
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

ভোরবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজগোজ শেষ করার পর হঠাৎ মনে হয়— কী যেন একটা বাকি থেকে গেল! ঠোঁটে সামান্য একটু রঙের ছোঁয়া লাগতেই বদলে যায় পুরো মুখের অবয়ব, চোখে-মুখে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত সাধারণ মনে হওয়া এই ছোট্ট প্রসাধনীটি কেবল রূপচর্চার অনুষঙ্গ নয়, এটি ব্যক্তিত্ব-আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।
এটি বিশ্ব জুড়ে সম্ভবত এককভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রসাধনী পণ্য— লিপস্টিক, হস্তচালিত ঠোঁট-রঞ্জক থেকে শুরু করে আজকের দিনে যা পরিণত হয়েছে বিলিয়ন ডলারের বাজারে।
হঠাৎ করে লিপস্টিক নিয়ে পড়ার কারণ হলো— প্রতি বছরের ২৯ জুলাই দিনটিকে বিশ্ব জুড়ে পালন করা হয় ‘আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবস’ হিসেবে। না, এ দিবসে নেই কোনো সরকারি ছুটি। তবে বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যপ্রেমী, মেকআপ শিল্পী আর কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রির কাছে দিনটির অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।

বিশ্বের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত এই প্রসাধনীর পেছনে রয়েছে প্রায় চার হাজার বছরের এক দীর্ঘ, নাটকীয় ও বর্ণিল ইতিহাস। চার হাজার বছরের সেই বিবর্তনে লিপস্টিক আজ কেবল একখণ্ড মোম আর রঙের মিশ্রণ নয়, এটি ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি ও ফ্যাশনের ইতিহাস পেরিয়ে নারীর স্বাধিকার, আত্মবিশ্বাস ও স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের এক অমলিন প্রতীক।
কিন্তু লিপস্টিকের সূচনালগ্ন ঠিক হবে? সে প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ইতিহাসের পাতা উলটালে আমাদের ফিরে যেতে হবে সুদূর অতীতে, প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বছর আগের প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়।
ওই সময় আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উর নগরে সুমেরীয় রানি পু-আবি (কুইন শুবাদ) সাদা সিসার সঙ্গে গুঁড়ো করা লাল পাথর মিশিয়ে তৈরি করতেন এক বিশেষ মিশ্রণ, সেটিই ঠোঁটে লাগাতেন। প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণায় উঠে এসেছে, সামুদ্রিক ঝিনুকের খোলসে সংরক্ষিত থাকত এই রং। মেসোপটেমিয়ার নারীরা সৌন্দর্য ও সামাজিক অবস্থান বোঝাতে মূল্যবান রত্ন চূর্ণ করেও ঠোঁটে মাখতেন।
এ চর্চা বিস্তৃত হয় প্রাচীন মিসরে। সেখানে লাল ঠোঁট ছিল আভিজাত্য, ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। নারী ও পুরুষ— উভয়েই ঠোঁটে রং ব্যবহার করতেন। মিসরীয়রা লাল অকার মাটির সঙ্গে আঠা বা রেজিন মিশিয়ে ঠোঁটে দীর্ঘক্ষণ রঙ ধরে রাখার উপায় বের করে। তবে তারা ব্রোমিন ম্যানাইট ও আয়োডাইডের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে যে বেগুনি আভা তৈরি করত, তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘মৃত্যুচুম্বন’। কারণ এই উপাদান ব্যবহারে অনেকেই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তেন।
এই বিষাক্ত উপাদান এড়িয়ে নতুন উদ্ভাবনে এগিয়ে আসেন মিসরের বিখ্যাত রানি ক্লিওপেট্রা। তিনি পিপীলিকা ও কারমাইন পোকা গুঁড়ো করে প্রাপ্ত লাল রঞ্জক এবং ডুমুরের দুধ ও মোমের মিশ্রণে তৈরি করেন তার রাজকীয় লাল প্রসাধনী। কখনো কখনো এতে মাছের আঁশ মিশিয়ে একটি চমৎকার ঝিলমিলে ভাব আনা হতো।
প্রাচীন গ্রিস ও রোমেও ঠোঁট রাঙানোর প্রথার প্রচলন ছিল। তবে গ্রিসে একসময় লিপস্টিক কেবল যৌনকর্মীদের চেনার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তখন যৌনকর্মীদের জন্য আইনিভাবে বাধ্যবাধকতামূলক ছিল লিপস্টিক ব্যবহার করা। রোমান সাম্রাজ্যে আবার আভিজাত্য প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে পুরুষ ও অভিজাত নারীরা এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতেন।

