
ফজলুল বারী

পুঁজিবাজারে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। একটি কোম্পানির লাখ লাখ শেয়ার বিক্রির জন্য প্রস্তুত, অথচ ক্রেতা নেই বললেই চলে। প্রতিদিনই প্রতীকী লেনদেনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হারে দর কমছে, কিন্তু তাতেও বাজারে উল্লেখযোগ্য ক্রয় আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম আলোচিত কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেড।
মাত্র আট কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ারদর ১১০ টাকা ১০ পয়সা থেকে নেমে এসেছে ৪৭ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে শেয়ারটির মূল্য কমেছে প্রায় ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে বিক্রয় আদেশের পরিমাণও দ্রুত বেড়েছে। যেখানে শুরুতে বিক্রির জন্য এক ইউনিট শেয়ার ছিল, সেখানে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৪৪১ ইউনিটে। সংখ্যার হিসেবে এটি বড় বৃদ্ধি হলেও বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। কারণ বিক্রেতা থাকলেও ক্রেতার দেখা মিলছে না।
এ অবস্থায় শেয়ারটি ইতোমধ্যেই ফোর্স সেলের আওতায় চলে এসেছে। সাধারণত মার্জিন ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা শেয়ারের মূল্য নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে ব্রোকারেজ হাউসগুলো শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয়ের চেষ্টা করে। কিন্তু বেক্সিমকোর ক্ষেত্রে সেই ফোর্স সেলও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। কারণ বাজারে ক্রেতা নেই। ফলে বিক্রির চাপ আরও বাড়ছে, অথচ চাহিদা তৈরি হচ্ছে না।
এখন বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কত টাকায় নামলে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারে ক্রেতাদের আগ্রহ তৈরি হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বাজারে নানা আলোচনা চলছে। তবে এসবের অধিকাংশই অনুমাননির্ভর। কোনো শক্তিশালী মৌলভিত্তিক বিশ্লেষণ বা নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নের ভিত্তিতে নয়, বরং বাজারের মনস্তত্ত্ব ও বিনিয়োগকারীদের ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এসব মতামত গড়ে উঠেছে।

একটি প্রচলিত ধারণা হলো, শেয়ারটির দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে নেমে এলে কিছু বিনিয়োগকারী আগ্রহী হতে পারেন। কারণ তখন অনেকের কাছে এটি ‘ডিপ ভ্যালু’ বা কম দামে কেনার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ফোর্স সেলের চাপ অব্যাহত থাকলে দাম আরও নেমে যেতে পারে। তবে এসবই বাজারভিত্তিক অনুমান। এর পেছনে কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন বা নিরীক্ষিত তথ্য নেই।
তবে বেক্সিমকো লিমিটেডকে শুধুমাত্র একটি সংকটাপন্ন শেয়ার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কোম্পানিটির ভেতরে এখনও উল্লেখযোগ্য সম্পদ ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা রয়েছে। এটি বেক্সিমকো গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত এই গ্রুপের বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে কোম্পানিটির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পে বেক্সিমকোর দীর্ঘ উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, এভিয়েশন, রিয়েল এস্টেট, ইঞ্জিনিয়ারিং, সিকিউরিটিজ এবং অন্যান্য খাতেও গ্রুপটির বিনিয়োগ রয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংক, পাওয়ার ও পেট্রোলিয়াম খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ, বেক্সটেক্সসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে বেক্সিমকোর ব্যবসায়িক সংযোগ বাজারে সুপরিচিত।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এত সম্পদ ও ব্যবসায়িক উপস্থিতি থাকার পরও কেন শেয়ারটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না?
এর প্রধান কারণ আস্থার সংকট। পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই সম্পদ পরিচালনার সক্ষমতা ও নেতৃত্বের প্রতি বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস। বেক্সিমকো লিমিটেডের ক্ষেত্রে অনেক বিনিয়োগকারীর ধারণা, কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে গ্রুপটির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর। সেই নেতৃত্বকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি শেয়ারদরে পড়ে।
বর্তমানে বাজারে বেক্সিমকোকে ঘিরে নানা ধরনের ফ্যালাসি, গুজব ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। কেউ এটিকে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাময় শেয়ার মনে করছেন, আবার কেউ এটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে দেখছেন। ফলে বাজারে একটি দ্বিধাবিভক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে বিক্রির চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য ক্রেতারা আরও কম দামের অপেক্ষায় রয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত বেক্সিমকো লিমিটেডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে দুটি বিষয়—প্রথমত কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা এবং দ্বিতীয়ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতা। কেবল দরপতন কোনো শেয়ারকে আকর্ষণীয় করে তোলে না। বিনিয়োগকারীরা জানতে চান, কোম্পানির আয়, সম্পদ, নগদ প্রবাহ ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা কতটা শক্তিশালী। সেই প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বেক্সিমকোর শেয়ারদরে স্থিতিশীলতা ফিরবে কি না, সেটিই এখন বাজারের সবচেয়ে বড় কৌতূহল।
দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের ঋণ নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ নেয়া হয়েছে প্রভাব খাটিয়ে প্রয়োজনীয় জামানত ছাড়াই। এমনকি বেক্সিমকো গ্রুপের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা পরিচালক ও সহযোগী কোম্পানির কাছে থাকা শেয়ার বন্ধক রেখেও ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে বেক্সিমকো গ্রুপের তালিকাভুক্ত কোম্পানি তিনটি। এগুলো হলো বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো) লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে গত বছরের নভেম্বর শেষে বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় বেক্সিমকোর ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বলে জানানো হয়েছিল। বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের। ব্যাংকটি থেকে ২৯টি কোম্পানির নামে ২৩ হাজার ৯১২ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা ঋণ গেছে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে। সালমান এফ রহমান নিজেই ওই ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ও বেনামি কোম্পানি তৈরি করে এ ঋণ নিয়েছেন তিনি। এছাড়া আর যেসব ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের বড় অংকের ঋণ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৩ হাজার ১৮২ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৮৩৯ কোটি, সোনালী ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৬৭৭ কোটি, এক্সিম ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৪৬৮ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৯ কোটি, রূপালী ব্যাংক থেকে ৯৬৫ কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে ১৭০ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৪৬ কোটি, ঢাকা ব্যাংক থেকে ১৩৭ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ৮৫ কোটি ও পদ্মা ব্যাংক থেকে ২৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। গ্রুপটির কাছে আরো কয়েকটি ব্যাংক ও সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ রয়েছে।
উল্লেখ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান নিজেই ‘দরবেশ’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন এবং বাংলাদেশের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির প্রায় সব ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। তিনি মানি লন্ডারিংসহ বেশ কয়েকটি মামলায় এখন বিচারের মুখোমুখি। বর্তমানে জেলে রয়েছেন। এদিকে বিনিয়োগকারীদের হাহাকার চলছে। এমন পরিস্থিতি তারা কল্পনাও করতে পারেননি। বেক্সিমকোর শেয়ার কিনে হাজার হাজার কোটি টাকা হারিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এখন নিঃস্ব। এই পরিস্থিতিতে সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কি কিছুই করণীয় নেই? একথা মনে রাখা দরকার, উদ্ভূত এই পরিস্থিতির জন্য বিনিয়োগকারীরাই শুধু দায়ী নন। তাই তাদের স্বার্থ রক্ষা করাটাও সরকারের দায়িত্ব।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

