
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি ফের চালু করার লক্ষ্যে একটি কাঠামোগত সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে অনলাইনে এ সমঝোতায় সই করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ চুক্তির অধীনে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিকে আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে। এই ৬০ দিনের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে উপনীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে সমঝোতায়।
ইরান যুদ্ধ এবং তা ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এটিকে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বরং বলা যায়, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রয়োজনীয় ‘জিগস পাজলে’র টুকরোগুলো এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এই পাজলের একেকটি টুকরার আকার বা আকৃতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো— সবগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করা, যেখানে কোনো বড় প্রশ্নের উত্তর বাকি থাকবে না।
কিন্তু এই সপ্তাহান্তে ঘোষিত সমঝোতাকে যদি সত্যিই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ দিতে হয়, তাহলে আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রতিটি পক্ষকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী অর্জন করতে চায়। সমস্যা হলো— যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই এর উদ্দেশ্য নিয়ে স্পষ্টতা ছিল না। ফলে এখন সেই লক্ষ্য অর্জনের পথও অস্পষ্ট।
বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির শঙ্কা— যে দুটি বিষয়কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন— সেগুলো এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ইঙ্গিত মিলছে, কাঠামোগত চুক্তির পরবর্তী আলোচনায় এসব বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
যৌথ কর্মপরিকল্পনা থেকে যে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন
এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে নতুন নয়। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান হিসেবে জাতিসংঘের পক্ষে আমি যে আলোচনার নেতৃত্ব দিয়েছিলাম, সেটিই পরে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামে পরিচিত হয়।
চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিকে নিয়ে গঠিত ছয় জাতির সেই আলোচনার লক্ষ্য ছিল একটিই— বিশ্বকে নিশ্চিত করা যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
মানবাধিকার, আঞ্চলিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা অন্যান্য বিতর্কিত বিষয় তখনো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু আমরা সচেতনভাবেই সেগুলো পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরে সেগুলো আর কার্যকরভাবে সমাধান করা হয়নি। আমাদের সামনে থাকা ‘জিগস পাজলে’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই প্রমাণ করা যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে না।
২০১৫ সালে জেসিপিওএ চূড়ান্ত হয় এবং কয়েক বছর সফলভাবেই কার্যকর ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে চুক্তিটিকে অপর্যাপ্ত ঘোষণা করেন এবং কার্যত এর সমাপ্তি ঘটান।
আজ নতুন করে যে সমঝোতার চেষ্টা চলছে, সেটিও একই মৌলিক প্রশ্ন থেকে শুরু হওয়া উচিত— ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের কোন কোন উদ্দেশ্য একটি স্থায়ী চুক্তির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে?
হরমুজ প্রণালি খুললেই কি সমস্যার সমাধান?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে সহজ উত্তর হতে পারে— হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা। যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে সরাসরি আঘাত করেছে। জ্বালানির দাম বেড়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাই প্রণালিটি দ্রুত চালু হওয়া অবশ্যই স্বাগত।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি যুদ্ধের কারণ ছিল না, বরং যুদ্ধের ফলাফল। অতএব শুধু প্রণালি খুলে দিলেই যুদ্ধের মূল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিরোধের সমাধান হবে না।
গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অন্যের বিভিন্ন প্রস্তাব কখনো অবাস্তব, কখনো অপ্রাসঙ্গিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে পুরো বিশ্ব উদ্বেগ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে।