সময়ের পরিক্রমায় লিপস্টিকের জনপ্রিয়তায় বহু উত্থান-পতন এসেছে। মধ্যযুগে ইউরোপে খ্রিস্টান গির্জার প্রভাব বাড়লে ঠোঁটে রঙ লাগানোকে ‘ঈশ্বরের কাজে হস্তক্ষেপ ও শয়তানের প্ররোচনা’ বা পাপ হিসেবে দেখা হতো। ১৮ শতকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এমন আইনও পাস করা হয়, যেখানে বলা হয়েছিল— কোনো নারী যদি প্রসাধনী দিয়ে পুরুষকে প্রলুব্ধ করে বিয়ে করেন, তবে সেই বিয়ে বাতিল হবে এবং ওই নারীকে ‘ডাইনি’ হিসেবে বিচার করা যেতে পারে!
তবে এই কঠোরতার মাঝেই এক নাটকীয় ব্যতিক্রম ঘটান ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ। তিনি তার ফ্যাকাশে মুখের সঙ্গে গাঢ় লাল ঠোঁটের বৈপরীত্য খুব পছন্দ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই লাল রঙ অশুভ আত্মাকে দূরে রাখে। রাজকীয় অনুমোদনে লাল ঠোঁট আবারও ইউরোপীয় আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়।
লিপস্টিকের কাঠামোগত বিবর্তনে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অবদানটি আসে আরব-স্পেনের প্রখ্যাত চিকিৎসক ও শল্যবিদ আবু আল-কাসিম আল-জাহরাভির হাত ধরে। তিনি সুগন্ধি ও রঙের মিশ্রণকে একটি বিশেষ ছাঁচে গড়িয়ে শক্ত কাঠির রূপ দেন। এটিই ছিল ইতিহাসে প্রথম সহজে বহনযোগ্য শক্ত লিপস্টিক, যা আজকের আধুনিক লিপস্টিক টিউবের আদি রূপ।

আধুনিক বাণিজ্যিক লিপস্টিকের যাত্রা শুরু হয় ১৮৮৪ সালে। ফরাসি ব্র্যান্ড ‘গেরল্যাঁ’ (Guerlain) হরিণের চর্বি, মৌমাছির মোম ও ক্যাস্টর অয়েল দিয়ে তৈরি লিপস্টিক রেশমি কাগজে মুড়ে বাজারে আনে। এরপর ১৯২৩ সালে মরিস লেভি পেঁচিয়ে খোলা ও বন্ধ করার সুইভেল টিউব উদ্ভাবন করেন, যা প্রসাধনী দুনিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে লিপস্টিক রূপচর্চার গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনেরও এক শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়।
নারীর ভোটাধিকার (১৯১২)
নিউইয়র্কের রাজপথে ‘সাফ্রেজেট’ আন্দোলনের নারী আন্দোলনকারীরা সমঅধিকার ও ভোটাধিকারের দাবিতে মিছিলে নামলে বিউটি উদ্যোক্তা এলিজাবেথ আরডেন তাদের হাতে লাল লিপস্টিক তুলে দেন। লাল ঠোঁট রাতারাতি নারীমুক্তি ও প্রতিবাদের প্রতীকে রূপ নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও চার্চিল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষের নারীদের কাছে লাল লিপস্টিক ছিল স্থিতিস্থাপকতা ও সাহসের প্রতীক। অ্যাডলফ হিটলার প্রসাধনী ও লাল লিপস্টিক চরম ঘৃণা করতেন। ফলে নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ও নারী শ্রমিকদের মনোবল ধরে রাখতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল যুদ্ধকালীন অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও লিপস্টিকের উৎপাদন বন্ধ করেননি।
বিদ্রোহ ও কেজিবির অস্ত্র
লিপস্টিক কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে, তার প্রমাণ মেলে ১৯৬৯ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে ‘ক্যাটারপিলার ট্র্যাকস’-এর ওপর বিশালাকার লাল লিপস্টিকের ভাস্কর্য নির্মাণে, যা যুদ্ধবিরোধী প্রতীক হিসেবে দাঁড়ায়। এমনকি স্নায়যুদ্ধকালে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি লিপস্টিকের আবরণে ৪ দশমিক ৫ মিলিমিটারের একক গুলিবর্ষণে সক্ষম ‘দ্য কিস অব ডেথ’ নামক পিস্তল তৈরি করেছিল!

