আপনার ভোট: অধিকার নাকি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা?

এম ডি মাসুদ খান

বাংলাদেশ একটি সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় একজন নাগরিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার হলো ভোটাধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো— আমরা অনেক সময় এই মূল্যবান অধিকারটিকে আবেগ, অভ্যাস কিংবা তথাকথিত ‘বিকল্প নেই’ মানসিকতার কাছে সমর্পণ করে দিই। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এখনই সময় নিজের ভোট, নিজের দায়িত্ব এবং নিজের অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাববার।

প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা প্রায় একই চিত্র দেখি। একাধিক প্রার্থী মাঠে নামেন, প্রচারণা চলে। কেউ বলেন, ‘আমি অমুক দলের প্রার্থী, আমার মার্কা অমুক— দোয়া করবেন।’ করমর্দন, কোলাকুলি আর সাময়িক সৌজন্যের মধ্য দিয়েই যেন জনগণ ও প্রতিনিধির সম্পর্কের সূচনা এবং সমাপ্তি ঘটে। ভোট গ্রহণ শেষ হলে সেই যোগাযোগও প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর জনগণের সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধির কোনো দৃশ্যমান সংযোগ থাকে না— এটাই আমাদের পরিচিত বাস্তবতা।

গত কয়েক দশকের নির্বাচনি অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— নির্বাচনের আগে ব্যক্তি প্রার্থী নয়, দলই হয়ে ওঠে মুখ্য; আর নির্বাচনের পরে জনগণ নয়, দলের এজেন্ডাই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র অগ্রাধিকার। অথচ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক নিরাপত্তা— এই মৌলিক বিষয়গুলোর ওপরই একজন নাগরিকের জীবনমান নির্ভর করে। দুঃখজনকভাবে, এসব খাতে বাস্তব ও টেকসই পরিবর্তন খুব কম ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো— নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে আমরা খুব কমই কোনো লিখিত অঙ্গীকার পাই। আগামী পাঁচ বছরে-

১। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে তিনি কী করবেন,

২। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তাঁর নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী,

৩। এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা কী হবে,

৪। নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিতে তাঁর দায়বদ্ধতা কোথায়—

এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর সাধারণত অনুপস্থিত থাকে।

নেই বাধ্যতামূলক ইশতেহার, নেই সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, এমনকি নির্বাচনের পর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানানো বা জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে ক্ষমতায় গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় শক্তির ওপর নির্ভর করে অনেক ক্ষেত্রেই জনগণের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত থেকে যায়।

এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— ভোট দেওয়ার মাধ্যমেই কি একজন নাগরিকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? নাকি ভোট দেওয়ার আগেই প্রশ্ন করা, যাচাই করা এবং দাবি তোলাও নাগরিক দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ?

একজন সচেতন নাগরিক কখনোই অন্ধ সমর্থক হতে পারেন না। সচেতন নাগরিক হওয়ার অর্থ হলো—

১। প্রার্থী ব্যক্তির যোগ্যতা, সততা ও অতীত ভূমিকা বিবেচনা করা; ২। দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে জনগণের স্বার্থে দাঁড়ানোর সাহস আছে কি না, তা যাচাই করা; ৩। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা বিষয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট কি না, তা জানা; ৪। প্রতিশ্রুতি আদায়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তোলা।

ভোট মানে শুধু ব্যালট পেপারে সিল মারা নয়। ভোট মানে নিজের অধিকার রক্ষা করা এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া। যে প্রার্থী বা যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিয়ে উদাসীন, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা একজন সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়— পরিবর্তন হঠাৎ আসে না; কিন্তু সচেতনতা থেকেই পরিবর্তনের সূচনা হয়। আজ যদি আমরা প্রশ্ন না করি, আজ যদি আমরা জবাবদিহি না চাই, তাহলে আগামী পাঁচ বছরেও হয়তো একই হতাশা আমাদের ঘিরে থাকবে।

এখানেই একজন সচেতন নাগরিকের আরেকটি দায়িত্ব সামনে আসে। যদি দেখা যায়—

  • কোনো প্রার্থীর নির্দিষ্ট ও লিখিত ইশতেহার নেই,
  • জবাবদিহির সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই,
  • নাগরিকদের সামনে দেওয়া বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি অনুপস্থিত,
  • তিনি জনগণের প্রতিনিধি না হয়ে কেবল দলের এজেন্ডার বাহক হিসেবে কাজ করেন,
  • নির্বাচনের আগে ফাঁকা বক্তব্য ছাড়া জনগণের সঙ্গে বাস্তব কোনো সংযোগ নেই,
  • এবং নির্বাচিত হওয়ার পর নাগরিককে কেবল করদাতা হিসেবে দেখেন—

তাহলে এমন প্রার্থীকে দেওয়া ভোট কোনো পরিবর্তনের হাতিয়ার নয়; বরং তা ক্ষমতাকে প্রশ্নহীন বৈধতা দেওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের ভোটটি রক্ষা করাই একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।

অতএব, নিজের প্রতি সুবিচার করুন। আবেগ নয়, বিবেচনা দিয়ে ভোট দিন। দল নয়, নাগরিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দিন। আপনার ভোট যেন ক্ষমতার অলংকার না হয়— বরং হোক জনগণের অধিকার আদায়ের শক্তিশালী হাতিয়ার।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ভাষা ও রাজনীতি— কী শেখাচ্ছেন এই প্রজন্মকে?

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো— এই ভাষা কেবল বেনামি অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ নয়; শিল্পী, শিক্ষক, লেখক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও জনপ্রিয় অনলাইন ব্যক্তিত্বদের মধ্যেও এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে কী ধরনের ভাষা ও সংস্কৃতির উদাহরণ রেখে যাচ্ছি?

৭ দিন আগে

বিশ্বকাপের উল্লাস: বিনোদন ও বিশ্বাসের সীমারেখা

কিন্তু যখন এই আনন্দ-উচ্ছ্বাস এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে ধর্মীয় প্রতীক, ঈমানের পরিচয় কিংবা পবিত্র বিশ্বাসকে বিনোদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করানো হয়, তখন বিষয়টি আর শুধুমাত্র খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন এটি বিবেক, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

৭ দিন আগে

জুলাইয়ে নারীর ভূমিকা ও প্রাপ্তি

জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে এই লেখার মাধ্যমে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং রাষ্ট্র, সমাজ ও ইতিহাসের কাছে দাবি রাখি— এই দেশ, এই ইতিহাস যেন তাদের নামেও উচ্চারিত হয়। দীর্ঘ জুলাইয়ে ঝরে যাওয়া অসংখ্য নারীর প্রাণ, যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও নারীদের লড়াই এখনো চলমান।

৯ দিন আগে

শিশুরা মেধাবী, আমরা কি তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ দিচ্ছি?

বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর— সবখানেই অসংখ্য মেধাবী শিশুর জন্ম হচ্ছে। তারা প্রশ্ন করতে জানে, নতুন কিছু ভাবতে জানে, স্বপ্ন দেখতে জানে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল সম্ভাবনার একটি বড় অংশ সঠিক পরিচর্যা, দিকনির্দেশনা ও সহায়ক পরিবেশের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

১১ দিন আগে