ভারতীয় ক্যাপ্টেনের স্মৃতিতে আত্মসমর্পণের প্রেক্ষাপট

আনিসুর রহমান
আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ২১: ৩৯
ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানি সৈন্যরা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর ভারত ও বাংলাদেশের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। সম্প্রতি ভারতীয় সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক ক্যাপ্টেন বিজয়ীর সাথে পরাজয়ের আলাপচারিতার প্রাথমিক মুহূর্তগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরে প্রথমবারের মত এর পূর্বকথা সামনে এনেছেন।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নির্ভয় শর্মা বলেছেন, একজন তরুণ ভারতীয় ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি অগ্রসর মিত্র বাহিনীর অংশ হিসেবে ঢাকা শহরে পা রাখা ভারতীয় সৈন্যদের প্রথম দলে ছিলেন।

সম্প্রতি তিনি একটি স্বনামে লেখা স্মৃতিকথায় সেদিনের প্রথম ঘন্টার ঘটনাগুলোর স্বল্প পরিচিত কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তিনি স্বীকার করেন, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের সিদ্দিকীও এ পর্বের অংশ ছিলেন।

পরে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও মিজোরামের গভর্নর হিসাবে দায়িত্ব পালনকারী শর্মা বলেন, তারা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সদর দফতরে যাওয়ার জন্য মিরপুর ব্রিজ দিয়ে ‘ঢাকা’ প্রবেশ করেন।

কিন্তু কিছু ঘটনার কারণে পাকিস্তানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজীর কাছে পৌঁছানোর তাদের প্রথম প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। অবশ্য পরে তারা ভারতের ১০১০ অঞ্চলের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং মেজর জেনারেল গান্ধর্ব নাগরার একটি বার্তা নিয়ে তার কাছে পৌঁছেন।

শর্মা বলেন, তাদের দ্বিতীয় যাত্রায়, ভারতের ২ প্যারা ব্যাটালিয়নের তার কমান্ডিং অফিসার কর্নেল পান্নু এবং আরও কয়েকজনের সাথে এবার তারা ‘প্রথম সৈন্য’ হিসাবে শত্রু-অধিকৃত ঢাকা সেনানিবাসে প্রবেশ এবং বার্তা পৌঁছাতে সফল হন।

ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত শর্মার নিবন্ধে বলা হয়, ‘ব্যাটালিয়নটি সফলভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হওয়ার পর কর্নেল পান্নু, আরও কয়েকজন ও আমি অফিসারের সাথে দ্রুত সদর দফতরে জেনারেল নিয়াজীর কাছে যাই।’

তিনি লিখেছেন, ‘যখন আমরা পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টারে প্রবেশ করে জেনারেল নিয়াজীর অফিসের পাশে আমাদের জিপ দাঁড় করাই তখন একজন স্মার্ট পোশাকপরা, দীর্ঘকায় ও সুঠামদেহী সৈনিক আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান।’

শর্মা আরো বলেন, কড়া শৃঙ্খলাবদ্ধ স্ট্যান্ডিং গার্ড ভারতীয়দের অফিসে প্রবেশে বাধা দেয়। সৈন্যটি ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে একেবারেই অবহিত ছিলেন না এবং ‘কী করবেন বা বলবেন’ বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

শর্মা লিখেছেন, ‘তিনি আমাদেরকে তার জেনারেলের জন্য সংরক্ষিত জায়গায় আমাদের জিপ পার্ক করতে নিষেধ করেন। আমরা তাকে একপাশে ঠেলে জেনারেলের ঘরে ঢুকে পড়ি।’

তিনি স্মরণ করেন, কর্নেল পান্নু ‘নিয়াজীর দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন এবং নিয়াজী তার চোখের দিকে তাকাতে পারছিলেন না। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে শীর্ষ পাকিস্তানি জেনারেল হতাশায় দু’হাত দিয়ে তার মাথা চেপে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘আমার তার বিড়বিড় করা স্পষ্ট মনে আছে- ‘পিন্ডি মে বৈঠে হারামজাদন নে মারওয়া দিয়া (রাওয়ালপিন্ডিতে যারা বসে আছে তারা আমাদের হতাশ করেছে)।’

তিনি বলেন, রাওয়ালপিন্ডি সেই সকাল পর্যন্ত তাকে বোকা বানিয়েছিল, যা আমাদের ‘পথে সহায়ক হয়েছিল।’