আধুনিক যুগে ‘ইন্টারন্যাশনাল লিপস্টিক ডে’ বা ‘আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবস’ ব্যাপকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিউটি উদ্যোক্তা ও মেকআপ শিল্পী হুদা কাট্টান (হুদা বিউটির প্রতিষ্ঠাতা) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রঙের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের উদযাপনে এই দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করেন। সেই থেকে প্রতি বছরের ২৯ জুলাই প্রসাধনী ব্র্যান্ডগুলোর নতুন শেড উন্মোচন, বিশেষ ছাড় প্রদান ও ফ্যাশনপ্রেমীদের নানা আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে দিনটি পালিত হয়ে আসছে।
গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য, বিশ্বব্যাপী লিপস্টিকের বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আগামী কয়েক বছরে আরও কয়েক গুণ বাড়বে। বাজারে অসংখ্য শেড ও টেক্সচার (ম্যাট, গ্লসি, লিকুইড, টিন্ট) থাকলেও লাল শেডের আবেদন এখনো শীর্ষে। সর্বকালের সেরা ও জনপ্রিয় কিছু আইকনিক লাল শেডের মধ্যে রয়েছে—
প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ‘ভার্চুয়াল ট্রাই-অন’ ফিচারের সাহায্যে ঘরে বসেই ত্বকের সঙ্গে মানানসই শেড বেছে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি রাসায়নিকমুক্ত ও অর্গানিক উপাদানে তৈরি লিপস্টিকের চাহিদাও এখন তুঙ্গে।

লিপস্টিক কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ায় না, মানসম্মত লিপস্টিকে থাকা উপাদান ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতেও সাহায্য করে। তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক সচেতনতার ওপর জোর দেন—
মান যাচাই ও মেয়াদের দিকে খেয়াল রাখা
কসমেটিকস কেনার আগে উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদ যাচাই করা জরুরি। সাধারণত একটি লিপস্টিক ১২ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত ব্যবহার উপযোগী থাকে। রঙ বা গন্ধে পরিবর্তন এলে তা পরিহার করা উচিত।
সংক্রমণ এড়ানো
ব্যক্তিগত লিপস্টিক অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। এতে হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস, ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
ঠোঁটের আর্দ্রতা ও যত্ন
ম্যাট লিপস্টিক দীর্ঘদিন ব্যবহারে ঠোঁট শুষ্ক হতে পারে, তাই আগে লিপবাম ব্যবহার করা ভালো।
দিনের শেষে পরিষ্কার করা: ঘুমানোর আগে অবশ্যই মেকআপ রিমুভার, মাইসেলার ওয়াটার বা নারকেল তেল দিয়ে ঠোঁট ভালোভাবে পরিষ্কার করে লিপবাম লাগিয়ে নেওয়া উচিত।
বিশ্ব লিপস্টিক দিবস উদযাপনের জন্য বিশাল কোনো আয়োজনের প্রয়োজন পড়ে না। প্রিয় কোনো পুরোনো শেড ঠোঁটে মেখে নেওয়া, অনেক দিন ধরে কেনার তালিকায় থাকা নতুন কোনো রঙ চেষ্টা করা, কিংবা রঙিন ঠোঁটে প্রিয় একটি হাসিমুখের সেলফি তোলাই হতে পারে আজকের দিনের সেরা উদযাপন!

ভোরবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজগোজ শেষ করার পর হঠাৎ মনে হয়— কী যেন একটা বাকি থেকে গেল! ঠোঁটে সামান্য একটু রঙের ছোঁয়া লাগতেই বদলে যায় পুরো মুখের অবয়ব, চোখে-মুখে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত সাধারণ মনে হওয়া এই ছোট্ট প্রসাধনীটি কেবল রূপচর্চার অনুষঙ্গ নয়, এটি ব্যক্তিত্ব-আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।
এটি বিশ্ব জুড়ে সম্ভবত এককভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রসাধনী পণ্য— লিপস্টিক, হস্তচালিত ঠোঁট-রঞ্জক থেকে শুরু করে আজকের দিনে যা পরিণত হয়েছে বিলিয়ন ডলারের বাজারে।
হঠাৎ করে লিপস্টিক নিয়ে পড়ার কারণ হলো— প্রতি বছরের ২৯ জুলাই দিনটিকে বিশ্ব জুড়ে পালন করা হয় ‘আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবস’ হিসেবে। না, এ দিবসে নেই কোনো সরকারি ছুটি। তবে বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যপ্রেমী, মেকআপ শিল্পী আর কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রির কাছে দিনটির অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।

