নির্বাচনের তফসিল পেছাবে?

শাহরিয়ার শরীফ
নির্বাচন কমিশনের লোগো

বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দলগুলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী হলে পুনঃতফসিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য তফসিল পেছানোর পক্ষে রোববার মত দেওয়ার পরদিনই কমিশনার রাশেদা এ কথা বললেন।

বিরোধী নেতার অনুরোধ এবং নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচন পেছানোর বিষয়টি এখন আলোচনার অন্যতম প্রসঙ্গ।

কমিশনার রাশেদা আরও বলেন, বিরোধীরা নির্বাচনে আসতে চাইলে সে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনকে জানাতে হবে। বিরোধীরা না জানালে তফসিল অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবল তফসিল পিছিয়ে দিলেই নির্বাচনে আসবে না বিএনপি। তাদের নির্বাচনে আনার একমাত্র পথ রাজনৈতিক সমঝোতা। পর্দার আড়ালে এমন সমঝোতা চেষ্টা চলছে বলে নানা সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে।

সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কমিশনার রাশেদা সুলতানা। তাঁর কাছে প্রশ্ন ছিল, বিএনপি নির্বাচনে আসতে চাইলে তফসিল পেছানো হবে কি না?

জবাবে কমিশনার বলেন, ‘দেখেন, যদি ফিরতে চায়, আমার জানামতে পূর্বেও উনারা একটু পরেই এসেছিলেন এবং সুযোগটা পেয়েছিলেন। উনারা যদি ফিরতে চান, কীভাবে কী করা যাবে, নিশ্চয়ই আমরা আলোচনা করব। সিদ্ধান্ত নেব। উনারা সিদ্ধান্ত নিলে, আসতে চাইলে অবশ্যই আমরা ওয়েলকাম করব। আমরা কমিশনাররা বসব। আইন-কানুন দেখব, তারপর যেটা সিদ্ধান্ত হয়।’

সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় একটি শূন্যতা থেকেই যাচ্ছে বলেও এ সময় মন্তব্য করেন রাশেদা সুলতানা।

বিএনপিসহ সব দলকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে গত ১৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে সব দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সর্বদা স্বাগত জানাবে। পারস্পারিক প্রতিহিংসা, অবিশ্বাস ও অনাস্থা পরিহার করে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা ও সমাধান অসাধ্য নয়।’

তফসিল পেছানোর আলোচনা রাজনৈতিক মহলে ছড়িয়ে পড়লেও সংলাপ বা আলোচনার বিষয়টি এখনো পর্দার আড়ালে রয়ে গেছে। তবে মন্ত্রিসভা ছোট করা, তফসিল পেছানো, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের জামিন দেওয়া এবং সংলাপ আয়োজন করার মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ কাজ করছে। এই সমঝোতা প্রক্রিয়ার আলোচনায় এসেছে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর বিষয়টিও।

গত ২৮ অক্টোবর দলীয় সমাবেশে ‘পুলিশি হামলা’ ও ‘নির্বিচারে’ গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ২৯ অক্টোবর থেকে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে আসছে বিএনপি। ইতোমধ্যে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় অধিকাংশ নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। একই কর্মসূচি পালন করছে জামায়াতে ইসলামী ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোটগুলো।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি বলেছে, একতরফা নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টার মধ্য দিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন দেশকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে সরকারের একতরফা নির্বাচন আয়োজনের সহায়ক ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন দেশের ৪৭ নাগরিক। এ অবস্থায় নির্বাচন উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি করতে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সোমবার বিবৃতি দিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তফসিল পিছিয়ে প্রকৃতপক্ষে কোনো লাভ হবে না। একটি রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে আসবে না। কারণ তাদের নির্বাচন করার লোক কোথায়?

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামিন আবেদনের শুনানি ২২ নভেম্বর ঠিক করেছেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক ফয়সাল বিন আতিক। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফখরুল ইসলামের আইনজীবীরা এর বিরোধিতা করেন। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে জামিন শুনানির নতুন দিন ঠিক করেন।

প্রধান বিচারপতির বাসভবনের ফটক ভেঙে ইটপাটকেল নিক্ষেপের মামলায় ২৯ অক্টোবর থেকে কারাগারে রয়েছেন মির্জা ফখরুল।

সোমবার এক সংবাদবিজ্ঞপ্তিতে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ২৮ অক্টোবর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত মোট গ্রেপ্তার ১৭ হাজার ১৮১ জন, মোট মামলা কমপক্ষে ৭২৪ এবং মোট মৃত্যু ১৫ জন।

২০১৫ সাল ও কাছাকাছি সময়ে দায়ের হওয়া ঢাকার দুটি ও রংপুরে একটি মামলায় সোমবার মোট বিএনপির ৫৪ নেতা-কর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রিজভী বলেন, ওই সময়ে ২০টি ‘মিথ্যা’ মামলায় নয়জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশসহ ১৫৩ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে।

এদিকে রোববার থেকে শুরু হওয়া ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ শেষে সোমবার অজ্ঞাত স্থান থেকে ভার্চুয়াল প্রেস ব্রিফিংয়ে আগামীকাল বুধবার ও বৃহস্পতিবার আরেক দফা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ ঘোষণা করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই ৪৮ ঘণ্টা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।’

বিরোধীদের কর্মসূচি প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘আপনারা জানেন বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা গত ৪৮ ঘণ্টায় ১৮টি যানবাহনে আগুন দিয়েছে। অবরোধ-হরতাল কেউ মানছে না, জনগণ এমন কি বিএনপির সমর্থকদেরও এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা নাই। রুহুল কবির রিজভী সাহেব অনলাইনে এসে যে কর্মসূচি ঘোষণা করছেন এগুলো আসলে গাড়ি পোড়ানো কিংবা সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তিতে আগুন দেয়ার কর্মসূচি ছাড়া অন্য কোনো কিছু নয়।’

সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সমসাময়িক বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে, তাতে বিএনপির নির্বাচন বর্জনের ডাক ঢাকা পড়ে গেছে। এখন নির্বাচন উৎসব আমেজ শুরু হয়ে গেছে।’

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা কি টেকসই শান্তিচুক্তিতে রূপ নেবে?

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির শঙ্কা— যে দুটি বিষয়কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন— সেগুলো এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ইঙ্গিত মিলছে, কাঠামোগত চুক্তির পরবর্তী আলোচনায় এসব বিষয়ই

৮ দিন আগে

ছয় শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ছয়শো শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

বর্তমান সরকার হাম প্রতিরোধে সকল ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় না। তাহলে এক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে বাধা কোথায়? হামে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় না আনা হলে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব

৯ দিন আগে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুষ্টু লোক, স্বাস্থ‍্যমন্ত্রীর কোটি টাকা ও মিরাকল প্রতিমন্ত্রী

সাম্প্রতিক সময়ের তিনটি আলোচিত ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি দৃশ্য। চরিত্র আলাদা, সংলাপ আলাদা, কিন্তু প্রশ্ন একটাই— প্রকৃত সত্য কী? সবটাই যে সত্য, তা নয়। আবার সবটাই যে মিথ্যা, সেটিও বলা যায় না। আর এই ধূসর অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয় জনবিশ্বাসের।

১০ দিন আগে

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

১৫ দিন আগে