পুঁজিবাজারে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। একটি কোম্পানির লাখ লাখ শেয়ার বিক্রির জন্য প্রস্তুত, অথচ ক্রেতা নেই বললেই চলে। প্রতিদিনই প্রতীকী লেনদেনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হারে দর কমছে, কিন্তু তাতেও বাজারে উল্লেখযোগ্য ক্রয় আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম আলোচিত কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেড।
মাত্র আট কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ারদর ১১০ টাকা ১০ পয়সা থেকে নেমে এসেছে ৪৭ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে শেয়ারটির মূল্য কমেছে প্রায় ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে বিক্রয় আদেশের পরিমাণও দ্রুত বেড়েছে। যেখানে শুরুতে বিক্রির জন্য এক ইউনিট শেয়ার ছিল, সেখানে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৪৪১ ইউনিটে। সংখ্যার হিসেবে এটি বড় বৃদ্ধি হলেও বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। কারণ বিক্রেতা থাকলেও ক্রেতার দেখা মিলছে না।
এ অবস্থায় শেয়ারটি ইতোমধ্যেই ফোর্স সেলের আওতায় চলে এসেছে। সাধারণত মার্জিন ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা শেয়ারের মূল্য নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে ব্রোকারেজ হাউসগুলো শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয়ের চেষ্টা করে। কিন্তু বেক্সিমকোর ক্ষেত্রে সেই ফোর্স সেলও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। কারণ বাজারে ক্রেতা নেই। ফলে বিক্রির চাপ আরও বাড়ছে, অথচ চাহিদা তৈরি হচ্ছে না।
এখন বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কত টাকায় নামলে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারে ক্রেতাদের আগ্রহ তৈরি হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বাজারে নানা আলোচনা চলছে। তবে এসবের অধিকাংশই অনুমাননির্ভর। কোনো শক্তিশালী মৌলভিত্তিক বিশ্লেষণ বা নির্ভরযোগ্য মূল্যায়নের ভিত্তিতে নয়, বরং বাজারের মনস্তত্ত্ব ও বিনিয়োগকারীদের ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এসব মতামত গড়ে উঠেছে।