বিশ্বের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত এই প্রসাধনীর পেছনে রয়েছে প্রায় চার হাজার বছরের এক দীর্ঘ, নাটকীয় ও বর্ণিল ইতিহাস। চার হাজার বছরের সেই বিবর্তনে লিপস্টিক আজ কেবল একখণ্ড মোম আর রঙের মিশ্রণ নয়, এটি ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি ও ফ্যাশনের ইতিহাস পেরিয়ে নারীর স্বাধিকার, আত্মবিশ্বাস ও স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের এক অমলিন প্রতীক।
কিন্তু লিপস্টিকের সূচনালগ্ন ঠিক হবে? সে প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ইতিহাসের পাতা উলটালে আমাদের ফিরে যেতে হবে সুদূর অতীতে, প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বছর আগের প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়।
ওই সময় আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উর নগরে সুমেরীয় রানি পু-আবি (কুইন শুবাদ) সাদা সিসার সঙ্গে গুঁড়ো করা লাল পাথর মিশিয়ে তৈরি করতেন এক বিশেষ মিশ্রণ, সেটিই ঠোঁটে লাগাতেন। প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণায় উঠে এসেছে, সামুদ্রিক ঝিনুকের খোলসে সংরক্ষিত থাকত এই রং। মেসোপটেমিয়ার নারীরা সৌন্দর্য ও সামাজিক অবস্থান বোঝাতে মূল্যবান রত্ন চূর্ণ করেও ঠোঁটে মাখতেন।
এ চর্চা বিস্তৃত হয় প্রাচীন মিসরে। সেখানে লাল ঠোঁট ছিল আভিজাত্য, ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। নারী ও পুরুষ— উভয়েই ঠোঁটে রং ব্যবহার করতেন। মিসরীয়রা লাল অকার মাটির সঙ্গে আঠা বা রেজিন মিশিয়ে ঠোঁটে দীর্ঘক্ষণ রঙ ধরে রাখার উপায় বের করে। তবে তারা ব্রোমিন ম্যানাইট ও আয়োডাইডের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে যে বেগুনি আভা তৈরি করত, তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘মৃত্যুচুম্বন’। কারণ এই উপাদান ব্যবহারে অনেকেই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তেন।
এই বিষাক্ত উপাদান এড়িয়ে নতুন উদ্ভাবনে এগিয়ে আসেন মিসরের বিখ্যাত রানি ক্লিওপেট্রা। তিনি পিপীলিকা ও কারমাইন পোকা গুঁড়ো করে প্রাপ্ত লাল রঞ্জক এবং ডুমুরের দুধ ও মোমের মিশ্রণে তৈরি করেন তার রাজকীয় লাল প্রসাধনী। কখনো কখনো এতে মাছের আঁশ মিশিয়ে একটি চমৎকার ঝিলমিলে ভাব আনা হতো।
প্রাচীন গ্রিস ও রোমেও ঠোঁট রাঙানোর প্রথার প্রচলন ছিল। তবে গ্রিসে একসময় লিপস্টিক কেবল যৌনকর্মীদের চেনার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তখন যৌনকর্মীদের জন্য আইনিভাবে বাধ্যবাধকতামূলক ছিল লিপস্টিক ব্যবহার করা। রোমান সাম্রাজ্যে আবার আভিজাত্য প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে পুরুষ ও অভিজাত নারীরা এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতেন।

