
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পর এবার ভারতেও তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্দোলনের সূচনা, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পরে রাজপথে বড় আকারের বিক্ষোভের কারণে ভারতের চলমান ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে অনেকেই ‘জুলাইয়ের আবহ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনের সূচনা কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের মাধ্যমে হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা থেকেই এর শুরু। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই অনলাইন উদ্যোগ লাখো তরুণের ক্ষোভের প্রতীকে পরিণত হয়। বর্তমানে প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনটি ভারতের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
যেভাবে শুরু
চলতি বছরের মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মামলার শুনানিতে কর্মসংস্থানহীন তরুণদের ‘পরজীবী’ ও ‘কাকরোচ’ (আরশোলা) হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। আদালতের ওই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা ৩০ বছর বয়সী রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ করে প্রশ্ন তোলেন, ‘দেশের সব কাকরোচ যদি এক হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?’
মজার ছলেই তিনি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। সংগঠনটির স্লোগান ছিল— ‘A Political Party for the People the System Forgot to Count’, অর্থাৎ ‘রাষ্ট্র যাদের হিসাবই রাখেনি, তাদের জন্য একটি রাজনৈতিক দল।’
ডিজিটাল ব্যঙ্গ হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের ক্ষোভের প্রতীকে পরিণত হয়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষ এতে যুক্ত হন। দুই সপ্তাহের মধ্যে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির অনুসারীর সংখ্যাকেও অতিক্রম করে।
সরকার জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সংগঠনটির বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বন্ধ করার চেষ্টা করলেও আন্দোলনের বিস্তার থামাতে পারেনি।
প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে রাজপথে
ভারতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তির কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিট (NEET)-এ গত ৩ মে প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। বহু শিক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় বসেছিলেন। অনেক পরিবার কোচিং ও প্রস্তুতির জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
কিন্তু মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সামনে আসে বড় ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ। তদন্তে জানা যায়, বিপুল অর্থের বিনিময়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি হয়েছে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্তত ২১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
এ ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বাড়লেও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান দায়িত্ব স্বীকার করেননি। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আন্দোলন রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনে যোগ দেন সোনাম ওয়াংচুক
জুন মাসের শুরুতে দিল্লিতে সিজেপির প্রথম সরাসরি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির দাবি ছিল— প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে।
জুনের শেষ সপ্তাহে আন্দোলনে যোগ দেন লাদাখের প্রখ্যাত প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদী সোনাম ওয়াংচুক। তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরে আমরণ অনশন শুরু করেন। অনশনের ২০তম দিনে, ১৮ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে।
হাসপাতাল থেকেই ওয়াংচুক সংসদের প্রথম কার্যদিবসে ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির আহ্বান জানান।
সংসদ অভিমুখে মিছিল, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন সকাল থেকেই দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইল ইন্টারনেটও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এসবের মধ্যেও সকাল থেকে যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হন বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করেন। শুধু শিক্ষার্থী নন, তাদের অভিভাবক, বিভিন্ন পেশার মানুষ এবং সাধারণ নাগরিকও কর্মসূচিতে যোগ দেন।
দুপুরে ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি নিয়ে বিক্ষোভকারীরা পুলিশি ব্যারিকেড অতিক্রমের চেষ্টা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংসদ মার্গ ও যন্তর মন্তর এলাকায় পুলিশ টিয়ারগ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। ড্রোন ভিডিওতে হাজারো বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
মুজাফফরনগর থেকে আসা ২৪ বছর বয়সী ই-রিকশাচালক রবি গুরুতর আহত হন। তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। রাম মনোহর লোহিয়া ও লেডি হার্ডিং হাসপাতালে বহু আহত বিক্ষোভকারী চিকিৎসা নেন। টিয়ারগ্যাসের হাত থেকে বাঁচতে অনেক শিক্ষার্থী দিল্লির বাংলা সাহিব গুরুদ্বারে আশ্রয় নেন।
দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে প্রায় ১৮০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১৮ জন নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশের সদস্য এবং ৬০ জন বিক্ষোভকারী। এছাড়া ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।
সরকারের সঙ্গে বৈঠকেও মেলেনি সমাধান
পরিস্থিতির অবনতি হলে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। প্রায় চার ঘণ্টার বৈঠকে সিজেপির প্রতিনিধি আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস তিনটি দাবি তুলে ধরেন— সোনাম ওয়াংচুককে মুক্তি দিতে হবে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
