এমপিওভুক্ত শিক্ষকের সাংবাদিকতা: নিয়োগ বিধি ও বাস্তবতা

জাকির আহমদ খান কামাল

বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। শিক্ষা বিস্তারে তাদের ভূমিকা যেমন অপরিসীম, তেমনি তাদের পেশাগত অধিকার ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও রয়েছে নানামুখী বিতর্ক। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে—এমপিওভুক্ত শিক্ষক সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে পারবেন কি না, বিশেষ করে বর্তমান এনটিআরসি (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) নিয়োগবিধির আলোকে।

বর্তমান এনটিআরসি নিয়োগবিধি ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষককে পূর্ণকালীন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকতে হয়। এ প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতার পেশাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সাংবাদিকতাও একটি পূর্ণকালীন পেশা। নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, অফিসের এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও আর্থিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করা হয়, যা এমপিও নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ এতে শিক্ষকতার সময়, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে থেকে একই সঙ্গে পূর্ণকালীন সাংবাদিকতা করা আইনি ও নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

শুধু তাই নয়, অনেক সময় সাংবাদিকতা পেশাকে নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়। স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনকেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিষয়ে সমীহ করে চলতে হয়।

এমপিও একটি আর্থিক সহায়তা হলেও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সরকারি শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির প্রতিফলন। বিধিমালায় সব ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বলা না থাকলেও প্রচলিত সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি ও শিক্ষা প্রশাসনের নির্দেশনায় দেখা যায়— এমপিওভুক্ত শিক্ষক অন্য কোনো পূর্ণকালীন পেশায় যুক্ত হতে পারবেন না, যা তার মূল দায়িত্ব পালনে বাধা তৈরি করে।

নতুন নীতিমালায় শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা, আইন পেশা কিংবা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরিসহ কোনো আর্থিক লাভজনক পেশায় জড়িত থাকা যাবে না— এ কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে আরও জানানো হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা এখন থেকে অন্য কোনো বেতনের চাকরি বা অর্থপ্রাপ্তির কাজে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। নীতিমালার ১১ নম্বর ধারা এবং ১৭ উপধারা (ক) ও (খ)-এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

উপধারা (ক) অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর একাধিক চাকরি কিংবা আর্থিক লাভজনক পদে কর্মরত পাওয়ার প্রমাণ মিললে তার এমপিও বাতিলসহ প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে সরকার।

উপধারা (খ)-তে ‘আর্থিক লাভজনক’ পদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে— সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় কর্মের বিনিময়ে প্রাপ্ত বেতন, ভাতা বা সম্মানি— সবই এ শর্তের অন্তর্ভুক্ত।

সরকারি কর্মচারীরা যেমন অন্য কোনো লাভজনক কাজে যুক্ত হতে পারেন না, তেমনি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা এখন একই নিয়মের আওতায়। তাদের বেতন, বাড়িভাড়া, ঈদ বোনাসসহ বিভিন্ন ভাতা সরকার প্রদান করছে। তাই নীতিমালায় স্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। নতুন নীতিমালা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বর্তমানে মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা মিলিয়ে দেশে প্রায় ছয় লাখের বেশি শিক্ষক ও কর্মচারী এমপিওভুক্ত রয়েছেন। জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে ডিসিদের দেওয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সরকার এ কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

গত ১৭ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ডিসিদের মতবিনিময় সভায় যুক্তি দেওয়া হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয় নির্বাচনে প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তারা যদি প্রকাশ্যে সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন, তবে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে।

এর আগে ২০২৩ সালের ডিসি সম্মেলনেও শিক্ষকদের জন্য সরকারি কর্মচারীদের মতো আচরণবিধি প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যেন শিক্ষকতার পাশাপাশি ঠিকাদারি বা সাংবাদিকতা বন্ধ করা যায়।

শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে এ নীতিমালা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদল এ উদ্যোগকে শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক মনে করলেও অন্য পক্ষের মতে, এটি বৈষম্য ও অস্থিরতা তৈরি করবে।

যোগ্য শিক্ষকদের সাংবাদিকতার পথ বন্ধ করা হলে স্থানীয় গণমাধ্যম আরও দুর্বল হয়ে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আবার অনেকে মনে করেন, শিক্ষক সমাজ কেন গণমাধ্যমের দায় নেবে— যেমন সাংবাদিক সমাজকে শিক্ষার দায় দেওয়ার সুযোগ নেই।

অতএব স্পষ্টভাবে বলা যায়— বর্তমান এনটিআরসি নিয়োগবিধি অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে থেকে পূর্ণকালীন সাংবাদিকতা করার সুযোগ নেই। তবে নীতিমালার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ও যুগোপযোগী সংশোধনের মাধ্যমে খণ্ডকালীন, অরাজনৈতিক ও শিক্ষামূলক সাংবাদিকতার পথ উন্মুক্ত রাখা যেতে পারে। এতে একদিকে শিক্ষকের মেধা ও অভিজ্ঞতা সমাজের কাজে লাগবে, অন্যদিকে শিক্ষকতা পেশার শৃঙ্খলাও অক্ষুণ্ণ থাকবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কলাম লেখক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মুসলিম উম্মাহ: অতীতের গৌরব, বর্তমানের সংকট ও পুনর্জাগরণ

কেন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় মুসলিম বিশ্বের উপস্থিতি সীমিত? কেন এত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বহু মুসলিম দেশ প্রযুক্তির ক্রেতা, উদ্ভাবক নয়? কেন রাজনৈতিক বিভক্তি ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাইরের শক্তির জন্য হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে?

৭ দিন আগে

শুধু দাবিদাওয়ার আন্দোলন নয়, রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষের গল্প

২০ জুলাইয়ের সেই দিন এবং এরপর পুলিশি দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করার পরও মানুষ যে আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছে, তা সম্ভব হতো না, যদি এমন এক শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত না হতো, যারা এতদিন সংগঠিত রাজনীতির বাইরে ছিল। তারা এতদিন শুধু পর্যবেক্ষক ছিল। কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও স্বী

৭ দিন আগে

পোল্ট্রি খামার: লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা

বিশ্ব জুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোল্ট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বি

৮ দিন আগে

ককরোচ আন্দোলনে উত্তাল দিল্লি, ভারতের বুকেও কি ‘জুলাইয়ের আবহ’?

দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্দোলনের সূচনা, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পরে রাজপথে বড় আকারের বিক্ষোভের কারণে ভারতের চলমান ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে অনেকেই ‘জুলাইয়ের আবহ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।

১০ দিন আগে