন্য ডিসি নুরুল কাদের খান, এসপি চৌধুরী আব্দুল গাফফার, মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল, ইকবাল হোসেন, আনসার কমান্ডারসহ নয় সদস্যের প্রশাসনিক ইউনিট গঠন করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রফিকুল ইসলাম বকুলের তত্ত্বাবধানেই প্রশাসন চলতে থাকে। ডিসি নূরুল কাদের খান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নামে সকল কার্যক্রম শুরু করেন।
শত্রু মুক্ত হওয়ার পরও বেশ কয়েকবার যুদ্ধবিমান থেকে পাবনা শহরে গোলাবর্ষণ করা হয়। জনযোদ্ধারা বিল্ডিংয়ের ছাঁদে উঠে বিমানের দিকে গুলি ছুড়তে থাকে। দুইদিনের যুদ্ধে পাবনায় ডিসি ও এসপি অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। অনেক সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীও যুদ্ধে অংশ নেন। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমজাদ হোসেন এমএনএ, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রব বগা মিয়া এমপিএ, ন্যাপনেতা আমিনুল ইসলাম বাদশা, রনেশ মৈত্র, আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম আলী কাদেরী, দেওয়ান মাহবুবুল হক ওরফে ফেরু, ওয়াজি উদ্দিন খান, নবাব আলী মোল্লা, পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুস সাত্তার লালু, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুলসহ অনেকেই যুদ্ধে বিশাল ভূমিকা রাখেন।
ছাত্র ইউনিয়নের রবিউল ইসলাম রবি ও শিরিন বানু মিতিলসহ তাঁদের নেতাকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে ছাত্রলীগের রফিকুল ইসলাম বকুল, ইকবাল হোসেন, সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, বেবী ইসলাম, মো. ইসমত, ফজলুল হক মন্টু, মোখলেছুর রহমান মুকুল, সাঈদ আকতার ডিডু প্রমুখ ছাত্রনেতা অনন্য ভুমিকা পালন করেন।
অপরদিকে পাবনা শহর ছাড়াও জেলার গুরুত্বপুর্ণ স্থানগুলোতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। উত্তরবঙ্গের সাথে সড়ক পথে ঢাকার প্রধান যোগাযোগ ছিল নগরবাড়ী-দিনাজপুর সড়ক। এই সড়কের দুইটি স্থানে ফেরিঘাট ছিলো। ঘাট দুইটি হলো- নগরবাড়ী ও বাঘাবাড়ী। দুইটি ফেরিঘাটেই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রনেতারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
পাবনা শত্রুমুক্ত হওয়ার পর নাগরবাড়িতে প্রতিরোধ জোরদার করার প্রয়োজন হয়ে পরে। রফিকুল ইসলাম বকুলের নেতৃত্বে দুইশত জন যোদ্ধা নগরবাড়ী ঘাটে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নগরবাড়ী ঘাটের প্রতিরোধ ভেঙে দিতে ৪ঠা এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিমান আক্রমণ চালায়। পুলিশ লাইনের অস্ত্র পেয়ে যোদ্ধারা সাহসী হয়ে উঠেছিল। তারাও ভূমি থেকে বিমানের দিকে গুলি ছুড়তে থাকে। পাবনায় যাতে পাকিস্তানিরা আর প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য পাকশীতে ডিসি নুরুল কাদের খান অবস্থান নেন।
রাজশাহীর পথেও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। উত্তরবঙ্গে যুদ্ধের জন্য নগরবাড়ী ঘাটে কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই নগরবাড়ী ঘাটের দখল নেওয়ার জন্য পাকিস্তানিরা মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রতিদিনই বিমান হামলা চলতে থাকে। ১০ই এপ্রিল বিমান আক্রমণের সাথে গানবোট নিয়ে নদীপথেও আক্রমণ চালায়। ভারী আর্টিলারি গান দিয়ে মর্টার নিক্ষেপ করতে থাকে। চতুর্মুখী আক্রমণে যোদ্ধারা পর্যদুস্ত হয়ে অবস্থান ত্যাগ করে। অবশেষে নগরবাড়ী ঘাটের পতন ঘটে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দখলে চলে যায়। ১১ই এপ্রিল, রোববার পাবনা শহর আবারো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দখলে চলে যায়।
মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাবনাবাসী বিজয়ী হওয়ার বিরল গৌরব অর্জন করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাবনার এই বিজয় এক অনন্য ইতিহাস। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাবনার প্রতিরোধ যুদ্ধ ছিল প্রথম জনযুদ্ধ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাবনার এই যুদ্ধ এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ২৯শে মার্চ থেকে ১২ই এপ্রিল, এই ১৩দিন পাবনা পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত ছিলো।
তথ্যসূত্র:
১. পাবনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের কথা, মো. জহুরুল ইসলাম বিশু, প্রকাশকাল- ২০০৯
২. পাবনার প্রথম প্রতিরোধের যুদ্ধ, আমিরুল ইসলাম রাঙা ৩. নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিল, মেজর সিদ্দিক সালিক
৪. পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে শ্বেতপত্র,
প্রকাশকাল- ৫ই আগস্ট, ১৯৭১, তথ্য ও জাতীয় বিষয়ক দপ্তর, পাকিস্তান সরকার
৫. আমিরুল ইসলাম রাঙা, পাবনা
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি)