জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে অপসারণ

আফসানা বেগম কি সংস্কারের শাস্তি পেলেন?

হাবিব বাবুল
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০১: ৫৩
কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

২০২৪ সালের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা বইকে পরিচিত করার প্রশ্নে তার নিষ্ঠা, দূরদৃষ্টি ও নিরলস পরিশ্রম আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ২০২৫ সালেও তিনি ফ্রাঙ্কফুর্টে এসেছিলেন একই প্রত্যয় নিয়ে—বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতকে আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত করার বাস্তব পরিকল্পনা হাতে নিয়ে। শুধু পরিকল্পনা নয়, অগ্রগতিও হচ্ছিল। এমন একজন মেধাবী ও উদ্যমী মানুষের হঠাৎ অব্যাহতি বিস্ময়করই নয়, গভীরভাবে হতাশাজনক।

বিষয়টি জানা ও বোঝার চেষ্টা করছিলাম। যা জানলাম তা হচ্ছে— কিছুসংখ‍্যক সুবিধাবাদী প্রকাশক, যারা স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে পরিচিত তাদের হাত রয়েছে। এছাড়া একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক কিছু প্রকাশনা সংস্থাও আফসানা বেগমের অপসারণের সঙ্গে যুক্ত।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সংস্কারের প্রত্যাশা থেকেই। তিনি দায়িত্বটিকে ব্যক্তিগত ক্ষমতা বা সুবিধা হিসেবে নেননি; নিয়েছিলেন নৈতিক দায় হিসেবে। মানহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বই কেনার বিরুদ্ধে অবস্থান, কোটার অপব্যবহার বন্ধ করা, ভালো বই যেন লাইব্রেরিতে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করা— এসবই ছিল তাঁর কাজের কেন্দ্রবিন্দু। জুলাইয়ের যে স্পিরিট— স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, জবাবদিহি— তা যেন নিম্নমানের বই-ব্যবসায় নষ্ট না হয়, সেই চেষ্টাই তিনি করেছিলেন।

এই প্রেক্ষাপটে বই নির্বাচন নীতিমালায় সচিব-মন্ত্রী কোটা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল সময়োপযোগী ও সাহসী। কারণ এই কোটাই বছরের পর বছর দুর্নীতি, তোষামোদ আর অপাঠ্য বই ঢোকানোর প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে— এ কথা প্রকাশনা জগতের সবাই জানেন। কিন্তু জানলেও মুখ খোলেন না অনেকেই। আফসানা বেগম সেই নীরবতা ভাঙতে চেয়েছিলেন। সংস্কারের কথা বলাই যদি অপরাধ হয়, তবে আমাদের সাংস্কৃতিক প্রশাসনের ভিত যে কতটা দুর্বল, সেটিই প্রমাণিত হয়।

৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংস্কার, সম্ভাবনা ও পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে একটি সেমিনার হওয়ার কথা ছিল। সিরডাপ মিলনায়তন বুক করা হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই রাতের অন্ধকারে পরপর দুটি প্রজ্ঞাপন— কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো জবাবদিহি নেই। অব্যাহতি। সঙ্গে সঙ্গে সেমিনার বাতিল। প্রশ্ন জাগে— সংস্কারের আলোচনা কি এতটাই ভয়ের, যে আলো জ্বালানোর আগেই সুইচ বন্ধ করে দিতে হয়?

এই পুরো ঘটনায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা, বিশেষ করে উপদেষ্টা ফারুকির অবস্থান গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একজন উপদেষ্টার কাছ থেকে আমরা আশা করি নীতিগত সততা, সংস্কারের সাহস এবং মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা। কিন্তু এখানে দেখা গেল উল্টো চিত্র— সংস্কারের প্রস্তাবকে শাস্তি দিয়ে দমন করা হলো। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; নীরবতা এখানে পক্ষ নেওয়া। আর সেই পক্ষটি দুর্নীতির সুবিধাভোগীদের।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কোনো রুটিন দপ্তর নয়। এটি একটি নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান, যেখানে সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে প্রজন্মের পাঠাভ্যাস, জ্ঞানের মান ও সাংস্কৃতিক স্বাস্থ্যে। সেখানে যদি কোটা ও তোষামোদই নিয়ামক হয়, তবে ভালো বই হারিয়ে যায়, লাইব্রেরি ভরে ওঠে অপাঠ্য আবর্জনায়। এই বাস্তবতা বদলানোর উদ্যোগকে যদি মন্ত্রী পর্যায়ের সমর্থন না মিলে, তবে প্রশ্ন উঠবেই— উপদেষ্টা কি সংস্কার চান, নাকি পুরোনো সুবিধাভোগী ব্যবস্থাকেই আগলে রাখতে চান?