ঢাকার দোরগোড়ায় ভারতীয় ব্যাটালিয়নের অ্যাডজুট্যান্ট শর্মা স্মরণ করেন, তাদের সৈন্যরা ১৫-১৬ ডিসেম্বর মধ্যরাতে মিরপুর ব্রিজ পয়েন্টে ঢাকার দরজায় টোকা মেরে শত্রুকে হতচকিত করে তুলেছিল। আর ১৬ ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত গোলাবর্ষণ এবং বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণ অব্যাহত ছিল।

তিনি বলেন, নাগরা সকালে ঘটনাস্থলে আসেন এবং ‘আমাদের জানান যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছে এবং আমরা লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজীর কাছে একটি বার্তা নিয়ে যাচ্ছি।’

বার্তাটি ছিল: ‘প্রিয় আব্দুল্লাহ, আমি এখানে। খেলা শেষ, আমি আপনাকে আমার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি এবং আমি আপনার দায়িত্ব নেব।’

শর্মার মতে, নাগরার সহযোগী ডি ক্যাম্প ক্যাপ্টেন হিতেশ মেহতাকে তার সাথে যেতে বলা হল। এসময় পাকিস্তানি সৈন্যরা সেতুর অপর পাশে অবস্থান করছিল।

প্রাথমিকভাবে দুইজন ক্যাপ্টেন নিয়াজীর জন্য নাগরার হাতের লেখা বার্তা নিয়ে একটি জিপে উঠেন। নিয়াজী ছোটবেলা থেকেই নাগরার সাথে পরিচিত ছিলেন এবং তারা একে-অপরকে ‘নাম ধরে ডাকতেন।’

শর্মা বলেন, তারা দুজন জিপের দিকে যাওয়ার সাথে সাথে অন্য দুই অফিসার, মেজর জেএস শেঠি ও লেফটেন্যান্ট তেজিন্দর সিং লাফ দিয়ে গাড়িতে ওঠেন।

শর্মা লিখেছেন, ‘আমরা সবাই আসন্ন বিপদ বিস্মৃত হয়ে আত্মসমর্পণের বার্তা নিয়ে ঢাকা প্রবেশ ও ইতিহাস সৃষ্টির চিন্তায় উত্তেজিত ছিলাম।’

কিন্তু, তিনি স্মরণ করেন, ‘তারা তরুণ অফিসাররা সে সময় খুব কমই জানতেন যে ওপারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের নির্দেশ পায়নি এবং ‘তাই আমরা সেতু পার হওয়ার সাথে সাথে তারা গুলি চালালো। আমরা থামলাম।’

তিনি লেখেন, সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে আমি চিৎকার করে তাদের গুলি চালানো বন্ধ করতে বললাম। গুলিবর্ষণ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অবিলম্বে শত্রু সৈন্যরা ছোট ভারতীয় সৈন্য দলটিকে ঘিরে ফেলে এবং নিরস্ত্র করে ফেলে।

ভারতীয় অফিসাররা তখন একজন পাকিস্তানি জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারকে (জেসিও) একজন সিনিয়র অফিসারকে ফোন করতে বলেন। আর একই সঙ্গে শর্মা তাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করলে ভয়ানক পরিণতির হুমকি দিয়ে বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী ঢাকাকে ঘিরে রেখেছে এবং তাদের জেনারেলরা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়ে গেছে।

শর্মা বলেন, সৌভাগ্যক্রমে অচিরেই একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন এসে দলটিকে মিরপুর গ্যারিসনে নিয়ে যান, সেখানে গ্যারিসনের কমান্ডার তাদের অপেক্ষা করতে বলেন। প্রায় এক ঘন্টা পর ঢাকা গ্যারিসনের জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ সেখানে আসেন।

জামশেদের সঙ্গে তারা তাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর জিপে মিরপুর ব্রিজে ফিরে আসেন। তখন একটি পাকিস্তানি জিপ তাদের অনুসরণ করে। ফেরার পথে ‘আমাদের ওপর আবার গুলি চালানো হয়। আমরা কারা তা কোন পক্ষই জানত না।’

তিনি বলেন, মেজর শেঠি তার বাম পায়ে একটি মাঝারি মেশিনগানের গুলি লাগে এবং আরেকটি বুলেট সিংয়ের হেলমেটের ঠিক মাঝখানে বিদ্ধ করে, যদিও ভাগ্যক্রমে তা লক্ষ্যচ্যুত হয়। কিন্তু পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হয় এবং আমরা সেতুর অপর পাশে পৌঁছি।