সময়ের পরিক্রমায় লিপস্টিকের জনপ্রিয়তায় বহু উত্থান-পতন এসেছে। মধ্যযুগে ইউরোপে খ্রিস্টান গির্জার প্রভাব বাড়লে ঠোঁটে রঙ লাগানোকে ‘ঈশ্বরের কাজে হস্তক্ষেপ ও শয়তানের প্ররোচনা’ বা পাপ হিসেবে দেখা হতো। ১৮ শতকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এমন আইনও পাস করা হয়, যেখানে বলা হয়েছিল— কোনো নারী যদি প্রসাধনী দিয়ে পুরুষকে প্রলুব্ধ করে বিয়ে করেন, তবে সেই বিয়ে বাতিল হবে এবং ওই নারীকে ‘ডাইনি’ হিসেবে বিচার করা যেতে পারে!
তবে এই কঠোরতার মাঝেই এক নাটকীয় ব্যতিক্রম ঘটান ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ। তিনি তার ফ্যাকাশে মুখের সঙ্গে গাঢ় লাল ঠোঁটের বৈপরীত্য খুব পছন্দ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই লাল রঙ অশুভ আত্মাকে দূরে রাখে। রাজকীয় অনুমোদনে লাল ঠোঁট আবারও ইউরোপীয় আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়।
লিপস্টিকের কাঠামোগত বিবর্তনে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অবদানটি আসে আরব-স্পেনের প্রখ্যাত চিকিৎসক ও শল্যবিদ আবু আল-কাসিম আল-জাহরাভির হাত ধরে। তিনি সুগন্ধি ও রঙের মিশ্রণকে একটি বিশেষ ছাঁচে গড়িয়ে শক্ত কাঠির রূপ দেন। এটিই ছিল ইতিহাসে প্রথম সহজে বহনযোগ্য শক্ত লিপস্টিক, যা আজকের আধুনিক লিপস্টিক টিউবের আদি রূপ।

আধুনিক বাণিজ্যিক লিপস্টিকের যাত্রা শুরু হয় ১৮৮৪ সালে। ফরাসি ব্র্যান্ড ‘গেরল্যাঁ’ (Guerlain) হরিণের চর্বি, মৌমাছির মোম ও ক্যাস্টর অয়েল দিয়ে তৈরি লিপস্টিক রেশমি কাগজে মুড়ে বাজারে আনে। এরপর ১৯২৩ সালে মরিস লেভি পেঁচিয়ে খোলা ও বন্ধ করার সুইভেল টিউব উদ্ভাবন করেন, যা প্রসাধনী দুনিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে লিপস্টিক রূপচর্চার গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনেরও এক শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়।
নারীর ভোটাধিকার (১৯১২)
নিউইয়র্কের রাজপথে ‘সাফ্রেজেট’ আন্দোলনের নারী আন্দোলনকারীরা সমঅধিকার ও ভোটাধিকারের দাবিতে মিছিলে নামলে বিউটি উদ্যোক্তা এলিজাবেথ আরডেন তাদের হাতে লাল লিপস্টিক তুলে দেন। লাল ঠোঁট রাতারাতি নারীমুক্তি ও প্রতিবাদের প্রতীকে রূপ নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও চার্চিল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষের নারীদের কাছে লাল লিপস্টিক ছিল স্থিতিস্থাপকতা ও সাহসের প্রতীক। অ্যাডলফ হিটলার প্রসাধনী ও লাল লিপস্টিক চরম ঘৃণা করতেন। ফলে নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ও নারী শ্রমিকদের মনোবল ধরে রাখতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল যুদ্ধকালীন অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও লিপস্টিকের উৎপাদন বন্ধ করেননি।
বিদ্রোহ ও কেজিবির অস্ত্র
লিপস্টিক কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে, তার প্রমাণ মেলে ১৯৬৯ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে ‘ক্যাটারপিলার ট্র্যাকস’-এর ওপর বিশালাকার লাল লিপস্টিকের ভাস্কর্য নির্মাণে, যা যুদ্ধবিরোধী প্রতীক হিসেবে দাঁড়ায়। এমনকি স্নায়যুদ্ধকালে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি লিপস্টিকের আবরণে ৪ দশমিক ৫ মিলিমিটারের একক গুলিবর্ষণে সক্ষম ‘দ্য কিস অব ডেথ’ নামক পিস্তল তৈরি করেছিল!