একটি প্রচলিত ধারণা হলো, শেয়ারটির দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে নেমে এলে কিছু বিনিয়োগকারী আগ্রহী হতে পারেন। কারণ তখন অনেকের কাছে এটি ‘ডিপ ভ্যালু’ বা কম দামে কেনার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ফোর্স সেলের চাপ অব্যাহত থাকলে দাম আরও নেমে যেতে পারে। তবে এসবই বাজারভিত্তিক অনুমান। এর পেছনে কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন বা নিরীক্ষিত তথ্য নেই।
তবে বেক্সিমকো লিমিটেডকে শুধুমাত্র একটি সংকটাপন্ন শেয়ার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কোম্পানিটির ভেতরে এখনও উল্লেখযোগ্য সম্পদ ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা রয়েছে। এটি বেক্সিমকো গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত এই গ্রুপের বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে কোম্পানিটির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পে বেক্সিমকোর দীর্ঘ উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, এভিয়েশন, রিয়েল এস্টেট, ইঞ্জিনিয়ারিং, সিকিউরিটিজ এবং অন্যান্য খাতেও গ্রুপটির বিনিয়োগ রয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংক, পাওয়ার ও পেট্রোলিয়াম খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ, বেক্সটেক্সসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে বেক্সিমকোর ব্যবসায়িক সংযোগ বাজারে সুপরিচিত।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এত সম্পদ ও ব্যবসায়িক উপস্থিতি থাকার পরও কেন শেয়ারটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না?
এর প্রধান কারণ আস্থার সংকট। পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই সম্পদ পরিচালনার সক্ষমতা ও নেতৃত্বের প্রতি বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস। বেক্সিমকো লিমিটেডের ক্ষেত্রে অনেক বিনিয়োগকারীর ধারণা, কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে গ্রুপটির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর। সেই নেতৃত্বকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি শেয়ারদরে পড়ে।
বর্তমানে বাজারে বেক্সিমকোকে ঘিরে নানা ধরনের ফ্যালাসি, গুজব ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। কেউ এটিকে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাময় শেয়ার মনে করছেন, আবার কেউ এটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে দেখছেন। ফলে বাজারে একটি দ্বিধাবিভক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে বিক্রির চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য ক্রেতারা আরও কম দামের অপেক্ষায় রয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত বেক্সিমকো লিমিটেডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে দুটি বিষয়—প্রথমত কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা এবং দ্বিতীয়ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতা। কেবল দরপতন কোনো শেয়ারকে আকর্ষণীয় করে তোলে না। বিনিয়োগকারীরা জানতে চান, কোম্পানির আয়, সম্পদ, নগদ প্রবাহ ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা কতটা শক্তিশালী। সেই প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বেক্সিমকোর শেয়ারদরে স্থিতিশীলতা ফিরবে কি না, সেটিই এখন বাজারের সবচেয়ে বড় কৌতূহল।
দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের ঋণ নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ নেয়া হয়েছে প্রভাব খাটিয়ে প্রয়োজনীয় জামানত ছাড়াই। এমনকি বেক্সিমকো গ্রুপের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা পরিচালক ও সহযোগী কোম্পানির কাছে থাকা শেয়ার বন্ধক রেখেও ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে বেক্সিমকো গ্রুপের তালিকাভুক্ত কোম্পানি তিনটি। এগুলো হলো বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো) লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে গত বছরের নভেম্বর শেষে বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় বেক্সিমকোর ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বলে জানানো হয়েছিল। বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের। ব্যাংকটি থেকে ২৯টি কোম্পানির নামে ২৩ হাজার ৯১২ কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা ঋণ গেছে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে। সালমান এফ রহমান নিজেই ওই ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ও বেনামি কোম্পানি তৈরি করে এ ঋণ নিয়েছেন তিনি। এছাড়া আর যেসব ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের বড় অংকের ঋণ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৩ হাজার ১৮২ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৮৩৯ কোটি, সোনালী ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৬৭৭ কোটি, এক্সিম ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৪৬৮ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৯ কোটি, রূপালী ব্যাংক থেকে ৯৬৫ কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে ১৭০ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৪৬ কোটি, ঢাকা ব্যাংক থেকে ১৩৭ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ৮৫ কোটি ও পদ্মা ব্যাংক থেকে ২৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। গ্রুপটির কাছে আরো কয়েকটি ব্যাংক ও সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ রয়েছে।
উল্লেখ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান নিজেই ‘দরবেশ’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন এবং বাংলাদেশের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির প্রায় সব ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। তিনি মানি লন্ডারিংসহ বেশ কয়েকটি মামলায় এখন বিচারের মুখোমুখি। বর্তমানে জেলে রয়েছেন। এদিকে বিনিয়োগকারীদের হাহাকার চলছে। এমন পরিস্থিতি তারা কল্পনাও করতে পারেননি। বেক্সিমকোর শেয়ার কিনে হাজার হাজার কোটি টাকা হারিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এখন নিঃস্ব। এই পরিস্থিতিতে সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কি কিছুই করণীয় নেই? একথা মনে রাখা দরকার, উদ্ভূত এই পরিস্থিতির জন্য বিনিয়োগকারীরাই শুধু দায়ী নন। তাই তাদের স্বার্থ রক্ষা করাটাও সরকারের দায়িত্ব।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

সাম্প্রতিক সময়ের তিনটি আলোচিত ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি দৃশ্য। চরিত্র আলাদা, সংলাপ আলাদা, কিন্তু প্রশ্ন একটাই— প্রকৃত সত্য কী? সবটাই যে সত্য, তা নয়। আবার সবটাই যে মিথ্যা, সেটিও বলা যায় না। আর এই ধূসর অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয় জনবিশ্বাসের।
৫ দিন আগে
ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
১০ দিন আগে
প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ
১২ দিন আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১২ দিন আগে