তবে বৈঠক শেষে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। জে পি নাড্ডা আন্দোলন ও অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে হাসপাতাল থেকেই সোনাম ওয়াংচুক জানান, সংসদে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত তার অনশন চলবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও আন্দোলনকারীরা বলছেন, শুধু আশ্বাসে তারা সন্তুষ্ট নন।
মিছিল নয়, আন্দোলন চলবে
সংঘর্ষের পরদিন মঙ্গলবার সকালে যন্তর মন্তরে আবারও ১৫০ থেকে ২০০ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। বৃষ্টির মধ্যেও তারা স্লোগান দিতে থাকেন। পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা হয়। আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় টহল দেন এবং বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়।
এদিন সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, ‘আমরা গতকাল বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছি, কারণ আমরা আর কোনো তরুণকে আহত হতে দিতে চাইনি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আর মিছিল করব না, কারণ পুলিশ আবারও তরুণদের ওপর হামলা চালাবে।’
তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, মিছিল বন্ধ হলেও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তার দাবি, ১৫০ জনের বেশি আন্দোলনকারী এখনও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সোমবারের সংঘর্ষে প্রায় ১৮০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। তাদের মধ্যে ১১৮ জন নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশের সদস্য এবং ৬০ জন বিক্ষোভকারী। পুলিশ জানিয়েছে, ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কয়েক মাস আগে আত্মপ্রকাশ করা স্বঘোষিত ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ইতোমধ্যে লাখো তরুণ ভারতীয়, বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের সমর্থন পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন এখন ভারতের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক ছাত্র-তরুণ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অনেকের কাছেই এটি নতুন করে ‘জুলাইয়ের আবহ’ নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পর এবার ভারতেও তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্দোলনের সূচনা, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পরে রাজপথে বড় আকারের বিক্ষোভের কারণে ভারতের চলমান ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে অনেকেই ‘জুলাইয়ের আবহ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলনের সূচনা কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের মাধ্যমে হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা থেকেই এর শুরু। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই অনলাইন উদ্যোগ লাখো তরুণের ক্ষোভের প্রতীকে পরিণত হয়। বর্তমানে প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনটি ভারতের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
যেভাবে শুরু
চলতি বছরের মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মামলার শুনানিতে কর্মসংস্থানহীন তরুণদের ‘পরজীবী’ ও ‘কাকরোচ’ (আরশোলা) হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। আদালতের ওই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা ৩০ বছর বয়সী রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ করে প্রশ্ন তোলেন, ‘দেশের সব কাকরোচ যদি এক হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?’
মজার ছলেই তিনি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। সংগঠনটির স্লোগান ছিল— ‘A Political Party for the People the System Forgot to Count’, অর্থাৎ ‘রাষ্ট্র যাদের হিসাবই রাখেনি, তাদের জন্য একটি রাজনৈতিক দল।’
ডিজিটাল ব্যঙ্গ হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের ক্ষোভের প্রতীকে পরিণত হয়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষ এতে যুক্ত হন। দুই সপ্তাহের মধ্যে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির অনুসারীর সংখ্যাকেও অতিক্রম করে।
সরকার জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সংগঠনটির বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বন্ধ করার চেষ্টা করলেও আন্দোলনের বিস্তার থামাতে পারেনি।
প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে রাজপথে
ভারতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তির কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিট (NEET)-এ গত ৩ মে প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। বহু শিক্ষার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় বসেছিলেন। অনেক পরিবার কোচিং ও প্রস্তুতির জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
কিন্তু মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সামনে আসে বড় ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ। তদন্তে জানা যায়, বিপুল অর্থের বিনিময়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি হয়েছে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্তত ২১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
এ ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বাড়লেও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান দায়িত্ব স্বীকার করেননি। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আন্দোলন রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনে যোগ দেন সোনাম ওয়াংচুক
জুন মাসের শুরুতে দিল্লিতে সিজেপির প্রথম সরাসরি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির দাবি ছিল— প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে।
জুনের শেষ সপ্তাহে আন্দোলনে যোগ দেন লাদাখের প্রখ্যাত প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদী সোনাম ওয়াংচুক। তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরে আমরণ অনশন শুরু করেন। অনশনের ২০তম দিনে, ১৮ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে।
