
এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

‘ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ’— এমনটাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট। যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান অবস্থায় ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এখন আর শুধুমাত্র সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি শক্তি পুনর্বিন্যাসের এক তীব্র লড়াইয়ে রূপ নিতে যাচ্ছে বলেই বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। এই যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে তেল, গ্যাস, সরবরাহপথ এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। বর্তমান বিশ্বে তেল আর কেবল একটি পণ্য নয়, এটি পরিণত হয়েছে এক শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে।
বিশ্বের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। এই গুরুত্বপূর্ণ পথটিতে চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে সরাসরি ধাক্কা দিচ্ছে। এর ফলে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, আর এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী আরও গভীর ও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে— যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান সংকটকে শুরুর দিকে আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন এই উত্তেজনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এবং জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর।
ইতোমধ্যে এক মাস পেরিয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের। এর প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘায়িত এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে, আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এই সংকটের প্রভাব থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশও।
দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশ তীব্র তেল সংকটের মুখে পড়তে পারে, যা দেশকে গভীর সংকটের খাঁদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের জন্যও ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ, দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক এই গুরুত্বপূর্ণ রুটের ওপর নির্ভরশীল, যা মুম্বাই থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়। বাকি অংশ চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথে পরিচালিত হয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আন্ডারসি কেবল ডিজিটাল যোগাযোগের প্রধান ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক এসব সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যদিও ইরান সরাসরি এসব কেবল অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দেয়নি, তবে যুদ্ধপ্রভাবিত অঞ্চলে যে কোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এই সাবমেরিন কেবল। ফলে ভারতের ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের বড় অংশই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে, সমুদ্রতলের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা এখন বৈশ্বিক নতুন হুমকি হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, ‘আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হতে পারে।’ ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের সীমিত জ্বালানি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ফিলিং স্টেশন সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ায় বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন। সেখানে অল্প পরিমাণ জ্বালানি প্লাস্টিকের বোতলে বেশি দামে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতেও যানবাহনের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের জেরে ভয়ংকর চাপে পড়েছে বৈশ্বিক তেলের বাজার। অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। তেল সংকটের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলা ও অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ। জ্বালানির ব্যবহার কমাতে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সংকটময় এই মুহূর্তে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। অথচ, রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতে অনুমতি চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের দেওয়া চিঠির এখনো কোনো জবাব দেয়নি ওয়াশিংটন।
৩০ মার্চ সচিবালয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র জানান, ‘রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য ভারতকে একটি স্যাংশন ওয়েভার দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ঈদের আগের দিন আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সরকারের মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। আমরা অনুরোধ করেছি, অন্তত দুই মাসের বা ছয় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়া হোক।’ রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ডিজেলসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনতে বাংলাদেশের বিশেষ ছাড়ের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র— এমন আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও পেট্রোনাস (মালয়েশিয়া), ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। সামান্য কিছু ডিজেল ও অন্যান্য ফার্নেস অয়েল চীন ও ভারত থেকেও আমদানি করা হয়। আর ওমান, সৌদি আরব এবং বিশেষভাবে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। সম্প্রতি কিছু এলএনজি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের এফএসআরইউ বা ফ্লোটিং টার্মিনালগুলো মূলত মার্কিন প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা নয়— এটি একটি বিকাশমান অর্থনীতি, যার ট্রেড ভলিউম ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনেক বেশি। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে গোলাগুলি নয়; এটি বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এবং অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে দেশের ডিজেল, অকটেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে। এর ফলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প— সব খাতেই ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি পায়।
এই সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান এখন আর বিকল্প নয়— অপরিহার্য।
সরকারের করণীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে, কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো সময়ের দাবি। অন্যদিকে পেট্রল পাম্প মালিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে— কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মুনাফা থেকে বিরত থেকে সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি তেল সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে— একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এখনই বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে— অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো, গণপরিবহন ব্যবহার বৃদ্ধি, এবং ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প খোঁজা প্রয়োজন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তত ৩–৬ মাসের জ্বালানি মজুত গড়ে তোলাও জরুরি।
আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল না কিনে সচেতনভাবে ব্যবহার করলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব— এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
লেখক: কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

‘ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ’— এমনটাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট। যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান অবস্থায় ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এখন আর শুধুমাত্র সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি শক্তি পুনর্বিন্যাসের এক তীব্র লড়াইয়ে রূপ নিতে যাচ্ছে বলেই বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। এই যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে তেল, গ্যাস, সরবরাহপথ এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। বর্তমান বিশ্বে তেল আর কেবল একটি পণ্য নয়, এটি পরিণত হয়েছে এক শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে।