এখন স্থায়ী সমঝোতার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো— উভয় পক্ষকে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে কোন কোন বিষয় চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হবে। পাশাপাশি সেই ফলাফল ইসরায়েলও গ্রহণ করবে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে এই সমঝোতা হয় ভঙ্গুর হবে, অথবা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নই অসম্ভব হয়ে উঠবে।
‘নো সারপ্রাইজ’ নীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
জেসিপিওএ সফল হওয়ার পেছনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি ছিল— ‘নো সারপ্রাইজ রাউন্ড’। ২০১৩ সালের অন্তর্বর্তী সমঝোতা থেকে ২০১৫ সালের পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে এই নীতিই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। আমরা আলোচনার শুরুতেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম— কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, আরাকের হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া— সবকিছুই তালিকাভুক্ত ছিল।
শুরুতে ইরানকে এসব বিষয়ে সম্মত হতে হয়নি। কিন্তু তাদের বুঝতে হয়েছিল, এই প্রশ্নগুলো আলোচনার বাইরে রাখলে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতাও সম্ভব হবে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল— তালিকাটি সম্পূর্ণ ছিল। কেউ হঠাৎ করে নতুন কোনো শর্ত বা নতুন কোনো ইস্যু সামনে আনেনি। ফলে ইরানের আলোচকরা জানতেন, কোন কোন বিষয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে কিংবা কোথায় ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এই স্বচ্ছতা ধীরে ধীরে পারস্পরিক আস্থা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল, যা আজকের পরিস্থিতিতে প্রায় অনুপস্থিত।
আমাদের সাফল্য রাতারাতি আসেনি। প্রতিটি ধাপ ছিল ধৈর্য, নির্ভুলতা এবং খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার ফল। বর্তমান আলোচনাও যদি সত্যিই স্থায়ী শান্তির দিকে যেতে চায়, তাহলে একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কারণ একটি সফল কূটনৈতিক সমঝোতার অর্থ এই নয় যে দুই পক্ষই নিজেদের সব দাবি আদায় করবে, বরং উভয় পক্ষ এমনটুকু পাবে, যা তাদের মৌলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে যথেষ্ট।
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার নাম ইসরায়েল
এবার আরও একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। আলোচনার সবচেয়ে কঠিন ‘অপ্রত্যাশিত’ উপাদান হতে পারে ইসরায়েল।
নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ট্রাম্পের লক্ষ্য থেকে ভিন্ন বলেই মনে হয়। ট্রাম্প যেখানে যুদ্ধ থামিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী, সেখানে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব স্থায়ীভাবে দুর্বল করতে চান। বিশেষ করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন ভেঙে দিতে তিনি যুদ্ধকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।
যুদ্ধ চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রেখে তিনি লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে পারবেন এবং একই সঙ্গে ইরানের ওপরও সর্বোচ্চ চাপ বজায় রাখতে পারবেন— এমন প্রত্যাশা তার ছিল। কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে সম্ভাব্য বহু ইরানি নেতাকে হত্যা করার কৌশল দীর্ঘমেয়াদে আলোচনাকে সহজ করেনি।
উদাহরণ হিসেবে আলি লারিজানির কথা বলা যায়। তিনি কট্টরপন্থি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাস্তববাদী আলোচক হতে পারতেন। তার পরিবর্তে এখন ইরানের সামনে এমন একদল নতুন নেতা উঠে এসেছে, যাদের আন্তর্জাতিক আলোচনার অভিজ্ঞতা অনেক কম।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও অবশ্য রয়েছেন— পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। জেসিপিওএ আলোচনায় তিনি ছিলেন উপপ্রধান আলোচক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তিনি পরিচিত মুখ এবং জটিল পারমাণবিক কূটনীতি সম্পর্কে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ কারণেই বর্তমান আলোচনায় তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এবার যে ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশে তাকে আলোচনা চালাতে হচ্ছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত। স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে এমন আলোচক প্রয়োজন, যারা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন না, বরং জটিল ও কারিগরি বিষয় নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা চালাতে সক্ষম হবেন।