আধুনিক যুগে ‘ইন্টারন্যাশনাল লিপস্টিক ডে’ বা ‘আন্তর্জাতিক লিপস্টিক দিবস’ ব্যাপকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিউটি উদ্যোক্তা ও মেকআপ শিল্পী হুদা কাট্টান (হুদা বিউটির প্রতিষ্ঠাতা) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রঙের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের উদযাপনে এই দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করেন। সেই থেকে প্রতি বছরের ২৯ জুলাই প্রসাধনী ব্র্যান্ডগুলোর নতুন শেড উন্মোচন, বিশেষ ছাড় প্রদান ও ফ্যাশনপ্রেমীদের নানা আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে দিনটি পালিত হয়ে আসছে।
গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য, বিশ্বব্যাপী লিপস্টিকের বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আগামী কয়েক বছরে আরও কয়েক গুণ বাড়বে। বাজারে অসংখ্য শেড ও টেক্সচার (ম্যাট, গ্লসি, লিকুইড, টিন্ট) থাকলেও লাল শেডের আবেদন এখনো শীর্ষে। সর্বকালের সেরা ও জনপ্রিয় কিছু আইকনিক লাল শেডের মধ্যে রয়েছে—
প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ‘ভার্চুয়াল ট্রাই-অন’ ফিচারের সাহায্যে ঘরে বসেই ত্বকের সঙ্গে মানানসই শেড বেছে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি রাসায়নিকমুক্ত ও অর্গানিক উপাদানে তৈরি লিপস্টিকের চাহিদাও এখন তুঙ্গে।

লিপস্টিক কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ায় না, মানসম্মত লিপস্টিকে থাকা উপাদান ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতেও সাহায্য করে। তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক সচেতনতার ওপর জোর দেন—
মান যাচাই ও মেয়াদের দিকে খেয়াল রাখা
কসমেটিকস কেনার আগে উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদ যাচাই করা জরুরি। সাধারণত একটি লিপস্টিক ১২ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত ব্যবহার উপযোগী থাকে। রঙ বা গন্ধে পরিবর্তন এলে তা পরিহার করা উচিত।
সংক্রমণ এড়ানো
ব্যক্তিগত লিপস্টিক অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। এতে হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস, ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
ঠোঁটের আর্দ্রতা ও যত্ন
ম্যাট লিপস্টিক দীর্ঘদিন ব্যবহারে ঠোঁট শুষ্ক হতে পারে, তাই আগে লিপবাম ব্যবহার করা ভালো।
দিনের শেষে পরিষ্কার করা: ঘুমানোর আগে অবশ্যই মেকআপ রিমুভার, মাইসেলার ওয়াটার বা নারকেল তেল দিয়ে ঠোঁট ভালোভাবে পরিষ্কার করে লিপবাম লাগিয়ে নেওয়া উচিত।
বিশ্ব লিপস্টিক দিবস উদযাপনের জন্য বিশাল কোনো আয়োজনের প্রয়োজন পড়ে না। প্রিয় কোনো পুরোনো শেড ঠোঁটে মেখে নেওয়া, অনেক দিন ধরে কেনার তালিকায় থাকা নতুন কোনো রঙ চেষ্টা করা, কিংবা রঙিন ঠোঁটে প্রিয় একটি হাসিমুখের সেলফি তোলাই হতে পারে আজকের দিনের সেরা উদযাপন!

১৯৯৩ সাল ছিল স্যাম নিলের জন্য দারুণ একটি বছর। সে বছরই মুক্তি পায় ‘দ্য পিয়ানো’, যেখানে অন্যতম চরিত্রে ছিলেন স্যাম। এ চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পায়। ওই বছরই মুক্তি পায় স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ‘জুরাসিক পার্ক’। এ সিনেমার ড. অ্যালান গ্র্যান্ট চরিত্রটি বিশ্ব জুড়ে ব্যা
১৬ দিন আগে
মিসরের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব মন্ত্রণালয় বলছে, নতুন এই আবিষ্কারগুলো শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং বাইজান্টাইন শাসনামলে মিসরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি, ধর্মীয় চর্চা এবং নগর পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আনবে।
২৪ দিন আগে
মার্কিন পপ তারকা টেলর সুইফট ও এনএফএল তারকা ট্রাভিস কেলসি আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। শুক্রবার নিউইয়র্কে জাঁকজমকপূর্ণ এক আয়োজনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বহুল আলোচিত এই বিয়েকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ‘রাজকীয় বিয়ে’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
০৫ জুলাই ২০২৬
দীর্ঘ ৩০ বছর পর মরদেহের কোনো অবশেষ পাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার আশঙ্কায় মামলার বাদী ও সালমান শাহর পরিবার এই আবেদনটি করেছিলেন।
২৩ জুন ২০২৬