অব্যাহতির পর আফসানা বেগম দায়িত্ব আঁকড়ে ধরেননি। কারণ আত্মসম্মান দিয়ে দায়িত্ব শুরু হয়েছিল, আত্মসম্মান দিয়েই তা শেষ হয়েছে। পরিচয় বা সম্মান তাঁকে নতুন করে বানাতে হয়নি— এই পরিচয় নিয়েই তাকে ডাকা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে কোনো পেশাগত ব্যর্থতার অভিযোগ নেই, আছে কেবল নীতিগত দৃঢ়তার ‘অপরাধ’। এটি ব্যক্তির নয়, একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা।

ফারুকি সাহেবের কাছে প্রশ্ন— সংস্কারের কথা বললেই যদি দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আসলে কী বার্তা দিচ্ছে? গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশ, নৈতিকতার যে নতুন দাবি— তা কি কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ? মেধাবীদের দমন করে, দুর্নীতির কোটাকে রক্ষা করে কি সংস্কৃতির উন্নয়ন সম্ভব?

এই ঘটনা একটি সতর্ক সংকেত। আজ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, কাল অন্য প্রতিষ্ঠান। যদি নীতিগত সততা শাস্তিযোগ্য হয়, তবে যোগ্য মানুষরা সরে যাবে, আর জায়গা নেবে তোষামোদকারীরা। এর দায় শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের নয়, রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের।

আমি এখনো বিশ্বাস করি— জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সংস্কারযোগ্য এবং তা হওয়া দরকার। সত্য বলার দরজা বন্ধ হলে, সেই সত্য আরও জোরে বলতে হয়। ফারুকি সাহেব, ইতিহাস নীরবতা মনে রাখে না— কাজ মনে রাখে। আপনি কোন পাশে দাঁড়ালেন, সেটাই একদিন মূল‍্যায়ন হবে।

লেখক: শুদ্ধস্বর ডটকমের প্রধান সম্পাদক, ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ভয়, পতন আর উৎসব: আমার দেখা ৫ আগস্ট

৫ আগস্ট রাতের সেই এক ধরনের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পরিস্থিতি একটা চাপা শঙ্কা তৈরি করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশেই যা দেখেছিলাম— দেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে ওঠা সেই অবর্ণনীয় আনন্দ— তা ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম।

৪ দিন আগে

কী দিয়েছে ৫ আগস্ট, কী দিতে পারেনি?

আজ ৫ আগস্ট ২০২৬। সেই দুপুরের ঠিক দুই বছর পর। যে মিছিল সেদিন শাহবাগ, শহিদ মিনার আর যমুনার সামনের রাস্তায় থেমে গিয়েছিল আনন্দ-উল্লাসে, তার পায়ের শব্দ আজও যেন মিলিয়ে যায়নি। বদলেছে সরকার, বদলেছে সংসদ, বদলেছে রাষ্ট্রের নথিপত্র। কিন্তু সেই দিনের প্রশ্নগুলো এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

৪ দিন আগে

৫ আগস্ট: ইতিহাস নির্মাণের গণঅভ্যুত্থান দিবস

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, রক্তক্ষয় এবং দেশ জুড়ে অশান্তির পর ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।

৫ দিন আগে

চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশ আজ আর সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নয়; বরং উদীয়মান একটি আঞ্চলিক অর্থনীতি। সেই বাস্তবতার আলোকে কূটনীতিও হতে হবে আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে, কিন্তু কারও প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে, বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অটু

৫ দিন আগে