আমার অভিজ্ঞতা বলছে, আব্বাস আরাগচি ও তার দলের কয়েকজন সদস্য সেই সক্ষমতা রাখেন। তবে প্রশ্ন হলো— তেহরানের পক্ষ থেকে তারা কতটা রাজনৈতিক ছাড় দেওয়ার স্বাধীনতা পাবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জেসিপিওএর সময় আলোচনায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানি অংশ নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল আলোচনা সীমাবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে, ইসরায়েল দূর থেকে নিবিড়ভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।
যুদ্ধের বাস্তবতা বিবেচনায় এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যথেষ্ট হবে না। অন্তত একটি আঞ্চলিক কাঠামোও প্রয়োজন হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— আলোচনার পুরো প্রক্রিয়াটি এমন হতে হবে, যেন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বিশ্বাস করতে পারে— চুক্তিটি বাস্তবেই টিকে থাকবে।
জেসিপিওএর সবচেয়ে বড় শিক্ষা— অনেক সময় একটি চুক্তি তার শর্তের কারণে ব্যর্থ হয় না, বরং তাকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক পরিবেশই সেটিকে ভঙ্গুর করে তোলে। এ বাস্তবতা ইরানের জন্য যেমন সত্য, তেমনি ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
নতুন ‘ইয়ট’ বনাম পুরনো ‘ট্যাংকার’
জাতিসংঘ ও ইউরোপ যখন আগের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না, তখন নতুন ধরনের অনানুষ্ঠানিক জোট সামনে আসছে। বর্তমান সংকটে পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মিশর, তুরস্ক ও সৌদি আরবকে নিয়ে গঠিত একটি নতুন অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে ইসলামাবাদ শুধু মধ্যস্থতাই করেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কাঠামোগত সমঝোতার ঘোষণাও দিয়েছে।
কেউ পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতার কথা বলেছেন, কেউ মিশরের সুয়েজ খাল, সৌদি আরবের জ্বালানি সম্পদ কিংবা তুরস্কের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন। তবে এসব দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি অন্য জায়গায়। তারা কূটনীতির একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি অনুসরণ করছে— সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোকে এমন একটি নিরপেক্ষ পরিবেশে বসানো, যেখানে তারা খোলামেলা আলোচনা করতে পারে।
এ উদ্যোগের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে, তারা কত দ্রুত বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে পারে তার ওপর। আমি এসব নতুন উদ্যোগকে অনেকটা ‘ইয়টে’র সঙ্গে তুলনা করি। আন্তর্জাতিক কূটনীতির পুরোনো ‘ট্যাংকার’গুলোর তুলনায় এগুলো দ্রুত চলতে পারে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু আলোচনা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই ‘ইয়ট’গুলো কি একই গতিপথ ধরে রাখতে পারবে?
আর যদি একটি চুক্তি হয়, তাহলে সেটি বাস্তবায়ন, তদারকি কিংবা প্রয়োজনে লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কে নেবে? যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বের ‘পুলিশ’ হতে চায় না। আবার পুরোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে। সেক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি রক্ষার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে— এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
চীনকে উপেক্ষা করলে চলবে না
মে মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর বেইজিং একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দেয়— ‘সংলাপ ও আলোচনাই এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ, শক্তি প্রয়োগ অচল পথ।’
জেসিপিওএর আলোচনায় চীনের ভূমিকা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। অথচ বাস্তবে বেইজিং ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রতিটি বৈঠকে তারা অংশ নিয়েছে, জটিল বিষয়গুলোতে গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো জেসিপিওএকে সফল চুক্তি হিসেবে দেখেন না। কিন্তু সেই চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া আজও মূল্যবান শিক্ষা দেয়। ২০১৫ সালের সমঝোতা কোনো একক দেশের সাফল্য ছিল না। ছয়টি দেশ পুরো সময় একসঙ্গে থেকেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছিল তাদের মধ্যে সংযোগসূত্র।