বিশ্বের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। এই গুরুত্বপূর্ণ পথটিতে চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে সরাসরি ধাক্কা দিচ্ছে। এর ফলে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, আর এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী আরও গভীর ও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে— যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান সংকটকে শুরুর দিকে আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন এই উত্তেজনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এবং জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর।
ইতোমধ্যে এক মাস পেরিয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের। এর প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘায়িত এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে, আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এই সংকটের প্রভাব থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশও।
দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশ তীব্র তেল সংকটের মুখে পড়তে পারে, যা দেশকে গভীর সংকটের খাঁদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের জন্যও ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ, দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক এই গুরুত্বপূর্ণ রুটের ওপর নির্ভরশীল, যা মুম্বাই থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়। বাকি অংশ চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথে পরিচালিত হয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আন্ডারসি কেবল ডিজিটাল যোগাযোগের প্রধান ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক এসব সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যদিও ইরান সরাসরি এসব কেবল অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দেয়নি, তবে যুদ্ধপ্রভাবিত অঞ্চলে যে কোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এই সাবমেরিন কেবল। ফলে ভারতের ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের বড় অংশই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে, সমুদ্রতলের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা এখন বৈশ্বিক নতুন হুমকি হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, ‘আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হতে পারে।’ ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের সীমিত জ্বালানি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ফিলিং স্টেশন সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ায় বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন। সেখানে অল্প পরিমাণ জ্বালানি প্লাস্টিকের বোতলে বেশি দামে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতেও যানবাহনের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের জেরে ভয়ংকর চাপে পড়েছে বৈশ্বিক তেলের বাজার। অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। তেল সংকটের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলা ও অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ। জ্বালানির ব্যবহার কমাতে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সংকটময় এই মুহূর্তে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। অথচ, রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতে অনুমতি চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের দেওয়া চিঠির এখনো কোনো জবাব দেয়নি ওয়াশিংটন।
৩০ মার্চ সচিবালয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র জানান, ‘রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য ভারতকে একটি স্যাংশন ওয়েভার দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ঈদের আগের দিন আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সরকারের মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। আমরা অনুরোধ করেছি, অন্তত দুই মাসের বা ছয় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়া হোক।’ রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ডিজেলসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনতে বাংলাদেশের বিশেষ ছাড়ের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র— এমন আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও পেট্রোনাস (মালয়েশিয়া), ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। সামান্য কিছু ডিজেল ও অন্যান্য ফার্নেস অয়েল চীন ও ভারত থেকেও আমদানি করা হয়। আর ওমান, সৌদি আরব এবং বিশেষভাবে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। সম্প্রতি কিছু এলএনজি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের এফএসআরইউ বা ফ্লোটিং টার্মিনালগুলো মূলত মার্কিন প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা নয়— এটি একটি বিকাশমান অর্থনীতি, যার ট্রেড ভলিউম ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনেক বেশি। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে গোলাগুলি নয়; এটি বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এবং অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে দেশের ডিজেল, অকটেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে। এর ফলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প— সব খাতেই ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি পায়।
এই সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান এখন আর বিকল্প নয়— অপরিহার্য।
সরকারের করণীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে, কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো সময়ের দাবি। অন্যদিকে পেট্রল পাম্প মালিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে— কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মুনাফা থেকে বিরত থেকে সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি তেল সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে— একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এখনই বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে— অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো, গণপরিবহন ব্যবহার বৃদ্ধি, এবং ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প খোঁজা প্রয়োজন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তত ৩–৬ মাসের জ্বালানি মজুত গড়ে তোলাও জরুরি।
আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল না কিনে সচেতনভাবে ব্যবহার করলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব— এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
লেখক: কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মেধার পক্ষে দাঁড়ানো মানে শুধু পরীক্ষার্থীর পক্ষে দাঁড়ানো নয়; এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নৈতিক মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানো। এখন সাহসী সিদ্ধান্তের সময়— রাষ্ট্রকে মেধার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
৫ দিন আগে
সম্ভবত সেই দিক বিবেচনায় আজ শনিবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইমরানুল হাসান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকার চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজার হতে প্রয়োজনীয় তেল ক্রয় করছে। ফলে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই। দ
৭ দিন আগে
প্রতিমন্ত্রী যখন বলেছেন প্রতিদিন সরকারের ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার কথা, তখন ধরে নেওয়া যায় যে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো কর্মকর্তা হিসাবটি তাকে জানিয়েছেন। কিন্তু সেটি কীভাবে, সে বিষয়টি প্রতিমন্ত্রী তথা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা দরকার, যেন এ নিয়ে গণবিভ্রান্তির অবসান ঘটে।
৭ দিন আগে
মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঘোষণা বা একটি ঘটনার ফল নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং একটি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের চূড়ান্ত রূপ। এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব, প্রেরণা, ত্যাগ ও সাহস— সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস।
৮ দিন আগে