হাসপাতাল থেকেই ওয়াংচুক সংসদের প্রথম কার্যদিবসে ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির আহ্বান জানান।
সংসদ অভিমুখে মিছিল, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন সকাল থেকেই দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটসহ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইল ইন্টারনেটও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এসবের মধ্যেও সকাল থেকে যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হন বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করেন। শুধু শিক্ষার্থী নন, তাদের অভিভাবক, বিভিন্ন পেশার মানুষ এবং সাধারণ নাগরিকও কর্মসূচিতে যোগ দেন।
দুপুরে ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি নিয়ে বিক্ষোভকারীরা পুলিশি ব্যারিকেড অতিক্রমের চেষ্টা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংসদ মার্গ ও যন্তর মন্তর এলাকায় পুলিশ টিয়ারগ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। ড্রোন ভিডিওতে হাজারো বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
মুজাফফরনগর থেকে আসা ২৪ বছর বয়সী ই-রিকশাচালক রবি গুরুতর আহত হন। তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। রাম মনোহর লোহিয়া ও লেডি হার্ডিং হাসপাতালে বহু আহত বিক্ষোভকারী চিকিৎসা নেন। টিয়ারগ্যাসের হাত থেকে বাঁচতে অনেক শিক্ষার্থী দিল্লির বাংলা সাহিব গুরুদ্বারে আশ্রয় নেন।
দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে প্রায় ১৮০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১৮ জন নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশের সদস্য এবং ৬০ জন বিক্ষোভকারী। এছাড়া ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।
সরকারের সঙ্গে বৈঠকেও মেলেনি সমাধান
পরিস্থিতির অবনতি হলে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। প্রায় চার ঘণ্টার বৈঠকে সিজেপির প্রতিনিধি আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস তিনটি দাবি তুলে ধরেন— সোনাম ওয়াংচুককে মুক্তি দিতে হবে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
তবে বৈঠক শেষে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। জে পি নাড্ডা আন্দোলন ও অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে হাসপাতাল থেকেই সোনাম ওয়াংচুক জানান, সংসদে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত তার অনশন চলবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও আন্দোলনকারীরা বলছেন, শুধু আশ্বাসে তারা সন্তুষ্ট নন।
মিছিল নয়, আন্দোলন চলবে
সংঘর্ষের পরদিন মঙ্গলবার সকালে যন্তর মন্তরে আবারও ১৫০ থেকে ২০০ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। বৃষ্টির মধ্যেও তারা স্লোগান দিতে থাকেন। পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা হয়। আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় টহল দেন এবং বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়।
এদিন সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, ‘আমরা গতকাল বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছি, কারণ আমরা আর কোনো তরুণকে আহত হতে দিতে চাইনি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আর মিছিল করব না, কারণ পুলিশ আবারও তরুণদের ওপর হামলা চালাবে।’
তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, মিছিল বন্ধ হলেও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তার দাবি, ১৫০ জনের বেশি আন্দোলনকারী এখনও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সোমবারের সংঘর্ষে প্রায় ১৮০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। তাদের মধ্যে ১১৮ জন নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশের সদস্য এবং ৬০ জন বিক্ষোভকারী। পুলিশ জানিয়েছে, ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কয়েক মাস আগে আত্মপ্রকাশ করা স্বঘোষিত ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ইতোমধ্যে লাখো তরুণ ভারতীয়, বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের সমর্থন পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন এখন ভারতের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক ছাত্র-তরুণ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অনেকের কাছেই এটি নতুন করে ‘জুলাইয়ের আবহ’ নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বহু শতাব্দীর পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো নারীর সাফল্যকে প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখেছে। একজন পুরুষের পদোন্নতি ‘যোগ্যতার স্বীকৃতি’, আর একজন নারীর পদোন্নতি ‘বিশেষ সুবিধা’— এই ধারণা শুধু বৈষম্যমূলক নয়, এটি তথ্যবিবর্জিতও। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বা পদোন্নতির সমালোচনা করতে হলে তথ্য, নীতি ও যোগ্যতার
৫ দিন আগে
দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কাজী জেসিনের যোগ্যতা নিয়ে যুক্তি উপস্থাপনের পরিবর্তে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে— তিনি কার সঙ্গে ‘ঘুমিয়েছেন’, কাকে ‘খুশি করেছেন’ বা কীভাবে এই পদ পেয়েছেন। এসব মন্তব্য কোনোভাবেই রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, এগুলো নারীবিদ্বেষের প্রকাশ।
৬ দিন আগে
৫ আগস্ট রাতের সেই এক ধরনের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পরিস্থিতি একটা চাপা শঙ্কা তৈরি করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশেই যা দেখেছিলাম— দেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে ওঠা সেই অবর্ণনীয় আনন্দ— তা ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম।
৭ দিন আগে
আজ ৫ আগস্ট ২০২৬। সেই দুপুরের ঠিক দুই বছর পর। যে মিছিল সেদিন শাহবাগ, শহিদ মিনার আর যমুনার সামনের রাস্তায় থেমে গিয়েছিল আনন্দ-উল্লাসে, তার পায়ের শব্দ আজও যেন মিলিয়ে যায়নি। বদলেছে সরকার, বদলেছে সংসদ, বদলেছে রাষ্ট্রের নথিপত্র। কিন্তু সেই দিনের প্রশ্নগুলো এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
৭ দিন আগে