আজও ইউরোপের ভূমিকা শেষ হয়ে যায়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য— এই তিন দেশ আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো— যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অনেক ক্ষেত্রেই একে অন্যের অবস্থান সঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। কোন প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, কোনটি প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে কিংবা কোন বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে— এসব নিয়েই দুপক্ষের ব্যাখ্যা প্রায়ই ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এমনকি এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি লেবানন পর্যন্ত প্রযোজ্য ছিল কি না— এ প্রশ্নেও তাদের অবস্থান এক ছিল না।
আরেকটি জটিল প্রশ্ন হবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ইরানের কোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে ইরান সবসময়ই বলে আসেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসা গবেষণার মতো শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য সীমিত মাত্রায় সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার অধিকার তাদের থাকা উচিত— যে অধিকার জেসিপিওএতেও স্বীকৃত ছিল।
২০২৫ সালের হামলার পর যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ধারণা করা যায় যে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুনর্গঠনে অনেক সময় লাগবে। অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ফিরে যাওয়া এবং তা কার্যকর অস্ত্রে রূপান্তর করা— দুই-ই এখনো দীর্ঘ পথ।
আমার অভিজ্ঞতা বলছে, একটি বিস্তৃত সমঝোতায় পৌঁছানোর একমাত্র পথ হলো ধাপে ধাপে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা। হরমুজ প্রণালি নিরাপদ করে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করা এবং সামরিক সংঘাত বন্ধে দুই পক্ষের সদিচ্ছা— এসব অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ।
কিন্তু এগুলোই শেষ লক্ষ্য নয়, বরং শুরু। অর্থাৎ, আগে জিগস পাজলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টুকরো ঠিক জায়গায় বসাতে হবে। তারপর দেখতে হবে সেগুলো মিলিয়ে কেমন ছবি তৈরি হচ্ছে। এরপর ধাপে ধাপে পুরো কাঠামো সম্পূর্ণ করতে হবে।
কূটনীতির ভাষায় একেই বলা হয়— ‘ড্রিপ, ড্রিপ, ড্রিপ’। অর্থাৎ একবারে সব নয়, বরং ধারাবাহিক ছোট ছোট অগ্রগতির মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এটি এক পরীক্ষা পুরো প্রক্রিয়া বিশ্বের বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ বহু বছর ধরেই কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনার মুখে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন কিংবা সুদানের মতো সংঘাতে কার্যকর সমাধান দিতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি অনেক ক্ষেত্রেই প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।
গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) ভূমিকাও আগের মতো নেই। ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অঙ্গীকার নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিজের নতুন ভূমিকা খুঁজছে। এদিকে নতুন নতুন জোট ও উদ্যোগ গড়ে উঠছে। যেমন, ব্রিকস বা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক আঞ্চলিক কাঠামো। কিন্তু এগুলোরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
শুধু সামরিক শক্তি কিংবা শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা যায় না। বরং প্রতিরক্ষা, কূটনীতি এবং উন্নয়ন— এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো টিকে থাকতে পারে। তবে তার জন্য তাদের প্রমাণ করতে হবে, অতীতের অভিজ্ঞতা আজও বর্তমান সংকট সমাধানে কাজে লাগানো সম্ভব।
ইরানকে ঘিরে এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়; এর অর্থনৈতিক প্রভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এই সংকটের সমাধান মানে শুধু একটি যুদ্ধ থামানো নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে আরও বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই— আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি তাদের অভিজ্ঞতা, কূটনৈতিক দক্ষতা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? নাকি বিশ্ব এমন এক সংঘাতের পরিণতি বহন করবে, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না?