বাসস’র সঙ্গে আলাপকালে কাদের সিদ্দিকী স্মরণ করেন, তাৎক্ষণিকভাবে কোন সাদা পতাকা পাওয়া না যাওয়ায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের জিপের ওপরে একটি সাদা শার্ট উড়ানো হয়। মিরপুর ব্রিজে ফেরার পথে শার্টটি কোথাও পড়ে যায়। এতে তারা অরক্ষিত হয়ে পড়েন এবং গাড়ি লক্ষ্য করে শত্রুপক্ষ গুলি চালায়।

শর্মা লিখেছেন, এর কিছুক্ষণ পরে সকাল ১০টা ৪২ মিনিটে, পাকিস্তানি অফিসারদের সাথে ভারতীয় অফিসারদের দলটি নিয়াজীকে নাগরার চিরকুটটি হস্তান্তর করতে ঢাকায় পুনঃপ্রবেশ করে।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’-এ বলেছেন নাগরার বার্তা পেয়ে নিয়াজী পূর্ব পাকিস্তানে নৌবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরিফ এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীসহ উপস্থিত সিনিয়র জেনারেলদের সাথে পরিস্থিতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, তারা উভয়েই নিয়াজীকে হাল ছেড়ে দেওয়ার এবং নাগরার আহ্বানে সাড়া দেয়ার পরামর্শ দেন কারণ, পাকিস্তানি পক্ষের ‘ঢাকা’ রক্ষা করার মতো যথেষ্ট শক্তি ছিল না।

সালিক লিখেছেন, ‘জেনারেল নিয়াজী মেজর জেনারেল জামশেদকে নাগরাকে অভ্যর্থনা জানাতে পাঠান।’

কাদের সিদ্দিকীর বর্ণনা

বাসস’র সাথে আলাপকালে কাদের সিদ্দিকী বলেন, জামশেদ একটি মার্সিডিজ গাড়িতে ঘটনাস্থলে আসেন। এরপরে আসে বেশ কয়েকটি পাকিস্তানি সামরিক যান। নাগরা ও আরও দুই ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার, সান সিং ও ক্লেয়ার এবং তিনি নিজে গাড়ির পিছনের সিটে উঠে বসেন।

তিনি বলেন, জামশেদ ঢাকা সেনানিবাসে যাওয়ার পথে চালকের পাশে সামনের সিটে বসেন এবং ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে জামশেদের অস্থায়ী অফিসে কিছুক্ষণ থামেন। সেখান থেকে তারা নিয়াজীকে ফোন করার চেষ্টা করেন কিন্তু লাইনটি বিকল দেখতে পান।

প্রতিনিধি দলটি সরাসরি ঢাকা সেনানিবাসে নিয়াজীর অফিসে চলে যায়। সেখানে একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন তাদের অভ্যর্থনা জানায়। তিনি তাদের বলেন, জেনারেল খুব শিগগির সেখানে আসবেন। কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘৪/৫ মিনিট পর নিয়াজী এলেন এবং উভয় পক্ষ সালাম বিনিময় এবং করমর্দন করল। আমি তার (নিয়াজীর) সাথে করমর্দনের জন্য আমার হাত বাড়াতে পারলাম না।’

১৯৭১ সালের যুদ্ধের নথি থেকে জানা যায় প্রায় এক ঘণ্টা পরে ভারতীয় ইস্টার্ন ফ্রন্টের জেনারেল চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব নিয়াজীর সদর দফতরে আসেন। এরপর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ আলোচনা শুরু হয়।

বাসস থেকে নেওয়া

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা কি টেকসই শান্তিচুক্তিতে রূপ নেবে?

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির শঙ্কা— যে দুটি বিষয়কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন— সেগুলো এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ইঙ্গিত মিলছে, কাঠামোগত চুক্তির পরবর্তী আলোচনায় এসব বিষয়ই

৮ দিন আগে

ছয় শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ছয়শো শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

বর্তমান সরকার হাম প্রতিরোধে সকল ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় না। তাহলে এক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে বাধা কোথায়? হামে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় না আনা হলে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব

৯ দিন আগে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুষ্টু লোক, স্বাস্থ‍্যমন্ত্রীর কোটি টাকা ও মিরাকল প্রতিমন্ত্রী

সাম্প্রতিক সময়ের তিনটি আলোচিত ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি দৃশ্য। চরিত্র আলাদা, সংলাপ আলাদা, কিন্তু প্রশ্ন একটাই— প্রকৃত সত্য কী? সবটাই যে সত্য, তা নয়। আবার সবটাই যে মিথ্যা, সেটিও বলা যায় না। আর এই ধূসর অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয় জনবিশ্বাসের।

১০ দিন আগে

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

১৫ দিন আগে