এ প্রশ্নের উত্তর শুধু ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং আগামী দিনের আন্তর্জাতিক কূটনীতির দিকনির্দেশও অনেকটাই ঠিক করে দেবে।
[যুযুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজে প্রকাশিত নিবন্ধের ভাবানুবাদ। নিবন্ধটি লিখেছেন প্রতিষ্ঠানটির পলিসি অ্যাডভাইজার ব্যারোনেস অ্যাশটন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ওয়্যারউইকের চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োজিত আছেন। ব্রিটিশ লেবার পার্টির এই রাজনীতিবিদ এর আগে ইউরোপিয়ান কমিশনের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ ও বাণিজ্যবিষয়ক কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। লেবার সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারিও ছিলেন তিনি]

যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি ফের চালু করার লক্ষ্যে একটি কাঠামোগত সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে অনলাইনে এ সমঝোতায় সই করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ চুক্তির অধীনে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিকে আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে। এই ৬০ দিনের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে উপনীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে সমঝোতায়।
ইরান যুদ্ধ এবং তা ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এটিকে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বরং বলা যায়, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রয়োজনীয় ‘জিগস পাজলে’র টুকরোগুলো এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এই পাজলের একেকটি টুকরার আকার বা আকৃতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো— সবগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করা, যেখানে কোনো বড় প্রশ্নের উত্তর বাকি থাকবে না।
কিন্তু এই সপ্তাহান্তে ঘোষিত সমঝোতাকে যদি সত্যিই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ দিতে হয়, তাহলে আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রতিটি পক্ষকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী অর্জন করতে চায়। সমস্যা হলো— যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই এর উদ্দেশ্য নিয়ে স্পষ্টতা ছিল না। ফলে এখন সেই লক্ষ্য অর্জনের পথও অস্পষ্ট।
বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির শঙ্কা— যে দুটি বিষয়কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন— সেগুলো এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ইঙ্গিত মিলছে, কাঠামোগত চুক্তির পরবর্তী আলোচনায় এসব বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
যৌথ কর্মপরিকল্পনা থেকে যে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন
এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে নতুন নয়। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান হিসেবে জাতিসংঘের পক্ষে আমি যে আলোচনার নেতৃত্ব দিয়েছিলাম, সেটিই পরে জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামে পরিচিত হয়।
চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিকে নিয়ে গঠিত ছয় জাতির সেই আলোচনার লক্ষ্য ছিল একটিই— বিশ্বকে নিশ্চিত করা যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
মানবাধিকার, আঞ্চলিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা অন্যান্য বিতর্কিত বিষয় তখনো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু আমরা সচেতনভাবেই সেগুলো পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরে সেগুলো আর কার্যকরভাবে সমাধান করা হয়নি। আমাদের সামনে থাকা ‘জিগস পাজলে’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই প্রমাণ করা যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে না।
২০১৫ সালে জেসিপিওএ চূড়ান্ত হয় এবং কয়েক বছর সফলভাবেই কার্যকর ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে চুক্তিটিকে অপর্যাপ্ত ঘোষণা করেন এবং কার্যত এর সমাপ্তি ঘটান।
আজ নতুন করে যে সমঝোতার চেষ্টা চলছে, সেটিও একই মৌলিক প্রশ্ন থেকে শুরু হওয়া উচিত— ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের কোন কোন উদ্দেশ্য একটি স্থায়ী চুক্তির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে?
হরমুজ প্রণালি খুললেই কি সমস্যার সমাধান?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে সহজ উত্তর হতে পারে— হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা। যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে সরাসরি আঘাত করেছে। জ্বালানির দাম বেড়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাই প্রণালিটি দ্রুত চালু হওয়া অবশ্যই স্বাগত।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি যুদ্ধের কারণ ছিল না, বরং যুদ্ধের ফলাফল। অতএব শুধু প্রণালি খুলে দিলেই যুদ্ধের মূল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিরোধের সমাধান হবে না।
গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অন্যের বিভিন্ন প্রস্তাব কখনো অবাস্তব, কখনো অপ্রাসঙ্গিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে পুরো বিশ্ব উদ্বেগ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে।
এখন স্থায়ী সমঝোতার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো— উভয় পক্ষকে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে কোন কোন বিষয় চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হবে। পাশাপাশি সেই ফলাফল ইসরায়েলও গ্রহণ করবে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে এই সমঝোতা হয় ভঙ্গুর হবে, অথবা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নই অসম্ভব হয়ে উঠবে।
‘নো সারপ্রাইজ’ নীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
জেসিপিওএ সফল হওয়ার পেছনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি ছিল— ‘নো সারপ্রাইজ রাউন্ড’। ২০১৩ সালের অন্তর্বর্তী সমঝোতা থেকে ২০১৫ সালের পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে এই নীতিই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। আমরা আলোচনার শুরুতেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম— কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, আরাকের হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া— সবকিছুই তালিকাভুক্ত ছিল।
শুরুতে ইরানকে এসব বিষয়ে সম্মত হতে হয়নি। কিন্তু তাদের বুঝতে হয়েছিল, এই প্রশ্নগুলো আলোচনার বাইরে রাখলে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতাও সম্ভব হবে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল— তালিকাটি সম্পূর্ণ ছিল। কেউ হঠাৎ করে নতুন কোনো শর্ত বা নতুন কোনো ইস্যু সামনে আনেনি। ফলে ইরানের আলোচকরা জানতেন, কোন কোন বিষয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে কিংবা কোথায় ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এই স্বচ্ছতা ধীরে ধীরে পারস্পরিক আস্থা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল, যা আজকের পরিস্থিতিতে প্রায় অনুপস্থিত।
আমাদের সাফল্য রাতারাতি আসেনি। প্রতিটি ধাপ ছিল ধৈর্য, নির্ভুলতা এবং খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার ফল। বর্তমান আলোচনাও যদি সত্যিই স্থায়ী শান্তির দিকে যেতে চায়, তাহলে একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কারণ একটি সফল কূটনৈতিক সমঝোতার অর্থ এই নয় যে দুই পক্ষই নিজেদের সব দাবি আদায় করবে, বরং উভয় পক্ষ এমনটুকু পাবে, যা তাদের মৌলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে যথেষ্ট।
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার নাম ইসরায়েল
এবার আরও একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। আলোচনার সবচেয়ে কঠিন ‘অপ্রত্যাশিত’ উপাদান হতে পারে ইসরায়েল।
নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ট্রাম্পের লক্ষ্য থেকে ভিন্ন বলেই মনে হয়। ট্রাম্প যেখানে যুদ্ধ থামিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী, সেখানে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব স্থায়ীভাবে দুর্বল করতে চান। বিশেষ করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন ভেঙে দিতে তিনি যুদ্ধকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।
যুদ্ধ চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রেখে তিনি লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেতে পারবেন এবং একই সঙ্গে ইরানের ওপরও সর্বোচ্চ চাপ বজায় রাখতে পারবেন— এমন প্রত্যাশা তার ছিল। কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে সম্ভাব্য বহু ইরানি নেতাকে হত্যা করার কৌশল দীর্ঘমেয়াদে আলোচনাকে সহজ করেনি।
উদাহরণ হিসেবে আলি লারিজানির কথা বলা যায়। তিনি কট্টরপন্থি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাস্তববাদী আলোচক হতে পারতেন। তার পরিবর্তে এখন ইরানের সামনে এমন একদল নতুন নেতা উঠে এসেছে, যাদের আন্তর্জাতিক আলোচনার অভিজ্ঞতা অনেক কম।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও অবশ্য রয়েছেন— পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। জেসিপিওএ আলোচনায় তিনি ছিলেন উপপ্রধান আলোচক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তিনি পরিচিত মুখ এবং জটিল পারমাণবিক কূটনীতি সম্পর্কে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ কারণেই বর্তমান আলোচনায় তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এবার যে ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশে তাকে আলোচনা চালাতে হচ্ছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত। স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে এমন আলোচক প্রয়োজন, যারা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন না, বরং জটিল ও কারিগরি বিষয় নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা চালাতে সক্ষম হবেন।
আমার অভিজ্ঞতা বলছে, আব্বাস আরাগচি ও তার দলের কয়েকজন সদস্য সেই সক্ষমতা রাখেন। তবে প্রশ্ন হলো— তেহরানের পক্ষ থেকে তারা কতটা রাজনৈতিক ছাড় দেওয়ার স্বাধীনতা পাবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জেসিপিওএর সময় আলোচনায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানি অংশ নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল আলোচনা সীমাবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে, ইসরায়েল দূর থেকে নিবিড়ভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।
যুদ্ধের বাস্তবতা বিবেচনায় এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু দ্বিপাক্ষিক আলোচনা যথেষ্ট হবে না। অন্তত একটি আঞ্চলিক কাঠামোও প্রয়োজন হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— আলোচনার পুরো প্রক্রিয়াটি এমন হতে হবে, যেন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বিশ্বাস করতে পারে— চুক্তিটি বাস্তবেই টিকে থাকবে।
জেসিপিওএর সবচেয়ে বড় শিক্ষা— অনেক সময় একটি চুক্তি তার শর্তের কারণে ব্যর্থ হয় না, বরং তাকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক পরিবেশই সেটিকে ভঙ্গুর করে তোলে। এ বাস্তবতা ইরানের জন্য যেমন সত্য, তেমনি ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
নতুন ‘ইয়ট’ বনাম পুরনো ‘ট্যাংকার’
জাতিসংঘ ও ইউরোপ যখন আগের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না, তখন নতুন ধরনের অনানুষ্ঠানিক জোট সামনে আসছে। বর্তমান সংকটে পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মিশর, তুরস্ক ও সৌদি আরবকে নিয়ে গঠিত একটি নতুন অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে ইসলামাবাদ শুধু মধ্যস্থতাই করেনি, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কাঠামোগত সমঝোতার ঘোষণাও দিয়েছে।
কেউ পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতার কথা বলেছেন, কেউ মিশরের সুয়েজ খাল, সৌদি আরবের জ্বালানি সম্পদ কিংবা তুরস্কের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন। তবে এসব দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি অন্য জায়গায়। তারা কূটনীতির একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি অনুসরণ করছে— সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোকে এমন একটি নিরপেক্ষ পরিবেশে বসানো, যেখানে তারা খোলামেলা আলোচনা করতে পারে।
এ উদ্যোগের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে, তারা কত দ্রুত বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে পারে তার ওপর। আমি এসব নতুন উদ্যোগকে অনেকটা ‘ইয়টে’র সঙ্গে তুলনা করি। আন্তর্জাতিক কূটনীতির পুরোনো ‘ট্যাংকার’গুলোর তুলনায় এগুলো দ্রুত চলতে পারে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু আলোচনা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই ‘ইয়ট’গুলো কি একই গতিপথ ধরে রাখতে পারবে?
আর যদি একটি চুক্তি হয়, তাহলে সেটি বাস্তবায়ন, তদারকি কিংবা প্রয়োজনে লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কে নেবে? যুক্তরাষ্ট্র আর বিশ্বের ‘পুলিশ’ হতে চায় না। আবার পুরোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে। সেক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি রক্ষার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে— এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
চীনকে উপেক্ষা করলে চলবে না
মে মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর বেইজিং একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দেয়— ‘সংলাপ ও আলোচনাই এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ, শক্তি প্রয়োগ অচল পথ।’
জেসিপিওএর আলোচনায় চীনের ভূমিকা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। অথচ বাস্তবে বেইজিং ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রতিটি বৈঠকে তারা অংশ নিয়েছে, জটিল বিষয়গুলোতে গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো জেসিপিওএকে সফল চুক্তি হিসেবে দেখেন না। কিন্তু সেই চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া আজও মূল্যবান শিক্ষা দেয়। ২০১৫ সালের সমঝোতা কোনো একক দেশের সাফল্য ছিল না। ছয়টি দেশ পুরো সময় একসঙ্গে থেকেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছিল তাদের মধ্যে সংযোগসূত্র।
আজও ইউরোপের ভূমিকা শেষ হয়ে যায়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য— এই তিন দেশ আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো— যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অনেক ক্ষেত্রেই একে অন্যের অবস্থান সঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। কোন প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, কোনটি প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে কিংবা কোন বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে— এসব নিয়েই দুপক্ষের ব্যাখ্যা প্রায়ই ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এমনকি এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি লেবানন পর্যন্ত প্রযোজ্য ছিল কি না— এ প্রশ্নেও তাদের অবস্থান এক ছিল না।
আরেকটি জটিল প্রশ্ন হবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ইরানের কোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে ইরান সবসময়ই বলে আসেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসা গবেষণার মতো শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য সীমিত মাত্রায় সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার অধিকার তাদের থাকা উচিত— যে অধিকার জেসিপিওএতেও স্বীকৃত ছিল।
২০২৫ সালের হামলার পর যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ধারণা করা যায় যে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুনর্গঠনে অনেক সময় লাগবে। অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ফিরে যাওয়া এবং তা কার্যকর অস্ত্রে রূপান্তর করা— দুই-ই এখনো দীর্ঘ পথ।
আমার অভিজ্ঞতা বলছে, একটি বিস্তৃত সমঝোতায় পৌঁছানোর একমাত্র পথ হলো ধাপে ধাপে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা। হরমুজ প্রণালি নিরাপদ করে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করা এবং সামরিক সংঘাত বন্ধে দুই পক্ষের সদিচ্ছা— এসব অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ।
কিন্তু এগুলোই শেষ লক্ষ্য নয়, বরং শুরু। অর্থাৎ, আগে জিগস পাজলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টুকরো ঠিক জায়গায় বসাতে হবে। তারপর দেখতে হবে সেগুলো মিলিয়ে কেমন ছবি তৈরি হচ্ছে। এরপর ধাপে ধাপে পুরো কাঠামো সম্পূর্ণ করতে হবে।
কূটনীতির ভাষায় একেই বলা হয়— ‘ড্রিপ, ড্রিপ, ড্রিপ’। অর্থাৎ একবারে সব নয়, বরং ধারাবাহিক ছোট ছোট অগ্রগতির মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এটি এক পরীক্ষা পুরো প্রক্রিয়া বিশ্বের বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ বহু বছর ধরেই কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনার মুখে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন কিংবা সুদানের মতো সংঘাতে কার্যকর সমাধান দিতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি অনেক ক্ষেত্রেই প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।
গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) ভূমিকাও আগের মতো নেই। ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অঙ্গীকার নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিজের নতুন ভূমিকা খুঁজছে। এদিকে নতুন নতুন জোট ও উদ্যোগ গড়ে উঠছে। যেমন, ব্রিকস বা বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক আঞ্চলিক কাঠামো। কিন্তু এগুলোরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
শুধু সামরিক শক্তি কিংবা শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা যায় না। বরং প্রতিরক্ষা, কূটনীতি এবং উন্নয়ন— এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো টিকে থাকতে পারে। তবে তার জন্য তাদের প্রমাণ করতে হবে, অতীতের অভিজ্ঞতা আজও বর্তমান সংকট সমাধানে কাজে লাগানো সম্ভব।
ইরানকে ঘিরে এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়; এর অর্থনৈতিক প্রভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এই সংকটের সমাধান মানে শুধু একটি যুদ্ধ থামানো নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে আরও বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই— আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি তাদের অভিজ্ঞতা, কূটনৈতিক দক্ষতা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? নাকি বিশ্ব এমন এক সংঘাতের পরিণতি বহন করবে, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না?
এ প্রশ্নের উত্তর শুধু ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং আগামী দিনের আন্তর্জাতিক কূটনীতির দিকনির্দেশও অনেকটাই ঠিক করে দেবে।
[যুযুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজে প্রকাশিত নিবন্ধের ভাবানুবাদ। নিবন্ধটি লিখেছেন প্রতিষ্ঠানটির পলিসি অ্যাডভাইজার ব্যারোনেস অ্যাশটন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ওয়্যারউইকের চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োজিত আছেন। ব্রিটিশ লেবার পার্টির এই রাজনীতিবিদ এর আগে ইউরোপিয়ান কমিশনের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ ও বাণিজ্যবিষয়ক কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। লেবার সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারিও ছিলেন তিনি]

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ
৯ দিন আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১০ দিন আগে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।
১০ দিন আগে
গত ২৫ বছরের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত ও অনৈতিক। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপে জনগণের ত্রাহি অবস্থা। তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত জনগণের কাঁধে বোঝার ওপর শাকের আঁটি বলেই মনে করছে সাধারণ মানুষ।
১০ দিন আগে